আজ ১৪ আগস্ট। পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস (উর্দু: یوم آزادی; ইয়ুম-ই আজাদী)। আজ পাকিস্তানে জাতীয় ছুটির দিন। ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর ১৯৪৭ সালের এই দিনে পাকিস্তান একটি সার্বভৌম দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। দক্ষিণ এশিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ গুলো নিয়ে আলাদা রাষ্ট্র গঠন করার জন্য পাকিস্তান আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের আত্মপ্রকাশ ঘটে। আন্দোলনটি পরিচালনা করে নিখিল ভারত মুসলিম লীগ, যার নেতৃত্বে ছিলেন মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ।
স্বাধীনতা দিবসের প্রধান অনুষ্ঠানটি হয় ইসলামাবাদে। সেখানে রাষ্ট্রপতির কার্যালয় এবং সংসদ ভবনে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার সাথে পতাকা উত্তোলিত হয় এবং নেতৃত্ববৃন্দের ভাষণ সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। এছাড়াও এদিনের উল্লেখযোগ্য অনুষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে পতাকা উত্তোলন অনুষ্ঠান, প্যারেড, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, দেশাত্মবোধক গান গাওয়া ইত্যাদি। এই দিনে বিভিন্ন পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। দেশের সাধারণ নাগরিকবৃন্দ এই দিনে তাদের বাসায় পতাকা উত্তোলন করেন, এছাড়াও যানবাহন এবং পোষাকে জাতীয় পতাকার প্রদর্শন পরিলক্ষিত হয়।
১৯৪৭ সাল ও ইতিহাসের রক্তক্ষরণ
ইতিহাসের পাতায় ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাস কেবল দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্মলগ্নের গল্প বলে না; এটি শতাব্দীর অন্যতম করুণ, ক্ষতের ও বিয়োগান্তক ঘটনার অমলিন সাক্ষ্য বহন করে। প্রায় দুইশো বছরের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শোষণের শিকল ভেঙে উপমহাদেশ মুক্ত হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সেই মুক্তির আনন্দ ম্লান হয়ে গিয়েছিল জন্মভূমির বুক চিড়ে আঁকা এক রক্তিম রেখায়।
যে মুক্তির জন্য তিন পুরুষ রক্ত দিয়েছিল, তা এল বিভাজনের তীব্র বিষবাষ্প মেখে। দীর্ঘদিনের ব্রিটিশ রাজের ‘ভাগ করো ও শাসন করো’ (Divide and Rule) নীতির বিষবৃক্ষ, ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগের জন্ম এবং ১৯০৯ সালের পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থার মাধ্যমে দুই সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক দূরত্ব স্পষ্ট হতে শুরু করে। পরবর্তীতে ১৯৪০ সালে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর উপস্থাপন করা ‘লাহোর প্রস্তাব’ এবং ‘দ্বিজাতি তত্ত্ব’ (Two-Nation Theory)—যেখানে হিন্দু ও মুসলমানদের দুটি পৃথক জাতি হিসেবে দাবি করা হয়েছিল—দেশভাগের সম্ভাবনাকে বাস্তবতার মুখে দাঁড় করায়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-উত্তর সময়ে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস এবং নিখিল ভারত মুসলিম লীগের মধ্যকার রাজনৈতিক সমঝোতার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। ১৯৪৬ সালের ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’ বা প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস কেন্দ্র করে কলকাতা ও নোয়াখালীসহ বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়া ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা দুই সম্প্রদায়ের সুবাতাস চিরতরে স্তব্ধ করে দেয়।
চূড়ান্ত আঘাতটি আসে লর্ড মাউন্টব্যাটেনের তাড়াহুড়ো করে আনা ৩ জুনের পরিকল্পনায়। ভারতের সংস্কৃতি, ইতিহাস বা ভূগোল সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ স্যার সাইরিল র্যাডক্লিফ নামক এক ব্রিটিশ আইনজীবীর হাতে তুলে দেওয়া হলো মানচিত্র ব্যবচ্ছেদের দায়িত্ব। মাত্র পাঁচ সপ্তাহের ব্যবধানে ঘরের ভেতর দিয়ে, খামার আর নদীর বুক চিড়ে যে কাল্পনিক সীমানা এঁকে দেওয়া হলো, তা এক রাতেই কোটি কোটি মানুষকে নিজের জন্মভূমিতে ‘পরবাসী’ বানিয়ে দিল।
পাঞ্জাব ও বাংলার বুক চিরে ফেলা এই বিভাজন জন্ম দিল মানব ইতিহাসের বৃহত্তম ও করুণতম বাধ্যবাধক স্থানান্তরের। প্রায় দেড় কোটি মানুষ ভিটেমাটি ছেড়ে পা বাড়াল অজানা আশ্রয়ের খোঁজে; পথেই সাম্প্রদায়িক সহিংসতার দাবানলে প্রাণ হারাল ১০ থেকে ২০ লাখ নিরীহ মানুষ। হাজার হাজার নারী হারালেন আত্মমর্যাদা। দেশভাগ কেবল মাটি বা নদীকে ভাগ করেনি; ভাগ করেছিল সেনাবাহিনী, কোষাগার, রেলপথ, সরকারি চেয়ার-টেবিল, এমনকি হৃদয়ের স্পন্দনকে।
মানচিত্রে ভারতের ভূমির পরিমান ৭৭.৭ শতাংশ এবং পাকিস্তানের ২২.৩ শতাংশ। ভূখণ্ডের এই হিসেব শেষ পর্যন্ত কেবল ভূমির বণ্টন ছিল না—তা ছিল লক্ষ কোটি মানুষের ট্র্যাজেডি, ভিটেমাটি হারানোর দীর্ঘশ্বাস এবং দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মধ্যে জন্ম নেওয়া এক অনন্ত রাজনৈতিক ক্ষতের উপাখ্যান। এই ক্ষত দীর্ঘমেয়াদি হয়। তৈরি হয় কাশ্মীর সমস্যা, বঙ্গভঙ্গের রেশ এবং ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি।
দেশভাগের মূল কারণসমূহ
একটি অখণ্ড ভূখণ্ড কেন দুটি পৃথক সত্তায় বিভক্ত হয়ে গেল, তার পেছনে কাজ করেছিল কিছু জটিল ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক পরামিতি। বিশেষ করে- ব্রিটিশদের দীর্ঘদিনের সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও কৌশলী শাসনব্যবস্থা, সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু অধ্যুষিত ভারতে মুসলিমদের অধিকার ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কা ও একটি পৃথক সার্বভৌম ভূমির আকাঙ্ক্ষা, কেবিনেট মিশন পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়া এবং কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে আপোসহীন মনোভাব, ১৯৪৭ সালের প্রাক্কালে দেশজুড়ে চরম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও আস্থার চূড়ান্ত সংকট।
দেশভাগের ফলে ব্রিটিশ ভারতের বিশাল ভূখণ্ডকে মূলত দুইভাগে ভাগ করা হয়:
প্রায় ৭৮ শতাংশ ভূখণ্ড নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে ভারত। এতে যুক্ত হয় সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলসহ মোট ৯টি প্রদেশ এবং অধিকাংশ দেশীয় রাজ্য।
অপরদিকে প্রায় ২২ শতাংশ অংশ নিয়ে গঠিত হয় পাকিস্তান। এটি দুটি ভিন্ন ভৌগোলিক খণ্ডে বিভক্ত ছিল—পশ্চিম পাকিস্তান (বর্তমান পাকিস্তান) এবং প্রায় ১,৫০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত পূর্ব পাকিস্তান (আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ)।
রক্তাক্ত পাঞ্জাব
মানচিত্রে কাটা পড়ল পাঁচটি নদীর দেশ অখণ্ড ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে অবস্থিত সমৃদ্ধ পাঞ্জাব। এটি ছিল শস্য, সেচব্যবস্থা এবং সামাজিক সম্প্রীতির এক অনন্য প্রতীক। কিন্তু ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার অছিলায় এই প্রদেশকে বিভক্ত করা মাত্রই পুরো এলাকা পরিণত হয়েছে যুদ্ধক্ষেত্রে।
পশ্চিম পাঞ্জাবের উর্বর কৃষি জমি, ঐতিহ্যবাহী বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক কেন্দ্র লাহোর, রাওয়ালপিন্ডি ও মুলতান চলে গেছে পাকিস্তানের ভাগে। অপরদিকে ভারতের অংশ হয়েছে পূর্ব পাঞ্জাব (অমৃতসর, জলন্ধর ও লুধিয়ানা)।
নানকানা সাহিবের মতো পবিত্র গুরুদুয়ারা ও ঐতিহাসিক স্থানগুলো পাকিস্তানের সীমান্তে পড়ে যাওয়ায় শিখ সম্প্রদায় নিজেদের ঐতিহ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। রায়ট ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার জেরে দুই সীমান্তেই শুরু হয়েছে ভিটেমাটি ছাড়ার হিড়িক। হাজার হাজার মানুষ বোঝাই ট্রেন দুই সীমান্তে পৌঁছাচ্ছে কেবল লাশের সারি নিয়ে।
ব্যবচ্ছেদ বাংলা
নদ-নদী ও পাটশিল্পের আত্মহননপূর্ব ভারতে দ্বিতীয় বৃহত্তম আঘাতটি এসেছে অবিভক্ত বাংলার ওপর। কেবল সাংস্কৃতিক সংযোগই নয়, একটি সম্পূর্ণ স্বাবলম্বী অর্থনৈতিক কাঠামোকে দ্বিখণ্ডিত করা হয়েছে। তৎকালীন বিশ্বের বৃহত্তম পাট উৎপাদনকারী অঞ্চল পূর্ব বাংলা (যা পাকিস্তানের অংশে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ নাম ধারণ করেছে) কাঁচামালের একচ্ছত্র মালিক হলেও, সমস্ত পাটকল ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা রয়ে গেছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে (বিশেষ করে কলকাতা ও হুগলি নদীর অববাহিকায়)।
এর ফলে একই সাথে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে চাষী ও কারখানা মালিক উভয়ই। পোর্ট ও রাজধানীর হিসাব: অবিভক্ত বাংলার প্রাণকেন্দ্র এবং তৎকালীন অর্থনৈতিক রাজধানী কলকাতা ভারতের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় পূর্ব পাকিস্তান এক বিশাল অবকাঠামোগত শূন্যতায় পড়েছে। ভারত পেয়েছে পশ্চিমবঙ্গ, আর পাকিস্তান পেয়েছে পূর্ব বাংলা।
নদীমাতৃক বাংলার জলসীমা ও জমি ভাগ হওয়ার পর লক্ষ লক্ষ মানুষ শরণার্থী হয়ে শিয়ালদহ স্টেশন ও সীমান্ত পার হয়ে অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমাচ্ছে।
চায়ের দেশ যখন পাকিস্তানের মানচিত্রে পাঞ্জাব ও বাংলার ভাগ্য যখন রেডক্লিফ কমিশনের নথিতে বন্দি, তখন আসামের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলা সিলেটে আয়োজন করা হয়েছিল এক ঐতিহাসিক গণভোটের। আসাম প্রদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পূর্ব বাংলায় যোগ দেওয়া হবে কি না—এই প্রশ্নে নির্ধারিত হয় তাদের ভবিষ্যৎ।
আসাম ছিল একটি হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশ, তবে সেখানকার সুরমা উপত্যকার সিলেট জেলা ছিল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ও বাংলাভাষী। তৎকালীন আসামের চিফ মিনিস্টার গোপীনাথ বরদলৈয়ের অনিচ্ছা এবং প্রতিকূল প্রাকৃতিক দুর্যোগ সত্ত্বেও ভোটারের অভূতপূর্ব উপস্থিতি দেখা যায়।
মোট ৫,৪৬,৮১৫ ভোটারের মধ্যে ২,৩৯,৬১৯ ভোট পড়ে পাকিস্তানের পক্ষে এবং ১,৮৪,০৪১ ভোট পড়ে ভারতের আসামে থাকার পক্ষে। সিলেট জয় করে পাকিস্তান, তবে এখানেও রেডক্লিফের সিদ্ধান্তের কারণে মূল সিলেটের করিমগঞ্জ মহকুমাটি ভারতের আসাম রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।
কেবল মাটি নয়, ভাগ হয়েছিল নদী, রেলপথ, সরকারি দপ্তর, রাজস্ব, এমনকি সেনাবাহিনীর সদস্য ও সামরিক সরঞ্জাম পর্যন্ত। মোট সম্পদ ও ঋণের ৮২.৫ শতাংশ পেয়েছিল ভারত এবং ১৭.৫ শতাংশ পেয়েছিল পাকিস্তান।
এক অনন্ত ক্ষতের উপাখ্যান
দেশভাগ কেবল মানচিত্রের সীমানা নির্ধারণ করেনি; তা উৎখাত করেছিল প্রায় ১ কোটি ৫০ লক্ষ মানুষকে। এটি ছিল মানব ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ জোরপূর্বক স্থানান্তর। লাখ লাখ প্রাণ হারিয়েছে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার দাবানলে, আর কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে রয়ে গেছে নিজের ভিটেমাটি হারানোর এক দীর্ঘশ্বাস।
আজও ইতিহাস পর্যালোচনায় ১৯৪৭ সালের অগাস্ট একাধারে স্বাধীনতার আলো এবং স্বজন হারানোর এক করুণ আঁধার নিয়ে স্মৃতিতে জেগে আছে।
বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি


























