ঢাকা ১১:৩২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬, ১০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্মরণে স্যার আবদুল করিম গজনভি: শিক্ষা, সংগ্রাম ও চেতনার ১৫৪ বছর

ছবি সহায়তায় এআই: আবদুল করিম গজনভি

১৮৭২ সালের ২৫ আগস্ট। টাঙ্গাইলের (তৎকালীন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি) দেলদুয়ার গ্রামে এক ঐতিহ্যবাহী ও প্রখ্যাত জমিদার পরিবারে জন্ম নেন স্যার আবদুল করিম গজনভি। তাঁর পিতা আবদুল হাকিম খান গজনভি এবং মাতা করিমুন নেসা খানম চৌধুরানী। এই পরিবারের মূল শেকড় আফগানিস্তানের গজনীতে, যা পরবর্তীতে বাংলায় এসে জমিদারি ও শিক্ষানুরাগের জন্য সুপরিচিত হয়। উল্লেখ্য, প্রখ্যাত নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া ছিলেন তাঁর আপন খালা এবং বিশিষ্ট রাজনীতিবীদ ও শিল্পপতি স্যার আবদুল হালীম গজনভি ছিলেন তাঁর ছোট ভাই।

স্যার আবদুল করিম গজনভি মায়ের অনুপ্রেরণায় দেশ ও বিদেশে উচ্চশিক্ষা অর্জন করেন। তিনি ইংল্যান্ডের ডেভনশায়ারের সেন্ট পিটার্স স্কুল এবং লন্ডনের রেন অ্যান্ড গার্নেজ ইনস্টিটিউশনে পড়াশোনা করেন। তিনি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় এবং জার্মানির জেনা বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য অবস্থান করেন। ইউরোপের শিক্ষা ব্যবস্থা প্রত্যক্ষ করার পর ১৮৯০ সালে তিনি ঐতিহ্যবাহী আইসিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন।

রাজনৈতিক ভূমিকা ও সংগ্রাম

স্যার আবদুল করিম গজনভি বিংশ শতাব্দীর শুরুতেই তিনি অবিভক্ত বাংলার রাজনীতি ও প্রশাসনিক সংস্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে শুরু করেন। তিনি বঙ্গীয় শাসন পরিষদ এবং ভারতীয় কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য ছিলেন। পাশাপাশি অবিভক্ত বাংলার মন্ত্রী হিসেবে দুইবার দায়িত্ব পালন করেন। ১৯২৪ সালে অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ রিফর্মস এনকোয়ারি কমিটির কাছে মুসলিমদের রাজনৈতিক অধিকার সুরক্ষায় তিনি বলিষ্ঠ দাবি জানান। ১৯২৭ সালে তাঁর নেতৃত্বে ১৫ জন মুসলিম নেতা সাইমন কমিশনের বিষয়ে যৌথ ভূমিকা রাখেন। পরবর্তীতে বাংলার গভর্নরের এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে ১৯৩৪ সালে তিনি অবসর নেন।

অবিভক্ত বাংলার রাজনীতিতে স্যার আবদুল করিম গজনভি ছিলেন অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং স্বতন্ত্র ভাবধারার একজন মুসলিম রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। ২০ শতকের প্রথমার্ধে যখন বাংলায় স্বাধিকার আন্দোলন, সাম্প্রদায়িক রাজনীতি এবং শাসনতান্ত্রিক সংস্কারের নানা ঘাত-প্রতিঘাত চলছিল, তখন তাঁর নেওয়া রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো বাংলার ভূরাজনীতি এবং মুসলিম সমাজের ভবিষ্যৎ গঠনে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছিল।

বঙ্গভঙ্গ (১৯০৫) সমর্থন

১৯০৫ সালে লর্ড কার্জন কর্তৃক বঙ্গভঙ্গ ঘোষিত হলে স্যার আবদুল করিম গজনভি এই সিদ্ধান্তকে সর্বান্তঃকরণে সমর্থন জানান। তিনি বিশ্বাস করতেন, পূর্ব বাংলা ও আসাম প্রদেশ গঠনের ফলে পিছিয়ে পড়া মুসলিম সম্প্রদায় শিক্ষা ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে নিজস্ব সুযোগ-সুবিধা পাবে।  প্রভাব: কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনের বিরুদ্ধে তিনি শক্ত অবস্থান নেন। কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ যখন তাঁকে সমালোচনার পাত্র বানিয়েছিলেন, তখন তৎকালীন গভর্নর স্যার জোসেফ বাম্পফিল্ড ফুলার তাঁকে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে থাকায় “Right Ghaznavi” হিসেবে আখ্যায়িত করেন। এর মাধ্যমে পূর্ব বাংলার মুসলিমদের নিজস্ব রাজনৈতিক কণ্ঠস্বর হিসেবে তিনি আত্মপ্রকাশ করেন।

আইনসভায় নেতৃত্ব

১৯০৯ থেকে ১৯১২ সাল পর্যন্ত তিনি ‘ইম্পেরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিল’ (পূর্ব বাংলা ও আসাম)-এর সদস্য ছিলেন। পরবর্তীতে ১৯১৩-১৯১৬ মেয়াদে ভাইসরয়ের এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলের মনোনীত সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।  প্রভাব: কেন্দ্রীয় পর্যায়ে তৎকালীন সরকারের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে বাংলার মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে তিনি সোচ্চার ছিলেন।

মন্টেগু-চেমসফোর্ড সংস্কার

১৯১৯ সালের ‘গভর্নমেন্ট অব ইন্ডিয়া অ্যাক্ট’-এর অধীনে গঠিত দ্বিতীয় (১৯২৪-১৯২৬) ও তৃতীয় (১৯২৭-১৯২৯) বঙ্গীয় প্রাদেশিক আইন পরিষদের নির্বাচিত সদস্য এবং দুইবার অবিভক্ত বাংলার মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।  রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও মতামত: ১৯২৪ সালে ‘অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ রিফর্মস এনকোয়ারি কমিটি’র সামনে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে তিনি স্পষ্টভাবে মন্তব্য করেন যে, “ইউরোপীয় ধাঁচের পশ্চিমা গণতন্ত্র ভারতের মুসলিমদের জন্য চরম ক্ষতিকর হবে”।  প্রভাব: তিনি মনে করতেন, উপযুক্ত শিক্ষা ও অর্থনৈতিক ভিত্তি ছাড়া নিখাদ সংখ্যাগরিষ্ঠতার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হলে সংখ্যালঘিষ্ঠ মুসলিমরা রাজনৈতিকভাবে চিরতরে পিছিয়ে পড়বে। তাঁর রচিত গ্রন্থ The Working of the Dyarchial System in Bengal-এ তিনি এই শাসনব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা ও মুসলিম অধিকারের দুর্বলতা তুলে ধরেন।

সাইমন কমিশন

কংগ্রেস ও ভারতীয় অনেক রাজনৈতিক দল যখন ১৯২৭ সালে সাইমন কমিশন বর্জন করেছিল, স্যার আবদুল করিম গজনভি তখন কমিশনের সমর্থনে বলিষ্ঠ ভূমিকা নেন। তাঁর নেতৃত্বে ১৫ জন বিশিষ্ট মুসলিম নেতা সাইমন কমিশনের অনুকূলে যৌথ বিবৃতি প্রদান করেন।  প্রভাব: তিনি ১৯২৮ সালে ‘বেঙ্গল সাইমন কমিটি’ এবং ১৯২৯ সালে ‘অল ইন্ডিয়া প্রভিন্সিয়াল সাইমন কমিটিস’-এর সভাপতি নির্বাচিত হন। ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে ইতিবাচক সংলাপের মাধ্যমে মুসলিমদের পৃথক নির্বাচন (Separate Electorate) ও আসন সংরক্ষণের দাবি তিনি অত্যন্ত জোরালো করেন, যা পরবর্তীতে ১৯৩২ সালের ‘কমিউনাল অ্যাওয়ার্ড’ (Communal Award) ও ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনে মুসলিমদের রাজনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখে।

গভর্নিং কাউন্সিলে দায়িত্ব 

১৯২৯ সালের এপ্রিল থেকে ১৯৩৪ সালের মে মাস পর্যন্ত তিনি ‘বেঙ্গল এক্সিকিউটিভ কাউন্সিল’-এর প্রভাবশালী সদস্য ছিলেন।  প্রভাব: নির্বাহী পরিষদের সদস্য হিসেবে তিনি বাংলার সরকারি চাকরি ও শিক্ষা খাতে মুসলিমদের জন্য কোটা ও সুযোগ বৃদ্ধি করতে প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগ করেন।সারসংক্ষেপস্যার আবদুল করিম গজনভির রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোর মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল—”সংঘাত নয়, বরং প্রশাসনিক ও শাসনতান্ত্রিক উপায়ে মুসলিমদের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও স্বাধিকার প্রতিষ্ঠা।” তাঁর রাজনীতির ফলেই অবিভক্ত বাংলায় একটি সুশিক্ষিত ও রাজনৈতিকভাবে সচেতন মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশ ঘটে, যা পরবর্তীতে ১৯৪৭ সালের রাজনৈতিক রূপরেখা ও ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের পটভূমি তৈরিতে অত্যন্ত প্রভাব ফেলেছিল।

মুসলিম শিক্ষায় অবদান

স্যার আবদুল করিম গজনভি বাংলার পিছিয়ে পড়া মুসলিম সমাজকে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে তিনি ছিলেন এক দূরদর্শী পথপ্রদর্শক  ছিলেন। ১৯১৪ সালে গঠিত ১৪ সদস্যের ‘মোহামেডান এডুকেশনাল অ্যাডভাইজরি কমিটি’-এর অন্যতম প্রভাবশালী সদস্য ছিলেন তিনি। নিজস্ব জমিদারি আয় থেকে দরিদ্র ও অনগ্রসর মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য নিয়মিত স্কলারশিপ ও অনুদান প্রদান করতেন।

সাহিত্য ও বিখ্যাত গ্রন্থাবলী

স্যার আবদুল করিম গজনভি রাজনীতিবিদ ও সমাজসেবকের পরিচয়ের পাশাপাশি ছিলেন একজন প্রভাবশালী লেখক ও গবেষক। তাঁর বিখ্যাত ৩টি গ্রন্থ হলো: বাংলার মুসলিম শিক্ষাব্যবস্থা ও সংস্কার সংক্রান্ত ঐতিহাসিক বই। অবিভক্ত বাংলার দ্বৈত শাসন ব্যবস্থার প্রয়োগ ও তার প্রভাবের রূপরেখা এবং হজযাত্রীদের অধিকার, সুবিধা ও যাতায়াত ব্যবস্থা নিয়ে লেখা মৌলিক গ্রন্থ।

স্বীকৃতি ও শেষ জীবন

শিক্ষা, সমাজসংস্কার ও প্রশাসনিক অবদানের জন্য ব্রিটিশ সরকার স্যার আবদুল করিম গজনভিকে দুটি অন্যতম সেরা উপাধিতে ভূষিত করেন। ১৯২৮ সালে তাকে নাইটহুড (স্যার) উপাধি এবং ১৯৩৩ সালে ‘নবাব বাহাদুর’  উপাধি।

দীর্ঘ কর্মময় জীবন শেষে ১৯৩৯ সালের ২৪ জুলাই কলকাতার বালিগঞ্জে ৬৬ বছর বয়সে এই মহান নেতা মৃত্যুবরণ করেন।

স্যার আবদুল করিম গজনভি ছিলেন বাংলা তথা ভারতীয় উপমহাদেশের আধুনিক শিক্ষা সংস্কার ও রাজনীতির এক অনন্য রূপকার। তাঁর ১৫৪তম জন্মদিনে তাঁর স্মৃতি ও অবদানের প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা।

বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি

Tag :

স্মরণে স্যার আবদুল করিম গজনভি: শিক্ষা, সংগ্রাম ও চেতনার ১৫৪ বছর

আপডেট সময় ০৫:১৫:২২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬

১৮৭২ সালের ২৫ আগস্ট। টাঙ্গাইলের (তৎকালীন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি) দেলদুয়ার গ্রামে এক ঐতিহ্যবাহী ও প্রখ্যাত জমিদার পরিবারে জন্ম নেন স্যার আবদুল করিম গজনভি। তাঁর পিতা আবদুল হাকিম খান গজনভি এবং মাতা করিমুন নেসা খানম চৌধুরানী। এই পরিবারের মূল শেকড় আফগানিস্তানের গজনীতে, যা পরবর্তীতে বাংলায় এসে জমিদারি ও শিক্ষানুরাগের জন্য সুপরিচিত হয়। উল্লেখ্য, প্রখ্যাত নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া ছিলেন তাঁর আপন খালা এবং বিশিষ্ট রাজনীতিবীদ ও শিল্পপতি স্যার আবদুল হালীম গজনভি ছিলেন তাঁর ছোট ভাই।

স্যার আবদুল করিম গজনভি মায়ের অনুপ্রেরণায় দেশ ও বিদেশে উচ্চশিক্ষা অর্জন করেন। তিনি ইংল্যান্ডের ডেভনশায়ারের সেন্ট পিটার্স স্কুল এবং লন্ডনের রেন অ্যান্ড গার্নেজ ইনস্টিটিউশনে পড়াশোনা করেন। তিনি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় এবং জার্মানির জেনা বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য অবস্থান করেন। ইউরোপের শিক্ষা ব্যবস্থা প্রত্যক্ষ করার পর ১৮৯০ সালে তিনি ঐতিহ্যবাহী আইসিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন।

রাজনৈতিক ভূমিকা ও সংগ্রাম

স্যার আবদুল করিম গজনভি বিংশ শতাব্দীর শুরুতেই তিনি অবিভক্ত বাংলার রাজনীতি ও প্রশাসনিক সংস্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে শুরু করেন। তিনি বঙ্গীয় শাসন পরিষদ এবং ভারতীয় কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য ছিলেন। পাশাপাশি অবিভক্ত বাংলার মন্ত্রী হিসেবে দুইবার দায়িত্ব পালন করেন। ১৯২৪ সালে অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ রিফর্মস এনকোয়ারি কমিটির কাছে মুসলিমদের রাজনৈতিক অধিকার সুরক্ষায় তিনি বলিষ্ঠ দাবি জানান। ১৯২৭ সালে তাঁর নেতৃত্বে ১৫ জন মুসলিম নেতা সাইমন কমিশনের বিষয়ে যৌথ ভূমিকা রাখেন। পরবর্তীতে বাংলার গভর্নরের এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে ১৯৩৪ সালে তিনি অবসর নেন।

অবিভক্ত বাংলার রাজনীতিতে স্যার আবদুল করিম গজনভি ছিলেন অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং স্বতন্ত্র ভাবধারার একজন মুসলিম রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। ২০ শতকের প্রথমার্ধে যখন বাংলায় স্বাধিকার আন্দোলন, সাম্প্রদায়িক রাজনীতি এবং শাসনতান্ত্রিক সংস্কারের নানা ঘাত-প্রতিঘাত চলছিল, তখন তাঁর নেওয়া রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো বাংলার ভূরাজনীতি এবং মুসলিম সমাজের ভবিষ্যৎ গঠনে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছিল।

বঙ্গভঙ্গ (১৯০৫) সমর্থন

১৯০৫ সালে লর্ড কার্জন কর্তৃক বঙ্গভঙ্গ ঘোষিত হলে স্যার আবদুল করিম গজনভি এই সিদ্ধান্তকে সর্বান্তঃকরণে সমর্থন জানান। তিনি বিশ্বাস করতেন, পূর্ব বাংলা ও আসাম প্রদেশ গঠনের ফলে পিছিয়ে পড়া মুসলিম সম্প্রদায় শিক্ষা ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে নিজস্ব সুযোগ-সুবিধা পাবে।  প্রভাব: কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনের বিরুদ্ধে তিনি শক্ত অবস্থান নেন। কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ যখন তাঁকে সমালোচনার পাত্র বানিয়েছিলেন, তখন তৎকালীন গভর্নর স্যার জোসেফ বাম্পফিল্ড ফুলার তাঁকে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে থাকায় “Right Ghaznavi” হিসেবে আখ্যায়িত করেন। এর মাধ্যমে পূর্ব বাংলার মুসলিমদের নিজস্ব রাজনৈতিক কণ্ঠস্বর হিসেবে তিনি আত্মপ্রকাশ করেন।

আইনসভায় নেতৃত্ব

১৯০৯ থেকে ১৯১২ সাল পর্যন্ত তিনি ‘ইম্পেরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিল’ (পূর্ব বাংলা ও আসাম)-এর সদস্য ছিলেন। পরবর্তীতে ১৯১৩-১৯১৬ মেয়াদে ভাইসরয়ের এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলের মনোনীত সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।  প্রভাব: কেন্দ্রীয় পর্যায়ে তৎকালীন সরকারের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে বাংলার মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে তিনি সোচ্চার ছিলেন।

মন্টেগু-চেমসফোর্ড সংস্কার

১৯১৯ সালের ‘গভর্নমেন্ট অব ইন্ডিয়া অ্যাক্ট’-এর অধীনে গঠিত দ্বিতীয় (১৯২৪-১৯২৬) ও তৃতীয় (১৯২৭-১৯২৯) বঙ্গীয় প্রাদেশিক আইন পরিষদের নির্বাচিত সদস্য এবং দুইবার অবিভক্ত বাংলার মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।  রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও মতামত: ১৯২৪ সালে ‘অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ রিফর্মস এনকোয়ারি কমিটি’র সামনে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে তিনি স্পষ্টভাবে মন্তব্য করেন যে, “ইউরোপীয় ধাঁচের পশ্চিমা গণতন্ত্র ভারতের মুসলিমদের জন্য চরম ক্ষতিকর হবে”।  প্রভাব: তিনি মনে করতেন, উপযুক্ত শিক্ষা ও অর্থনৈতিক ভিত্তি ছাড়া নিখাদ সংখ্যাগরিষ্ঠতার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হলে সংখ্যালঘিষ্ঠ মুসলিমরা রাজনৈতিকভাবে চিরতরে পিছিয়ে পড়বে। তাঁর রচিত গ্রন্থ The Working of the Dyarchial System in Bengal-এ তিনি এই শাসনব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা ও মুসলিম অধিকারের দুর্বলতা তুলে ধরেন।

সাইমন কমিশন

কংগ্রেস ও ভারতীয় অনেক রাজনৈতিক দল যখন ১৯২৭ সালে সাইমন কমিশন বর্জন করেছিল, স্যার আবদুল করিম গজনভি তখন কমিশনের সমর্থনে বলিষ্ঠ ভূমিকা নেন। তাঁর নেতৃত্বে ১৫ জন বিশিষ্ট মুসলিম নেতা সাইমন কমিশনের অনুকূলে যৌথ বিবৃতি প্রদান করেন।  প্রভাব: তিনি ১৯২৮ সালে ‘বেঙ্গল সাইমন কমিটি’ এবং ১৯২৯ সালে ‘অল ইন্ডিয়া প্রভিন্সিয়াল সাইমন কমিটিস’-এর সভাপতি নির্বাচিত হন। ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে ইতিবাচক সংলাপের মাধ্যমে মুসলিমদের পৃথক নির্বাচন (Separate Electorate) ও আসন সংরক্ষণের দাবি তিনি অত্যন্ত জোরালো করেন, যা পরবর্তীতে ১৯৩২ সালের ‘কমিউনাল অ্যাওয়ার্ড’ (Communal Award) ও ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনে মুসলিমদের রাজনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখে।

গভর্নিং কাউন্সিলে দায়িত্ব 

১৯২৯ সালের এপ্রিল থেকে ১৯৩৪ সালের মে মাস পর্যন্ত তিনি ‘বেঙ্গল এক্সিকিউটিভ কাউন্সিল’-এর প্রভাবশালী সদস্য ছিলেন।  প্রভাব: নির্বাহী পরিষদের সদস্য হিসেবে তিনি বাংলার সরকারি চাকরি ও শিক্ষা খাতে মুসলিমদের জন্য কোটা ও সুযোগ বৃদ্ধি করতে প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগ করেন।সারসংক্ষেপস্যার আবদুল করিম গজনভির রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোর মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল—”সংঘাত নয়, বরং প্রশাসনিক ও শাসনতান্ত্রিক উপায়ে মুসলিমদের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও স্বাধিকার প্রতিষ্ঠা।” তাঁর রাজনীতির ফলেই অবিভক্ত বাংলায় একটি সুশিক্ষিত ও রাজনৈতিকভাবে সচেতন মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশ ঘটে, যা পরবর্তীতে ১৯৪৭ সালের রাজনৈতিক রূপরেখা ও ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের পটভূমি তৈরিতে অত্যন্ত প্রভাব ফেলেছিল।

মুসলিম শিক্ষায় অবদান

স্যার আবদুল করিম গজনভি বাংলার পিছিয়ে পড়া মুসলিম সমাজকে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে তিনি ছিলেন এক দূরদর্শী পথপ্রদর্শক  ছিলেন। ১৯১৪ সালে গঠিত ১৪ সদস্যের ‘মোহামেডান এডুকেশনাল অ্যাডভাইজরি কমিটি’-এর অন্যতম প্রভাবশালী সদস্য ছিলেন তিনি। নিজস্ব জমিদারি আয় থেকে দরিদ্র ও অনগ্রসর মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য নিয়মিত স্কলারশিপ ও অনুদান প্রদান করতেন।

সাহিত্য ও বিখ্যাত গ্রন্থাবলী

স্যার আবদুল করিম গজনভি রাজনীতিবিদ ও সমাজসেবকের পরিচয়ের পাশাপাশি ছিলেন একজন প্রভাবশালী লেখক ও গবেষক। তাঁর বিখ্যাত ৩টি গ্রন্থ হলো: বাংলার মুসলিম শিক্ষাব্যবস্থা ও সংস্কার সংক্রান্ত ঐতিহাসিক বই। অবিভক্ত বাংলার দ্বৈত শাসন ব্যবস্থার প্রয়োগ ও তার প্রভাবের রূপরেখা এবং হজযাত্রীদের অধিকার, সুবিধা ও যাতায়াত ব্যবস্থা নিয়ে লেখা মৌলিক গ্রন্থ।

স্বীকৃতি ও শেষ জীবন

শিক্ষা, সমাজসংস্কার ও প্রশাসনিক অবদানের জন্য ব্রিটিশ সরকার স্যার আবদুল করিম গজনভিকে দুটি অন্যতম সেরা উপাধিতে ভূষিত করেন। ১৯২৮ সালে তাকে নাইটহুড (স্যার) উপাধি এবং ১৯৩৩ সালে ‘নবাব বাহাদুর’  উপাধি।

দীর্ঘ কর্মময় জীবন শেষে ১৯৩৯ সালের ২৪ জুলাই কলকাতার বালিগঞ্জে ৬৬ বছর বয়সে এই মহান নেতা মৃত্যুবরণ করেন।

স্যার আবদুল করিম গজনভি ছিলেন বাংলা তথা ভারতীয় উপমহাদেশের আধুনিক শিক্ষা সংস্কার ও রাজনীতির এক অনন্য রূপকার। তাঁর ১৫৪তম জন্মদিনে তাঁর স্মৃতি ও অবদানের প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা।

বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি