দীর্ঘ তিন মাসের প্রজনন ও সংরক্ষণকালীন নিষেধাজ্ঞা শেষে ১ সেপ্টেম্বর থেকে পর্যটক ও বনজীবীদের জন্য উন্মুক্ত হয়েছে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন। প্রতিবছর ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত বনের প্রজনন মৌসুম ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় সর্বসাধারণের প্রবেশ বন্ধ থাকে। নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উপকূলীয় এলাকায় ফিরে এসেছে কর্মচাঞ্চল্য। তবে প্রথম দিনেই সকাল থেকে টানা বৃষ্টি ও ঝোড়ো বাতাসের কারণে সুন্দরবনে প্রবেশে বাধাগ্রস্ত হয়েছেন জেলে-বাওয়ালি ও ঘুরতে আসা পর্যটকেরা।
সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মশিউর রহমান জানান, প্রথম দিন দুপুর ২টা পর্যন্ত ১৫৯টি নৌযানের পাস ইস্যু করা হয়েছে। এর মাধ্যমে চার শতাধিক জেলে-বাওয়ালি সুন্দরবনে প্রবেশের অনুমতি পেয়েছেন। সাতক্ষীরা রেঞ্জের চারটি স্টেশন থেকে এ মৌসুমে মাছ ধরা ও ইকোট্যুরিজমের জন্য ২ হাজার ৯৩৮টি বিএলসি (বোট লাইসেন্স সার্টিফিকেট) নবায়ন করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, কলাগাছি ও দোবেকি ইকোট্যুরিজম কেন্দ্র পর্যটকদের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত রাখা হয়েছে। জেলেদের নিরাপত্তার বিষয়ে তিনি বলেন, বনের ভেতরে কোস্টগার্ডের সঙ্গে যৌথ টহল কার্যক্রম চলমান রয়েছে। দস্যুদের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সুন্দরবনের বর্ষাকালীন রূপ এক অনন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ধারণ করে। ঘন সবুজ ম্যানগ্রোভের পাতায় বৃষ্টির ফোঁটা, নদী-খালের উপচে পড়া ঘোলা জল আর কাদামাটির ভেজা বাতাসের গা ছমছমে আবহ দেশ-বিদেশের ভ্রমণপিপাসুদের সবসময়ই আকর্ষণ করে। তবে প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে প্রথম দিন অনেক পর্যটকই সুন্দরবনের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেননি।
মুন্সীগঞ্জ এলাকার টাইগারপয়েন্ট রিসোর্টের ব্যবস্থাপক আব্দুল হামিদ জানান, সুন্দরবন বন্ধ থাকায় তাদের স্টাফদের অনেক কষ্টে দিন কাটাতে হয়েছে। আজ তাদের জন্য অনেক আনন্দের দিন।
লিডার্স হোস্টেলের কর্মকর্তা অসিত মণ্ডল জানান, তাদের অতিথিশালায় পর্যটক রয়েছেন। তবে বৈরী আবহাওয়ার কারণে তারা কোথাও যেতে পারেননি।
বরসা রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ জানায়, তাদের প্রতিটি কক্ষ অতিথিতে পূর্ণ থাকলেও বৈরী আবহাওয়ার কারণে কেউ বনের ভেতরে প্রবেশ করতে পারেননি। আকাশলীনা ইকো রিসোর্টের ব্যবস্থাপক সাইফুল ইসলাম জানান, সংযোগ সড়ক সংস্কার ও আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে পর্যটকের আগমন আরও বাড়বে।
ঢাকা থেকে আসা পর্যটক মুনিয়া ও ইমরান হোসেন জানান, সুন্দরবনের অপরূপ রূপ দেখতে এলেও বৃষ্টি ও ঝোড়ো বাতাসের কারণে তাঁদের পরিকল্পনা থমকে গেছে। তবে তারা হতাশ নন। আগামীকাল সূর্যের দেখা মিললে তাঁরা বনে প্রবেশ করবেন।
ঘুরতে আসা শিক্ষার্থী রাইসা তাসনিম ছোঁয়া বলেন, আবহাওয়া খারাপ থাকায় মুন্সীগঞ্জ ও নীলডুমুর—দুই জায়গায় গিয়েও বনে প্রবেশ করতে না পেরে আমার মন খারাপ হয়েছে।
আরেক পর্যটক তাহমিদ হাসান সজীব কিছুটা হতাশা প্রকাশ করলেও সৈকত নামের এক পর্যটক জানান, সুন্দরবনের বর্ষাস্নাত প্রাকৃতিক রূপ তাকে ভীষণ মুগ্ধ করেছে।
প্রথম দিনই সুন্দরবন ঘুরতে যাওয়ার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করেও ব্যর্থ হওয়া রিফাত আবির সৈকত বলেন, নানা-নানি ও আত্মীয়স্বজনকে নিয়ে সবভাবে চেষ্টা করেও তাঁরা সুন্দরবনে প্রবেশ করতে পারেননি। সুন্দরবনের পর্যটনসেবা আরও সহজ ও উন্নত করার জন্য তিনি বন মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
পর্যটন নৌকার মাঝি সাগর বলেন, আবহাওয়া ভালো হলেই তারা ট্রলার নিয়ে বনের দিকে যাত্রা করবেন। অন্যদিকে নীলডুমুরের জেলে সবদুল গাজী জানান, দীর্ঘদিনের অপেক্ষা ও কষ্ট শেষে পাস পেয়ে তাঁরা আনন্দিত। তবে দস্যুভীতির মধ্যেও জীবিকার তাগিদে তাঁদের বনে যেতে হচ্ছে।
সর্বোপরি সুন্দরবন উপকূলের মানুষের প্রত্যাশা, সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল ৪-৫টি জেলার প্রায় এক কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বাংলা৭১নিউজ/জেএস


























