বিশ্ববাজারে হালাল পণ্যের চাহিদা ও বাজার ক্রমেই সম্প্রসারিত হচ্ছে। খাদ্যপণ্যের পাশাপাশি তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য, প্রসাধনী, ওষুধ ও কৃষিশিল্পেও বাড়ছে হালাল মান ও সার্টিফিকেশনের গুরুত্ব। তবে বাংলাদেশের হালাল শিল্পের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে আস্থার সংকট, সার্টিফিকেশন নিয়ে অস্পষ্টতা, কাঁচামালের উৎস শনাক্তকরণ এবং সমন্বিত নীতিমালার অভাব বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ খাতের বিকাশে একটি সমন্বিত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, নির্ভরযোগ্য সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা এবং উৎপাদনের প্রতিটি পর্যায়ে ট্রেসিবিলিটি নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছেন ব্যবসায়ী ও খাত বিশেষজ্ঞরা।
শনিবার (৭ নভেম্বর) সকালে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ইনভেস্টমেন্ট বাংলাদেশের সম্মেলন কক্ষে ‘ইনভেস্টস মিটআপ ৩.০’ অনুষ্ঠানে ‘হালাল শিল্পে বিনিয়োগ’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনায় এসব বিষয় উঠে আসে।
আলোচনায় বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার পারভেজ বলেন, ইসলামিক ফাউন্ডেশন কিংবা বিএসটিআই; কোনো প্রতিষ্ঠানই এখন পর্যন্ত ব্যবসায়ীদের মধ্যে প্রত্যাশিত আস্থা তৈরি করতে পারেনি। এ ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের অসচেতনতা ও সমন্বয়ের অভাবও রয়েছে।
তিনি বলেন, সবাইকে একটি ছাতার নিচে এনে একটি হালাল ইনস্টিটিউট বা পৃথক হালাল বিভাগ গঠন করা হলে সংশ্লিষ্ট সবাই উপকৃত হবেন। সমন্বিতভাবে নীতিমালা ও গাইডলাইন তৈরি করা গেলে হালাল পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানির সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ীদের অযথা বিড়ম্বনায় পড়তে হবে না।
ট্রেসিবিলিটির গুরুত্ব তুলে ধরে আনোয়ার পারভেজ বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে এখন শুধু পণ্যের মান নয়, কাঁচামালের উৎস এবং উৎপাদন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একটি সুতা কোথা থেকে সংগ্রহ করা হচ্ছে, তুলার উৎপত্তি কী, সেটির সার্টিফিকেশন আছে কি না, এসব তথ্যও ক্রেতারা জানতে চান।
তিনি বলেন, কাঁচামালের উৎস থেকে শুরু করে উৎপাদনের প্রতিটি ধাপের তথ্য সংরক্ষণ করতে হচ্ছে। শুধু হালাল পণ্যের ক্ষেত্রেই নয়, তৈরি পোশাকশিল্পেও এ ধরনের ট্রেসিবিলিটি এখন বড় শর্ত।
আনোয়ার পারভেজ আরও বলেন, কৃষিতে ব্যবহৃত সার ও রাসায়নিক উপাদান পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর কি না, উৎপাদন প্রক্রিয়া পরিবেশবান্ধব কি না, এসব বিষয়ও আন্তর্জাতিক ক্রেতারা গুরুত্ব দিচ্ছেন। বিশেষ করে ইউরোপের বাজারে পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ও পণ্যের উৎস শনাক্ত করার বিষয়টি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে।
তিনি বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে এ ধরনের সার্টিফিকেশন ও ট্রেসিবিলিটি ছাড়া তৈরি পোশাক রপ্তানি কঠিন হয়ে উঠতে পারে। গার্মেন্টস খাতে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের এসব শর্ত পূরণ করা সম্ভব হলে হালাল শিল্পেও একই ধরনের ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। তবে এ জন্য প্রয়োজন নীতিগত সিদ্ধান্ত ও সবার সম্মিলিত অঙ্গীকার।
এ সময় এক ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, চামড়াজাত পণ্য হালাল সার্টিফাই করতে গিয়ে নানা সমস্যার মুখে পড়তে হয়। বিশেষ করে পশুর উৎপত্তি ও সরবরাহের ধারাবাহিক তথ্য বা ট্রেসিবিলিটি পাওয়া কঠিন। আরেক ব্যবসায়ী বলেন, কোন প্রতিষ্ঠান থেকে হালাল সার্টিফিকেশন নিতে হবে, তা নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে দ্বিধা রয়েছে।
জবাবে সাবেক বিএসটিআই মহাপরিচালক এস এম ফেরদৌস আলম বলেন, ইসলামিক ফাউন্ডেশন কিংবা বিএসটিআই, যে প্রতিষ্ঠান থেকেই সার্টিফিকেশন দেওয়া হোক না কেন, নির্ধারিত প্রটোকল অনুসরণ করতেই হবে। নির্দিষ্ট পণ্যের জন্য কীভাবে সার্টিফিকেশন দিতে হবে, তা প্রটোকলে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।
তিনি বলেন, শরিয়াহভিত্তিক বিষয়গুলো যাচাইয়ের জন্য বিএসটিআইয়ের পাঁচ থেকে ছয়টি টিম রয়েছে। এসব টিমের সদস্যরা কারখানা পরিদর্শন করেন এবং উৎপাদনের বিভিন্ন ধাপ পর্যবেক্ষণ করেন। প্রথম পর্যায়ে কোনো ত্রুটি পাওয়া গেলে পরবর্তী পর্যায়ে তা সংশোধনের সুযোগ দেওয়া হয়। এরপর চূড়ান্ত অনুমোদনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। বিএসটিআইয়ের সক্ষমতা তুলে ধরে ফেরদৌস আলম বলেন, আন্তর্জাতিক অ্যাক্রেডিটেশনের জন্য প্রতিষ্ঠানটি প্রস্তুত। শুরুতে হালাল সার্টিফিকেশনের দায়িত্ব ইসলামিক ফাউন্ডেশনকে দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানটি এককভাবে কার্যক্রম পরিচালনায় সমস্যায় পড়লে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনায় বিএসটিআইকেও এ কার্যক্রমে যুক্ত করা হয়।
তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে বিএসটিআইয়ে হালাল ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে কোটি কোটি টাকার আধুনিক যন্ত্রপাতি রয়েছে। ল্যাবটি অ্যাক্রেডিটেশনও পেয়েছে। তাই বিএসটিআইয়ের সার্টিফিকেশন নিয়ে ব্যবসায়ীদের দ্বিধান্বিত হওয়ার কারণ নেই। প্রতিষ্ঠানটি থেকে হালাল সার্টিফিকেশন নেওয়া সম্ভব।
অন্যদিকে, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের হালাল সার্টিফিকেশন বিভাগের পরিচালক ড. এ কে এম বদরুল আহসান বলেন, ২০২৩ সালে হালাল সার্টিফিকেট নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। বিভিন্ন আন্তমন্ত্রণালয় সভার পর সরকারি অ্যালোকেশন অব বিজনেসে হালাল সার্টিফিকেশনের দায়িত্ব ইসলামিক ফাউন্ডেশনকে দেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ইসলামিক ফাউন্ডেশনকে হালাল সার্টিফিকেশন ও হালাল স্ট্যান্ডার্ড সার্টিফিকেশনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
অনুষ্ঠানে ‘হালাল শিল্পে বিনিয়োগের সম্ভাবনা’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক মো. মমিনুল ইসলাম। প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালে বৈশ্বিক হালাল অর্থনীতির বাজারের আকার ছিল প্রায় ৭ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২৪ থেকে ২০৩৪ সাল পর্যন্ত বার্ষিক ৬ দশমিক ২ শতাংশ চক্রবৃদ্ধি প্রবৃদ্ধির হার (সিএজিআর) বজায় থাকলে ২০৩৪ সালের মধ্যে এ বাজারের আকার ১২ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
এতে আরও বলা হয়, বৈশ্বিক সামগ্রিক অর্থনীতিতে হালাল খাতের অবদান প্রায় ১১ দশমিক ৪ শতাংশ। বিশ্বজুড়ে মুসলিম ভোক্তার সংখ্যা প্রায় ১ দশমিক ৯ বিলিয়ন, যা মোট বিশ্ব জনসংখ্যার প্রায় ২৪ শতাংশ। ফলে হালাল পণ্যের বাজারে খাদ্যপণ্যের পাশাপাশি তৈরি পোশাক, প্রসাধনী, ওষুধ, পর্যটন ও আর্থিক সেবারও বড় সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রবন্ধে জানানো হয়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৯৪৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের হালাল পণ্য রপ্তানির সম্ভাবনা বা পূর্বাভাস রয়েছে। দেশে বর্তমানে ৮০২টি হালাল সার্টিফায়েড পণ্য এবং ৩০১টি হালাল সার্টিফায়েড উৎপাদক প্রতিষ্ঠান সক্রিয় রয়েছে। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯১ শতাংশ মুসলিম হওয়ায় অভ্যন্তরীণ বাজারেও হালাল পণ্যের বিশাল ভোক্তা গোষ্ঠী রয়েছে।
বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ






















