বাংলাদেশের উপকূলে খাবার পানিতে বাড়ছে লবণাক্ততা। সেই পানির মাধ্যমে অতিরিক্ত সোডিয়াম গ্রহণের ফলে সেখানকার মানুষের বাড়ছে উচ্চরক্তচাপ, হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি। এমনকি কিডনি রোগ ও গর্ভাবস্থায় নানা জটিলতার আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে। খুলনার কয়রা ও আশাশুনি উপজেলায় পরিচালিত একটি গবেষণার প্রাথমিক ফলে এমন উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, দুই উপজেলার খাবার পানির উৎসগুলোর একটি বড় অংশেই লবণাক্ততা রয়েছে। কয়রায় খাবার পানির ৫৫ দশমিক ৩ শতাংশ উৎসে লবণাক্ততা পাওয়া গেছে। আশাশুনিতে এ হার ২৩ দশমিক ৩ শতাংশ। একই সঙ্গে ৪০ বছর বা তার বেশি বয়সী জনগোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশের আগামী ১০ বছরে হৃদরোগ বা স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার মাঝারি থেকে উচ্চঝুঁকি রয়েছে।
গতকাল মহাখালীর আইসিডিডিআর,বির সাসাকাওয়া মিলনায়তনে ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের সহযোগিতায় আইসিডিডিআর,বি আয়োজিত ‘পানীয় জলের লবণাক্ততা ও স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব: বাংলাদেশের প্রমাণ ও নীতিগত সুপারিশ’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের নীতি ও গবেষণার ফল প্রকাশ সেমিনারে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।
আইসিডিডিআর,বির সিনিয়র সায়েন্টিস্ট ড. আলিয়া নাহিদ ‘এনআইএইচআর গ্লোবাল হেলথ রিসার্চ সেন্টার ফর নন-কমিউনিকেবল ডিজিজেস অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল চেঞ্জ’-এর বাংলাদেশ কর্মসূচির প্রাথমিক ফল উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, গবেষণার আওতায় খুলনার কয়রা ও আশাশুনি উপজেলার ৭১টি কমিউনিটি ক্লিনিকের আওতাধীন ১৭২টি গ্রামে খাবার পানির উৎসগুলোর লবণাক্ততা পরীক্ষা করা হয়। গবেষকরা মোট ২৭ হাজার ৬৯৭টি পানির উৎস জরিপ করেন। এর মধ্যে ৬ হাজার ৭০৩টি বা ২৪ দশমিক ২ শতাংশ উৎস মানুষ খাবার পানি হিসেবে ব্যবহার করছিল। এ খাবার পানির উৎসগুলোর মধ্যে কয়রায় ৫৫ দশমিক ৩ শতাংশ এবং আশাশুনিতে ২৩ দশমিক ৩ শতাংশ উৎসে লবণাক্ততা পাওয়া গেছে।
ড. আলিয়া নাহিদ বলেন, উপকূলীয় লাখো মানুষের দৈনন্দিন জীবনের জন্য যে পানির ওপর নির্ভর করতে হয়, সেই পানিই ক্রমে স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে উঠছে। খাবার পানির লবণাক্ততা এখন আর শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়; এটি জনস্বাস্থ্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয়। পানির মাধ্যমে অতিরিক্ত সোডিয়াম গ্রহণ উচ্চরক্তচাপের পাশাপাশি হৃদরোগ ও কিডনি রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। গর্ভাবস্থায় নারীরাও বাড়তি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
গবেষণার আরেকটি অংশে কয়রা ও আশাশুনি উপজেলার ৪০ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সী ১৫ হাজার ৪৭১ প্রাপ্তবয়স্কের হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি মূল্যায়ন করা হয়। এতে দেখা যায়, প্রায় প্রতি পাঁচজনে একজন বা ২১ দশমিক ৬ শতাংশ আগামী ১০ বছরে মাঝারি থেকে উচ্চমাত্রার কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ বা হৃদরোগ ও স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন। এক্ষেত্রে কমপক্ষে ১০ শতাংশ বা তার বেশি ঝুঁকিকে মাঝারি থেকে উচ্চমাত্রার ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। কয়রায় এ হার ১৯ দশমিক ৭ শতাংশ এবং আশাশুনিতে ২৩ দশমিক ৬ শতাংশ।
ফলের ভিত্তিতে গবেষকদল পানি ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার একটি সমন্বিত ইন্টারভেনশন প্যাকেজ তৈরি করেছে। এর লক্ষ্য হলো কম লবণাক্ত খাবার পানির প্রাপ্যতা বাড়ানো এবং একই সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে অসংক্রামক রোগ সম্পর্কে সচেতনতা ও চিকিৎসাসেবা জোরদার করা। এতে কমিউনিটি রেইনওয়াটার হার্ভেস্টিং সিস্টেম, পন্ড স্যান্ড ফিল্টার ও টিউবওয়েল স্থাপনের পাশাপাশি খাবার পানির উৎসগুলোর জন্য একটি ডিজিটাল রেজিস্ট্রি ও মনিটরিং ব্যবস্থা প্রস্তাব করা হয়েছে।
অন্যদিকে, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমে কমিউনিটি মোবিলাইজেশন ও স্বাস্থ্যশিক্ষার পাশাপাশি উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবেটিস এবং দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগের ডিজিটাল সেবা যুক্ত করা হবে। অ্যালগরিদমভিত্তিক ‘ক্লিনিক্যাল ডিসিশন সাপোর্ট সিস্টেম’-এর মাধ্যমে রোগীদের স্ক্রিনিং, রেফারেল, চিকিৎসা ও ফলোআপে সহায়তা করা হবে।
উপকূলীয় বাংলাদেশে গত প্রায় দুই দশকে পরিচালিত বিভিন্ন গবেষণায় খাবার পানির লবণাক্ততা, বিশেষ করে পানিতে অতিরিক্ত সোডিয়ামের উপস্থিতির সঙ্গে রক্তচাপ বৃদ্ধির যোগসূত্র পাওয়া গেছে। তবে খাবার পানিতে লবণাক্ততার সুনির্দিষ্ট স্বাস্থ্যভিত্তিক নিরাপদ মাত্রা এখনো নির্ধারিত হয়নি বলে উল্লেখ করেছেন ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক পাওলো ভিইনিস। তিনি বলেন, খাবার পানির লবণাক্ততার জন্য এখনো সুনির্দিষ্ট স্বাস্থ্যভিত্তিক মাত্রা নির্ধারিত হয়নি। সোডিয়ামসহ অন্যান্য খনিজ উপাদান কীভাবে মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে, তা নিয়ে গবেষণা চলমান রয়েছে। এ বিষয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে খাবার পানির স্বাস্থ্যভিত্তিক মানদণ্ড নির্ধারণে উপযুক্ত নির্দেশিকা প্রণয়নের আহ্বান জানান তিনি।
ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক অ্যাড্রিয়ান বাটলার দেখান, কীভাবে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড়ের জলোচ্ছ্বাস খাবার পানির পুকুর ও অগভীর ভূগর্ভস্থ পানিতে দীর্ঘমেয়াদি লবণাক্ততা তৈরি করতে পারে।
তিনি জলোচ্ছ্বাসের পর পানির উৎসগুলো দ্রুত পরিষ্কার ও পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি উপকূলীয় পোল্ডার ও বাঁধ নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আরও উঁচু করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
আইসিডিডিআর,বির নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ বলেন, বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে স্বাস্থ্যের প্রভাব সম্পর্কিত তথ্য-প্রমাণ এখনো সীমিত। বাস্তবসম্মত অভিযোজন কৌশল ও উদ্ভাবনের ওপর গবেষণার পরিমাণ আরও কম। নিরাপদ খাবার পানি, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এবং কমিউনিটির অংশগ্রহণকে একসঙ্গে যুক্ত করে তথ্য-প্রমাণ তৈরি এবং বিভিন্ন সমাধান পরীক্ষা করার মাধ্যমে আইসিডিডিআর,বি এ গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতিগুলো পূরণে কাজ করছে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মিসেস ফাহমিদা খানম বলেন, উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জন্য লবণাক্ততা এরই মধ্যে বড় ধরনের স্বাস্থ্যসমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ আরও বাড়তে পারে। এ ধরনের গবেষণালব্ধ প্রমাণ দেশের অভ্যন্তরে নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য অভিযোজন এবং এর প্রভাব মোকাবিলায় প্রশমন কৌশল গ্রহণের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. লুৎফর রহমান বলেন, এ ধরনের গবেষণা পরিবেশ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করে দেয়। লবণাক্ততাপ্রবণ এলাকায় নিরাপদ পানীয় জলের ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে নিয়মিত পরিবীক্ষণ জোরদার করতে এবং পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত তৈরিতে গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শেখ মোমেনা মনি। অনুষ্ঠানে প্যানেল আলোচনায় শিক্ষাবিদ, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
বাংলা৭১নিউজ/জেএস























