মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিদের কথা উঠলেই সবার আগে চোখে ভেসে ওঠে মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ রাজপরিবারগুলোর কথা। কিন্তু রাজকীয় উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্মিলিত পারিবারিক সম্পদ বাদ দিয়ে, যদি একক কোনো স্বনির্ভর মুসলিম ব্যবসায়ীর কথা বলা হয়, যার ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের কাছে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক রাজপুত্রের সম্পদও নস্যি—তবে বিশ্বমঞ্চে সবার শীর্ষে উঠে আসবে নাইজেরিয়ার কিংবদন্তি শিল্পোদ্যোক্তা আলিকো ডাঙ্গোটের নাম।
দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বজুড়ে মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে সবচেয়ে বিত্তশালী ও প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে নিজের একক আধিপত্য ধরে রেখেছেন আফ্রিকার এই শীর্ষ ধনী। ব্লুমবার্গ বিলিয়নিয়ার ইনডেক্সের সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, এই কিংবদন্তির মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৩৬ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
মধ্যপ্রাচ্যের রাজপরিবারগুলোর সম্মিলিত রাজকীয় সম্পদ বাদ দিলে, একক স্বনির্ভর মুসলিম ব্যবসায়ী হিসেবে ডাঙ্গোটেই এখন বিশ্বমঞ্চে সবার শীর্ষে। বিশ্বের শীর্ষ ধনীর তালিকায় তার অবস্থান বর্তমানে ৬৪তম।
কিন্তু কীভাবে নাইজেরিয়ার এক সাধারণ তরুণ থেকে ডাঙ্গোটে হয়ে উঠলেন বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যতম এক চালিকাশক্তি?আলিকো ডাঙ্গোটে/
জন্ম ও প্রাথমিক জীবন
১৯৫৭ সালের ১০ এপ্রিল নাইজেরিয়ার কানো রাজ্যের এক ঐতিহ্যবাহী মুসলিম পরিবারে আলিকো ডাঙ্গোটের জন্ম। তার পরিবারটি কেবল রক্ষণশীল ছিল না, বরং ব্যবসার দিক থেকেও ছিল অত্যন্ত সফল। তার মাতুলালয় ছিল সে সময়ের পশ্চিম আফ্রিকার অন্যতম শীর্ষ ধনী আলহাসান দান্তাতার পরিবার।
শৈশবেই ডাঙ্গোটে তার বাবাকে হারান। এরপর তার বড় হয়ে ওঠা নানা এবং মামাদের হাত ধরে। পারিবারিক পরিবেশটাই এমন ছিল যে, সেখানে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কেবল ব্যবসার আলাপ হতো। ফলে খুব ছোটবেলা থেকেই ডাঙ্গোটের রক্তে মিশে যায় বাণিজ্য।
এক সাক্ষাৎকারে তিনি নিজেই বলেছিলেন, ‘আমি যখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়তাম, তখন থেকেই লজেন্সের প্যাকেট কিনে এনে বন্ধুদের কাছে বিক্রি করতাম। স্রেফ মুনাফা করার আনন্দের জন্য আমি এটি করতাম।’
উচ্চশিক্ষা: কায়রোর আল-আজহারের দিনগুলো
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা নাইজেরিয়াতে শেষ করার পর উচ্চশিক্ষার জন্য ডাঙ্গোটে পাড়ি জমান মিশরে। মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন ও মর্যাদাপূর্ণ বিদ্যাপীঠ কায়রোর আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ব্যবসায় শিক্ষা ও প্রশাসন বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। আল-আজহারের দিনগুলো তার জীবনদর্শনে গভীর প্রভাব ফেলে। একদিকে তিনি যেমন আধুনিক ব্যবসার কৌশল শিখেছেন, অন্যদিকে ইসলামিক মূল্যবোধ ও শৃঙ্খলার পাঠও সেখান থেকেই গ্রহণ করেন।সামাজিক অনুষ্ঠানে আলিকো ডাঙ্গোটে/
ব্যবসায় হাতেখড়ি: মামার কাছ থেকে নেওয়া ৩০০০ ডলারের ঋণ
১৯৭৭ সালে, মাত্র ২০ বছর বয়সে ‘ডাঙ্গোটে গ্রুপ’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ব্যবসায় হাতেখড়ি হয় ডাঙ্গোটের। শুরুর দিকে নিজে ব্যবসা করার তীব্র ইচ্ছা থাকলেও পর্যাপ্ত পুঁজি ছিল না। তখন মামা সানসি দান্তাতার কাছ থেকে মাত্র পাঁচ লাখ নাইরা (যা তৎকালীন সময়ে প্রায় তিন হাজার মার্কিন ডলারের সমতুল্য ছিল) ঋণ নেন তিনি। শর্ত ছিল, তিন মাসের মধ্যে এই অর্থ ফেরত দিতে হবে।
ডাঙ্গোটে সেই টাকা দিয়ে কানো শহরে চাল, চিনি ও সিমেন্টের পাইকারি ব্যবসা শুরু করেন। অবিশ্বাস্য ঠেকলেও সত্য, ডাঙ্গোটে তার অসাধারণ মেধা ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে মাত্র তিন মাসের মধ্যেই মামার পুরো ঋণ পরিশোধ করতে সক্ষম হন।
আমদানিকারক থেকে উৎপাদক
১৯৮১ সালে তার হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত হয় ডাঙ্গোটে নাইজেরিয়া লিমিটেড এবং ব্লু স্টার সার্ভিসেস। ওই সময় চিনি, চাল, আটা, লবণ ও সিমেন্ট আমদানির মাধ্যমে নাইজেরিয়ার বাজারে একচেটিয়া ব্যবসা গড়ে তোলেন তিনি। তবে নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে ডাঙ্গোটে বুঝতে পারেন, শুধু আমদানির ওপর নির্ভর করে কোনো দেশের অর্থনীতি বা নিজের ব্যবসা দীর্ঘস্থায়ী করা সম্ভব নয়। আফ্রিকার উচিত নিজের প্রয়োজনীয় পণ্য নিজেই উৎপাদন করা।
এই ভাবনা থেকেই তিনি আমদানির ব্যবসা ছেড়ে পণ্য উৎপাদনে বিপুল বিনিয়োগ শুরু করেন। নাইজেরিয়াতেই একের পর এক চিনি পরিশোধন কেন্দ্র, আটার মিল ও লবণের কারখানা গড়ে তোলেন।
যেভাবে ডালপালা মেলল ডাঙ্গোটে সাম্রাজ্য
ডাঙ্গোটের ব্যবসায়িক জীবনের সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্ট ছিল সিমেন্ট উৎপাদন খাতে প্রবেশ করা। ডাঙ্গোটে সিমেন্ট বর্তমানে পুরো সাব-সাহারা আফ্রিকার বৃহত্তম সিমেন্ট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। নাইজেরিয়াসহ আফ্রিকার ১০টিরও বেশি দেশে এই কোম্পানির বিশাল উৎপাদন কারখানা রয়েছে।
তবে তার সাম্প্রতিক সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী এবং যুগান্তকারী প্রজেক্ট হলো ‘ডাঙ্গোটে অয়েল রিফাইনারি’। নাইজেরিয়া বিশ্বের অন্যতম প্রধান খনিজ তেল উৎপাদনকারী দেশ হওয়া সত্ত্বেও পরিশোধনের অভাবে এতকাল জ্বালানি আমদানি করত।
ডাঙ্গোটে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে লেগোসের উপকণ্ঠে বিশ্বের বৃহত্তম ‘সিঙ্গেল-ট্রেন’ তেল শোধনাগার নির্মাণ করেন। প্রতিদিন ৬ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল তেল পরিশোধনের ক্ষমতাসম্পন্ন এই মেগা প্রজেক্টটি নাইজেরিয়াকে তেল আমদানিকারক থেকে তেল রপ্তানিকারক দেশে রূপান্তর করেছে।
এই অভাবনীয় সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে ‘আফ্রিকান এনার্জি পারসন অব দ্য ইয়ার ২০২৬’ সম্মানে ভূষিত করেছে আফ্রিকান এনার্জি চেম্বার।
কীভাবে হলেন মুসলিমদের মধ্যে সবচেয়ে ধনী?
আলিকো ডাঙ্গোটের এই শীর্ষ ধনী হওয়ার নেপথ্যে রয়েছে কয়েকটি মূল কৌশল:
স্থানীয়করণ: বিদেশের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আফ্রিকার মাটিতেই কাঁচামাল ও পণ্য তৈরি করা।
মুনাফার পুনর্বিনিয়োগ: তিনি বিলাসবহুল জীবনযাপনে অর্থ ওড়ানোর চেয়ে ব্যবসার মুনাফা ফের নতুন বড় প্রকল্পে খাটানো পছন্দ করেন।
কঠোর নিয়মানুবর্তিতা: বিলিয়নিয়ার হওয়া সত্ত্বেও ডাঙ্গোটে এখনও কঠোর পরিশ্রম করেন। তিনি সাধারণত প্রতিদিন সকাল ৮টার মধ্যে অফিসে পৌঁছান এবং টানা রাত ৯টা বা তার বেশি সময় পর্যন্ত কাজ করেন। বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, ব্যবসার চাপের ওপর ভিত্তি করে তিনি অনেক সময় দৈনিক ১৪ থেকে ১৮ ঘণ্টাও কাজ করেন।
তিনি দৈনিক মাত্র চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা ঘুমান। সাধারণত রাত ১১টা বা ১২টার দিকে ঘুমাতে যান এবং ভোর ৫টায় ঘুম থেকে ওঠেন। কোনো কোনো জটিল প্রজেক্টের সময়ে তিনি রাত ২টায় ঘুমাতে গিয়ে ভোর ৫টায় উঠে পড়ার কথাও উল্লেখ করেছেন।
ঘুম থেকে ওঠার পর ভোর সাড়ে ৫টা থেকে সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত তিনি নিয়ম করে জিম করেন অথবা ট্রেডমিলে দৌড়ান। তার মতে, এই শরীরচর্চাই তাঁকে সারাদিন মানসিক চাপমুক্ত এবং সতেজ রাখতে সাহায্য করে।
ব্যবসাকে শখ মনে করা: ৬৯ বছর বয়সেও এত খাটতে পারার রহস্য হিসেবে তিনি বলেন, ‘আমি ব্যবসাকে কাজ মনে করি না, এটি আমার শখ। কাজ মনে করলে আমি এত পরিশ্রম করতে পারতাম না।’
সামাজিক কাজে অবদান
শুধু অর্থ উপার্জনই নয়, সম্পদ বিলিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রেও আলিকো ডাঙ্গোটে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। ১৯৯৪ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘আলিকো ডাঙ্গোটে ফাউন্ডেশন’। এটি বর্তমানে আফ্রিকার অন্যতম বৃহত্তম ব্যক্তিগত দাতব্য সংস্থা।
শিক্ষায় বিপ্লব: সম্প্রতি ২০২৬ সালে তিনি সুবিধাবঞ্চিত নাইজেরীয় শিক্ষার্থীদের জন্য প্রায় ১০০ বিলিয়ন নাইরার একটি বিশাল শিক্ষা সহায়তা প্রকল্প চালু করেছেন, যার লক্ষ্য ১৩ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থীর পড়াশোনা নিশ্চিত করা।
স্বাস্থ্য খাত: বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যৌথভাবে আফ্রিকা থেকে পোলিও নির্মূলে তিনি শত শত মিলিয়ন ডলার দান করেছেন। এছাড়াও ইবোলা ও করোনা মহামারির সময়ে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নে তার অবদান ছিল অনস্বীকার্য।
দারিদ্র্য বিমোচন ও দুর্যোগ মোকাবেলা: আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে খরা, বন্যা বা যে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে ডাঙ্গোটে ফাউন্ডেশন সবার আগে ত্রাণ ও পুনর্বাসনের কাজে এগিয়ে আসে।
৬৯ বছর বয়সী আলিকো ডাঙ্গোটে আজ কেবল একজন সফল ব্যবসায়ী নন, বরং পুরো আফ্রিকার অর্থনৈতিক স্বাধীনতার প্রতীক। সততা, সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত এবং নিজ মহাদেশের মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতাই কানোর এই মুসলিম তরুণকে বিশ্বের দরবারে নিয়ে গেছে এক অনন্য উচ্চতায়। বিশ্বের কোটি কোটি তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য আলিকো ডাঙ্গোটের জীবন এক জীবন্ত অনুপ্রেরণার নাম।
সূত্র: ফোর্বস, ব্লুমবার্গ, ইয়াহু ফিন্যান্স, টিআরটি আফ্রিকা
বাংলা৭১নিউজ/এসএএইচ
























