
বাংলাদেশের খুচরা বিক্রয় খাতে এক বড় পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ক্রেতারা এখন আর দোকানে গিয়ে শুধু পণ্য কিনে বাড়ি ফিরতে চান না; বরং তারা খুঁজছেন উন্নত পরিবেশ, মানসম্মত সেবা এবং এক ভিন্নধর্মী অভিজ্ঞতা। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের ক্রেতাদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি।
খুচরা খাতের ভবিষ্যৎ ধারা শীর্ষক প্যানেল আলোচনায় ক্রেতার এমন মনোভাব উঠে এসেছে। শনিবার (১৮ এপ্রিল) সকালে রাজধানীর একটি হোটেলে বাংলাদেশ রিটেইল কংগ্রেস ২০২৬–এ এই প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
আয়োজকরা জানান, স্বপ্নের পরিবেশনায়, সিঙ্গার ও বাটার সঞ্চালনায় এবং কনকা ও গ্রি (ইলেক্ট্রো মার্ট লিমিটেড)-এর সহযোগিতায় বাংলাদেশ রিটেইল কংগ্রেস ২০২৬–এর অষ্টম আয়োজন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এবারের কংগ্রেসের প্রতিপাদ্য ‘জ্ঞানের মাধ্যমে খুচরা ব্যবসার রূপান্তর’।
প্যানেল আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন বাটা বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারিয়া ইয়াসমিন, ইনামি বাংলাদেশের কান্ট্রি হেড তানজীম আলম এবং সিঙ্গার বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমএইচএম ফাইরোজ।
সিঙ্গার বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, পণ্যের চেয়ে অভিজ্ঞতাই এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আগে দোকানে গিয়ে পণ্য চাওয়া এবং তা কিনে নিয়ে আসাই ছিল স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু এখন চিত্র বদলেছে।
ক্রেতারা এখন দোকানের পরিবেশ, সংগীত, কর্মীদের পোশাক ও ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। বিশেষ করে বৈদ্যুতিক পণ্য ও গৃহস্থালি যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রে ‘অভিজ্ঞতা কেন্দ্র’গুলো জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
তিনি আরও বলেন, এসব কেন্দ্রে ক্রেতারা পণ্য ব্যবহার করে তা তাদের দৈনন্দিন জীবনে কী পরিবর্তন আনতে পারে, তা সরাসরি অনুভব করতে পারছেন। যেমন, টেলিভিশন এখন কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং তথ্য ও বিনোদনের সমন্বিত মাধ্যম হিসেবে সমাদৃত হচ্ছে।
ফারিয়া ইয়াসমিন বলেন, বাংলাদেশের বাজার বর্তমানে প্রধানত তিনটি স্তরে বিভক্ত। উচ্চবিত্তরা মূলত বিশেষায়িত বিক্রয়কেন্দ্রে যান উন্নত সেবা ও অভিজ্ঞতার খোঁজে, যেখানে পণ্যের দামের চেয়ে মানের গুরুত্ব বেশি।
ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণি পণ্যের মানের পাশাপাশি সেবার নিশ্চয়তা বা গ্যারান্টি এবং সঠিক দামের সমন্বয় খোঁজেন। আর স্বল্প আয়ের ক্রেতাদের কাছে পণ্যের সহজলভ্যতা ও সাশ্রয়ী দামই প্রধান বিবেচ্য।
তানজীম আলম বলেন, প্রযুক্তির প্রভাবে ক্রেতাদের সচেতনতা বাড়ছে। দেশে মোবাইল ও ইন্টারনেটের ব্যাপক প্রসারের ফলে ক্রেতারা এখন অনেক বেশি তথ্যসমৃদ্ধ। তারা শুধু সাধারণ অনুসন্ধানেই সীমাবদ্ধ নন, বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক অনুসন্ধান ব্যবহার করে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের তুলনা করছেন। ফলে ব্র্যান্ডগুলোর জন্য অনলাইনে উপস্থিতি বজায় রাখা এখন আর ঐচ্ছিক নয়, বরং অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
তার মতে, তরুণ উদ্যোক্তাদের চ্যালেঞ্জ ও ব্র্যান্ডের প্রতি আনুগত্য কমে আসা বাজারে বড় কোম্পানিগুলোর জন্য নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। অনেক ক্ষেত্রে তরুণ উদ্যোক্তারা অনলাইনভিত্তিক বাণিজ্যের মাধ্যমে ঘরে বসেই সফলভাবে ব্যবসা পরিচালনা করছেন, যা বড় কোম্পানিগুলোর জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে, বর্তমান তরুণ প্রজন্মের মধ্যে নির্দিষ্ট কোনো ব্র্যান্ডের প্রতি আগের মতো একনিষ্ঠ আনুগত্য কমছে। যে ব্র্যান্ড ভালো অভিজ্ঞতা ও মান দিচ্ছে, তারা সেদিকেই ঝুঁকছে।
আলোচকরা জানান, খুচরা বিক্রয় খাতকে আরও এগিয়ে নিতে হলে পুরো ব্যবস্থাকে ডিজিটাল করতে হবে। বিশেষ করে খুচরা বিক্রেতাদের জন্য সহজ অর্থায়ন, উন্নত পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা এবং প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন জরুরি।
পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে দ্রুত সরবরাহ ব্যবস্থা যেভাবে বাজার বদলে দিচ্ছে, বাংলাদেশেও তেমন পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে। তাই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে ব্যবসার ধরনে পরিবর্তন আনা এবং ক্রেতাদের আস্থা অর্জন করা এখন সময়ের দাবি।
বাংলা৭১নিউজ/এবি