ঢাকা ১১:২৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬, ৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo শিল্পকলায় রুনা লায়লার সংগীতানুষ্ঠান শুক্রবার Logo প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী পদে দায়িত্ব গ্রহণ করলেন রাশেদ Logo মোদির বাসভবনের সামনে থেকে রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা আটক Logo জোরালো হচ্ছে মোদির পদত্যাগের দাবি Logo সরকার সাইবার বুলিংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে: তথ্য উপদেষ্টা Logo তেজগাঁওয়ে ভাঙারি ব্যবসায়ী হত্যা, র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার ২ Logo ‘কঠিন সময়েই দায়িত্ব পেয়েছি, আবার ঘুরে দাঁড়াবে আল-আরাফাহ ব্যাংক’ Logo বদলির তদবির নিয়ে শিক্ষকদের ভিড়ে অফিসে ঢুকতে পারি না: শিক্ষামন্ত্রী Logo ১২ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দেবে রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স Logo টাঙ্গাইলে যমুনার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে ভয়াবহ ভাঙন, বড় বিপর্যয়ের আশঙ্কা

ফাইনাল শেষে মারপিট : যে ধরনের শাস্তির মুখে পড়তে পারে আর্জেন্টিনা?

বিশ্বকাপ ফাইনালের শেষ দিকে ঘটে যাওয়া বিরূপ আচরণের জেরে আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে তদন্ত হবে বলে নিশ্চিত করেছে ফিফা। মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ফাইনালের শেষ বাঁশি বাজার পর কী ঘটেছিল– তা মূল্যায়নের জন্য ফিফার শৃঙ্খলা কমিটি একজন প্রসিকিউটর নিয়োগ করেছে যিনি শৃঙ্খলা ও নৈতিকতা বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন।

এই ঘটনায় দোষি প্রমাণিত হলে খেলোয়াড় বা কোচ নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে পারেন, আর আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ)-কেও জরিমানা করা হতে পারে। রবিবার ১-০ গোলে হারের পর স্পেন বিশ্বকাপ জয়ের উদযাপন শুরু করলে আর্জেন্টিনা দলের সদস্য ও তাদের সহায়ক স্টাফদের কয়েকজনের সঙ্গে স্পেনের খেলোয়াড়দের বাকবিতণ্ডা ও সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ার ঘটনা ঘটে।

নাহুয়েল মোলিনা, লিয়ান্দ্রো পারেদেস, থিয়াগো আলমাদা এবং সহকারী কোচ রবার্তো আয়ালা এই ঘটনায় জড়িত ছিলেন বলে দেখা যায়। প্রথমে ফিফা জানিয়েছিল যে, স্পেনের এরিক গার্সিয়ার গলায় ধাক্কা দেওয়ার কারণে রেফারি স্লাভকো ভিনচিচ পারেদেসকে লাল কার্ড দেখিয়েছেন।

তবে অল্প সময় পরই পারেদেসের লাল কার্ডটি নথি থেকে সরিয়ে ফেলা হয় এবং ফিফা বিবিসি স্পোর্টকে নিশ্চিত করে যে তখন কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। আর্জেন্টিনা এর আগেই একজন খেলোয়াড়কে হারিয়েছিল। দ্বিতীয়ার্ধের যোগ করা সময়ে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন এনজো ফার্নান্দেজ।

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ২-১ গোলে সেমিফাইনাল জয়ের পর ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের ওপর আর্জেন্টিনার দাবির সমর্থনে একটি ব্যানার প্রদর্শন করায় দলটির বিরুদ্ধে সম্ভাব্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া আগেই শুরু করেছিল ফিফা।

বিশ্বকাপ ফাইনালের পর কী ঘটেছিল?
নিউ জার্সিতে শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে লিওনেল মেসিসহ আর্জেন্টিনার কয়েকজন খেলোয়াড় মাঠে লুটিয়ে পড়েন। অন্যরা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন, আর স্পেনের খেলোয়াড়রা উল্লাসে দৌড়ে মাঠজুড়ে ছড়িয়ে পড়েন। অতিরিক্ত সময়ে বদলি হয়ে মাঠ ছাড়ার পর রদ্রি ডাগআউট থেকে ছুটে এসে সতীর্থদের সঙ্গে যোগ দেন।

ম্যানচেস্টার সিটির মিডফিল্ডার রদ্রি পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডার মোলিনাকে তার বাহু বা পেটে ঘুষি মারতে দেখা যায়। সেখান থেকেই পরিস্থিতির সূত্রপাত হয়। রদ্রি মোলিনার মুখোমুখি হন, তবে আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে এগিয়ে যেতে দেখা যায় আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়কেই।

সতীর্থকে সমর্থন দিতে গার্সিয়া এগিয়ে গেলে পারেদেসও ঘটনায় জড়িয়ে পড়েন এবং গার্সিয়ার গলায় আঙুল দিয়ে খোঁচা দেন। বেঞ্চে থাকা বদলি খেলোয়াড় গাভি পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করলে আলমাদা তাকে মাটিতে ফেলে দেন।

এরপর পারেদেস স্প্যানিশ খেলোয়াড়টির মুখে হাত রেখে তাকে মাটিতে ঠেলে দেন। আয়ালাকে গার্সিয়ার গলার কাছে ধরে থাকতে দেখা যায়। পরে তাকে স্পেনের মিডফিল্ডার দানি ওলমোর ওপর আঘাত করতেও দেখা যায়।

বিবিসি ওয়ানের সম্প্রচারে অ্যালান শিয়ারার বলেন, “পারেদেস কারও মুখের দিকে দুই বা তিনটি জোরালো ঘুষি ছুড়ে মেরেছে। সে তাদের ওপর চড়াও হয়েছিল। এর কোনো যুক্তি নেই।”

“আমরা জানি বিষয়টি তাদের কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ এবং হেরে গেলে কতটা কষ্ট লাগে। কিন্তু হার মেনে নেওয়ারও একটি পদ্ধতি আছে। আর্জেন্টিনার কাছ থেকে আমরা এমন দৃশ্য অনেকবারই দেখেছি। শেষ বাঁশির পর তাদের প্রতিক্রিয়া ভয়াবহ।”

জো হার্ট যোগ করেন, “খেলা শেষ হয়ে গেছে। আজ যা ঘটেছে তা নিয়ে তাদের কোনো অভিযোগ থাকার সুযোগ নেই। এটা জঘন্য আচরণ।”

তবে আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি, যিনি পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেছিলেন, ম্যাচ-পরবর্তী সাক্ষাৎকারে ঘটনাকে তেমন গুরুত্ব দিয়ে দেখেননি বলে মনে হয়েছে।

তিনি বলেন, “জয়ের সময় আমরা উদার থাকি, পরাজয়ের সময়ও আমাদের উদার থাকতে হবে। আজ আমরা দেখাচ্ছি যে আমরা হারতে জানি।”

“আমরা ম্যাচ হেরেছি এবং তা মেনে নিচ্ছি। কিন্তু তার মানে এই নয় যে আমরা জীবন থামিয়ে দেব বা এখানে পৌঁছাতে যা করেছি তা সব ভুলে যাব।”

ফিফার শৃঙ্খলা কমিটির সামনে বিভিন্ন ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। শৃঙ্খলা ও নৈতিকতা বিষয়ক প্রসিকিউটর নিয়োগের মাধ্যমে ফিফা কেবল সম্ভাব্য সহিংস আচরণ নয়, বরং অন্যান্য অপরাধও বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করবে।

খেলোয়াড় বা জাতীয় ফুটবল সংস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হলে এবং তারা দোষী সাব্যস্ত হলে কঠোর শাস্তির আশঙ্কা বাড়বে। শৃঙ্খলা বিধিমালার ১৩ নম্বর অনুচ্ছেদে আপত্তিকর আচরণ ও ফেয়ার প্লে’র নীতিমালা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

খেলোয়াড় ও স্টাফদের কর্মকাণ্ডকে “শোভন আচরণের মৌলিক নিয়ম লঙ্ঘন” এবং “ফুটবল খেলা ও/অথবা ফিফার সুনাম ক্ষুণ্ন করে এমন আচরণ” হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে।

শৃঙ্খলা ও নৈতিকতা বিষয়ক প্রসিকিউটর “অভিযোগকে গুরুতর বা লঘু করে এমন উভয় ধরনের পরিস্থিতি” বিবেচনায় নেবেন এবং তার বৈশ্বিকভাবে নিষেধাজ্ঞা আরোপের ক্ষমতাও রয়েছে।

আর্জেন্টিনা কী ধরনের শাস্তির মুখে পড়তে পারে?
স্পেনের ফুটবল ফেডারেশনের সাবেক সভাপতি লুইস রুবিয়ালেস স্পেনের নারী বিশ্বকাপ জয়ের পর জেনি এরমোসোর ঠোঁটে চুমু দেওয়ার ঘটনায় ফিফা এই ধারার অধীনে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছিল।

রুবিয়ালেসকে ২০২৩ সালে তিন বছরের জন্য সব ধরনের ফুটবল-সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ড থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল এবং তিনি সেই সিদ্ধান্ত বাতিলের আবেদনেও সফল হননি।

২০১৪ সালের বিশ্বকাপে ইতালির ডিফেন্ডার জর্জিও কিয়েলিনিকে কামড় দেওয়ার কারণে উরুগুয়ের স্ট্রাইকার লুইস সুয়ারেজকে চার মাসের জন্য সব ধরনের ফুটবল-সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।

এর ফলে লিভারপুলের খেলোয়াড় হিসেবে তিনি প্রিমিয়ার লিগ মৌসুমের প্রথম নয়টি ম্যাচ খেলতে পারেননি। তবে আলমাদা, আয়ালা, মোলিনা ও পারেদেসের ক্ষেত্রে এত দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞা হওয়ার আশঙ্কা কম।

অন্যদিকে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিজেদের খেলোয়াড়দের আচরণ নিয়ে এএফএ বেশ কয়েকবার সমস্যায় পড়েছে।

২০২২ বিশ্বকাপ ফাইনালের পরও ‘আপত্তিকর আচরণ ও ফেয়ার প্লের নীতিমালা লঙ্ঘন’ এবং ‘খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাদের অসদাচরণ’ সংক্রান্ত অভিযোগের মুখোমুখি হয়েছিল আর্জেন্টিনা।

দক্ষিণ আমেরিকার দলটি পেনাল্টিতে ফ্রান্সকে হারিয়েছিল, তবে তাদের উদযাপনের ধরণ নিয়ে সমালোচনা হয়েছিল।

অ্যাস্টন ভিলার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ টুর্নামেন্টের সেরা গোলরক্ষকের ট্রফি নিয়ে অশোভন অঙ্গভঙ্গি করেছিলেন। পরে ড্রেসিংরুমে তাকে ফ্রান্সের তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পেকে বিদ্রূপ করতেও দেখা যায়।

আর্জেন্টিনাকে ১৮ হাজার ৩০০ পাউন্ড জরিমানা করা হয়েছিল এবং তবে কোনো খেলোয়াড়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তবে ২০২৪ সালে চিলি ও কলম্বিয়ার বিপক্ষে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ম্যাচে “আপত্তিকর আচরণের” দায়ে মার্তিনেজকে দুই ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।

চিলির বিপক্ষে ৩-০ গোলের জয়ের পর তিনি কোপা আমেরিকার একটি প্রতিরূপ ট্রফি ব্যবহার করে তার কুখ্যাত উদযাপন পুনরাবৃত্তি করেন। চার দিন পর কলম্বিয়ার বিপক্ষে ২-১ গোলের হারের পর মাঠে এক ক্যামেরাম্যান কাছে এলে তিনি নিজের গ্লাভস দিয়ে ক্যামেরায় আঘাত করেন।

২০২৪ সালে আর্জেন্টিনার কোপা আমেরিকা জয়ের পর চেলসির মিডফিল্ডার এনজো ফের্নান্দেজ তার পোস্ট করা একটি ভিডিওর জন্য ক্ষমা চাইতে বাধ্য হন। ফরাসি ফুটবল ফেডারেশন গানটিকে ‘বর্ণবাদী ও বৈষম্যমূলক’ স্লোগান বলে উল্লেখ করেছিল।

এই বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের পর প্রদর্শিত ব্যানারের কারণেও এএফএ সম্ভবত জরিমানার মুখে পড়তে যাচ্ছে। বিজয় উদযাপনের সময় খেলোয়াড়রা ‘Las Malvinas son Argentinas’ লেখা একটি কাপড় ধরে ছিলেন, যার বাংলা অর্থ ‘ফকল্যান্ডস আর্জেন্টিনার’।

২০১৪ সালে স্লোভেনিয়ার বিপক্ষে একটি প্রীতি ম্যাচের আগে একই বার্তাসংবলিত ব্যানার প্রদর্শনের কারণে এএফএকে ২০ হাজার পাউন্ড জরিমানা করা হয়েছিল।

ব্যানারটি ধরে থাকা খেলোয়াড়দের বিরুদ্ধেও ফিফা নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে। তারা হলেন টটেনহামের ক্রিস্তিয়ান রোমেরো, সাবেক টটেনহাম খেলোয়াড় জিওভানি লো সেলসো এবং ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের লিসান্দ্রো মার্তিনেজ।

ইউরো ২০২৪ ফাইনালে ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারানোর পর বিজয় উদযাপনের সময় ‘জিব্রাল্টার স্পেনের’ স্লোগান দেওয়ায় স্পেন অধিনায়ক আলভারো মোরাতা এবং সতীর্থ রদ্রিকে উয়েফা এক ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ করেছিল।

আর্জেন্টিনার আচরণ নিয়ে ফিফার প্রসিকিউটরের তদন্ত শেষ করতে কত সময় লাগবে সে বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই।

১৮ই ফেব্রুয়ারি উয়েফা রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে বেনফিকার ১-০ গোলের পরাজয়ের ম্যাচে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের প্রতি জিয়ানলুকা প্রেস্তিয়ানি কথিত বর্ণবাদী মন্তব্য করেছেন কি না তা তদন্ত করতে একজন নৈতিকতা ও শৃঙ্খলা পরিদর্শক নিয়োগ করেছিল।

২৪শে এপ্রিল, অর্থাৎ দুই মাসেরও বেশি সময় পরে, সমকামীবিদ্বেষী আচরণের দায়ে প্রেস্তিয়ানিকে ছয় ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়, যার মধ্যে তিন ম্যাচের শাস্তি দুই বছরের জন্য স্থগিত রাখা হয়েছিল।

বাংলা৭১নিউজ/এসএএইচ

Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ

শিল্পকলায় রুনা লায়লার সংগীতানুষ্ঠান শুক্রবার

ফাইনাল শেষে মারপিট : যে ধরনের শাস্তির মুখে পড়তে পারে আর্জেন্টিনা?

আপডেট সময় ০১:১০:৩০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

বিশ্বকাপ ফাইনালের শেষ দিকে ঘটে যাওয়া বিরূপ আচরণের জেরে আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে তদন্ত হবে বলে নিশ্চিত করেছে ফিফা। মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ফাইনালের শেষ বাঁশি বাজার পর কী ঘটেছিল– তা মূল্যায়নের জন্য ফিফার শৃঙ্খলা কমিটি একজন প্রসিকিউটর নিয়োগ করেছে যিনি শৃঙ্খলা ও নৈতিকতা বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন।

এই ঘটনায় দোষি প্রমাণিত হলে খেলোয়াড় বা কোচ নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে পারেন, আর আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ)-কেও জরিমানা করা হতে পারে। রবিবার ১-০ গোলে হারের পর স্পেন বিশ্বকাপ জয়ের উদযাপন শুরু করলে আর্জেন্টিনা দলের সদস্য ও তাদের সহায়ক স্টাফদের কয়েকজনের সঙ্গে স্পেনের খেলোয়াড়দের বাকবিতণ্ডা ও সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ার ঘটনা ঘটে।

নাহুয়েল মোলিনা, লিয়ান্দ্রো পারেদেস, থিয়াগো আলমাদা এবং সহকারী কোচ রবার্তো আয়ালা এই ঘটনায় জড়িত ছিলেন বলে দেখা যায়। প্রথমে ফিফা জানিয়েছিল যে, স্পেনের এরিক গার্সিয়ার গলায় ধাক্কা দেওয়ার কারণে রেফারি স্লাভকো ভিনচিচ পারেদেসকে লাল কার্ড দেখিয়েছেন।

তবে অল্প সময় পরই পারেদেসের লাল কার্ডটি নথি থেকে সরিয়ে ফেলা হয় এবং ফিফা বিবিসি স্পোর্টকে নিশ্চিত করে যে তখন কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। আর্জেন্টিনা এর আগেই একজন খেলোয়াড়কে হারিয়েছিল। দ্বিতীয়ার্ধের যোগ করা সময়ে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন এনজো ফার্নান্দেজ।

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ২-১ গোলে সেমিফাইনাল জয়ের পর ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের ওপর আর্জেন্টিনার দাবির সমর্থনে একটি ব্যানার প্রদর্শন করায় দলটির বিরুদ্ধে সম্ভাব্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া আগেই শুরু করেছিল ফিফা।

বিশ্বকাপ ফাইনালের পর কী ঘটেছিল?
নিউ জার্সিতে শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে লিওনেল মেসিসহ আর্জেন্টিনার কয়েকজন খেলোয়াড় মাঠে লুটিয়ে পড়েন। অন্যরা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন, আর স্পেনের খেলোয়াড়রা উল্লাসে দৌড়ে মাঠজুড়ে ছড়িয়ে পড়েন। অতিরিক্ত সময়ে বদলি হয়ে মাঠ ছাড়ার পর রদ্রি ডাগআউট থেকে ছুটে এসে সতীর্থদের সঙ্গে যোগ দেন।

ম্যানচেস্টার সিটির মিডফিল্ডার রদ্রি পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডার মোলিনাকে তার বাহু বা পেটে ঘুষি মারতে দেখা যায়। সেখান থেকেই পরিস্থিতির সূত্রপাত হয়। রদ্রি মোলিনার মুখোমুখি হন, তবে আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে এগিয়ে যেতে দেখা যায় আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়কেই।

সতীর্থকে সমর্থন দিতে গার্সিয়া এগিয়ে গেলে পারেদেসও ঘটনায় জড়িয়ে পড়েন এবং গার্সিয়ার গলায় আঙুল দিয়ে খোঁচা দেন। বেঞ্চে থাকা বদলি খেলোয়াড় গাভি পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করলে আলমাদা তাকে মাটিতে ফেলে দেন।

এরপর পারেদেস স্প্যানিশ খেলোয়াড়টির মুখে হাত রেখে তাকে মাটিতে ঠেলে দেন। আয়ালাকে গার্সিয়ার গলার কাছে ধরে থাকতে দেখা যায়। পরে তাকে স্পেনের মিডফিল্ডার দানি ওলমোর ওপর আঘাত করতেও দেখা যায়।

বিবিসি ওয়ানের সম্প্রচারে অ্যালান শিয়ারার বলেন, “পারেদেস কারও মুখের দিকে দুই বা তিনটি জোরালো ঘুষি ছুড়ে মেরেছে। সে তাদের ওপর চড়াও হয়েছিল। এর কোনো যুক্তি নেই।”

“আমরা জানি বিষয়টি তাদের কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ এবং হেরে গেলে কতটা কষ্ট লাগে। কিন্তু হার মেনে নেওয়ারও একটি পদ্ধতি আছে। আর্জেন্টিনার কাছ থেকে আমরা এমন দৃশ্য অনেকবারই দেখেছি। শেষ বাঁশির পর তাদের প্রতিক্রিয়া ভয়াবহ।”

জো হার্ট যোগ করেন, “খেলা শেষ হয়ে গেছে। আজ যা ঘটেছে তা নিয়ে তাদের কোনো অভিযোগ থাকার সুযোগ নেই। এটা জঘন্য আচরণ।”

তবে আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি, যিনি পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেছিলেন, ম্যাচ-পরবর্তী সাক্ষাৎকারে ঘটনাকে তেমন গুরুত্ব দিয়ে দেখেননি বলে মনে হয়েছে।

তিনি বলেন, “জয়ের সময় আমরা উদার থাকি, পরাজয়ের সময়ও আমাদের উদার থাকতে হবে। আজ আমরা দেখাচ্ছি যে আমরা হারতে জানি।”

“আমরা ম্যাচ হেরেছি এবং তা মেনে নিচ্ছি। কিন্তু তার মানে এই নয় যে আমরা জীবন থামিয়ে দেব বা এখানে পৌঁছাতে যা করেছি তা সব ভুলে যাব।”

ফিফার শৃঙ্খলা কমিটির সামনে বিভিন্ন ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। শৃঙ্খলা ও নৈতিকতা বিষয়ক প্রসিকিউটর নিয়োগের মাধ্যমে ফিফা কেবল সম্ভাব্য সহিংস আচরণ নয়, বরং অন্যান্য অপরাধও বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করবে।

খেলোয়াড় বা জাতীয় ফুটবল সংস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হলে এবং তারা দোষী সাব্যস্ত হলে কঠোর শাস্তির আশঙ্কা বাড়বে। শৃঙ্খলা বিধিমালার ১৩ নম্বর অনুচ্ছেদে আপত্তিকর আচরণ ও ফেয়ার প্লে’র নীতিমালা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

খেলোয়াড় ও স্টাফদের কর্মকাণ্ডকে “শোভন আচরণের মৌলিক নিয়ম লঙ্ঘন” এবং “ফুটবল খেলা ও/অথবা ফিফার সুনাম ক্ষুণ্ন করে এমন আচরণ” হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে।

শৃঙ্খলা ও নৈতিকতা বিষয়ক প্রসিকিউটর “অভিযোগকে গুরুতর বা লঘু করে এমন উভয় ধরনের পরিস্থিতি” বিবেচনায় নেবেন এবং তার বৈশ্বিকভাবে নিষেধাজ্ঞা আরোপের ক্ষমতাও রয়েছে।

আর্জেন্টিনা কী ধরনের শাস্তির মুখে পড়তে পারে?
স্পেনের ফুটবল ফেডারেশনের সাবেক সভাপতি লুইস রুবিয়ালেস স্পেনের নারী বিশ্বকাপ জয়ের পর জেনি এরমোসোর ঠোঁটে চুমু দেওয়ার ঘটনায় ফিফা এই ধারার অধীনে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছিল।

রুবিয়ালেসকে ২০২৩ সালে তিন বছরের জন্য সব ধরনের ফুটবল-সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ড থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল এবং তিনি সেই সিদ্ধান্ত বাতিলের আবেদনেও সফল হননি।

২০১৪ সালের বিশ্বকাপে ইতালির ডিফেন্ডার জর্জিও কিয়েলিনিকে কামড় দেওয়ার কারণে উরুগুয়ের স্ট্রাইকার লুইস সুয়ারেজকে চার মাসের জন্য সব ধরনের ফুটবল-সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।

এর ফলে লিভারপুলের খেলোয়াড় হিসেবে তিনি প্রিমিয়ার লিগ মৌসুমের প্রথম নয়টি ম্যাচ খেলতে পারেননি। তবে আলমাদা, আয়ালা, মোলিনা ও পারেদেসের ক্ষেত্রে এত দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞা হওয়ার আশঙ্কা কম।

অন্যদিকে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিজেদের খেলোয়াড়দের আচরণ নিয়ে এএফএ বেশ কয়েকবার সমস্যায় পড়েছে।

২০২২ বিশ্বকাপ ফাইনালের পরও ‘আপত্তিকর আচরণ ও ফেয়ার প্লের নীতিমালা লঙ্ঘন’ এবং ‘খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাদের অসদাচরণ’ সংক্রান্ত অভিযোগের মুখোমুখি হয়েছিল আর্জেন্টিনা।

দক্ষিণ আমেরিকার দলটি পেনাল্টিতে ফ্রান্সকে হারিয়েছিল, তবে তাদের উদযাপনের ধরণ নিয়ে সমালোচনা হয়েছিল।

অ্যাস্টন ভিলার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ টুর্নামেন্টের সেরা গোলরক্ষকের ট্রফি নিয়ে অশোভন অঙ্গভঙ্গি করেছিলেন। পরে ড্রেসিংরুমে তাকে ফ্রান্সের তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পেকে বিদ্রূপ করতেও দেখা যায়।

আর্জেন্টিনাকে ১৮ হাজার ৩০০ পাউন্ড জরিমানা করা হয়েছিল এবং তবে কোনো খেলোয়াড়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তবে ২০২৪ সালে চিলি ও কলম্বিয়ার বিপক্ষে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ম্যাচে “আপত্তিকর আচরণের” দায়ে মার্তিনেজকে দুই ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।

চিলির বিপক্ষে ৩-০ গোলের জয়ের পর তিনি কোপা আমেরিকার একটি প্রতিরূপ ট্রফি ব্যবহার করে তার কুখ্যাত উদযাপন পুনরাবৃত্তি করেন। চার দিন পর কলম্বিয়ার বিপক্ষে ২-১ গোলের হারের পর মাঠে এক ক্যামেরাম্যান কাছে এলে তিনি নিজের গ্লাভস দিয়ে ক্যামেরায় আঘাত করেন।

২০২৪ সালে আর্জেন্টিনার কোপা আমেরিকা জয়ের পর চেলসির মিডফিল্ডার এনজো ফের্নান্দেজ তার পোস্ট করা একটি ভিডিওর জন্য ক্ষমা চাইতে বাধ্য হন। ফরাসি ফুটবল ফেডারেশন গানটিকে ‘বর্ণবাদী ও বৈষম্যমূলক’ স্লোগান বলে উল্লেখ করেছিল।

এই বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের পর প্রদর্শিত ব্যানারের কারণেও এএফএ সম্ভবত জরিমানার মুখে পড়তে যাচ্ছে। বিজয় উদযাপনের সময় খেলোয়াড়রা ‘Las Malvinas son Argentinas’ লেখা একটি কাপড় ধরে ছিলেন, যার বাংলা অর্থ ‘ফকল্যান্ডস আর্জেন্টিনার’।

২০১৪ সালে স্লোভেনিয়ার বিপক্ষে একটি প্রীতি ম্যাচের আগে একই বার্তাসংবলিত ব্যানার প্রদর্শনের কারণে এএফএকে ২০ হাজার পাউন্ড জরিমানা করা হয়েছিল।

ব্যানারটি ধরে থাকা খেলোয়াড়দের বিরুদ্ধেও ফিফা নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে। তারা হলেন টটেনহামের ক্রিস্তিয়ান রোমেরো, সাবেক টটেনহাম খেলোয়াড় জিওভানি লো সেলসো এবং ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের লিসান্দ্রো মার্তিনেজ।

ইউরো ২০২৪ ফাইনালে ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারানোর পর বিজয় উদযাপনের সময় ‘জিব্রাল্টার স্পেনের’ স্লোগান দেওয়ায় স্পেন অধিনায়ক আলভারো মোরাতা এবং সতীর্থ রদ্রিকে উয়েফা এক ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ করেছিল।

আর্জেন্টিনার আচরণ নিয়ে ফিফার প্রসিকিউটরের তদন্ত শেষ করতে কত সময় লাগবে সে বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই।

১৮ই ফেব্রুয়ারি উয়েফা রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে বেনফিকার ১-০ গোলের পরাজয়ের ম্যাচে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের প্রতি জিয়ানলুকা প্রেস্তিয়ানি কথিত বর্ণবাদী মন্তব্য করেছেন কি না তা তদন্ত করতে একজন নৈতিকতা ও শৃঙ্খলা পরিদর্শক নিয়োগ করেছিল।

২৪শে এপ্রিল, অর্থাৎ দুই মাসেরও বেশি সময় পরে, সমকামীবিদ্বেষী আচরণের দায়ে প্রেস্তিয়ানিকে ছয় ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়, যার মধ্যে তিন ম্যাচের শাস্তি দুই বছরের জন্য স্থগিত রাখা হয়েছিল।

বাংলা৭১নিউজ/এসএএইচ