ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) পদত্যাগের দাবি নরেন্দ্র মোদি সরকারকে উভয় সংকটে ফেলেছে। সিজেপিসহ বিরোধী দলগুলোর দাবি পূরণ করা হলে সরকার রাজনৈতিকভাবে বৈধতার প্রশ্নের মুখে পড়বে। অন্যদিকে দমনপীড়ন চালালে তা জনরোষ উসকে দেবে।
দিল্লিতে শনিবারের বিক্ষোভ ও ধরপাকড়, নরেন্দ্র মোদির জন্য যে পরিস্থিতি তৈরি করেছে, সেটিকে ব্যাখ্যা করা যায় মার্কিন লেখক জোসেফ হেলারের ব্যবহার করা ‘যুক্তির ফাঁদ’ ধারণা দিয়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে লেখা উপন্যাস ‘ক্যাচ-২২’-তে এক পাইলটের চরম উভয় সংকট তুলে ধরতে এই ধারণা ব্যবহার করেন হেলার। তিনি এমন এক স্ববিরোধী পরিস্থিতি তুলে ধরেন, যেখানে সমস্যা সমাধানের উপায় নতুন আরেক সংকট তৈরি করে। এই ধারণা পরে ক্যাচ-২২ নামে জনপ্রিয় হয়।
নরেন্দ্র মোদির ক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতির বাস্তবতা বুঝতে হলে, আন্দোলনকারীদের প্রধান দাবির প্রতি নজর দেওয়া প্রয়োজন। তারা সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ চাইছেন। এর পেছনে যে অভিযোগ, সেটি বর্তমান সরকারের ক্ষমতায় থাকার রাজনৈতিক বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করছে। ফলে এটি কেবল একজন ব্যক্তির পদত্যাগের বিষয় নয়।
দাবির সঙ্গে যুক্ত সংবিধান ও বৈধতা
আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে আছে নির্বাচন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা। প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস ও তরুণদের প্ল্যাটফর্ম সিজেপির অভিযোগ, সংশোধনের নামে অনেক নাগরিককে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। কংগ্রেস এটিকে শুধু নির্বাচনী অনিয়ম নয়, সরাসরি সংবিধানের ওপর আঘাত হিসেবে উল্লেখ করেছে।
ভারতের নির্বাচন কমিশন (ইসিআই) একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। এমন প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে যখন ‘ভোট চুরির’ অভিযোগ ওঠে তখন পুরো নির্বাচন ব্যবস্থা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। তখন সরকারের ক্ষমতায় থাকার নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। কংগ্রেস ও সিজেপি এই প্রশ্নটিকে তাদের রাজনৈতিক দাবির কেন্দ্রে রেখেছে। তারা বলছে, যে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আছে, সেটি ত্রুটিপূর্ণ ও কারচুপিতে ভরা।
গত বছরের আগস্টে দিল্লিতে এক সংবাদ সম্মেলনে রাহুল গান্ধী অভিযোগ করেন, লোকসভা নির্বাচনে (২০২৪) বিজেপি ও ইসিআই মিলে ‘ভোট চুরি’ করেছে। এটিকে তিনি সংবিধানের ওপর গুরুতর আঘাত বলে আখ্যা দেন। দলীয় গবেষণা সেলের তৈরি করা নথির ভিত্তিতে ভোটার তালিকায় অনিয়ম, সন্দেহজনক ভোটার উপস্থিতি ও ইলেকট্রনিক তথ্যে গরমিলের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
ভারতজুড়ে ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) উদ্যোগ নিয়ে বিরোধী দলগুলো প্রায়ই প্রশ্ন তুলে আসছে। তাদের অভিযোগ, এই কার্যক্রমের মাধ্যমে তালিকা থেকে কয়েক কোটি ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। যার সুবিধা পাচ্ছে বিজেপি।
তবে বাদ পড়া ব্যক্তিদের কতজন যোগ্য ভোটার এবং বিজেপির সুবিধা পাওয়ার বিষয়ে এখনো সুনির্দিষ্ট তদন্ত হয়নি। গত মাসে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সেপ্রেসের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ইসিআইয়ের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এতে বলা হয়, ভোটার নিবন্ধন, নাম বাদ দেওয়া ও তথ্যভান্ডার ব্যবস্থাপনা নিয়ে তিন কমিশনারের মধ্যে দুজন অন্তত ১৪ বার আনুষ্ঠানিকভাবে আপত্তি জানিয়েছেন। সংবিধান অনুযায়ী, তিন সদস্যের ইসিতে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কথা থাকলেও সিইসি আপত্তি ওঠা বিষয়গুলোতে এককভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
বিজেপি সরকার এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। ইসিআই বলেছে, অভিযোগগুলো সামগ্রিক চিত্রের ‘কেবল একটি দিক’ তুলে ধরেছে। এসআইআরের উদ্দেশ্য হলো জালিয়াতির মাধ্যমে নিবন্ধিত ভোটারদের শনাক্ত করা। একই সঙ্গে যারা ভোটার হওয়ার যোগ্য, তাদের নাম তালিকায় নিশ্চিত করাটাও লক্ষ্য।
কমিশন আরও বলছে, ‘অবৈধ অভিবাসীদের ভোট দেওয়া ঠেকাতেও এই কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে।’ তবে সমালোচকদের দাবি, উদ্যোগটির কারণে প্রান্তিক ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী তুলনামূলকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চলমান বিক্ষোভেও কংগ্রেস, সিজেপিসহ অন্য রাজনৈতিক দলগুলো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে আঘাত ও সরকারের রাজনৈতিক বৈধতার দিকে বারবার আঙুল তুলছে।
তরুণদের উত্থান ও ‘ডোমিনো ইফেক্ট’
নরেন্দ্র মোদির জন্য এবারের পরিস্থিতি আরও সংকটময় হওয়ার অন্যতম কারণ আন্দোলনকারীদের প্রোফাইল। তারা মূলত দেশের তরুণ ও ছাত্রসমাজ। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে বিপুল জনপ্রিয় ‘ইনফ্লুয়েন্সাররাও’ সংহতি জানাচ্ছেন। গত জুলাই মাসে এই তরুণরাই প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবিতে রাজপথে নামেন। রাষ্ট্রযন্ত্রের চাপ সত্ত্বেও সে আন্দোলনে সফল হন।
শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের সেই সাফল্য তরুণদের মধ্যে ‘ডোমিনো ইফেক্ট’ বা ধারাবাহিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। তারা এখন আত্মবিশ্বাসী যে, একতাবদ্ধ থাকলে রাষ্ট্রের যেকোনো শক্তিশালী স্তম্ভকেও জবাবদিহির আওতায় আনা সম্ভব। শনিবার কয়েক হাজার আন্দোলনকারী আটকের পরও রোববার কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সিজেপি। এটি ইঙ্গিত দেয়, দমনপীড়নের মধ্যেও সংগঠনটি দাবি আদায়ের সম্ভাবনা দেখছে।
আন্দোলন দিল্লি থেকে অন্য রাজ্যগুলোতেও ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে বলে জানিয়েছে ভারতীয় গণমাধ্যম। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী সংবিধান রক্ষা ও জনগণের কণ্ঠস্বর সুরক্ষিত রাখতে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। পিছু না হটার ব্যাপারে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন সরকারকে।
নরেন্দ্র মোদির জন্য ‘ক্যাচ-২২’
আপাতদৃষ্টে মনে হচ্ছে, সিইসির পদত্যাগ অথবা দমনপীড়ন অব্যাহত রাখলে নরেন্দ্র মোদির রাজনৈতিক ক্ষতি প্রায় অবধারিত। বিকল্প হিসেবে তদন্তের ঘোষণা দেওয়া কিংবা ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়া পর্যালোচনার পথে হাঁটলেও বিরোধীদের চাপ সামলানোর চ্যালেঞ্জ থাকবে।
প্রথমত, আন্দোলনকারীদের চাপে সিইসি যদি পদত্যাগে বাধ্য হন, তবে সেটি সরকারের জন্য বুমেরাং হবে। কারণ, এই পদত্যাগের পর বিরোধী দলগুলো নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা এবং সরকারের রাজনৈতিক বা নৈতিক বৈধতা নিয়ে আরও প্রশ্ন তোলার সুযোগ পাবে। সরকারের বিরুদ্ধে ‘ভোট চুরি’র অভিযোগ জোরালো হবে। জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করা বিজেপি সরকারের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।
দ্বিতীয়ত, সরকার যদি নির্বাচন কমিশনারকে রক্ষা করতে গিয়ে দমনপীড়নের মাত্রা বাড়ায়, তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক পরিসরে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে সমালোচনা বাড়বে। তরুণদের ক্ষোভ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে তা শাসক দলের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
শনিবার তরুণদের গণগ্রেপ্তারের ঘটনায় ইতোমধ্যে উদ্বেগ প্রকাশ ও নিন্দা জানিয়েছে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের (ওএইচসিএইচআর) দপ্তর। যদিও সংস্থাটির উদ্বেগকে ‘অমূলক’ আখ্যা দিয়েছে ভারত সরকার।
এরপর কী?
দিল্লির রাজপথে চলমান আন্দোলনটি কেবল প্রশাসনিক রদবদল বা একজন কমিশনারের বিদায়ের দাবি নয়। এটি ভারতের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধারের এক বৃহত্তর লড়াই।
বিরোধী দল ও তরুণরা নির্বাচন কমিশনের স্বচ্ছতা, বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্নটিকে সরাসরি সরকারের রাজনৈতিক বৈধতার সঙ্গে জুড়ে দিয়েছে। এ সমীকরণ অনুযায়ী, সিইসির পদত্যাগ সরকারের নৈতিক বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। দমনপীড়নেও চাপ বাড়বে। এমন উভয় সংকটের মুখে নরেন্দ্র মোদি সম্ভাব্য কী বিকল্প পদক্ষেপ নেন, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ




























