পানিতে ডুবে মৃত্যু শিশুদের জন্য বড় একটি ঝুঁকি। বিশেষ করে ১ থেকে ৪ বছর বয়সী শিশুদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ পানিতে ডুবে যাওয়া। তাই ছোটবেলা থেকেই শিশুদের পানির সঙ্গে পরিচিত করা এবং সাঁতার শেখানো গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধু সাঁতার জানলেই যে শিশু পুরোপুরি নিরাপদ, এমনটা ভাবারও সুযোগ নেই।
সাঁতার শেখার মূল উদ্দেশ্য শুধু বিভিন্ন কৌশলে সাঁতার কাটা নয়। পানিতে পড়ে গেলে কীভাবে পানির ওপর ভেসে থাকতে হবে, কীভাবে পানির উপরিভাগে উঠে আসতে হবে এবং কীভাবে নিরাপদ জায়গায় পৌঁছাতে হবে—এসব মৌলিক দক্ষতাই শিশুর জীবন বাঁচাতে পারে।
তাই শিশুকে সাঁতার শেখানোর আগে অভিভাবকদের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানা দরকার।
১. সাধারণত ৪ বছর বয়সের দিকে শেখার সক্ষমতা বাড়ে
শিশুরা সাধারণত ৪ বছর বয়সের দিকে নির্দেশনা শুনে তা অনুসরণ করা এবং শেখা বিষয় মনে রাখার মতো মানসিক সক্ষমতা অর্জন করে। তবে কিছু শিশু এর আগেই সাঁতার শেখার জন্য প্রস্তুত হয়ে যেতে পারে।
২. ১ থেকে ৪ বছর বয়সেও সাঁতার শেখানো উপকারী
অল্প বয়সী কিছু শিশুও সাঁতারের প্রাথমিক দক্ষতা শিখতে পারে। বিশেষ করে পানিতে পড়ে গেলে কীভাবে পানির কিনারায় ফিরে আসতে হবে, সে ধরনের দক্ষতা তাদের জন্য কাজে লাগতে পারে।
তবে এই বয়সে শিশুকে শেখানোর ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে এগোনো এবং নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
৩. সাঁতার শেখানোর জায়গা নিরাপদ কি না দেখুন
শুধু সাঁতার শেখানোর ব্যবস্থা থাকলেই হবে না, পুকুর, সুইমিং পুল বা সমুদ্রসৈকতের পরিবেশও নিরাপদ হতে হবে।
জায়গাটি পরিষ্কার ও ভালোভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে কি না, তা দেখুন। প্রশিক্ষকের পাশাপাশি আলাদা উদ্ধারকর্মী থাকা জরুরি। কারণ প্রশিক্ষক একই সময়ে সব শিশুর দিকে নজর রাখতে পারেন না।
গভীর পানির জায়গা স্পষ্টভাবে চিহ্নিত থাকা এবং ছোট শিশুদের গভীর পানিতে চলে যাওয়া ঠেকানোর ব্যবস্থা থাকা দরকার। কাছাকাছি জীবন রক্ষার সরঞ্জাম ও প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা এবং পানিতে চলাচলের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত নিয়মও থাকা উচিত।
৪. প্রশিক্ষক প্রশিক্ষিত কি না নিশ্চিত করুন
শিশুকে সাঁতার শেখানোর আগে প্রশিক্ষকের যোগ্যতা সম্পর্কে খোঁজ নিন। তিনি কীভাবে প্রশিক্ষণ পেয়েছেন এবং তার কাজ কীভাবে মূল্যায়ন করা হয়, তা জানতে পারেন।
স্বীকৃত কোনো প্রতিষ্ঠানের নির্দেশনা বা প্রশিক্ষণ পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, সেটিও যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।
৫. একজন প্রশিক্ষকের কাছে বেশি শিশু নয়
বিশেষ করে ছোট শিশু ও নতুন সাঁতার শেখা শিশুদের ক্ষেত্রে একজন প্রশিক্ষকের কাছে যত কম শিশু থাকে, তত ভালোভাবে নজর রাখা সম্ভব।
প্রশিক্ষকের এমনভাবে শিশুদের পর্যবেক্ষণ করতে পারা উচিত, যাতে প্রয়োজনে হাত বাড়িয়ে দ্রুত তাদের কাছে পৌঁছাতে পারেন। শিশুদের দক্ষতা বাড়লে দলের আকার কিছুটা বড় হতে পারে। তবে যতজন শিশুকে নিরাপদে নজরদারি করা সম্ভব, তার চেয়ে বেশি শিশু একসঙ্গে রাখা উচিত নয়।
৬. ধাপে ধাপে শেখানোর ব্যবস্থা থাকতে হবে
সাঁতার শেখানোর একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকা জরুরি। সাধারণত প্রথমে শিশুকে পানির সঙ্গে পরিচিত করা হয়। এরপর ধীরে ধীরে পানিতে ভেসে থাকা, চলাফেরা এবং বিভিন্ন ধরনের সাঁতারের কৌশল শেখানো হয়।
শিশুর বর্তমান দক্ষতা যাচাই করে তাকে উপযুক্ত স্তরে রাখা এবং দক্ষতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরবর্তী ধাপে নেওয়ার ব্যবস্থা থাকা উচিত।
৭. অভিভাবকদের অন্তত কিছু সময় দেখতে দিন
শিশু কীভাবে সাঁতার শিখছে, তা অভিভাবকদের অন্তত কিছু সময় দেখার সুযোগ থাকা ভালো।
পুরো সময় অভিভাবক পাশে থাকলে কখনো কখনো শিশুর মনোযোগ নষ্ট হতে পারে। তবে ক্লাসের শুরু বা শেষের কিছু অংশ দেখার সুযোগ থাকা উচিত। অনেক সাঁতার শেখানোর জায়গায় এ জন্য পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা থাকে।
৮. ভাসমান সরঞ্জাম ব্যবহারে সতর্কতা
শিশুকে পানিতে ভাসিয়ে রাখতে বিভিন্ন ভাসমান সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয়। শুরুতে এগুলো শিশুকে নিরাপদ রাখতে এবং সঠিকভাবে শরীরের অবস্থান ও সাঁতারের কৌশল শেখাতে সহায়ক হতে পারে।
তবে এসব সরঞ্জামের ওপর শিশুর নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমানো উচিত। প্রশিক্ষণের এমন ব্যবস্থা থাকা দরকার, যাতে সময়ের সঙ্গে শিশু নিজে পানিতে ভেসে থাকার দক্ষতা অর্জন করতে পারে।
৯. পানিকে ভয় পেলেও সাঁতার শেখানো বন্ধ করবেন না
অনেক শিশুই পানিকে ভয় পায়। এটি অস্বাভাবিক নয়। কোনো শিশুকে ভয় দেখিয়ে বা জোর করে পানিতে নামানো ঠিক নয়। তবে শুধু পানির ভয় পাওয়ার কারণে সাঁতার শেখানো পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়াও ভালো নয়।
ধীরে ধীরে শিশুকে পানির সঙ্গে পরিচিত করাতে হবে। ছোট ছোট ধাপে এগিয়ে ইতিবাচকভাবে উৎসাহ দিতে হবে। প্রশিক্ষকেরও শিশুর ভয় বুঝে তাকে সহযোগিতা করার মানসিকতা থাকা প্রয়োজন।
১০. সাঁতার জানলেও শিশুকে একা ছাড়বেন না
শিশু সাঁতার শিখে ফেলেছে মানেই সে পানিতে পুরোপুরি নিরাপদ—এমন ধারণা বিপজ্জনক। ভালো সাঁতারুরাও পানিতে বিপদে পড়তে পারে।
শিশু পানিতে ক্লান্ত হয়ে যেতে পারে, আহত হতে পারে, কোথাও আটকে যেতে পারে কিংবা পানির নিচে কোনো কিছুর সঙ্গে জড়িয়ে যেতে পারে। আবার পানিতে দিক হারিয়েও বিপদে পড়তে পারে।
তাই শিশু সাঁতার জানলেও পানির আশপাশে তাকে কখনো একা রাখা উচিত নয়। নৌকায় ওঠা বা পানিতে অন্য ধরনের খেলাধুলার সময় অবশ্যই উপযুক্ত জীবন রক্ষাকারী জ্যাকেট পরাতে হবে।
সাঁতার শেখার পাশাপাশি নজরদারিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
শিশুকে সাঁতার শেখানো পানিতে ডুবে যাওয়ার ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এর পাশাপাশি পানির কাছে সবসময় শিশুর ওপর নজর রাখা জরুরি।
অভিভাবকদের নিজেদেরও পানিতে নিরাপত্তার নিয়ম সম্পর্কে ধারণা থাকা প্রয়োজন। শিশুদের জন্য নিরাপদ সাঁতার শেখানোর ব্যবস্থা বেছে নেওয়ার সময় প্রশিক্ষক, পরিবেশ, নিরাপত্তা সরঞ্জাম এবং শিশুদের প্রতি নজরদারির বিষয়গুলো ভালোভাবে যাচাই করা উচিত।
সাঁতার শেখার মূল লক্ষ্য প্রতিযোগিতায় ভালো করা নয়; বরং পানিতে বিপদে পড়লে নিজেকে সামলে নেওয়া এবং নিরাপদ জায়গায় পৌঁছানোর মতো মৌলিক দক্ষতা অর্জন করা। সঠিক প্রশিক্ষণ ও অভিভাবকের নিয়মিত নজরদারি একসঙ্গে থাকলেই শিশুর পানিতে নিরাপত্তা আরও বাড়ানো সম্ভব।
সূত্র: হার্ভার্ড
বাংলা৭১নিউজ/জেএস





























