ঢাকা ১১:২৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo মেয়ের জন্মদিনে নেইমারের অদ্ভুত কাণ্ড, বিস্মিত সবাই Logo আগামী তিন মাস ডেঙ্গু পরিস্থিতির জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ: প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী Logo ডিভাইসের আসক্তি থেকে শিশু-কিশোরদের মাঠে ফেরাতে হবে: ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী Logo সাংবাদিকরা সমাজ ও দেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন: পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী Logo সম্পত্তি হস্তান্তর আইন নিয়ে কেউ কেউ বিতর্ক তৈরির চেষ্টা করছেন : আইনমন্ত্রী Logo হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৭ শিশুর মৃত্যু Logo ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি ৫০ হাজার ছাড়ালো, মৃত্যু ১৪৩ Logo গুলশানে মিছিল : আওয়ামী লীগের ২৪ নেতাকর্মী ১০ দিনের রিমান্ডে Logo মধ্যপ্রাচ্যে ‘সর্বোচ্চ সংযমের’ আহ্বান জানিয়ে ঘোষণাপত্র গ্রহণ করল ব্রিকস Logo দুর্গাপূজা উপলক্ষে ইলিশ চায় ভারত, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আহ্বান

বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমের প্রয়াণদিবস আজ

আজ বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমের প্রয়াণদিবস। বাংলার বাউল গানকে নতুন দিশা দেয়া এই শিল্পী ৯৩ বছর বয়সে ২০০৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর না ফেরার দেশে পাড়ি জমান ভাটির এই মহাপুরুষ। মৃত্যুর ১৭ বছর পরও তার গান ও দর্শন সংগীতপ্রেমীদের হৃদয়ে আগের মতোই জীবন্ত।

জাগতিক কোনো উদ্দেশ্য পূরণে গান করতেন না শাহ আবদুল করিম। তার গানের মূল লক্ষ্য ছিল মানুষের কাছে নিজের আদর্শ ও দর্শন পৌঁছে দেওয়া। গান নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের প্রয়াত সংগীতশিল্পী কলিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্যের সঙ্গে এক আলাপচারিতায় সেই দর্শনের কথাই উঠে এসেছিল।

‘কথা বোঝা গেলেই হলো’
আলাপচারিতায় কলিকাপ্রসাদ শাহ আবদুল করিমকে প্রশ্ন করেছিলেন, অনেকে তার গান বিকৃত সুরে গায়, আবার কেউ কেউ তার নামও উল্লেখ করেন না। এসব দেখে তার খারাপ লাগে কি না।
জবাবে শাহ আবদুল করিম বলেছিলেন, ‘কথা বোঝা গেলেই হলো। আমার আর কিচ্ছু দরকার নাই।’
উত্তরটি শুনে বিস্মিত হয়েছিলেন কলিকাপ্রসাদ। নিজের সৃষ্টি অন্য কেউ সামনে বসে বিকৃতভাবে গাইলেও একজন শিল্পী কীভাবে কিছু মনে না করে থাকতে পারেন—সেটিই ছিল তার প্রশ্ন।

একজন শ্রোতাই যথেষ্ট

এরপর শাহ আবদুল করিম কলিকাপ্রসাদকেই একটি প্রশ্ন করেন। বলেন, কোনো অনুষ্ঠানে হাজার হাজার চেয়ার রাখা আছে, কিন্তু গান শুনতে কোনো মানুষ আসেনি; শুধু সামনের সারিতে একজন শ্রোতা বসে আছেন—তাহলে তিনি গান গাইতে পারবেন কি না।

কলিকাপ্রসাদ জানান, তিনি হয়তো পারবেন না।

তখন শাহ আবদুল করিম হাসতে হাসতে বলেন, তিনি পারবেন। কারণ তার গান শুধু গান নয়; গানের ভেতর দিয়ে তিনি একটি আদর্শ প্রচার করতে চান। সেই আদর্শ যদি একজন মানুষের কাছেও পৌঁছায়, তাতেই তিনি সন্তুষ্ট।
তার ভাষায়, সুর ঠিক না থাকলেও, গায়ক হিসেবে তার নাম উচ্চারিত না হলেও সমস্যা নেই—গানের কথার মধ্য দিয়ে সেই আদর্শ মানুষের কাছে পৌঁছালেই তার উদ্দেশ্য সফল।

‘পৃথিবীটা বাউলের পৃথিবী হবে’

শাহ আবদুল করিমের সেই আদর্শ কী—কলিকাপ্রসাদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি আবারও হাসেন। এরপর বলেন,
‘একদিন এই পৃথিবীটা বাউলের পৃথিবী হবে।’
ছোট্ট এই বাক্যের মধ্যেই যেন ধরা পড়ে তার দীর্ঘ সংগীতজীবনের দর্শন। মানুষের কথা, মানুষের অধিকার, সাম্য ও মানবিকতার বার্তা ছড়িয়ে দেওয়াই ছিল তার গানের অন্যতম শক্তি।

জানা যায়, এই কিংবদন্তি বাউলের জন্ম ১৯১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার বরাম হাওর কালনী নদী তীরবর্তী উজানধল গ্রামে। তার বাবা ছিলেন দিনমজুর ইব্রাহিম আলী ও মা নাইওরজান বিবি।

হাওর ভাটির বাসিন্দা শাহ আব্দুল করিমের পরিবারের অভাবের সংসারে ‘নুন আনতে পান্তা ফুরাত’। বাবার সংসারের অভাব মেটাতে ছোটবেলা থেকে শ্রম দিয়ে অর্থ উপার্জন করতে হয়েছে শাহ আব্দুল করিমকে। এর ফলে কোনো বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষালাভের সুযোগ পাননি তিনি। ১২ বছর বয়সে নিজ গ্রামের এক নৈশবিদ্যালয়ে কিছুকাল পড়াশোনা করেন। সেখানেই তিনি প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন।
পরে নিজের চেষ্টায় তিনি স্বশিক্ষিত হয়ে ওঠেন। কৈশোরকাল থেকেই গণসংগীতের প্রতি তার আকর্ষণ ছিল। সম্ভবত জীবনের বাস্তবতা তাকে গণসংগীত রচনায় উদ্বুদ্ধ করে।

বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিম অনেক কালজয়ী সংগীতের রচিয়তা। এর মধ্যে ‘বন্দে মায়া লাগাইছে’, ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম’, ‘গাড়ি চলে না’, ‘আমি কুলহারা কলঙ্কিনী’, ‘তোমরা কুঞ্জ সাজাও গো’ অন্যতম।

২০০১ খ্রিষ্টাব্দে শাহ আবদুল করিমকে একুশে পদকে ভূষিত করা হয়। এছাড়াও তিনি রাগিব-রাবেয়া সাহিত্য পুরস্কার, লেবাক অ্যাওয়ার্ড, মেরিল-প্রথম আলো আজীবন সম্মাননা, সিটিসেল-চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ড আজীবন সম্মাননাসহ অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন।

উল্লেখ্য, শাহ আব্দুল করিমের লেখা গান নিয়ে এই পর্যন্ত ছয়টি বই প্রকাশিত হয়েছে। বইগুলো হচ্ছে ‘আপ্তাব সংগীত’, ‘গণসংগীত’, ‘কালনীর ঢেউ’, ‘জাতির চিঠি’, ‘কালনীর তীরে’ ও ‘দোলমালা’।

বাংলা একাডেমি তার দশটি গান ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করেছে। তিনি জীবদ্দশায় একুশে পদকসহ দেশে-বিদেশে বহু সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। তবে এসব সম্মান সুরস্কারের তোয়াক্কা কখনও করেননি সমাজ পরিবর্তনের স্বাপ্নিক বাউল শাহ আব্দুল করিম।

২০০৯ সালে তিনি চলে গেলেও তার গান থেমে যায়নি। বরং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে তার গান নতুন কণ্ঠে, নতুন সুরে ফিরে আসছে। আর সেই গানের কথার মধ্য দিয়ে আজও বেঁচে আছেন ভাটির বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিম।

বাংলা৭১নিউজ/জেএস

Tag :

মেয়ের জন্মদিনে নেইমারের অদ্ভুত কাণ্ড, বিস্মিত সবাই

বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমের প্রয়াণদিবস আজ

আপডেট সময় ০৯:০৭:৫৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আজ বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমের প্রয়াণদিবস। বাংলার বাউল গানকে নতুন দিশা দেয়া এই শিল্পী ৯৩ বছর বয়সে ২০০৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর না ফেরার দেশে পাড়ি জমান ভাটির এই মহাপুরুষ। মৃত্যুর ১৭ বছর পরও তার গান ও দর্শন সংগীতপ্রেমীদের হৃদয়ে আগের মতোই জীবন্ত।

জাগতিক কোনো উদ্দেশ্য পূরণে গান করতেন না শাহ আবদুল করিম। তার গানের মূল লক্ষ্য ছিল মানুষের কাছে নিজের আদর্শ ও দর্শন পৌঁছে দেওয়া। গান নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের প্রয়াত সংগীতশিল্পী কলিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্যের সঙ্গে এক আলাপচারিতায় সেই দর্শনের কথাই উঠে এসেছিল।

‘কথা বোঝা গেলেই হলো’
আলাপচারিতায় কলিকাপ্রসাদ শাহ আবদুল করিমকে প্রশ্ন করেছিলেন, অনেকে তার গান বিকৃত সুরে গায়, আবার কেউ কেউ তার নামও উল্লেখ করেন না। এসব দেখে তার খারাপ লাগে কি না।
জবাবে শাহ আবদুল করিম বলেছিলেন, ‘কথা বোঝা গেলেই হলো। আমার আর কিচ্ছু দরকার নাই।’
উত্তরটি শুনে বিস্মিত হয়েছিলেন কলিকাপ্রসাদ। নিজের সৃষ্টি অন্য কেউ সামনে বসে বিকৃতভাবে গাইলেও একজন শিল্পী কীভাবে কিছু মনে না করে থাকতে পারেন—সেটিই ছিল তার প্রশ্ন।

একজন শ্রোতাই যথেষ্ট

এরপর শাহ আবদুল করিম কলিকাপ্রসাদকেই একটি প্রশ্ন করেন। বলেন, কোনো অনুষ্ঠানে হাজার হাজার চেয়ার রাখা আছে, কিন্তু গান শুনতে কোনো মানুষ আসেনি; শুধু সামনের সারিতে একজন শ্রোতা বসে আছেন—তাহলে তিনি গান গাইতে পারবেন কি না।

কলিকাপ্রসাদ জানান, তিনি হয়তো পারবেন না।

তখন শাহ আবদুল করিম হাসতে হাসতে বলেন, তিনি পারবেন। কারণ তার গান শুধু গান নয়; গানের ভেতর দিয়ে তিনি একটি আদর্শ প্রচার করতে চান। সেই আদর্শ যদি একজন মানুষের কাছেও পৌঁছায়, তাতেই তিনি সন্তুষ্ট।
তার ভাষায়, সুর ঠিক না থাকলেও, গায়ক হিসেবে তার নাম উচ্চারিত না হলেও সমস্যা নেই—গানের কথার মধ্য দিয়ে সেই আদর্শ মানুষের কাছে পৌঁছালেই তার উদ্দেশ্য সফল।

‘পৃথিবীটা বাউলের পৃথিবী হবে’

শাহ আবদুল করিমের সেই আদর্শ কী—কলিকাপ্রসাদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি আবারও হাসেন। এরপর বলেন,
‘একদিন এই পৃথিবীটা বাউলের পৃথিবী হবে।’
ছোট্ট এই বাক্যের মধ্যেই যেন ধরা পড়ে তার দীর্ঘ সংগীতজীবনের দর্শন। মানুষের কথা, মানুষের অধিকার, সাম্য ও মানবিকতার বার্তা ছড়িয়ে দেওয়াই ছিল তার গানের অন্যতম শক্তি।

জানা যায়, এই কিংবদন্তি বাউলের জন্ম ১৯১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার বরাম হাওর কালনী নদী তীরবর্তী উজানধল গ্রামে। তার বাবা ছিলেন দিনমজুর ইব্রাহিম আলী ও মা নাইওরজান বিবি।

হাওর ভাটির বাসিন্দা শাহ আব্দুল করিমের পরিবারের অভাবের সংসারে ‘নুন আনতে পান্তা ফুরাত’। বাবার সংসারের অভাব মেটাতে ছোটবেলা থেকে শ্রম দিয়ে অর্থ উপার্জন করতে হয়েছে শাহ আব্দুল করিমকে। এর ফলে কোনো বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষালাভের সুযোগ পাননি তিনি। ১২ বছর বয়সে নিজ গ্রামের এক নৈশবিদ্যালয়ে কিছুকাল পড়াশোনা করেন। সেখানেই তিনি প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন।
পরে নিজের চেষ্টায় তিনি স্বশিক্ষিত হয়ে ওঠেন। কৈশোরকাল থেকেই গণসংগীতের প্রতি তার আকর্ষণ ছিল। সম্ভবত জীবনের বাস্তবতা তাকে গণসংগীত রচনায় উদ্বুদ্ধ করে।

বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিম অনেক কালজয়ী সংগীতের রচিয়তা। এর মধ্যে ‘বন্দে মায়া লাগাইছে’, ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম’, ‘গাড়ি চলে না’, ‘আমি কুলহারা কলঙ্কিনী’, ‘তোমরা কুঞ্জ সাজাও গো’ অন্যতম।

২০০১ খ্রিষ্টাব্দে শাহ আবদুল করিমকে একুশে পদকে ভূষিত করা হয়। এছাড়াও তিনি রাগিব-রাবেয়া সাহিত্য পুরস্কার, লেবাক অ্যাওয়ার্ড, মেরিল-প্রথম আলো আজীবন সম্মাননা, সিটিসেল-চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ড আজীবন সম্মাননাসহ অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন।

উল্লেখ্য, শাহ আব্দুল করিমের লেখা গান নিয়ে এই পর্যন্ত ছয়টি বই প্রকাশিত হয়েছে। বইগুলো হচ্ছে ‘আপ্তাব সংগীত’, ‘গণসংগীত’, ‘কালনীর ঢেউ’, ‘জাতির চিঠি’, ‘কালনীর তীরে’ ও ‘দোলমালা’।

বাংলা একাডেমি তার দশটি গান ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করেছে। তিনি জীবদ্দশায় একুশে পদকসহ দেশে-বিদেশে বহু সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। তবে এসব সম্মান সুরস্কারের তোয়াক্কা কখনও করেননি সমাজ পরিবর্তনের স্বাপ্নিক বাউল শাহ আব্দুল করিম।

২০০৯ সালে তিনি চলে গেলেও তার গান থেমে যায়নি। বরং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে তার গান নতুন কণ্ঠে, নতুন সুরে ফিরে আসছে। আর সেই গানের কথার মধ্য দিয়ে আজও বেঁচে আছেন ভাটির বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিম।

বাংলা৭১নিউজ/জেএস