বিশ্বজুড়ে অন্তত ২২০ কোটি মানুষ কাছের বা দূরের জিনিস দেখতে সমস্যায় ভুগছেন। এর মধ্যে অন্তত ১০০ কোটি মানুষের দৃষ্টিসমস্যা প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিল, অথবা এখনো চিকিৎসার মাধ্যমে সমাধান করা যেতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত তথ্যপত্রে উঠে এসেছে এমনই উদ্বেগজনক চিত্র।
দৃষ্টিশক্তির সমস্যা শুধু চোখে কম দেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি শিশুদের শেখার ক্ষমতা, প্রাপ্তবয়স্কদের কর্মজীবন এবং বয়স্কদের স্বাভাবিক চলাফেরা ও স্বাধীন জীবনযাপনে প্রভাব ফেলে। তবে আশার কথা হলো, নিয়মিত চোখ পরীক্ষা, সঠিক সময়ে চিকিৎসা এবং প্রয়োজনীয় চশমা ব্যবহারের মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রেই দৃষ্টিসমস্যা প্রতিরোধ বা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
দৃষ্টিসমস্যার প্রধান কারণ কী
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হলো চোখের প্রতিসরণজনিত ত্রুটি। চোখে আলো সঠিকভাবে ফোকাস না হলে দূরের বা কাছের জিনিস দেখতে সমস্যা হয়। সাধারণত সঠিক পাওয়ারের চশমা বা কনট্যাক্ট লেন্স ব্যবহার করে এই সমস্যা সমাধান করা যায়। শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক উভয়ের ক্ষেত্রেই এটি দৃষ্টিসমস্যার অন্যতম প্রধান কারণ।
আরেকটি বড় কারণ ছানি। চোখের লেন্স ঘোলা হয়ে গেলে দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ছানি দূর করা সম্ভব হলেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা অনেকের নাগালের বাইরে থেকে যায়। এ ছাড়া গ্লুকোমা, বয়সজনিত ম্যাকুলার ডিজেনারেশন এবং ডায়াবেটিসের কারণে রেটিনার ক্ষতি দৃষ্টিশক্তি কমিয়ে দিতে পারে। মানুষের গড় আয়ু বাড়ার পাশাপাশি ডায়াবেটিসের প্রকোপ বৃদ্ধির কারণে এসব সমস্যার ঝুঁকিও বাড়ছে। ৪০ বছর বয়সের পর অনেকের কাছের জিনিস দেখতে অসুবিধা হয়। এই সমস্যাকে বলা হয় প্রেসবায়োপিয়া। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে প্রায় ৮২ কোটি ৬০ লাখ মানুষ এই সমস্যায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসা বা চশমা পাচ্ছেন না।
চোখের সমস্যা হলে জীবনে কী প্রভাব পড়ে
শিশুদের ছোটবেলা থেকে গুরুতর দৃষ্টিসমস্যা থাকলে তাদের শারীরিক, ভাষাগত, সামাজিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। স্কুলপড়ুয়া শিশুদের পড়াশোনার ফলও খারাপ হতে পারে। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে দৃষ্টিসমস্যা কাজের সুযোগ কমাতে পারে এবং উদ্বেগ ও বিষণ্নতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বয়স্কদের চলাফেরায় অসুবিধা, পড়ে গিয়ে আঘাত পাওয়া, হাড় ভাঙা এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার ঝুঁকি বাড়ে।
চোখ ভালো রাখতে যা করবেন
নিয়মিত চোখ পরীক্ষা করান: চোখে কোনো সমস্যা অনুভব না করলেও প্রয়োজন অনুযায়ী চোখ পরীক্ষা করানো জরুরি। এতে ছানি, গ্লুকোমা, চোখের পাওয়ারের সমস্যা এবং ডায়াবেটিসজনিত চোখের ক্ষতি প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা সম্ভব।
প্রয়োজনে চশমা ব্যবহার করুন: চোখ কুঁচকে দেখতে হলে, পড়ার সময় মাথাব্যথা হলে, রাতে দেখতে সমস্যা হলে কিংবা মোবাইলের লেখা পড়তে ফোন দূরে সরিয়ে ধরতে হলে চোখের পরীক্ষা করান। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সঠিক পাওয়ারের চশমা ব্যবহার করুন।
ডায়াবেটিস থাকলে বাড়তি সতর্ক থাকুন: ডায়াবেটিস চোখের রেটিনার ক্ষতি করতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত চোখ পরীক্ষা করান এবং রক্তে শর্করা, রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখুন। চোখের সংক্রমণ ও আঘেলাকে অবহেলা করবেন না: চোখে আঘাত লাগলে বা সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিন। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া চোখে কোনো ওষুধ, ঘরোয়া উপাদান বা অনিরাপদ ভেষজ চিকিৎসা ব্যবহার করবেন না।
হঠাৎ দৃষ্টি কমে যাওয়া বা হারিয়ে যাওয়া, চোখে তীব্র ব্যথা, চোখ লাল হওয়ার সঙ্গে ঝাপসা দেখা, হঠাৎ আলোর ঝলকানি বা ভাসমান দাগ দেখা, দৃষ্টির সামনে পর্দা নেমে আসার মতো অনুভূতি কিংবা চোখে রাসায়নিক পদার্থ পড়লে দেরি না করে জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, দৃষ্টিসমস্যার অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিরোধ, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের মাধ্যমে উপকার পাওয়া সম্ভব। যাঁদের দৃষ্টিশক্তির ক্ষতি পুরোপুরি ফিরিয়ে আনা যায় না, তাদের জন্যও বিশেষ পুনর্বাসনসেবা দৈনন্দিন কাজ করা এবং স্বাধীনভাবে জীবনযাপনে সহায়তা করতে পারে।
সূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস
বাংলা৭১নিউজ/জেএস


























