যে কোনো দিনই কবর জিয়ারত করা, কবরস্থানে গিয়ে মৃত মুসলমানদের জন্য দোয়া করা ও মৃত্যুর কথা স্মরণ করা সুন্নত ও সওয়াবের কাজ। রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মাঝে মাঝেই সাহাবিদের কবরস্থান জান্নাতুল বাকিতে যেতেন এবং বেশ কিছুক্ষণ সেখানে অবস্থান করতেন, কবরবাসীদের জন্য দোয়া করতেন।
কবর জিয়ারত করতে উৎসাহ দিয়ে নবীজি (সা.) বলেন, আপনারা কবর জিয়ারত করুন। কারণ কবর জিয়ারত দুনিয়ার আকর্ষণ কমিয়ে দেয় ও পরকালের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। (সুনানে ইবনে মাজা: ১৫৭১)
শাবানের মহিমান্বিত রাত শবে বরাতেও নবীজি (সা.) জান্নাতুল বাকিতে যেতেন, কবরের বাসিন্দাদের সালাম দিতেন ও তাদের জন্য দোয়া করতেন।
আয়েশা (রা.) বলেন, এক রাতে (সেটি ছিল শবে বরাত) নবীজিকে (সা.) ঘরে না পেয়ে খুঁজতে বের হলাম। খুঁজতে খুঁজতে জান্নাতুল বাকিতে গিয়ে তাকে পেলাম। তিনি বললেন, কী ব্যাপার আয়েশা? তোমার কি মনে হয়, আল্লাহ এবং তার রাসুল তোমার ওপর কোন অবিচার করবেন? আয়েশা (র.) বললেন, আমি ভাবছিলাম আপনি অন্য কোনো স্ত্রীর ঘরে গিয়েছেন কি না! নবীজি (সা.) তখন বললেন, আল্লাহ তাআলা মধ্য শাবানের রাতে দুনিয়ার নিকটবর্তী আকাশে নেমে আসেন এবং বনু কালব গোত্রের বকরি পালের লোমের সংখ্যার চেয়েও অধিক সংখ্যক লোককে ক্ষমা করে দেন। (সুনানে তিরমিজি: ৭৩৭)
শবে বরাতে নবীজিকে (সা.) অনুসরণ করে আমরাও আমাদের মৃত আত্মীয়-স্বজনের কবর জিয়ারত করতে পারি, তাদের জন্য দোয়া করতে পারি। আশা করা যায়, আল্লাহ তাআলা আমাদের দোয়ায় তাদের গুনাহ মাফ করবেন, মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন, আমাদেরকেও সওয়াব দান করবেন ও ক্ষমা করে দেবেন।
কবর জিয়ারতের নিয়ম হলো কবরের পাশে দাঁড়িয়ে মাইয়েতের চেহারার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে সালাম দেওয়া। তারপর মৃতের সওয়াবের উদ্দেশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করা বা দরুদ শরিফ ও বিভিন্ন দোয়া পড়া। হাদিসে যে সব সুরা বা আয়াতের বিশেষ ফজিলত বর্ণিত রয়েছে যেমন সুরা ফাতেহা, আয়াতুল কুরসী, সুরা ইখলাস তিলাওয়াত করে মৃতের জন্য সওয়াব পাঠানো যায়।
মৃতের জন্য হাত তুলে দোয়া করতে চাইলে কবরের দিকে ফিরে নয়, বরং কিবলামুখী হয়ে দাঁড়াবে। কবরের দিকে ফিরে হাত তুলে দোয়া করা ঠিক নয়। কেউ চাইলে হাত না তুলে মনে মনেও দোয়া করতে পারে।
কবর জিয়ারত করতে গিয়ে আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কবরবাসীকে সালাম দিয়ে দোয়া করতেন। সাহাবিদেরও তিনি সালাম দিয়ে দোয়া করতে শিখিয়েছেন। বুরায়দাহ (রা.) বলেন, আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কবরস্থানে গেলে পড়তে শিখিয়েছেন এ দোয়াটি:
السَّلَامُ عَلَيْكُمْ أَهْلَ الدِّيَارِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُسْلِمِينَ وَإِنَّا إِنْ شَاءَ اللَّهُ بِكُمْ لَلَاحِقُونَ نَسْأَلُ اللَّهَ لَنَا وَلَكُمُ الْعَافِيَةَ
উচ্চারণ: আসসালামু আলায়কুম আহলাদ দিয়ারি মিনাল মুমিনীনা ওয়াল মুসলিমীনা ওয়া ইন্না ইনশাআল্লাহু বিকুম লালাহিকূনা নাসআলুল্লাহা লানা ওয়ালাকুমুল আফিয়াহ।
অর্থ: হে কবরবাসী মুমিন ও মুসলিমগণ! তোমাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। ইনশাআল্লাহ অবশ্যই আমরাও তোমাদের সাথে মিলিত হচ্ছি। আমরা আমাদের ও তোমাদের জন্য আল্লাহর কাছে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রার্থনা করছি। (সহিহ মুসলিম: ৯৭৫)
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মদিনার কবরস্থান হয়ে যাচ্ছিলেন, এ সময় তাদের দিকে মুখ করে বললেন:
السَّلَامُ عَلَيْكُمْ يَا أَهْلَ الْقُبُورِ يَغْفِرُ اللَّهُ لَنَا وَلَكُمْ أَنْتُمْ سَلَفُنَا وَنَحْنُ بِالْأَثَرِ
উচ্চারণ: আসসালামু আলাইকুম ইয়া আহলাল কুবূরি ইয়াগফিরুল্লাহু লানা ওয়া লাকুম আনতুম সালাফুনা ওয়া নাহনু বিল আসারি।
অর্থ: হে কবরবাসী, তোমাদের ওপর শান্তি বৰ্ষিত হোক। আল্লাহ আমাদের ও তোমাদের গুনাহ ক্ষমা করে দিন, (পরকালের যাত্রায়) তোমরা আমাদের আগে গেছ আর আমরাও তোমাদের অনুসরণ করবো। (সুনানে তিরমিজি: ৫৯৬)
কবরস্থানে গেলে শরিয়তের বিধিনিষেধগুলো মনে রাখতে হবে। কবরস্থানে গিয়ে কবরে সেজদা করা, কবরে থাকা ওলি বা দরবেশের কাছে কিছু চাওয়া, কবরে থাকা ব্যক্তির জন্য প্রাণী উৎসর্গ করা ইত্যাদি শিরক ও গর্হিত পাপ। এ ছাড়া কবরস্থানে আরও কিছু কাজ করা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে বিভিন্ন হাদিসে। এর মধ্যে কয়েকটি হলো:
কবরের ওপর বসা নিষেধ। এটা আদবের খেলাফ। রাসুল (সা.) বলেছেন, কবরের ওপর বসার চেয়ে উত্তম হলো আগুনের ওপর বসা যে আগুন কাপড় পুড়িয়ে দিয়ে চামড়া পর্যন্ত জ্বালিয়ে দেবে। (মুসলিম: ৯৭১)
কবরের ওপর জুতো পরে হাঁটাহাঁটি করা নিষিদ্ধ। বশির ইবনে খাসাসিয়া (রা.) বলেন, আমি একবার রাসুলের (সা.) সাথে হাঁটছিলাম। তিনি মুসলমানদের একটি কবরস্থানে গিয়ে বললেন, এরা বহু মন্দ কাজ পরিত্যাগে অগ্রগামী হয়েছে, তারপর মুশরিকদের একটি কবরস্থানে গিয়ে বললেন, এরা বহু মঙ্গলময় কাজ পরিত্যাগে অগ্রগামী হয়েছে। তারপর তিনি অন্যদিকে লক্ষ্য করে দেখলেন, এক ব্যক্তি জুতা পায়ে কবরস্থানের মাঝখানে হাটাহাটি করছে। তিনি বললেন, হে জুতা পরিধানকারী, জুতা ফেলে দাও। (সুনানে নাসাঈ: ১০৭)
কবরের দিকে ফিরে নামাজ আদায় করা থেকে বিরত থাকতে হবে। রাসুল (সা.) বলেছেন, তোমরা কবরের দিকে ফিরে নামাজ আদায় করবে না এবং কবরের ওপর বসবেও না। (সহিহ মুসলিম: ৯৭২)
জাহেলি যুগে আরবরা কবরে পশু জবাই করতো। নবীজি (সা.) কবরে এ রকম পশু জবাই করতে নিষেধ করেন। (আবু দাউদ: ৩,২২২)
কবরস্থানে গিয়ে হাসি-তামাশা ও উল্লাস করা থেকে বিরত থাকতে হবে। রাসুল (সা.) বলেছেন, তোমরা তোমাদের ঘরগুলোকে কবর বানিয়ো না এবং কবরগুলোকে উৎসবের জায়গা বানিয়ো না।’ (আবু দাউদ: ২,০৪২)
বাংলা৭১নিউজ/এসএএইচ