ঢাকা ০৫:১৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ২৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo নভেম্বরে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ দিতে প্রস্তুত রূপপুর প্রকল্প Logo চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরলেন মির্জা আব্বাস Logo জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের সামনে ককটেল বিস্ফোরণ Logo আহত পুলিশ পরিদর্শককে দেখতে এভারকেয়ার হাসপাতালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী Logo ডেঙ্গু মোকাবিলায় দেশবাসীর জন্য প্রধানমন্ত্রীর জরুরি বার্তা Logo সংবিধান সংশোধন কমিটিকে জামায়াত কোনো পরামর্শ দেবে না: গোলাম পরওয়ার Logo ফ্যামেলি কার্ড নিয়ে অনিয়ম করলে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না: প্রতিমন্ত্রী টুকু Logo চীনের লাগাম টানতে শুধু স্বচ্ছতা যথেষ্ট নয় Logo লং মার্চে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হলে সবার আগে বিএনপি করত Logo সার্ক পুনরুজ্জীবিতকরণ ও পারস্পরিক বাণিজ্য সম্ভাবনা বৃদ্ধিতে গুরুত্বারোপ এলজিআরডি মন্ত্রীর
চিকিৎসাবিজ্ঞানের রাজপুত্রের জন্মদিন আজ

দুর্গম পথে ইবনে সিনার জ্ঞানচর্চা ও অমর যাত্রা

বিজ্ঞান, দর্শন ও মানববিদ্যার ইতিহাসে এমন কিছু নক্ষত্রের আবির্ভাব ঘটেছে, যাঁদের মেধার আলো সহস্রাব্দ পার হয়েও ফিকে হয় না। তেমনই এক কালজয়ী পুরুষ বুখারার দিগন্ত থেকে উঠে আসা মহাবিজ্ঞানী ইবনে সিনা—পাশ্চাত্য যাঁকে চেনে ‘অ্যাভিসেনা’ নামে। একই সঙ্গে চিকিৎসকদের রাজা, দর্শনের রাজপুত্র এবং চিন্তাজগতের এক অপরাজেয় দিকপাল। যখন মধ্যযুগীয় বিশ্ব অন্ধকারের গোলকধাঁধায় হাবুডুবু খাচ্ছিল, তখন ইবনে সিনা তাঁর প্রজ্ঞা, যুক্তি ও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধিৎসা দিয়ে মানব সভ্যতার সামনে জ্বালিয়েছিলেন জ্ঞানের অবিনশ্বর আলোকবর্তিকা।

শত রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, বন্দিদশা আর যাযাবর জীবনের তাড়া খাওয়ার মধ্যেও যিনি কলম থামাননি, রচনা করেছেন চিকিৎসাবিজ্ঞান ও দর্শনের অমর সব মহাকাব্য।

জন্ম ও বাল্যকাল

৯৮০ খ্রিস্টাব্দের ২২ আগস্ট বর্তমান উজবেকিস্তানের বুখারার নিকটবর্তী আফসোনা গ্রামে ইবনে সিনার জন্ম। পিতা আবদুল্লাহ ছিলেন সামানি রাজপরিবারের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। ঘরেই ছিল জ্ঞানচর্চার অনুকূল পরিবেশ। মাত্র ১০ বছর বয়সে তিনি সম্পূর্ণ পবিত্র কুরআন হেফজ করে তাঁর বিস্ময়কর মেধার পরিচয় দেন।

১৮ বছর বয়সের মধ্যেই তিনি তৎকালীন সমস্ত জ্ঞানশাখা—যুক্তিবিদ্যা, গণিত, পদার্থবিজ্ঞান ও চিকিৎসাশাস্ত্রে পূর্ণ দক্ষতা অর্জন করেন। সামানি শাসক নুহ ইবনে মানসুরকে এক জটিল ব্যাধি থেকে নিরাময় করে তিনি পুরস্কার হিসেবে লাভ করেন রাজকীয় পাঠাগারে প্রবেশের বিরল অধিকার, যা তাঁর জ্ঞানের পরিধিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।

জীবনসংগ্রাম

সামানি সাম্রাজ্যের পতনের পর ইবনে সিনার জীবন নেয় এক নাটকীয় মোড়। শুরু হয় এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পালিয়ে বেড়ানোর যাযাবর জীবন। খোয়ারিজম, জুরজান, রায় এবং হামাদানে তাঁকে আশ্রয় নিতে হয়। হামাদানে তিনি বুয়িদ রাজবংশের উজির (প্রধানমন্ত্রী) পদেও অধিষ্ঠিত হন। রাজকীয় চক্রান্ত, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং এমনকি কারাবাস—কোনো কিছুই তাঁর জ্ঞানতপস্যা থামাতে পারেনি। বন্দিশালার অন্ধকার প্রকোষ্ঠেও তাঁর কলম থেকে বেরিয়ে এসেছে একের পর এক অমর কালজয়ী সাহিত্য ও বৈজ্ঞানিক নথি।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের আলোকবর্তিকা

চিকিৎসাবিজ্ঞানে তাঁর রচিত বিশ্বকোষ ‘আল-কানুন ফিত তিব্ব’ (The Canon of Medicine) মানব ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী গ্রন্থ। এটি কেবল একটি বই ছিল না, ছিল চিকিৎসাবিজ্ঞানের সম্পূর্ণ এক সংবিধান।

রোগের নিখুঁত শনাক্তকরণে তিনি প্রথম বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করেন যে যক্ষ্মা একটি সংক্রামক বা ছোঁয়াচে রোগ। এছাড়া চোখের গঠন (অ্যানাটমি), রক্তে ও প্রস্রাবে শর্করার উপস্থিতি দিয়ে ডায়াবেটিস নির্ণয়, মেনিনজাইটিস এবং নানা প্রকার জটিল মানসিক ব্যাধি (যেমন—ডিপ্রেশন ও মেলাঙ্কোলিয়া) নিয়ে কাজ করেন।

তার ফার্মাকোলজি বা ওষুধ বিজ্ঞান বইটিতে প্রায় ৮০০টি একক ওষুধ ও প্রাকৃতিক ভেষজ উপাদানের গুণাগুণ বিস্তারিতভাবে সংকলিত রয়েছে।

দ্বাদশ শতকে জেরার্ড অব ক্রেমোনা বইটি ল্যাটিনে অনুবাদ করার পর এটি গোটা ইউরোপে আলোড়ন সৃষ্টি করে। পঞ্চদশ থেকে সপ্তদশ শতক পর্যন্ত প্রায় ৬০০ বছর ইউরোপের মোন্টপেলিয়ার ও প্যাদুয়াসহ বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এটি চিকিৎসাবিজ্ঞানের মূল পাঠ্যবই হিসেবে পড়া হতো।

দর্শনের নতুন দিগন্ত

ইবনে সিনা অ্যারিস্টটলের যুক্তিবিজ্ঞান এবং নব্য-প্লাতোবাদকে ইসলামি ভাবধারার সাথে অনন্যভাবে সমন্বয় করেন।

তাঁর মতে, মহাবিশ্বের সব কিছু আপেক্ষিক ও নশ্বর, কিন্তু এই সৃষ্টিকে টিকিয়ে রাখতে একজন পরম ও অবিনশ্বর সত্তার প্রয়োজন, যিনি স্বয়ংসম্পূর্ণ।

‘উড়ন্ত মানব পরীক্ষা’ হচ্ছে তার  আত্ম-সচেতনতা সম্পর্কিত একটি বিখ্যাত কাল্পনিক পরীক্ষা। তিনি দেখান যে, বাহ্যিক জগতের কোনো অনুভূতি না থাকলেও মানুষের ‘আত্মা’ বা নিজের অস্তিত্বের অনুভূতি সম্পূর্ণ স্বাধীন ও বাস্তব।

কিতাব আশ-শিফা তাঁর রচিত আরেকটি বিশাল দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক বিশ্বকোষ, যা মন ও আত্মাকে নিরাময়ের উপযোগী জ্ঞান দিয়ে সাজানো।

জীবনের মহাপ্রস্থান

প্রখর যুক্তিবাদী ও বিজ্ঞানী হওয়া সত্ত্বেও ইবনে সিনা ছিলেন গভীর ধার্মিক ও সূফি ভাবাপন্ন একজন মানুষ। যেকোনো কঠিন ও জটিল সমস্যার মুখোমুখি হলে তিনি মসজিদে গিয়ে সালাত আদায় করতেন এবং পরম সৃষ্টিকর্তার কাছে আলোর প্রার্থনা করতেন।

১০৩৭ খ্রিস্টাব্দে মাত্র ৫৭ বছর বয়সে ইরানের হামাদান শহরে চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই মহান জাদুকর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তিনি শারীরিকভাবে বিদায় নিলেও তাঁর রেখে যাওয়া জ্ঞান আজও আধুনিক বিজ্ঞানের প্রতিটি পাতায় আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে।

বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি

Tag :

নভেম্বরে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ দিতে প্রস্তুত রূপপুর প্রকল্প

চিকিৎসাবিজ্ঞানের রাজপুত্রের জন্মদিন আজ

দুর্গম পথে ইবনে সিনার জ্ঞানচর্চা ও অমর যাত্রা

আপডেট সময় ০৫:২৬:৫৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২২ অগাস্ট ২০২৬

বিজ্ঞান, দর্শন ও মানববিদ্যার ইতিহাসে এমন কিছু নক্ষত্রের আবির্ভাব ঘটেছে, যাঁদের মেধার আলো সহস্রাব্দ পার হয়েও ফিকে হয় না। তেমনই এক কালজয়ী পুরুষ বুখারার দিগন্ত থেকে উঠে আসা মহাবিজ্ঞানী ইবনে সিনা—পাশ্চাত্য যাঁকে চেনে ‘অ্যাভিসেনা’ নামে। একই সঙ্গে চিকিৎসকদের রাজা, দর্শনের রাজপুত্র এবং চিন্তাজগতের এক অপরাজেয় দিকপাল। যখন মধ্যযুগীয় বিশ্ব অন্ধকারের গোলকধাঁধায় হাবুডুবু খাচ্ছিল, তখন ইবনে সিনা তাঁর প্রজ্ঞা, যুক্তি ও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধিৎসা দিয়ে মানব সভ্যতার সামনে জ্বালিয়েছিলেন জ্ঞানের অবিনশ্বর আলোকবর্তিকা।

শত রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, বন্দিদশা আর যাযাবর জীবনের তাড়া খাওয়ার মধ্যেও যিনি কলম থামাননি, রচনা করেছেন চিকিৎসাবিজ্ঞান ও দর্শনের অমর সব মহাকাব্য।

জন্ম ও বাল্যকাল

৯৮০ খ্রিস্টাব্দের ২২ আগস্ট বর্তমান উজবেকিস্তানের বুখারার নিকটবর্তী আফসোনা গ্রামে ইবনে সিনার জন্ম। পিতা আবদুল্লাহ ছিলেন সামানি রাজপরিবারের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। ঘরেই ছিল জ্ঞানচর্চার অনুকূল পরিবেশ। মাত্র ১০ বছর বয়সে তিনি সম্পূর্ণ পবিত্র কুরআন হেফজ করে তাঁর বিস্ময়কর মেধার পরিচয় দেন।

১৮ বছর বয়সের মধ্যেই তিনি তৎকালীন সমস্ত জ্ঞানশাখা—যুক্তিবিদ্যা, গণিত, পদার্থবিজ্ঞান ও চিকিৎসাশাস্ত্রে পূর্ণ দক্ষতা অর্জন করেন। সামানি শাসক নুহ ইবনে মানসুরকে এক জটিল ব্যাধি থেকে নিরাময় করে তিনি পুরস্কার হিসেবে লাভ করেন রাজকীয় পাঠাগারে প্রবেশের বিরল অধিকার, যা তাঁর জ্ঞানের পরিধিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।

জীবনসংগ্রাম

সামানি সাম্রাজ্যের পতনের পর ইবনে সিনার জীবন নেয় এক নাটকীয় মোড়। শুরু হয় এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পালিয়ে বেড়ানোর যাযাবর জীবন। খোয়ারিজম, জুরজান, রায় এবং হামাদানে তাঁকে আশ্রয় নিতে হয়। হামাদানে তিনি বুয়িদ রাজবংশের উজির (প্রধানমন্ত্রী) পদেও অধিষ্ঠিত হন। রাজকীয় চক্রান্ত, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং এমনকি কারাবাস—কোনো কিছুই তাঁর জ্ঞানতপস্যা থামাতে পারেনি। বন্দিশালার অন্ধকার প্রকোষ্ঠেও তাঁর কলম থেকে বেরিয়ে এসেছে একের পর এক অমর কালজয়ী সাহিত্য ও বৈজ্ঞানিক নথি।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের আলোকবর্তিকা

চিকিৎসাবিজ্ঞানে তাঁর রচিত বিশ্বকোষ ‘আল-কানুন ফিত তিব্ব’ (The Canon of Medicine) মানব ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী গ্রন্থ। এটি কেবল একটি বই ছিল না, ছিল চিকিৎসাবিজ্ঞানের সম্পূর্ণ এক সংবিধান।

রোগের নিখুঁত শনাক্তকরণে তিনি প্রথম বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করেন যে যক্ষ্মা একটি সংক্রামক বা ছোঁয়াচে রোগ। এছাড়া চোখের গঠন (অ্যানাটমি), রক্তে ও প্রস্রাবে শর্করার উপস্থিতি দিয়ে ডায়াবেটিস নির্ণয়, মেনিনজাইটিস এবং নানা প্রকার জটিল মানসিক ব্যাধি (যেমন—ডিপ্রেশন ও মেলাঙ্কোলিয়া) নিয়ে কাজ করেন।

তার ফার্মাকোলজি বা ওষুধ বিজ্ঞান বইটিতে প্রায় ৮০০টি একক ওষুধ ও প্রাকৃতিক ভেষজ উপাদানের গুণাগুণ বিস্তারিতভাবে সংকলিত রয়েছে।

দ্বাদশ শতকে জেরার্ড অব ক্রেমোনা বইটি ল্যাটিনে অনুবাদ করার পর এটি গোটা ইউরোপে আলোড়ন সৃষ্টি করে। পঞ্চদশ থেকে সপ্তদশ শতক পর্যন্ত প্রায় ৬০০ বছর ইউরোপের মোন্টপেলিয়ার ও প্যাদুয়াসহ বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এটি চিকিৎসাবিজ্ঞানের মূল পাঠ্যবই হিসেবে পড়া হতো।

দর্শনের নতুন দিগন্ত

ইবনে সিনা অ্যারিস্টটলের যুক্তিবিজ্ঞান এবং নব্য-প্লাতোবাদকে ইসলামি ভাবধারার সাথে অনন্যভাবে সমন্বয় করেন।

তাঁর মতে, মহাবিশ্বের সব কিছু আপেক্ষিক ও নশ্বর, কিন্তু এই সৃষ্টিকে টিকিয়ে রাখতে একজন পরম ও অবিনশ্বর সত্তার প্রয়োজন, যিনি স্বয়ংসম্পূর্ণ।

‘উড়ন্ত মানব পরীক্ষা’ হচ্ছে তার  আত্ম-সচেতনতা সম্পর্কিত একটি বিখ্যাত কাল্পনিক পরীক্ষা। তিনি দেখান যে, বাহ্যিক জগতের কোনো অনুভূতি না থাকলেও মানুষের ‘আত্মা’ বা নিজের অস্তিত্বের অনুভূতি সম্পূর্ণ স্বাধীন ও বাস্তব।

কিতাব আশ-শিফা তাঁর রচিত আরেকটি বিশাল দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক বিশ্বকোষ, যা মন ও আত্মাকে নিরাময়ের উপযোগী জ্ঞান দিয়ে সাজানো।

জীবনের মহাপ্রস্থান

প্রখর যুক্তিবাদী ও বিজ্ঞানী হওয়া সত্ত্বেও ইবনে সিনা ছিলেন গভীর ধার্মিক ও সূফি ভাবাপন্ন একজন মানুষ। যেকোনো কঠিন ও জটিল সমস্যার মুখোমুখি হলে তিনি মসজিদে গিয়ে সালাত আদায় করতেন এবং পরম সৃষ্টিকর্তার কাছে আলোর প্রার্থনা করতেন।

১০৩৭ খ্রিস্টাব্দে মাত্র ৫৭ বছর বয়সে ইরানের হামাদান শহরে চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই মহান জাদুকর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তিনি শারীরিকভাবে বিদায় নিলেও তাঁর রেখে যাওয়া জ্ঞান আজও আধুনিক বিজ্ঞানের প্রতিটি পাতায় আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে।

বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি