ঢাকা ০১:৪৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬, ৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম

নেপথ্যে মুশাররাত জেবীনের মানবিকতার গল্প

ম্যাডাম, আপনার এই সহযোগিতার কথা আমরা মনে রাখব। আমাদের চেয়ারপার্সনও মনে রাখবেন।

কথাগুলো বলেছিলেন মালয়েশিয়া বিএনপির কয়েকজন নেতা। কৃতজ্ঞতায় ভরা কথাগুলোর জবাব এসেছিল মাত্র তিনটি শব্দে– ‘এটা আমার দায়িত্ব।’

ঘটনাটি ২০১৫ সালের ২৫ জানুয়ারি। মালয়েশিয়ায় সাপ্তাহিক ছুটির দিন রবিবার।

ছুটির দিনেও কুয়ালালামপুরের আকাশে বিষণ্নতা, প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটিতে ছড়িয়ে পড়ে হৃদয়বিদারক খবর—বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো আর নেই।

এর এক দিন আগেই কোকো তার বাসায় বুকে ব্যথা অনুভব করেন। অ্যাম্বুলেন্সে মালয়েশিয়ার একটি হাসপাতালে নেওয়ার পরে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ৪৫ বছর।

কোকোর মৃত্যুর খবরটি ছড়িয়ে পড়তেই তাকে দ্রুত দেশে পাঠানোর উদ্যোগ নেন মালয়েশিয়া বিএনপির নেতাকর্মীরা। কিন্তু সামনে প্রথম বাঁধা–সেদিন সরকারি ছুটি। বাংলাদেশ হাইকমিশন বন্ধ, গেটে ঝুলছে তালা। স্বাভাবিক নিয়মে পরবর্তী কর্মদিবস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হলে মরদেহ দেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া পিছিয়ে যেতে পারত। শোকাহত বিএনপি নেতাকর্মীরা তখন ছুটে যান মালয়েশিয়াস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনের তৎকালীন প্রথম সচিব (শ্রম) মুশাররাত জেবীনের কাছে।

বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে তিনি তৎক্ষণাৎ বাংলাদেশ হাইকমিশনারের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করেন। হাইকমিশনার তখন কুয়ালালামপুরের বাইরে অবস্থান করছিলেন। হেড অব চ্যান্সারি রইস হাসান সারওয়ারের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু সেখান থেকেও সুস্পষ্ট কোনো নির্দেশনা মেলেনি। ‘যা ভালো মনে হয় তাই করুন’ বলা হয় তাকে। মুশাররাত জেবীনের সামনে তখন এক কঠিন বাস্তবতা।

ছুটির দিনে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া হাইকমিশনের তালা খুলে দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া কতটা কঠিন, তা সেদিনই বুঝেছিলেন ২০তম ব্যাচের প্রশাসন ক্যাডারের এই নারী কর্মকর্তা। তার সামনে তখন দুটি পথ খোলা ছিল– এক পরবর্তী কর্মদিবস পর্যন্ত অপেক্ষা করা, অথবা পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় নিজের দায়িত্ববোধ থেকে জরুরি ব্যবস্থা নেওয়া।

একদিকে সরকারি বিধিবিধান, অন্যদিকে দেশে অপেক্ষমান একটি শোকাহত পরিবার ও দলীয় নেতাকর্মীরা। আর সেই পরিবারের একজন মা তার সন্তানের মৃত্যুশোকে মুহ্যমান, তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে খালেদা জিয়া তখন গুলশানের কার্যালয়ে অবস্থান করছিলেন এবং বিএনপির ডাকা অবরোধ কর্মসূচির নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। এমন এক কঠিন সময়ে মুশাররাত জেবীন চাকরির বিধি-বিধানের কথা না ভেবেই নিজের দায়িত্ববোধের পথটি বেছে নেন। কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের জন্য অপেক্ষা করেননি।

সকাল আনুমানিক ১০টা। দু’জন স্টাফকে সঙ্গে নিয়ে তিনি নিজেই গাড়ি চালিয়ে হাইকমিশনে পৌঁছান। ছুটির দিনে ফোন করে অফিসের কক্ষ খোলার ব্যবস্থা করা হয়। এরপর শুরু হয় মরদেহ দেশে পাঠানোর প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা। ক্যাসকেড কম্পানির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও হাসপাতালের রিলিজ লেটার দ্রুত নিয়ে আসতে বলা হয়। একে একে সংগ্রহ করা হয় প্রয়োজনীয় নথি। তিনি নিজেই কম্পিউটারের সামনে বসে পড়েন। সম্পন্ন হয় মরদেহ দেশে পাঠানোর প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা। খুলে যায় কোকোর মরদেহ দেশে পাঠানোর জটিল প্রক্রিয়া। শোকার্ত নেতাকর্মীদের মধ্যে ফিরে আসে স্বস্তি।

তারা কৃতজ্ঞতা জানান মুশাররাত জেবীনকে। নেতাকর্মীরা তখন এই কর্মকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, ‘ম্যাডাম, আপনার এই সহযোগিতার কথা আমরা মনে রাখব। আমাদের চেয়ারপার্সনও মনে রাখবেন।’ পরবর্তীতে তারা জানান, চেয়ারপার্সন আপনাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। মুশাররাত জেবীনের উত্তর ছিল একটাই যে ‘এটা আমার দায়িত্ব।’

মালয়েশিয়া বিএনপির তৎকালীন নেতা মোশাররফ হোসেন সেদিনের ঘটনা স্মরণ করে বলেন, আরাফাত রহমান কোকোর মরদেহ দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়ায় হাইকমিশনের ঊর্ধ্বতন পর্যায় থেকে তাৎক্ষণিক সহযোগিতা পাওয়া যায়নি। এমন পরিস্থিতিতে এগিয়ে আসেন তৎকালীন প্রথম সচিব (শ্রম) মুশাররাত জেবীন। ছুটির দিন, বন্ধ হাইকমিশন—কোনো কিছুই তার দায়িত্ববোধের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। প্রয়োজনীয় অনুমতির অপেক্ষা না করে তিনি বন্ধ হাইকমিশনের তালা খুলে মরদেহ দেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করেন। তার এই তাৎক্ষণিক উদ্যোগে দ্রুত মরদেহ দেশে পাঠানো সম্ভব হয়।

তিনি আরো জানান, মুশাররাত জেবীনের এই মানবিক ও দায়িত্বশীল ভূমিকার জন্য তৎকালীন বিএনপির চেয়ারপার্সন মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া তাকে ধন্যবাদ জানিয়েছিলেন।

মৃত্যুর পর একজন মানুষের রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা সামাজিক অবস্থান নয়, সবার আগে সামনে আসে তার পরিবার, তার স্বজনদের শোক এবং শেষ বিদায়ের অধিকার। মুশাররাত জেবীনের কাছে সেদিন কাজটি হয়তো ছিল একটি সরকারি দায়িত্ব। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের ঘটনাটিই তাকে মানবিক করে তুলেছিল।

কোকোর মরদেহ পরবর্তীতে দেশে আসে। ঢাকায় বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে জানাজা শেষে বনানী কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। হাজার হাজার মানুষ শেষ বিদায় জানাতে এসেছিলেন।

কোকোর মরদেহ দেশে ফেরানোর সেই ঘটনা মুশাররাত জেবীনের কর্মজীবনের একটি স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকলেও তার পেশাগত জীবনের পথটি ছিল অনেকটাই ভিন্ন। প্রশাসন ক্যাডারের এই মেধাবী কর্মকর্তা বর্তমানে যুগ্মসচিব। চাকরিজীবনে তিনি ফেনী জেলায় এসি ল্যান্ডসহ বিভিন্ন দপ্তর ও প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেছেন। মালয়েশিয়া থেকে দেশে ফেরার পর খাদ্য অধিদপ্তর, আইসিটি দপ্তর, ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড, প্রত্যাগত অভিবাসী কর্মীদের পুনঃএকত্রীকরণ-সংক্রান্ত প্রকল্প এবং বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)-এর মহাব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করেছেন। বর্তমানে তিনি ট্যারিফ কমিশনের সদস্য হিসেবে কর্মরত আছেন।

এই ঘটনা স্মরণ করিয়ে দেয় যে, সরকারি দায়িত্ব কখনো কখনো শুধু বিধি-বিধানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। মানবিকতা ও সময়ের তাগিদও সেখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

কিন্তু কোকোর লাশ ফেরত আনার বিষয়ে ভূমিকা রাখায় মুশাররাত জেবীন পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত ছিল দীর্ঘদিন। বিগত সরকারের সময়ে তাকে নানা হয়রানির শিকার হতে হয়।

আরাফাত রহমান কোকো (জন্ম ১২ আগস্ট ১৯৬৯) ছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার কনিষ্ঠ পুত্র এবং তারেক রহমানের ছোট ভাই। রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম নিলেও তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে যাননি। তার আগ্রহ ছিল ক্রীড়া, বিশেষ করে ক্রিকেট। ২০০২ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) ডেভেলপমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি দেশের ক্রিকেটের অবকাঠামো উন্নয়ন, যুব পর্যায়ের ক্রিকেট সম্প্রসারণ এবং পেশাদারিত্ব বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। অনেকের মতে তিনি আধুনিক বাংলাদেশ ক্রিকেটের এক নীরব স্থপতি ছিলেন।

তবে ২০০৭ সালের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তিনি দুর্নীতি ও অর্থপাচারের অভিযোগে গ্রেপ্তার হন। পরে জামিনে মুক্তি পেয়ে চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ড যান এবং সেখান থেকে মালয়েশিয়ায় স্থায়ীভাবে অবস্থান শুরু করেন। ২০১১ সালে অনুপস্থিতিতেই তাকে ছয় বছরের কারাদণ্ড ও জরিমানা করা হয়। এরপর তিনি আর দেশে ফিরে আসেননি। স্ত্রী শর্মিলা রহমান এবং দুই কন্যা জাহিয়া ও জাফিয়ার সঙ্গে কুয়ালালামপুরে থাকতেন।

বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ

Tag :

দাকোপ থেকে নৌপথে মোংলার উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী

নেপথ্যে মুশাররাত জেবীনের মানবিকতার গল্প

আপডেট সময় ১০:৫১:১৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬

ম্যাডাম, আপনার এই সহযোগিতার কথা আমরা মনে রাখব। আমাদের চেয়ারপার্সনও মনে রাখবেন।

কথাগুলো বলেছিলেন মালয়েশিয়া বিএনপির কয়েকজন নেতা। কৃতজ্ঞতায় ভরা কথাগুলোর জবাব এসেছিল মাত্র তিনটি শব্দে– ‘এটা আমার দায়িত্ব।’

ঘটনাটি ২০১৫ সালের ২৫ জানুয়ারি। মালয়েশিয়ায় সাপ্তাহিক ছুটির দিন রবিবার।

ছুটির দিনেও কুয়ালালামপুরের আকাশে বিষণ্নতা, প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটিতে ছড়িয়ে পড়ে হৃদয়বিদারক খবর—বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো আর নেই।

এর এক দিন আগেই কোকো তার বাসায় বুকে ব্যথা অনুভব করেন। অ্যাম্বুলেন্সে মালয়েশিয়ার একটি হাসপাতালে নেওয়ার পরে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ৪৫ বছর।

কোকোর মৃত্যুর খবরটি ছড়িয়ে পড়তেই তাকে দ্রুত দেশে পাঠানোর উদ্যোগ নেন মালয়েশিয়া বিএনপির নেতাকর্মীরা। কিন্তু সামনে প্রথম বাঁধা–সেদিন সরকারি ছুটি। বাংলাদেশ হাইকমিশন বন্ধ, গেটে ঝুলছে তালা। স্বাভাবিক নিয়মে পরবর্তী কর্মদিবস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হলে মরদেহ দেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া পিছিয়ে যেতে পারত। শোকাহত বিএনপি নেতাকর্মীরা তখন ছুটে যান মালয়েশিয়াস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনের তৎকালীন প্রথম সচিব (শ্রম) মুশাররাত জেবীনের কাছে।

বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে তিনি তৎক্ষণাৎ বাংলাদেশ হাইকমিশনারের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করেন। হাইকমিশনার তখন কুয়ালালামপুরের বাইরে অবস্থান করছিলেন। হেড অব চ্যান্সারি রইস হাসান সারওয়ারের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু সেখান থেকেও সুস্পষ্ট কোনো নির্দেশনা মেলেনি। ‘যা ভালো মনে হয় তাই করুন’ বলা হয় তাকে। মুশাররাত জেবীনের সামনে তখন এক কঠিন বাস্তবতা।

ছুটির দিনে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া হাইকমিশনের তালা খুলে দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া কতটা কঠিন, তা সেদিনই বুঝেছিলেন ২০তম ব্যাচের প্রশাসন ক্যাডারের এই নারী কর্মকর্তা। তার সামনে তখন দুটি পথ খোলা ছিল– এক পরবর্তী কর্মদিবস পর্যন্ত অপেক্ষা করা, অথবা পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় নিজের দায়িত্ববোধ থেকে জরুরি ব্যবস্থা নেওয়া।

একদিকে সরকারি বিধিবিধান, অন্যদিকে দেশে অপেক্ষমান একটি শোকাহত পরিবার ও দলীয় নেতাকর্মীরা। আর সেই পরিবারের একজন মা তার সন্তানের মৃত্যুশোকে মুহ্যমান, তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে খালেদা জিয়া তখন গুলশানের কার্যালয়ে অবস্থান করছিলেন এবং বিএনপির ডাকা অবরোধ কর্মসূচির নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। এমন এক কঠিন সময়ে মুশাররাত জেবীন চাকরির বিধি-বিধানের কথা না ভেবেই নিজের দায়িত্ববোধের পথটি বেছে নেন। কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের জন্য অপেক্ষা করেননি।

সকাল আনুমানিক ১০টা। দু’জন স্টাফকে সঙ্গে নিয়ে তিনি নিজেই গাড়ি চালিয়ে হাইকমিশনে পৌঁছান। ছুটির দিনে ফোন করে অফিসের কক্ষ খোলার ব্যবস্থা করা হয়। এরপর শুরু হয় মরদেহ দেশে পাঠানোর প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা। ক্যাসকেড কম্পানির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও হাসপাতালের রিলিজ লেটার দ্রুত নিয়ে আসতে বলা হয়। একে একে সংগ্রহ করা হয় প্রয়োজনীয় নথি। তিনি নিজেই কম্পিউটারের সামনে বসে পড়েন। সম্পন্ন হয় মরদেহ দেশে পাঠানোর প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা। খুলে যায় কোকোর মরদেহ দেশে পাঠানোর জটিল প্রক্রিয়া। শোকার্ত নেতাকর্মীদের মধ্যে ফিরে আসে স্বস্তি।

তারা কৃতজ্ঞতা জানান মুশাররাত জেবীনকে। নেতাকর্মীরা তখন এই কর্মকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, ‘ম্যাডাম, আপনার এই সহযোগিতার কথা আমরা মনে রাখব। আমাদের চেয়ারপার্সনও মনে রাখবেন।’ পরবর্তীতে তারা জানান, চেয়ারপার্সন আপনাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। মুশাররাত জেবীনের উত্তর ছিল একটাই যে ‘এটা আমার দায়িত্ব।’

মালয়েশিয়া বিএনপির তৎকালীন নেতা মোশাররফ হোসেন সেদিনের ঘটনা স্মরণ করে বলেন, আরাফাত রহমান কোকোর মরদেহ দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়ায় হাইকমিশনের ঊর্ধ্বতন পর্যায় থেকে তাৎক্ষণিক সহযোগিতা পাওয়া যায়নি। এমন পরিস্থিতিতে এগিয়ে আসেন তৎকালীন প্রথম সচিব (শ্রম) মুশাররাত জেবীন। ছুটির দিন, বন্ধ হাইকমিশন—কোনো কিছুই তার দায়িত্ববোধের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। প্রয়োজনীয় অনুমতির অপেক্ষা না করে তিনি বন্ধ হাইকমিশনের তালা খুলে মরদেহ দেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করেন। তার এই তাৎক্ষণিক উদ্যোগে দ্রুত মরদেহ দেশে পাঠানো সম্ভব হয়।

তিনি আরো জানান, মুশাররাত জেবীনের এই মানবিক ও দায়িত্বশীল ভূমিকার জন্য তৎকালীন বিএনপির চেয়ারপার্সন মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া তাকে ধন্যবাদ জানিয়েছিলেন।

মৃত্যুর পর একজন মানুষের রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা সামাজিক অবস্থান নয়, সবার আগে সামনে আসে তার পরিবার, তার স্বজনদের শোক এবং শেষ বিদায়ের অধিকার। মুশাররাত জেবীনের কাছে সেদিন কাজটি হয়তো ছিল একটি সরকারি দায়িত্ব। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের ঘটনাটিই তাকে মানবিক করে তুলেছিল।

কোকোর মরদেহ পরবর্তীতে দেশে আসে। ঢাকায় বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে জানাজা শেষে বনানী কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। হাজার হাজার মানুষ শেষ বিদায় জানাতে এসেছিলেন।

কোকোর মরদেহ দেশে ফেরানোর সেই ঘটনা মুশাররাত জেবীনের কর্মজীবনের একটি স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকলেও তার পেশাগত জীবনের পথটি ছিল অনেকটাই ভিন্ন। প্রশাসন ক্যাডারের এই মেধাবী কর্মকর্তা বর্তমানে যুগ্মসচিব। চাকরিজীবনে তিনি ফেনী জেলায় এসি ল্যান্ডসহ বিভিন্ন দপ্তর ও প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেছেন। মালয়েশিয়া থেকে দেশে ফেরার পর খাদ্য অধিদপ্তর, আইসিটি দপ্তর, ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড, প্রত্যাগত অভিবাসী কর্মীদের পুনঃএকত্রীকরণ-সংক্রান্ত প্রকল্প এবং বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)-এর মহাব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করেছেন। বর্তমানে তিনি ট্যারিফ কমিশনের সদস্য হিসেবে কর্মরত আছেন।

এই ঘটনা স্মরণ করিয়ে দেয় যে, সরকারি দায়িত্ব কখনো কখনো শুধু বিধি-বিধানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। মানবিকতা ও সময়ের তাগিদও সেখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

কিন্তু কোকোর লাশ ফেরত আনার বিষয়ে ভূমিকা রাখায় মুশাররাত জেবীন পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত ছিল দীর্ঘদিন। বিগত সরকারের সময়ে তাকে নানা হয়রানির শিকার হতে হয়।

আরাফাত রহমান কোকো (জন্ম ১২ আগস্ট ১৯৬৯) ছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার কনিষ্ঠ পুত্র এবং তারেক রহমানের ছোট ভাই। রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম নিলেও তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে যাননি। তার আগ্রহ ছিল ক্রীড়া, বিশেষ করে ক্রিকেট। ২০০২ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) ডেভেলপমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি দেশের ক্রিকেটের অবকাঠামো উন্নয়ন, যুব পর্যায়ের ক্রিকেট সম্প্রসারণ এবং পেশাদারিত্ব বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। অনেকের মতে তিনি আধুনিক বাংলাদেশ ক্রিকেটের এক নীরব স্থপতি ছিলেন।

তবে ২০০৭ সালের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তিনি দুর্নীতি ও অর্থপাচারের অভিযোগে গ্রেপ্তার হন। পরে জামিনে মুক্তি পেয়ে চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ড যান এবং সেখান থেকে মালয়েশিয়ায় স্থায়ীভাবে অবস্থান শুরু করেন। ২০১১ সালে অনুপস্থিতিতেই তাকে ছয় বছরের কারাদণ্ড ও জরিমানা করা হয়। এরপর তিনি আর দেশে ফিরে আসেননি। স্ত্রী শর্মিলা রহমান এবং দুই কন্যা জাহিয়া ও জাফিয়ার সঙ্গে কুয়ালালামপুরে থাকতেন।

বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ