ঢাকা ০১:৩০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬, ২৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
উপচে পড়া নদী, প্লাবিত জনপদ

বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এখনই সময়

চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে পাহাড়ি ঢল

উজানের পাহাড়ি ঢল আর আকাশভাঙা বৃষ্টিতে দেশের বিস্তীর্ণ জনপদে আবারও হাহাকার নেমে এসেছে। নিমেষেই তলিয়ে গেছে মাঠের ফসল, ভেসে গেছে হাজারো কৃষকের স্বপ্নের মাছের ঘের, আর বসতভিটায় বুক সমান পানি নিয়ে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন লাখ লাখ মানুষ। উত্তরপশ্চিম বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট একটি লঘুচাপের কারণে গত ৩ দিন ধরে দেশের ভেতর এবং সংলগ্ন ভারতের ত্রিপুরা, আসাম, মেঘালয় ও পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশে অতিভারী বর্ষণ চলছে। এতে করে দেশের আরও অনেক জেলা প্লাবিত হওয়ার সতর্কতা জারি করা হয়েছে। এই সংকটকালীন মুহূর্তে পানিবন্দি মানুষের জীবন বাঁচানো, খাবার ও বিশুদ্ধ পানি এবং নিরাপত্তা বড় প্রয়োজন। প্লাবিত জনপদ আর পানিবন্দী বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এখনই সময়।

এদিকে, দুর্যোগ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশিত ১০টি পদক্ষেপের কথা জানিয়েছেন তার উপদেষ্টা ও কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন। তিনি বলেন, সংকটের এই সময়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়াতে প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে বিভিন্ন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন।

এছাড়াও আবওয়ার মারাত্মক অবনতি ও বন্যা পরিস্থিতি খারাপ হওয়ায় চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের আওতাধীন সব জেলায় (চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান পার্বত্য জেলা) আগামীকাল শনিবারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ের (বিষয় কোড-২৭৫) পরীক্ষাটি স্থগিত করা হয়েছে। স্থগিত হওয়া পরীক্ষার পরিবর্তিত সময়সূচি পরবর্তীতে জানিয়ে দেয়া হবে।

পানির নিচে ২০ জেলা, অবরুদ্ধ লাখো প্রাণ

বর্তমানে দেশের পূর্বাঞ্চল, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলের প্রায় ২০টি জেলা বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে এবং অনেক জেলার নিম্নাঞ্চল ইতিমধ্যেই পানির নিচে। গত কয়েকদিনের রেকর্ড বৃষ্টিতে বান্দরবান, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, ফেনী ও খাগড়াছড়ি জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত। পাহাড় ধসের আশঙ্কার পাশাপাশি হাজার হাজার পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন।

হাওড় ও নদীবেষ্টিত সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি তীব্র আকার ধারণ করেছে। নদ-নদীর পানি বৃদ্ধিতে ময়মনসিংহ, নেত্রকোণা ও শেরপুর জেলার নতুন নতুন গ্রাম প্লাবিত হচ্ছে। তিস্তা ও ধরলার পানি বাড়ায় নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর ও কুড়িগ্রাম জেলার চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলের মানুষ চরম বিপাকে পড়েছেন। জলাবদ্ধতা ও নদীর উপচে পড়া পানিতে লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালী  প্লাবিত হচ্ছে নিম্নাঞ্চল।

খাবার বিশুদ্ধ পানির তীব্র অভাব

বন্যা কবলিত এলাকাগুলো থেকে আসছে মানবিক বিপর্যয়ের করুণ চিত্র। হাজার হাজার মানুষ ঘরের চালের ওপর কিংবা মাচায় দিন কাটাচ্ছেন। ঘরে পানি উঠে যাওয়ায় রান্নার কোনো উপায় নেই,চুলো জ্বলছে না। শিশু ও বৃদ্ধরা শুকনো খাবারের অভাবে তীব্র পুষ্টিহীনতায় ভুগছেন। নলকূপগুলো পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় এক ফোঁটা বিশুদ্ধ পানির জন্য চলছে হাহাকার। বন্যার নোংরা পানি ব্যবহারের ফলে পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিচ্ছে।

দুর্গম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাধভাঙ্গা মানুষগুলোর কাছে এখনও পৌঁছায়নি পর্যাপ্ত সরকারি বা বেসরকারি সাহায্য। চিঁড়ে, গুড়, মোয়া, খাবার স্যালাইন এবং পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেটের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।

বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত নদী

বর্তমানে দেশের ৫টি প্রধান নদীর পানি ৭টি জেলার মোট ৮টি পর্যবেক্ষণ স্টেশনে বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।  সাঙ্গু নদী বান্দরবান পয়েন্টে বিপদসীমার ৫৩ সেমি এবং চট্টগ্রামের দোহাজারী পয়েন্টে ০৪ সেমি ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। মাতামুহুরী নদী বান্দরবানের লামা পয়েন্টে ১৯ সেমি এবং কক্সবাজারের চিরিঙ্গা পয়েন্টে ৪১ সেমি ওপরে রয়েছে। খোয়াই নদী হবিগঞ্জের বাল্লা পয়েন্টে পানি বিপদসীমার ৩৪ সেমি ওপর দিয়ে বইছে। মনু নদী মৌলভীবাজার পয়েন্টে পরিস্থিতি বেশ আশঙ্কাজনক, এখানে পানি বিপদসীমার ৭৫ সেমি ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কুশিয়ারা নদী সুনামগঞ্জের মারকুলি পয়েন্টে ২২ সেমি এবং সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে ১৫ সেমি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

আগামী দিনের  পূর্বাভাস

লঘুচাপের প্রভাবে দেশের চার বিভাগ এবং তৎসংলগ্ন ভারতের রাজ্যগুলোতে অতিভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। এর মধ্যে ৩ দিনে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে- চট্টগ্রামে: ৭৫৯ মিমি, লামা (বান্দরবান) ৫৬২ মিমি এবং কক্সবাজারে: ৩০০ মিমি।

আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, আগামী ২ দিন সিলেট, চট্টগ্রাম, রংপুর, ময়মনসিংহ ও রাজশাহী বিভাগে ভারী থেকে অতিভারী এবং ভারতের ত্রিপুরা, মেঘালয় ও পশ্চিমবঙ্গে ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে। এর ফলে আগামী ৩ দিনে সম্ভাব্য বৃষ্টিপাতের পরিমাণ- বান্দরবান ও কক্সবাজার জেলা: ১৭৫-২০০ মিমি, চট্টগ্রাম, ফেনী, লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালী: ১৫০-১৭৫ মিমি,  সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোণা ও শেরপুর: ২০০-২৫০ মিমি, নীলফামারী, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম: ১২৫-১৫০ মিমি।

অববাহিকাভিত্তিক বন্যা পরিস্থিতি

গত ২৪ ঘণ্টায় হালদা, সাঙ্গু, মাতামুহুরী, মুহুরী, ফেনী ও সেলোনিয়া নদীর পানি কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। ফলে বান্দরবান, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের চলমান বন্যা পরিস্থিতি আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় ধীরগতিতে উন্নত হতে পারে।

অন্যদিকে গোমতী নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা আগামী ২ দিন আরও বাড়তে পারে। ফেনী, চট্টগ্রাম ও খাগড়াছড়ির গোমতী, মুহুরী, ফেনী, সেলোনিয়া ও হালদা নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করে নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদী বন্যা সৃষ্টি করতে পারে। এছাড়া লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালী জেলার নিম্নাঞ্চলও সাময়িকভাবে প্লাবিত হতে পারে।

এছাড়াও গত ২৪ ঘণ্টায় ধলাই ও খোয়াই নদীর পানি হ্রাস পাওয়ায় মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার বন্যা পরিস্থিতির ধীরগতিতে উন্নতি হতে পারে।

তবে সুরমা, কুশিয়ারা ও মনু নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় সিলেট ও সুনামগঞ্জে কুশিয়ারা নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে।

আর নতুন করে ঝুঁকিতে পড়বে সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোণা, শেরপুর ও ময়মনসিংহের বিভিন্ন এলাকা। এসব জেলা দিয়ে প্রবাহিত সারিগোয়াইন, সোমেশ্বরী, যাদুকাটা ও ভুগাই-কংস নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমা পার হতে পারে, যার ফলে নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

একইভাবে তিস্তার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় উত্তরাঞ্চলের বেশ কয়েকটি জেলার নিন্মাঞ্চল প্লাবিত হবে। বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্রের তথ্যানুযায়ি, গত ২৪ ঘণ্টায় তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা আগামী ৩ দিন ধরে ক্রমান্বয়ে বাড়বে। ফলে নীলফামারী, লালমনিরহাট ও রংপুর জেলায় তিস্তা নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে স্বল্পমেয়াদী বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে।

আরও জানা যায়, আগামী ৭২ ঘণ্টায় লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম জেলার ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে সতর্কসীমায় পৌঁছাতে পারে এবং নিম্নাঞ্চল সাময়িকভাবে প্লাবিত হতে পারে।

মানবিক আহ্বান

প্রকৃতির এই রুদ্ররূপের সামনে দাঁড়িয়ে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন থাকা এবং একে অপরের প্রতি হাত বাড়িয়ে দেওয়াটাই এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় মানবিক দায়িত্ব। পানিবন্দি মানুষগুলো আমাদেরই ভাই-বোন। ঘরের কোণে জলবন্দি শিশু ও নারীদের কষ্ট লাঘব করতে সরকারি সাহায্যের পাশাপাশি দেশের সামর্থ্যবান মানুষ, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং তরুণ সমাজকে এখনই এগিয়ে আসতে হবে। শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি আর জীবনরক্ষাকারী ওষুধ নিয়ে আমাদের তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে।

যেকোনো দুর্যোগে এদেশের সবসময় তার সর্বোচ্চ মানবিকতা দিয়ে জয়ী হয়েছে। এই কঠিন সময়েও সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও সহমর্মিতাই দুর্গত মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পারে- এই হোক আমাদের আজকের প্রত্যাশা।

বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি

Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ

উপচে পড়া নদী, প্লাবিত জনপদ

বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এখনই সময়

আপডেট সময় ১১:০৯:৩৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬

উজানের পাহাড়ি ঢল আর আকাশভাঙা বৃষ্টিতে দেশের বিস্তীর্ণ জনপদে আবারও হাহাকার নেমে এসেছে। নিমেষেই তলিয়ে গেছে মাঠের ফসল, ভেসে গেছে হাজারো কৃষকের স্বপ্নের মাছের ঘের, আর বসতভিটায় বুক সমান পানি নিয়ে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন লাখ লাখ মানুষ। উত্তরপশ্চিম বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট একটি লঘুচাপের কারণে গত ৩ দিন ধরে দেশের ভেতর এবং সংলগ্ন ভারতের ত্রিপুরা, আসাম, মেঘালয় ও পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশে অতিভারী বর্ষণ চলছে। এতে করে দেশের আরও অনেক জেলা প্লাবিত হওয়ার সতর্কতা জারি করা হয়েছে। এই সংকটকালীন মুহূর্তে পানিবন্দি মানুষের জীবন বাঁচানো, খাবার ও বিশুদ্ধ পানি এবং নিরাপত্তা বড় প্রয়োজন। প্লাবিত জনপদ আর পানিবন্দী বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এখনই সময়।

এদিকে, দুর্যোগ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশিত ১০টি পদক্ষেপের কথা জানিয়েছেন তার উপদেষ্টা ও কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন। তিনি বলেন, সংকটের এই সময়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়াতে প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে বিভিন্ন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন।

এছাড়াও আবওয়ার মারাত্মক অবনতি ও বন্যা পরিস্থিতি খারাপ হওয়ায় চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের আওতাধীন সব জেলায় (চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান পার্বত্য জেলা) আগামীকাল শনিবারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ের (বিষয় কোড-২৭৫) পরীক্ষাটি স্থগিত করা হয়েছে। স্থগিত হওয়া পরীক্ষার পরিবর্তিত সময়সূচি পরবর্তীতে জানিয়ে দেয়া হবে।

পানির নিচে ২০ জেলা, অবরুদ্ধ লাখো প্রাণ

বর্তমানে দেশের পূর্বাঞ্চল, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলের প্রায় ২০টি জেলা বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে এবং অনেক জেলার নিম্নাঞ্চল ইতিমধ্যেই পানির নিচে। গত কয়েকদিনের রেকর্ড বৃষ্টিতে বান্দরবান, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, ফেনী ও খাগড়াছড়ি জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত। পাহাড় ধসের আশঙ্কার পাশাপাশি হাজার হাজার পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন।

হাওড় ও নদীবেষ্টিত সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি তীব্র আকার ধারণ করেছে। নদ-নদীর পানি বৃদ্ধিতে ময়মনসিংহ, নেত্রকোণা ও শেরপুর জেলার নতুন নতুন গ্রাম প্লাবিত হচ্ছে। তিস্তা ও ধরলার পানি বাড়ায় নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর ও কুড়িগ্রাম জেলার চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলের মানুষ চরম বিপাকে পড়েছেন। জলাবদ্ধতা ও নদীর উপচে পড়া পানিতে লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালী  প্লাবিত হচ্ছে নিম্নাঞ্চল।

খাবার বিশুদ্ধ পানির তীব্র অভাব

বন্যা কবলিত এলাকাগুলো থেকে আসছে মানবিক বিপর্যয়ের করুণ চিত্র। হাজার হাজার মানুষ ঘরের চালের ওপর কিংবা মাচায় দিন কাটাচ্ছেন। ঘরে পানি উঠে যাওয়ায় রান্নার কোনো উপায় নেই,চুলো জ্বলছে না। শিশু ও বৃদ্ধরা শুকনো খাবারের অভাবে তীব্র পুষ্টিহীনতায় ভুগছেন। নলকূপগুলো পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় এক ফোঁটা বিশুদ্ধ পানির জন্য চলছে হাহাকার। বন্যার নোংরা পানি ব্যবহারের ফলে পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিচ্ছে।

দুর্গম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাধভাঙ্গা মানুষগুলোর কাছে এখনও পৌঁছায়নি পর্যাপ্ত সরকারি বা বেসরকারি সাহায্য। চিঁড়ে, গুড়, মোয়া, খাবার স্যালাইন এবং পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেটের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।

বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত নদী

বর্তমানে দেশের ৫টি প্রধান নদীর পানি ৭টি জেলার মোট ৮টি পর্যবেক্ষণ স্টেশনে বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।  সাঙ্গু নদী বান্দরবান পয়েন্টে বিপদসীমার ৫৩ সেমি এবং চট্টগ্রামের দোহাজারী পয়েন্টে ০৪ সেমি ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। মাতামুহুরী নদী বান্দরবানের লামা পয়েন্টে ১৯ সেমি এবং কক্সবাজারের চিরিঙ্গা পয়েন্টে ৪১ সেমি ওপরে রয়েছে। খোয়াই নদী হবিগঞ্জের বাল্লা পয়েন্টে পানি বিপদসীমার ৩৪ সেমি ওপর দিয়ে বইছে। মনু নদী মৌলভীবাজার পয়েন্টে পরিস্থিতি বেশ আশঙ্কাজনক, এখানে পানি বিপদসীমার ৭৫ সেমি ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কুশিয়ারা নদী সুনামগঞ্জের মারকুলি পয়েন্টে ২২ সেমি এবং সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে ১৫ সেমি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

আগামী দিনের  পূর্বাভাস

লঘুচাপের প্রভাবে দেশের চার বিভাগ এবং তৎসংলগ্ন ভারতের রাজ্যগুলোতে অতিভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। এর মধ্যে ৩ দিনে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে- চট্টগ্রামে: ৭৫৯ মিমি, লামা (বান্দরবান) ৫৬২ মিমি এবং কক্সবাজারে: ৩০০ মিমি।

আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, আগামী ২ দিন সিলেট, চট্টগ্রাম, রংপুর, ময়মনসিংহ ও রাজশাহী বিভাগে ভারী থেকে অতিভারী এবং ভারতের ত্রিপুরা, মেঘালয় ও পশ্চিমবঙ্গে ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে। এর ফলে আগামী ৩ দিনে সম্ভাব্য বৃষ্টিপাতের পরিমাণ- বান্দরবান ও কক্সবাজার জেলা: ১৭৫-২০০ মিমি, চট্টগ্রাম, ফেনী, লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালী: ১৫০-১৭৫ মিমি,  সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোণা ও শেরপুর: ২০০-২৫০ মিমি, নীলফামারী, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম: ১২৫-১৫০ মিমি।

অববাহিকাভিত্তিক বন্যা পরিস্থিতি

গত ২৪ ঘণ্টায় হালদা, সাঙ্গু, মাতামুহুরী, মুহুরী, ফেনী ও সেলোনিয়া নদীর পানি কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। ফলে বান্দরবান, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের চলমান বন্যা পরিস্থিতি আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় ধীরগতিতে উন্নত হতে পারে।

অন্যদিকে গোমতী নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা আগামী ২ দিন আরও বাড়তে পারে। ফেনী, চট্টগ্রাম ও খাগড়াছড়ির গোমতী, মুহুরী, ফেনী, সেলোনিয়া ও হালদা নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করে নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদী বন্যা সৃষ্টি করতে পারে। এছাড়া লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালী জেলার নিম্নাঞ্চলও সাময়িকভাবে প্লাবিত হতে পারে।

এছাড়াও গত ২৪ ঘণ্টায় ধলাই ও খোয়াই নদীর পানি হ্রাস পাওয়ায় মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার বন্যা পরিস্থিতির ধীরগতিতে উন্নতি হতে পারে।

তবে সুরমা, কুশিয়ারা ও মনু নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় সিলেট ও সুনামগঞ্জে কুশিয়ারা নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে।

আর নতুন করে ঝুঁকিতে পড়বে সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোণা, শেরপুর ও ময়মনসিংহের বিভিন্ন এলাকা। এসব জেলা দিয়ে প্রবাহিত সারিগোয়াইন, সোমেশ্বরী, যাদুকাটা ও ভুগাই-কংস নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমা পার হতে পারে, যার ফলে নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

একইভাবে তিস্তার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় উত্তরাঞ্চলের বেশ কয়েকটি জেলার নিন্মাঞ্চল প্লাবিত হবে। বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্রের তথ্যানুযায়ি, গত ২৪ ঘণ্টায় তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা আগামী ৩ দিন ধরে ক্রমান্বয়ে বাড়বে। ফলে নীলফামারী, লালমনিরহাট ও রংপুর জেলায় তিস্তা নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে স্বল্পমেয়াদী বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে।

আরও জানা যায়, আগামী ৭২ ঘণ্টায় লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম জেলার ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে সতর্কসীমায় পৌঁছাতে পারে এবং নিম্নাঞ্চল সাময়িকভাবে প্লাবিত হতে পারে।

মানবিক আহ্বান

প্রকৃতির এই রুদ্ররূপের সামনে দাঁড়িয়ে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন থাকা এবং একে অপরের প্রতি হাত বাড়িয়ে দেওয়াটাই এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় মানবিক দায়িত্ব। পানিবন্দি মানুষগুলো আমাদেরই ভাই-বোন। ঘরের কোণে জলবন্দি শিশু ও নারীদের কষ্ট লাঘব করতে সরকারি সাহায্যের পাশাপাশি দেশের সামর্থ্যবান মানুষ, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং তরুণ সমাজকে এখনই এগিয়ে আসতে হবে। শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি আর জীবনরক্ষাকারী ওষুধ নিয়ে আমাদের তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে।

যেকোনো দুর্যোগে এদেশের সবসময় তার সর্বোচ্চ মানবিকতা দিয়ে জয়ী হয়েছে। এই কঠিন সময়েও সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও সহমর্মিতাই দুর্গত মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পারে- এই হোক আমাদের আজকের প্রত্যাশা।

বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি