২০২৬ থেকে ২০৩১ সাল মেয়াদে প্রস্তাবিত এ প্যাকেজে থাকবে স্বল্প সুদের ঋণ, বেসরকারি বিনিয়োগ ও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারি (পিপিপি)। অগ্রাধিকার দেওয়া হবে ১২টি খাতকে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারি চুক্তির (ইপিএ) পূর্ণ বাস্তবায়ন, রপ্তানি সম্প্রসারণ, দক্ষ জনশক্তি পাঠানো এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পে বিনিয়োগ আকর্ষণেও গুরুত্ব দেবে বাংলাদেশ।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমানের প্রথম জাপান সফর ঘিরে দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা দিয়ে আসছে জাপান।
এবার সেই সম্পর্ককে অবকাঠামোকেন্দ্রিক সহযোগিতা থেকে শিল্পায়ন, প্রযুক্তি স্থানান্তর, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি বৃদ্ধির বৃহত্তর অংশীদারিতে রূপ দিতে চায় বাংলাদেশ। সংশ্লিষ্ট প্রস্তাব অনুযায়ী, যোগাযোগ অবকাঠামো, মাতারবাড়ী হাব, সেমিকন্ডাক্টর ও অটোমোবাইল শিল্পে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ সহায়তা চাওয়া হবে। পাশাপাশি জাপানের বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ আকর্ষণেও উদ্যোগ নেওয়া হবে। তবে প্রস্তাবিত ১৪ বিলিয়ন ডলারের পুরো অর্থ সরাসরি বিনিয়োগ হিসেবে আসবে না; এর মধ্যে ঋণ, বেসরকারি বিনিয়োগ ও পিপিপির অর্থায়ন থাকবে।
বিনিয়োগে বড় চ্যালেঞ্জ পরিবেশ : জাপানের কাছ থেকে বিনিয়োগ ও সহযোগিতা পাওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও তা বাস্তবায়নে দেশের অভ্যন্তরীণ সংস্কার, সুশাসন ও বিনিয়োগ পরিবেশকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তাঁদের মতে, সহযোগিতা প্যাকেজের ঘোষণা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, অর্থায়ন ও বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব প্রকল্পে রূপ দেওয়ার সক্ষমতাও ততটাই জরুরি।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, জাপানের বেসরকারি খাত তখনই বাংলাদেশে বিনিয়োগ করবে, যখন এখানে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা যাবে। এজন্য প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, দক্ষতা ও সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে।
এসব ক্ষেত্রে উন্নতি করা গেলে জাপানসহ অন্যান্য দেশ থেকেও বিনিয়োগ আকর্ষণ করা সম্ভব হবে। জাপান বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি আবদুল হক বলেন, বাংলাদেশে সংস্কার, আইনের শাসন, সুশাসন এবং সরকারি সেবার নিয়ন্ত্রণ সহজ করার বিষয়ে জাপানের প্রত্যাশা রয়েছে। দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে এসব সংস্কার গুরুত্বপূর্ণ। তবে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা অনুযায়ী সব ক্ষেত্রে অগ্রগতি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
প্রকল্প নির্বাচন ও ঋণ আলোচনায় প্রস্তুতি জরুরি : সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, জাপান আলোচনায় পেশাদারি দেখাবে; বাংলাদেশকেও একই ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে এগোতে হবে। প্রকল্প নির্বাচন, ঋণ নিয়ে আলোচনা এবং উপযুক্ত আর্থিক প্যাকেজ চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রস্তুতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, শুধু অর্থায়নের পরিমাণের দিকে নজর না দিয়ে প্রকল্পের উপযোগিতা, অর্থনৈতিক সুফল এবং আর্থিক শর্তগুলো যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। এতে সহযোগিতা প্যাকেজের কার্যকারিতা বাড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদে ঋণের অর্থনৈতিক সুফল নিশ্চিত করা সহজ হবে।
বাণিজ্য ও দক্ষ জনশক্তিতে নতুন সম্ভাবনা : বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণেও জাপান গুরুত্বপূর্ণ। সর্বশেষ অর্থবছরে দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩২৫ কোটি ডলার। এর মধ্যে বাংলাদেশ থেকে জাপানে রপ্তানি হয়েছে প্রায় ১৫০ কোটি ডলারের পণ্য। বিপরীতে জাপান থেকে আমদানি হয়েছে প্রায় ১৭৫ কোটি ডলারের পণ্য।
এ বাণিজ্য আরও বাড়াতে দুই দেশের অর্থনৈতিক অংশীদারি চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। চুক্তির কার্যকর বাস্তবায়ন হলে জাপানের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়ানোর পাশাপাশি রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে তৈরি পোশাকের বাইরে নতুন পণ্য ও শিল্প খাতে রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ কাজে লাগাতে চায় বাংলাদেশ। এ ছাড়া জাপানে বছরে ১ লাখ দক্ষ কর্মী ও শিক্ষার্থী পাঠানোর বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে। দক্ষ জনশক্তি তৈরি ও পাঠানোর ক্ষেত্রে ভাষা শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং জাপানের শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে বাংলাদেশের প্রশিক্ষণব্যবস্থার সমন্বয় প্রয়োজন হবে।
সব মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন জাপান সফরে বাংলাদেশের লক্ষ্য কেবল বড় অঙ্কের অর্থায়ন নিশ্চিত করা নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অংশীদারির ভিত্তি শক্তিশালী করা। প্রস্তাবিত ১৪ বিলিয়ন ডলারের সহযোগিতা প্যাকেজ বাস্তবায়িত হলে অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়ন, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও কর্মসংস্থানে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে সেই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা বাড়ানোই হবে বাংলাদেশের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
৭৯ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে জাপান
বাংলাদেশে আগামী পাঁচ বছরে ৬ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে জাপান, যা বাংলাদেশের মুদ্রায় ৭৯ হাজার কোটি টাকা। দেশটির বেসরকারি খাতের মাধ্যমে এ বিনিয়োগ আসবে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম নিক্কেই এশিয়ার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
নিক্কেই এশিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠকে যৌথ বিবৃতির মাধ্যমে এ বিনিয়োগ পরিকল্পনার ঘোষণা দেওয়ার কথা রয়েছে। এ বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদার হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পাশাপাশি বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও বিনিয়োগ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, জাপানের পরিকল্পিত বিনিয়োগের অর্থ ব্যয় করা হবে অটোমোবাইল, উৎপাদন শিল্প এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের অবকাঠামো উন্নয়নে। এ ছাড়া জাপানি ট্রেডিং প্রতিষ্ঠান সুমিতোমো করপোরেশনসহ অন্যান্য অংশীদারের উদ্যোগে গড়ে তোলা ‘বাংলাদেশ স্পেশাল ইকোনমিক জোন’-এও বিনিয়োগ করবে জাপানি কোম্পানিগুলো।























