ঢাকা ০৩:৪৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৬, ১৫ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কিংবদন্তি শিল্পী আব্দুল জব্বারের মৃত্যুবার্ষিকী আজ

তুমি কি দেখেছো কভু জীবনের পরাজয়, সালাম সালাম হাজার সালাম, জয় বাংলা বাংলার জয়সহ অসংখ্য কালজয়ী গানের শিল্পী, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কণ্ঠযোদ্ধা আব্দুল জব্বারের নবম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ২০১৭ সালের ৩০ আগস্ট চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন গুণী এই শিল্পী।

আব্দুল জব্বারের কণ্ঠে গাওয়া অসংখ্য গান আজও বাঙালির হৃদয়ে গভীরভাবে গেঁথে আছে। বিশেষ করে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তার গাওয়া দেশাত্মবোধক গান মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস ও মনোবল জুগিয়েছিল।

১৯৩৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি কুষ্টিয়া জেলায় জন্মগ্রহণ করেন আব্দুল জব্বার। ছোটবেলা থেকেই সংগীতের প্রতি ছিল তার গভীর অনুরাগ। পরে ওস্তাদ ওসমান গনি ও ওস্তাদ লুৎফুল হকের কাছে সংগীতে তালিম নেন তিনি।

১৯৫৮ সালে তৎকালীন পাকিস্তান বেতারে তালিকাভুক্ত শিল্পী হিসেবে সংগীতজীবন শুরু করেন আব্দুল জব্বার। ১৯৬২ সালে চলচ্চিত্রে প্রথমবার গান করেন। এরপর ১৯৬৪ সাল থেকে বাংলাদেশ টেলিভিশনের নিয়মিত শিল্পী হিসেবে যুক্ত হন।

মুক্তিযুদ্ধে কণ্ঠে কণ্ঠে প্রেরণা

আব্দুল জব্বারের সংগীতজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় মহান মুক্তিযুদ্ধ। ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে তার গাওয়া অসংখ্য গান মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস ও প্রেরণা জুগিয়েছিল। তার গান শুনে অনুপ্রাণিত হয়ে অনেকেই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন।

মুক্তিযুদ্ধের সময় শুধু গান গেয়েই দায়িত্ব শেষ করেননি তিনি। ভারতের বিভিন্ন এলাকায় প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে কাজ করেন। কলকাতায় থাকা মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন শিবিরে ঘুরে হারমোনিয়াম বাজিয়ে গণসংগীত পরিবেশন করতেন।

গান গেয়ে পাওয়া ১২ লাখ রুপি তিনি স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের ত্রাণ তহবিলে দান করেন। ফলে মুক্তিযুদ্ধে আব্দুল জব্বারের অবদান একজন শিল্পীর গণ্ডি ছাড়িয়ে একজন সক্রিয় কণ্ঠযোদ্ধার ভূমিকায় স্মরণীয় হয়ে আছে।

সর্বকালের সেরা গানের তালিকায় তিন গান

আব্দুল জব্বারের জনপ্রিয়তার বড় প্রমাণ পাওয়া যায় ২০০৬ সালে। ওই বছরের মার্চজুড়ে বিবিসি বাংলার শ্রোতাদের ভোটে নির্বাচিত সর্বকালের সেরা ২০টি বাংলা গানের তালিকায় তার গাওয়া তিনটি গান স্থান পায়।

গানগুলো হলো—তুমি কি দেখেছো কভু জীবনের পরাজয়, ‘সালাম সালাম হাজার সালাম এবং ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’।

পুরস্কার ও সম্মাননা

দীর্ঘ সংগীতজীবনে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বহু পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন আব্দুল জব্বার। ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু স্বর্ণপদক, ১৯৮০ সালে একুশে পদক এবং ১৯৯৬ সালে স্বাধীনতা পদকে ভূষিত হন তিনি।

এ ছাড়া ২০১১ সালে আজীবন সম্মাননা ও জহির রায়হান চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন এই কিংবদন্তি শিল্পী।

যেভাবে শেষ হলো জীবন

জীবনের শেষ দিকে নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন আব্দুল জব্বার। ২০১৭ সালের জুলাইয়ে কিডনি, হৃদযন্ত্র, প্রস্টেটসহ বিভিন্ন সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে, বর্তমানে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ভর্তি হন।

শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ১ আগস্ট তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৩০ আগস্ট মৃত্যুবরণ করেন তিনি।

কণ্ঠে দেশপ্রেম আর গানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করা আব্দুল জব্বার চলে গেলেও তার গাওয়া গান আজও বাঙালির হৃদয়ে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে আছে।

বাংলা৭১নিউজ/জেএস

Tag :

কিংবদন্তি শিল্পী আব্দুল জব্বারের মৃত্যুবার্ষিকী আজ

আপডেট সময় ০২:৫৬:৪৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৬

তুমি কি দেখেছো কভু জীবনের পরাজয়, সালাম সালাম হাজার সালাম, জয় বাংলা বাংলার জয়সহ অসংখ্য কালজয়ী গানের শিল্পী, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কণ্ঠযোদ্ধা আব্দুল জব্বারের নবম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ২০১৭ সালের ৩০ আগস্ট চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন গুণী এই শিল্পী।

আব্দুল জব্বারের কণ্ঠে গাওয়া অসংখ্য গান আজও বাঙালির হৃদয়ে গভীরভাবে গেঁথে আছে। বিশেষ করে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তার গাওয়া দেশাত্মবোধক গান মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস ও মনোবল জুগিয়েছিল।

১৯৩৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি কুষ্টিয়া জেলায় জন্মগ্রহণ করেন আব্দুল জব্বার। ছোটবেলা থেকেই সংগীতের প্রতি ছিল তার গভীর অনুরাগ। পরে ওস্তাদ ওসমান গনি ও ওস্তাদ লুৎফুল হকের কাছে সংগীতে তালিম নেন তিনি।

১৯৫৮ সালে তৎকালীন পাকিস্তান বেতারে তালিকাভুক্ত শিল্পী হিসেবে সংগীতজীবন শুরু করেন আব্দুল জব্বার। ১৯৬২ সালে চলচ্চিত্রে প্রথমবার গান করেন। এরপর ১৯৬৪ সাল থেকে বাংলাদেশ টেলিভিশনের নিয়মিত শিল্পী হিসেবে যুক্ত হন।

মুক্তিযুদ্ধে কণ্ঠে কণ্ঠে প্রেরণা

আব্দুল জব্বারের সংগীতজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় মহান মুক্তিযুদ্ধ। ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে তার গাওয়া অসংখ্য গান মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস ও প্রেরণা জুগিয়েছিল। তার গান শুনে অনুপ্রাণিত হয়ে অনেকেই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন।

মুক্তিযুদ্ধের সময় শুধু গান গেয়েই দায়িত্ব শেষ করেননি তিনি। ভারতের বিভিন্ন এলাকায় প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে কাজ করেন। কলকাতায় থাকা মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন শিবিরে ঘুরে হারমোনিয়াম বাজিয়ে গণসংগীত পরিবেশন করতেন।

গান গেয়ে পাওয়া ১২ লাখ রুপি তিনি স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের ত্রাণ তহবিলে দান করেন। ফলে মুক্তিযুদ্ধে আব্দুল জব্বারের অবদান একজন শিল্পীর গণ্ডি ছাড়িয়ে একজন সক্রিয় কণ্ঠযোদ্ধার ভূমিকায় স্মরণীয় হয়ে আছে।

সর্বকালের সেরা গানের তালিকায় তিন গান

আব্দুল জব্বারের জনপ্রিয়তার বড় প্রমাণ পাওয়া যায় ২০০৬ সালে। ওই বছরের মার্চজুড়ে বিবিসি বাংলার শ্রোতাদের ভোটে নির্বাচিত সর্বকালের সেরা ২০টি বাংলা গানের তালিকায় তার গাওয়া তিনটি গান স্থান পায়।

গানগুলো হলো—তুমি কি দেখেছো কভু জীবনের পরাজয়, ‘সালাম সালাম হাজার সালাম এবং ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’।

পুরস্কার ও সম্মাননা

দীর্ঘ সংগীতজীবনে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বহু পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন আব্দুল জব্বার। ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু স্বর্ণপদক, ১৯৮০ সালে একুশে পদক এবং ১৯৯৬ সালে স্বাধীনতা পদকে ভূষিত হন তিনি।

এ ছাড়া ২০১১ সালে আজীবন সম্মাননা ও জহির রায়হান চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন এই কিংবদন্তি শিল্পী।

যেভাবে শেষ হলো জীবন

জীবনের শেষ দিকে নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন আব্দুল জব্বার। ২০১৭ সালের জুলাইয়ে কিডনি, হৃদযন্ত্র, প্রস্টেটসহ বিভিন্ন সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে, বর্তমানে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ভর্তি হন।

শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ১ আগস্ট তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৩০ আগস্ট মৃত্যুবরণ করেন তিনি।

কণ্ঠে দেশপ্রেম আর গানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করা আব্দুল জব্বার চলে গেলেও তার গাওয়া গান আজও বাঙালির হৃদয়ে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে আছে।

বাংলা৭১নিউজ/জেএস