ঢাকা ০৩:৩৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৫ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বলেশ্বরের বুকে আর বাজবে না স্টিমারের হুইসেল

একসময় বলেশ্বর নদের বুক চিরে স্টিমার আসার শব্দে মুখর হয়ে উঠত পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার বড়মাছুয়া ঘাট। স্টিমারের হুইসেল শুনে কেউ ছুটতেন প্রিয়জনকে বিদায় জানাতে, কেউ অপেক্ষা করতেন নৌযানে ওঠার জন্য। যাত্রীদের পাশাপাশি পণ্য পরিবহনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল ঘাটটির।

তবে সেই ব্যস্ততা এখন নেই। বুধবার ( ৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে বড়মাছুয়া স্টিমারঘাটের পন্টুন সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে ঘাটটির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা দীর্ঘদিনের একটি স্মৃতিরও যেন অবসান হলো।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৮৫ সালে বড়মাছুয়া স্টিমারঘাট চালু হয়। একসময় পিরোজপুর, বরগুনা ও পটুয়াখালীর বিভিন্ন এলাকার মানুষের নৌপথে যাতায়াতের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল এটি। ঢাকা, বরিশালসহ বিভিন্ন এলাকায় যেতে অনেকেই এই ঘাট ব্যবহার করতেন।

ঘাটকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যও। স্টিমার আসার সময় ঘাট এলাকায় তৈরি হতো ব্যস্ততা। যাত্রীদের মালামাল ওঠানো-নামানো, স্বজনদের বিদায় জানানো কিংবা দীর্ঘ নৌযাত্রার অপেক্ষা—সব মিলিয়ে ঘাটটি ছিল স্থানীয় মানুষের জীবনের অংশ।

২০০৯ সালে নেদারল্যান্ডস সরকারের অর্থায়নে যাত্রীদের নিরাপদে ওঠানামার জন্য ঘাটে পন্টুন ও বেইলি সেতু স্থাপন করা হয়। তবে পরবর্তী সময়ে স্টিমার চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে ঘাটটির আগের ব্যস্ততা হারিয়ে যায়। তবু দীর্ঘদিন পন্টুনটি দাঁড়িয়ে ছিল।

স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা এমাদুল হক বলেন, ছোটবেলা থেকেই তিনি এই ঘাটে স্টিমারের আসা-যাওয়া দেখেছেন। তার ভাষায়, ঘাটটি শুধু যাতায়াতের জায়গা ছিল না, এর সঙ্গে স্থানীয় মানুষের আবেগ জড়িয়ে ছিল।

এমাদুল হক বলেন, ছোটবেলা থেকে দেখেছি এই ঘাটে স্টিমার আসত। কত মানুষ যাতায়াত করত। চোখের সামনে সেই স্মৃতিটুকুও হারিয়ে যাচ্ছে।

প্রবীণ সাংবাদিক দেবদাস মজুমদার বলেন, বড়মাছুয়া স্টিমারঘাটের সঙ্গে তারও অনেক স্মৃতি রয়েছে। সংবাদ সংগ্রহের কাজে নিয়মিত এই ঘাটে আসতেন তিনি।

দেবদাস মজুমদার বলেন, এই স্টিমারঘাটকে ঘিরে কত স্মৃতি রয়েছে। নিউজের কাজে আমরা প্রতিনিয়ত এখানে আসতাম। তখন ঘাটটি সব সময় মানুষের আনাগোনায় মুখর থাকত। এখন সেই দৃশ্য নেই।

স্থানীয় আরেক বাসিন্দা বলেন, স্টিমারে করে অনেকেই চিকিৎসার জন্য বরিশাল বা ঢাকায় যেতেন। ব্যবসায়ীরাও পণ্য নিয়ে যাতায়াত করতেন। এখন পন্টুনটাও চলে গেল। নতুন প্রজন্ম হয়তো জানবেই না, এখানে একসময় কত বড় নৌযান চলাচল করত।

বলেশ্বর নদ বয়ে চলবে, বড়মাছুয়া ঘাটও থাকবে। কিন্তু সেই ঘাটে আর হয়তো শোনা যাবে না স্টিমারের পরিচিত হুইসেল। সময়ের স্রোতে হারিয়ে গেল একটি নৌযুগের দৃশ্যমান শেষ চিহ্ন সেই পন্টুন।

বাংলা৭১নিউজ/জেএস

Tag :

বলেশ্বরের বুকে আর বাজবে না স্টিমারের হুইসেল

আপডেট সময় ০৯:১৩:৫৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

একসময় বলেশ্বর নদের বুক চিরে স্টিমার আসার শব্দে মুখর হয়ে উঠত পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার বড়মাছুয়া ঘাট। স্টিমারের হুইসেল শুনে কেউ ছুটতেন প্রিয়জনকে বিদায় জানাতে, কেউ অপেক্ষা করতেন নৌযানে ওঠার জন্য। যাত্রীদের পাশাপাশি পণ্য পরিবহনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল ঘাটটির।

তবে সেই ব্যস্ততা এখন নেই। বুধবার ( ৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে বড়মাছুয়া স্টিমারঘাটের পন্টুন সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে ঘাটটির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা দীর্ঘদিনের একটি স্মৃতিরও যেন অবসান হলো।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৮৫ সালে বড়মাছুয়া স্টিমারঘাট চালু হয়। একসময় পিরোজপুর, বরগুনা ও পটুয়াখালীর বিভিন্ন এলাকার মানুষের নৌপথে যাতায়াতের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল এটি। ঢাকা, বরিশালসহ বিভিন্ন এলাকায় যেতে অনেকেই এই ঘাট ব্যবহার করতেন।

ঘাটকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যও। স্টিমার আসার সময় ঘাট এলাকায় তৈরি হতো ব্যস্ততা। যাত্রীদের মালামাল ওঠানো-নামানো, স্বজনদের বিদায় জানানো কিংবা দীর্ঘ নৌযাত্রার অপেক্ষা—সব মিলিয়ে ঘাটটি ছিল স্থানীয় মানুষের জীবনের অংশ।

২০০৯ সালে নেদারল্যান্ডস সরকারের অর্থায়নে যাত্রীদের নিরাপদে ওঠানামার জন্য ঘাটে পন্টুন ও বেইলি সেতু স্থাপন করা হয়। তবে পরবর্তী সময়ে স্টিমার চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে ঘাটটির আগের ব্যস্ততা হারিয়ে যায়। তবু দীর্ঘদিন পন্টুনটি দাঁড়িয়ে ছিল।

স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা এমাদুল হক বলেন, ছোটবেলা থেকেই তিনি এই ঘাটে স্টিমারের আসা-যাওয়া দেখেছেন। তার ভাষায়, ঘাটটি শুধু যাতায়াতের জায়গা ছিল না, এর সঙ্গে স্থানীয় মানুষের আবেগ জড়িয়ে ছিল।

এমাদুল হক বলেন, ছোটবেলা থেকে দেখেছি এই ঘাটে স্টিমার আসত। কত মানুষ যাতায়াত করত। চোখের সামনে সেই স্মৃতিটুকুও হারিয়ে যাচ্ছে।

প্রবীণ সাংবাদিক দেবদাস মজুমদার বলেন, বড়মাছুয়া স্টিমারঘাটের সঙ্গে তারও অনেক স্মৃতি রয়েছে। সংবাদ সংগ্রহের কাজে নিয়মিত এই ঘাটে আসতেন তিনি।

দেবদাস মজুমদার বলেন, এই স্টিমারঘাটকে ঘিরে কত স্মৃতি রয়েছে। নিউজের কাজে আমরা প্রতিনিয়ত এখানে আসতাম। তখন ঘাটটি সব সময় মানুষের আনাগোনায় মুখর থাকত। এখন সেই দৃশ্য নেই।

স্থানীয় আরেক বাসিন্দা বলেন, স্টিমারে করে অনেকেই চিকিৎসার জন্য বরিশাল বা ঢাকায় যেতেন। ব্যবসায়ীরাও পণ্য নিয়ে যাতায়াত করতেন। এখন পন্টুনটাও চলে গেল। নতুন প্রজন্ম হয়তো জানবেই না, এখানে একসময় কত বড় নৌযান চলাচল করত।

বলেশ্বর নদ বয়ে চলবে, বড়মাছুয়া ঘাটও থাকবে। কিন্তু সেই ঘাটে আর হয়তো শোনা যাবে না স্টিমারের পরিচিত হুইসেল। সময়ের স্রোতে হারিয়ে গেল একটি নৌযুগের দৃশ্যমান শেষ চিহ্ন সেই পন্টুন।

বাংলা৭১নিউজ/জেএস