সংকট, গুজব ও নানা অস্থিরতার মধ্যেও গ্রাহকের আস্থা ধরে রেখে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক পিএলসি। ব্যাংক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন ও বিভিন্ন সংস্কারমূলক পদক্ষেপের কারণে একসময় চাপের মুখে পড়ে ব্যাংকটি। তবে, সেই পরিস্থিতি কাটিয়ে নতুন বছরে আবারও স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরতে শুরু করেছে প্রতিষ্ঠানটি। সংশ্লিষ্টদের মতে, কঠিন সময়েও বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো তারল্য সহায়তা নিতে হয়নি আল-আরাফাহকে। কোনো গ্রাহকের চেকও ফেরত যায়নি। বরং এ সময়ে ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে আমানত, বিনিয়োগ ও গ্রাহক সংখ্যা।
গত এক বছরে প্রযুক্তিনির্ভর ও গ্রাহককেন্দ্রিক ব্যাংকিং সেবা জোরদারে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকে। আধুনিক কোর ব্যাংকিং সিস্টেম চালুর মাধ্যমে লেনদেন আরও নিরাপদ, দ্রুত ও নিরবচ্ছিন্ন করা হয়েছে। একই সঙ্গে এজেন্ট ব্যাংকিং, ডিজিটাল ব্যাংকিং ও গ্রামীণ ক্ষুদ্র বিনিয়োগ কার্যক্রম সম্প্রসারণের ফলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যেও ব্যাংকটির কার্যক্রমের বিস্তার ঘটেছে। কঠিন সময় পেরিয়ে সুশাসন, জবাবদিহিতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ভিত্তিতে দেশের অন্যতম ইসলামী ধারার ব্যাংকটি আবারও আস্থা ও স্থিতিশীলতার জায়গায় ফিরতে শুরু করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের শুরুতে দেশের ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও গ্রাহকের আমানত সুরক্ষায় বড় ধরনের উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এর অংশ হিসেবে ১২টি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয় এবং নিবিড় তদারকির জন্য গঠন করা হয় স্বতন্ত্র পর্ষদ। এই তালিকায় আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক ছিল।
পরবর্তীতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণ ও বিভিন্ন সংস্থার অনুসন্ধানে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা ও কার্যক্রমে কিছু অনিয়ম ও দুর্বলতার চিত্র উঠে আসে। সুশাসন নিশ্চিত করতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনায় ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ছয় শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এসব পদক্ষেপ এবং সার্বিক পরিস্থিতির প্রভাবে ২০২৫ সালজুড়ে ব্যাংকটির কার্যক্রমে একধরনের অস্থিরতা দেখা দেয়।
তবে, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ একাধিক সংস্থার অডিটে ব্যাংকটি থেকে বড় ধরনের আর্থিক লুটপাট বা অর্থ পাচারের প্রমাণ মেলেনি। ফলে সংকট মোকাবিলা ও সংস্কার কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে তুলনামূলক দ্রুত সময়েই স্থিতিশীলতার পথে ফিরতে শুরু করে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক।
গত বছর শেষে ব্যাংকটির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সূচকে ইতিবাচক অগ্রগতির চিত্র উঠে এসেছে। আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের আমানত ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে দাঁড়িয়েছে ৫৪ হাজার ৫৯৩ কোটি টাকায়, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৫১ হাজার ৬০৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ নানা সংকট ও অনিশ্চয়তার মধ্যেও এক বছরে ব্যাংকটির আমানত বেড়েছে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা।
একই সময়ে বেড়েছে গ্রাহক হিসাবের সংখ্যাও। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটির আমানত হিসাবের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৮ লাখ ৬৬ হাজার ৪৪৭টিতে, যা ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে ছিল ৩৬ লাখ ৩৭ হাজার ২৪০টি। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে নতুন করে যুক্ত হয়েছে প্রায় দুই লাখ ২৯ হাজার হিসাব। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অস্থির পরিস্থিতির মধ্যেও গ্রাহকদের আস্থা ধরে রাখতে পারার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে এই প্রবৃদ্ধিতে।
বিনিয়োগ কার্যক্রমেও স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি বজায় রেখেছে ব্যাংকটি। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকের মোট বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ৫০ হাজার ৪৫৬ কোটি টাকায়, যেখানে আগের বছর একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৪৮ হাজার ৮৮৯ কোটি টাকা। ফলে সার্বিকভাবে আমানত, গ্রাহক সংখ্যা ও বিনিয়োগ তিনটি সূচকেই ইতিবাচক ধারায় এগিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
ব্যাংকটির সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসে পরিচালন মুনাফা হয়েছে ৮৫ কোটি টাকা। একই সময়ে এক লাখ ৮০ হাজার অ্যাকাউন্ট বেড়েছে। গত এপ্রিল মাস শেষে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের আমানত হিসাব সংখ্যা দাড়িয়েছে ৪০ লাখ ৪৫ হাজার। এ সময়ে বৈদেশিক বাণিজ্য হয়েছে প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকার। বর্তমানে ব্যাংকের ডিপোজিট ও বিনিয়োগ স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক অস্থিরতার মধ্যেও আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক কখনও তারল্য সংকটে পড়েনি। ফলে খাতের অন্য কয়েকটি বিপর্যস্ত ব্যাংকের মতো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জরুরি তারল্য সহায়তার প্রয়োজন হয়নি প্রতিষ্ঠানটির। যেখানে কিছু ব্যাংকে গ্রাহকদের ছোট অঙ্কের চেকও ফেরত যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে, সেখানে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকে কোনো গ্রাহকের চেক ফেরত যায়নি বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন।
সংকটকালেও গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী লেনদেন ও ব্যাংকিং সেবা অব্যাহত রাখতে সক্ষম হয়েছে ব্যাংকটি। এমন পরিস্থিতিও তৈরি হয়নি যে কোনো গ্রাহক কাঙ্ক্ষিত সেবা না পেয়ে শাখা থেকে ফিরে গেছেন। ফলে সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে ব্যাংকটিকে ঘিরে বড় ধরনের আস্থাহীনতা তৈরি হয়নি। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, কঠিন সময়ে ব্যাংক ব্যবস্থাপনার কার্যকর সিদ্ধান্ত ও সেবা সচল রাখার সক্ষমতাই এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
ব্যাংকটির কর্মকর্তারা বলছেন, গত দেড় বছরে নেওয়া একাধিক সংস্কার ও কাঠামোগত পদক্ষেপের সুফল এখন দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। সুশাসন নিশ্চিত করা, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ জোরদার এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা তৈরির লক্ষ্যেই এসব উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর অংশ হিসেবে চলতি বছরের শুরুতে ব্যাংকের প্রযুক্তিগত অবকাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে।
আধুনিক কোর ব্যাংকিং সিস্টেম ‘আবাবিল এনজি’ চালুর ফলে লেনদেন এখন আরও নিরাপদ, দ্রুত ও নিরবচ্ছিন্ন হয়েছে। একই সঙ্গে ইন্টারনেট ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিং, এটিএম, বিএফটিএন, আরটিজিএস ও এনপিএসবি সেবার কার্যকারিতা ও নির্ভরযোগ্যতাও বেড়েছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, এর মাধ্যমে ভবিষ্যতমুখী স্মার্ট ও ডিজিটাল ব্যাংকিং ব্যবস্থার দিকে আরও এক ধাপ এগিয়েছে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক।
গ্রামীণ অর্থনীতিতেও নিজেদের উপস্থিতি আরও জোরদার করেছে ব্যাংকটি। বর্তমানে দেশের ৩০৬টি উপজেলায় ছড়িয়ে থাকা ৭৩৮টি এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটের মাধ্যমে সেবা দিচ্ছে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক। গত ১৬ মাসে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে নতুন হিসাব যুক্ত হয়েছে প্রায় এক লাখ ৪৭ হাজার। এই খাতে আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে চার হাজার ৭০ কোটি টাকায়। এর মধ্যে ৮৮ শতাংশ আউটলেট গ্রামীণ এলাকায় অবস্থিত এবং প্রায় অর্ধেক গ্রাহকই নারী। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানোর ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি।
গ্রামীণ ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে পরিচালিত আল-আরাফাহ রুরাল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম (এআরডিপি) কার্যক্রমও সম্প্রসারিত হয়েছে। বর্তমানে দেশের দুই হাজার ৭৮০টি গ্রামে এ কর্মসূচির কার্যক্রম চালু রয়েছে। সদস্য সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৬ হাজারের বেশি, যার ৭২ শতাংশ নারী। গত ১৬ মাসে এ কর্মসূচির আওতায় প্রায় ৩০ হাজার নতুন হিসাব যুক্ত হয়েছে।
বর্তমানে মোট হিসাব সংখ্যা চার লাখ ১০ হাজার ৯০০। একই সময়ে আমানত বেড়েছে প্রায় ২০০ কোটি টাকা। বর্তমানে এআরডিপির আওতায় আমানতের পরিমাণ ৭৫০ কোটি টাকা এবং বিনিয়োগ ৫৪১ কোটি টাকা।
ডিজিটাল ব্যাংকিংয়েও সমন্বিত একটি শরিয়াহভিত্তিক ফাইন্যান্সিয়াল ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে ব্যাংকটি। ইন্টারনেট ব্যাংকিং, ইসলামিক ওয়ালেট, বাংলা কিউআর, এজেন্ট ব্যাংকিং ও এআরডিপিকে একই নেটওয়ার্কের আওতায় আনার মাধ্যমে সঞ্চয়, দান, শিক্ষা ও বিনিয়োগ কার্যক্রমকে ক্যাশলেস ব্যবস্থায় নিয়ে আসার চেষ্টা চলছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি দেশের ইসলামী ধারার ব্যাংকিং ব্যবস্থায় একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বর্তমানে সারা দেশে ২২৬টি শাখা, ৮৯টি উপশাখা এবং ৭৩৮টি এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটের মাধ্যমে গ্রাহক সেবা দিচ্ছে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক।
ব্যাংকের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রাফাত উল্লাহ খান বলেন, আস্থা হারানো সহজ হলেও তা পুনরুদ্ধার করা অনেক কঠিন। নানা চ্যালেঞ্জ, গুজব ও অস্থিরতার মধ্যেও গ্রাহকের আস্থা ধরে রাখতে পারা ব্যাংকটির সবচেয়ে বড় অর্জন। তার ভাষ্য, ‘সংকটের সময়েও বাংলাদেশ ব্যাংকের তারল্য সহায়তা নিতে হয়নি, কোনো গ্রাহকের চেক ফেরত যায়নি; বরং আমানত, বিনিয়োগ ও গ্রাহক সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। এটি প্রমাণ করে যে সুশাসন, জবাবদিহিতা ও প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে একটি প্রতিষ্ঠান আবারও শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ডিজিটাল ব্যাংকিং, এজেন্ট ব্যাংকিং ও গ্রামীণ উন্নয়ন কার্যক্রম সম্প্রসারণের ফলে সাধারণ মানুষের কাছে ব্যাংকিং সেবা আরও সহজ ও নির্ভরযোগ্য হয়েছে। বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তা ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। সংকটকে আড়াল না করে সংস্কারের মাধ্যমে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টাকেই ব্যাংকটির পুনরুদ্ধারের মূল শক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
বাংলা৭১নিউজ/এবি