ইতিহাসের পাতায় ১৯ জুলাই তারিখটি অস্ট্রেলিয়ার সামরিক ইতিহাসের এক অনন্য ও বৈচিত্র্যময় দিন। এই একটি মাত্র দিন যেমন বয়ে এনেছে সর্বোচ্চ বীরত্বের গৌরব, তেমনি উপহার দিয়েছে নজিরবিহীন রক্তক্ষয় আর ঐতিহাসিক নৌ-বিজয়। আজকের এই দিনে আমরা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি সেই যুদ্ধবিধ্বস্ত দিনগুলোর স্মৃতি। যেখানে মিশে আছে অস্ট্রেলীয় সেনাদের রক্ত, ঘাম এবং অদম্য সাহসিকতার গল্প।
সাহস যেখানে রূপকথা: গ্যালিপলির রক্তাক্ত পরিখা
১৯১৫ সালের মে মাস। চারদিকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দামামা। তুরস্কের গ্যালিপলি উপদ্বীপে অটোমান সাম্রাজ্যের সেনাদের সাথে মিত্রবাহিনীর তুমুল যুদ্ধ চলছে। চারিদিকে শুধু বারুদের গন্ধ আর বুলেটের গর্জন। এই গ্যালিপলির ‘কোর্টনিস পোস্ট’ নামক একটি পরিখায় (trench) অবস্থান করছিলেন অস্ট্রেলিয়ার ১৪তম ব্যাটালিয়নের ল্যান্স কর্পোরাল অ্যালবার্ট জ্যাকা। ১৯ মে’র ভোরে তুর্কি সেনারা আচমকা এক জঘন্য আক্রমণ চালিয়ে অস্ট্রেলীয় পরিখার একটি অংশ দখল করে নেয়। পরিস্থিতি এমন ছিল যে, পুরো ফ্রন্টলাইন ধসে পড়ার উপক্রম হয়েছিল।
সবাই যখন পিছু হটার কথা ভাবছে, ২৪ বছর বয়সী তরুণ অ্যালবার্ট জ্যাকা তখন সম্পূর্ণ ভিন্ন ধাতুতে গড়া। নিজের জীবনের পরোয়া না করে তিনি একাই তুর্কি সেনাদের ওপর পাল্টা আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেন। প্রচণ্ড গুলিবর্ষণের মুখে তিনি একাই পরিখার ভেতর ঝাঁপিয়ে পড়েন। শুরু হয় মুখোমুখি মল্লযুদ্ধ। জ্যাকা নিজের রাইফেল এবং বেয়নেট দিয়ে একাই পাঁচজন তুর্কি সেনাকে হত্যা করেন এবং বাকিদের পিছু হটতে বাধ্য করেন। সকাল যখন হলো, দেখা গেল জ্যাকা অক্ষত অবস্থায় পরিখাটি পুনরুদ্ধার করে একা দাঁড়িয়ে আছেন, মুখে তাঁর বিজয়ের চুরুট।
অ্যালবার্ট জ্যাকার এই অবিশ্বাস্য এবং অতিমানবীয় সাহসিকতার স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯১৫ সালের ১৯ জুলাই তাঁকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বীরত্বের সর্বোচ্চ পদক ‘ভিক্টোরিয়া ক্রস’- এ ভূষিত করা হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে কোনো অস্ট্রেলিয়ানের জন্য এটিই ছিল প্রথম ভিক্টোরিয়া ক্রস। জ্যাকার এই বীরত্বগাথা স্তিমিত হয়ে পড়া অস্ট্রেলীয় শিবিরের মনোবল এক ধাক্কায় আকাশে তুলে দিয়েছিল। তিনি হয়ে উঠেছিলেন অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় বীর, যা আজও দেশটির সামরিক ইতিহাসে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা হয়।
ফ্রান্সের সবুজ ঘাসে রক্তের আল্পনা
গ্যালিপলির রেশ কাটতে না কাটতেই অস্ট্রেলীয় বাহিনীকে পাঠানো হয় ফ্রান্সের ওয়েস্টার্ন ফ্রন্টে। ১৯১৬ সালের জুলাই মাস। ব্রিটিশ ও ফরাসি বাহিনী তখন সোম নদীর তীরে জার্মানদের বিরুদ্ধে লড়ছে। জার্মানদের মনোযোগ সোম নদীর যুদ্ধ থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য ফ্রেমেলস নামক একটি ফরাসি গ্রামে এক ডাইভার্সন বা বিভ্রান্তিমূলক আক্রমণের পরিকল্পনা করা হয়। ১৯ জুলাই বিকেল বেলায় সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ এবং সদ্য ফ্রান্সে পৌঁছানো অস্ট্রেলিয়ান ৫ম ডিভিশনকে জার্মানদের সুরক্ষিত বাঙ্কারের দিকে এগিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
কৌশলগতভাবে জায়গাটি ছিল সম্পূর্ণ উন্মুক্ত। আর জার্মানরা পাহাড়ের ওপর মেশিনগান নিয়ে ওত পেতে বসে ছিল। ১৯ জুলাই বিকেল ৬টায় যখন আক্রমণ শুরু হয়, তখন অস্ট্রেলীয় তরুণরা মূলত মৃত্যুর মুখে হেঁটে যায়। জার্মানদের নিখুঁত মেশিনগানের গুলি আর কামানের গোলায় মুহূর্তের মধ্যে পুরো রণক্ষেত্র লাশের স্তূপে পরিণত হয়। মাত্র এক রাতে—হ্যাঁ, মাত্র ২৪ ঘণ্টারও কম সময়ে—৫,৫৩৩ জন অস্ট্রেলিয়ান সেনা হতাহত হন, যার মধ্যে প্রায় ২,০০০ সেনা স্পটেই মারা যান।
অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসে এর চেয়ে বড় মানব বিপর্যয় আর কখনো ঘটেনি। কোনো একক যুদ্ধে বা এক রাতে এত বিপুল সংখ্যক অস্ট্রেলীয় প্রাণ হারানোর নজির আর নেই। পরদিন সকালে রণক্ষেত্রটি পরিণত হয়েছিল এক বিশাল কবরস্থানে। এই যুদ্ধ অস্ট্রেলিয়ার ঘরে ঘরে কান্নার রোল এনে দিয়েছিল। সিডনি থেকে মেলবোর্ন—এমন কোনো শহর ছিল না যেখানে কোনো মা তাঁর সন্তানকে বা কোনো স্ত্রী তাঁর স্বামীকে হারাননি। ফ্রেমেলসের এই রক্তক্ষয়ী ট্র্যাজেডি আজও অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসে এক গভীর, না শুকানো ক্ষতচিহ্ন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উত্তাল সমুদ্র: শিকার ও শিকারির খেলা
সময়টা ১৯৪০ সাল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তখন পুরোদমে চলছে। ভূমধ্যসাগরের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে ব্রিটিশ ও ইতালীয় নৌবাহিনীর মধ্যে তীব্র উত্তেজনা। ১৯ জুলাইয়ের ভোরে, অস্ট্রেলিয়ার গৌরবময় যুদ্ধজাহাজ এইচএমএস সিডনি (ডি৪৮) ব্রিটিশ ডেস্ট্রয়ারদের একটি বহরের সাথে ক্রিট দ্বীপের উত্তর-পশ্চিমে টহল দিচ্ছিল। হঠাৎ করেই তাদের মুখোমুখি হয় ইতালির রাজকীয় নৌবাহিনীর দুটি অত্যন্ত দ্রুতগামী এবং আধুনিক যুদ্ধজাহাজ—’বার্তোলোমিও কোলেউনি’ এবং ‘জিওভানি দেল্লে বান্দে নেরে’।
গতিতে ইতালীয় জাহাজগুলো এগিয়ে থাকলেও, রণকৌশল এবং সাহসিকতায় এগিয়ে ছিল এইচএমএস সিডনি- এর নাবিকরা। ক্যাপ্টেন জন কলিন্সের দূরদর্শী নেতৃত্বে ‘সিডনি’ অত্যন্ত নিখুঁত দূরপাল্লার গোলাবর্ষণ শুরু করে। সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের বুক চিরে সিডনির ছোঁড়া একটি গোলা সরাসরি আঘাত হানে ইতালীয় যুদ্ধজাহাজ ‘বার্তোলোমিও কোলেউনি’-র ইঞ্জিন রুমে। জাহাজটি সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়ে। এরপর ব্রিটিশ ডেস্ট্রয়ারগুলোর টর্পেডো আঘাতে ইতালির সেই অহংকার, আধুনিক যুদ্ধজাহাজটি ভূমধ্যসাগরের অতল তলে তলিয়ে যায়। অন্য ইতালীয় জাহাজটি কোনোমতে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে বাঁচে।
এই যুদ্ধে ইতালির শত শত সেনা হতাহত ও বন্দী হলেও, অবিশ্বাস্যভাবে এইচএমএস সিডনি- এর মাত্র একজন নাবিক সামান্য আহত হয়েছিলেন এবং জাহাজটির সামান্য ক্ষতি হয়েছিল। যখন সিডনি আলেকজান্দ্রিয়া বন্দরে ফিরে আসে, তখন মিত্রবাহিনীর সমস্ত জাহাজ সাইরেন বাজিয়ে এই অস্ট্রেলীয় বীরদের স্বাগত জানায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুর দিকে এই নৌ-বিজয় মিত্রবাহিনীর মনোবল বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল এবং প্রমাণ করেছিল যে, সাগরের বুকেও অস্ট্রেলিয়ানরা সমানে সমানে লড়তে ও জিততে জানে।
উপসংহার:
১৯ জুলাই- অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসে এক অবিচ্ছেদ্য দিন। ১৯১৫ সালের এই দিনে জন্ম নিয়েছিল অদম্য সাহসের প্রতীক, ১৯১৬ সালে এই দিনটিই সিক্ত হয়েছিল হাজারো তরুণের রক্তে আর ১৯৪০ সালে এই দিনেই সমুদ্রের বুকে ওড়ে বিজয়ের নিশান। ত্যাগ, বীরত্ব আর শোকের এই ত্রিমাত্রিক কোলাজই আজকের আধুনিক অস্ট্রেলিয়াকে তাদের বীরদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকতে শেখায়।
বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি






















