ঢাকা ০৭:২৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬, ২৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চীনের অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রধান কারিগর ঝু রোংজি মারা গেছেন

চীনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রধান কারিগর ঝু রোংজি মারা গেছেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৭ বছর। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী ঝু চীনকে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডাব্লিউটিও) অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁকে দেশটির ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ অর্থনৈতিক সংস্কারের অন্যতম প্রধান স্থপতি বলা হয়।

১৯৯৮ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত চীনের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী ঝু রোংজি দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, কেন্দ্রীয় পরিকল্পিত অর্থনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর (এসওই) সংস্কারের জন্য স্মরণীয় হয়ে আছেন।

চীনকে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডাব্লিউটিও) অন্তর্ভুক্ত করার আলোচনায় তিনি প্রধান ভূমিকা পালন করেন। ২০০১ সালে চীনের ডাব্লিউটিও-তে যোগদান দেশটির অর্থনীতিকে আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য আরও উন্মুক্ত করে এবং চীনা অর্থনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তনের সূচনা করে। ১৯৯৭ সালে হংকংয়ের চীনের কাছে হস্তান্তর প্রক্রিয়া নির্বিঘ্ন করতেও ঝু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। একই বছর তিনি এশীয় আর্থিক সংকট মোকাবিলায় বেইজিংয়ের নীতিনির্ধারণে নেতৃত্ব দেন।

চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া বুধবার প্রকাশিত সরকারি শোকবার্তায় ঝু রোংজিকে ‘কমিউনিস্ট পার্টির একজন অসাধারণ সদস্য, দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত ও বিশ্বস্ত কমিউনিস্ট যোদ্ধা, অসাধারণ বিপ্লবী ও রাষ্ট্রনায়ক এবং পার্টি ও রাষ্ট্রের একজন ব্যতিক্রমী নেতা’ হিসেবে অভিহিত করেছে। এক শোকবার্তায় বলা হয়েছে, এশীয় আর্থিক সংকটের ব্যাপক প্রভাব মোকাবিলা করে দেশকে এগিয়ে নিতে ঝু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি স্থিতিশীল ও দ্রুত রাখতে তিনি সক্রিয় রাজস্ব ও মুদ্রানীতি গ্রহণ করেন।

সিনহুয়ার শোকবার্তায় অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সংস্কারে ঝুর ভূমিকার কথাও বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারের ক্ষেত্রে তিনি সম্পত্তির অধিকারের বিষয়টি আরও স্পষ্ট করা এবং সরকারি কার্যক্রম থেকে ব্যবসায়িক কার্যক্রমকে আলাদা করার ওপর গুরুত্ব দেন। চীনকে ডাব্লিউটিও-তে অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্যে ঝুর নেতৃত্বে পরিচালিত দীর্ঘ ও কঠিন আলোচনার কথাও শোকবার্তায় উল্লেখ করা হয়েছে। ডাব্লিউটিও-তে যোগদানের মাধ্যমে বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে চীনের একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়া আরও দ্রুততর হয়।

২০০৩ সালের মার্চে প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে অবসর নেওয়ার পরও ঝু রোংজি হু জিনতাও ও শি জিনপিংয়ের নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারকে সমর্থন দিয়ে গেছেন, বলে সরকারি শোকবার্তায় উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, ‘চীনা বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন সমাজতন্ত্রের মহান কার্যক্রম’ নিয়ে তিনি সবসময় উদ্বিগ্ন ছিলেন এবং পার্টির শৃঙ্খলা ও সততা প্রতিষ্ঠা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করতেন।

১৯৯০-এর দশকে চীনে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ক্রমবর্ধমান ঋণ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর লোকসান যখন দেশটির আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল, তখন ঝু ঝুঁকি মোকাবিলায় রাজস্ব নীতি কেন্দ্রীভূত করা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো এবং লোকসানে থাকা প্রতিষ্ঠান বন্ধ বা বেসরকারিকরণের উদ্যোগ নেন।

গত বুধবারের সরকারি শোকবার্তায় ছাঁটাই হওয়া ও বেকার কর্মীদের পুনঃকর্মসংস্থানের ব্যবস্থা এবং সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা শক্তিশালী করার ক্ষেত্রেও ঝুর ভূমিকার প্রশংসা করা হয়েছে।

ঝু রোংজির সংক্ষিপ্ত পরিচয়

ঝু রোংজি ১৯২৮ সালে চীনের মধ্যাঞ্চলীয় হুনান প্রদেশের রাজধানী চাংশায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৫১ সালে তিনি সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন এবং সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। সেখানে তিনি আঞ্চলিক ও জাতীয় অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়নে কাজ করেন।

১৯৯১ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত তিনি চীনের অর্থনীতির দায়িত্বপ্রাপ্ত উপপ্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ১৯৯৮ সালে তিনি চীনের প্রধানমন্ত্রী হন এবং ২০০৩ সাল পর্যন্ত এ দায়িত্বে ছিলেন।

বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ

Tag :

চীনের অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রধান কারিগর ঝু রোংজি মারা গেছেন

আপডেট সময় ০৬:৩৩:০৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬

চীনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রধান কারিগর ঝু রোংজি মারা গেছেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৭ বছর। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী ঝু চীনকে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডাব্লিউটিও) অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁকে দেশটির ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ অর্থনৈতিক সংস্কারের অন্যতম প্রধান স্থপতি বলা হয়।

১৯৯৮ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত চীনের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী ঝু রোংজি দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, কেন্দ্রীয় পরিকল্পিত অর্থনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর (এসওই) সংস্কারের জন্য স্মরণীয় হয়ে আছেন।

চীনকে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডাব্লিউটিও) অন্তর্ভুক্ত করার আলোচনায় তিনি প্রধান ভূমিকা পালন করেন। ২০০১ সালে চীনের ডাব্লিউটিও-তে যোগদান দেশটির অর্থনীতিকে আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য আরও উন্মুক্ত করে এবং চীনা অর্থনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তনের সূচনা করে। ১৯৯৭ সালে হংকংয়ের চীনের কাছে হস্তান্তর প্রক্রিয়া নির্বিঘ্ন করতেও ঝু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। একই বছর তিনি এশীয় আর্থিক সংকট মোকাবিলায় বেইজিংয়ের নীতিনির্ধারণে নেতৃত্ব দেন।

চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া বুধবার প্রকাশিত সরকারি শোকবার্তায় ঝু রোংজিকে ‘কমিউনিস্ট পার্টির একজন অসাধারণ সদস্য, দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত ও বিশ্বস্ত কমিউনিস্ট যোদ্ধা, অসাধারণ বিপ্লবী ও রাষ্ট্রনায়ক এবং পার্টি ও রাষ্ট্রের একজন ব্যতিক্রমী নেতা’ হিসেবে অভিহিত করেছে। এক শোকবার্তায় বলা হয়েছে, এশীয় আর্থিক সংকটের ব্যাপক প্রভাব মোকাবিলা করে দেশকে এগিয়ে নিতে ঝু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি স্থিতিশীল ও দ্রুত রাখতে তিনি সক্রিয় রাজস্ব ও মুদ্রানীতি গ্রহণ করেন।

সিনহুয়ার শোকবার্তায় অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সংস্কারে ঝুর ভূমিকার কথাও বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারের ক্ষেত্রে তিনি সম্পত্তির অধিকারের বিষয়টি আরও স্পষ্ট করা এবং সরকারি কার্যক্রম থেকে ব্যবসায়িক কার্যক্রমকে আলাদা করার ওপর গুরুত্ব দেন। চীনকে ডাব্লিউটিও-তে অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্যে ঝুর নেতৃত্বে পরিচালিত দীর্ঘ ও কঠিন আলোচনার কথাও শোকবার্তায় উল্লেখ করা হয়েছে। ডাব্লিউটিও-তে যোগদানের মাধ্যমে বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে চীনের একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়া আরও দ্রুততর হয়।

২০০৩ সালের মার্চে প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে অবসর নেওয়ার পরও ঝু রোংজি হু জিনতাও ও শি জিনপিংয়ের নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারকে সমর্থন দিয়ে গেছেন, বলে সরকারি শোকবার্তায় উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, ‘চীনা বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন সমাজতন্ত্রের মহান কার্যক্রম’ নিয়ে তিনি সবসময় উদ্বিগ্ন ছিলেন এবং পার্টির শৃঙ্খলা ও সততা প্রতিষ্ঠা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করতেন।

১৯৯০-এর দশকে চীনে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ক্রমবর্ধমান ঋণ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর লোকসান যখন দেশটির আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল, তখন ঝু ঝুঁকি মোকাবিলায় রাজস্ব নীতি কেন্দ্রীভূত করা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো এবং লোকসানে থাকা প্রতিষ্ঠান বন্ধ বা বেসরকারিকরণের উদ্যোগ নেন।

গত বুধবারের সরকারি শোকবার্তায় ছাঁটাই হওয়া ও বেকার কর্মীদের পুনঃকর্মসংস্থানের ব্যবস্থা এবং সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা শক্তিশালী করার ক্ষেত্রেও ঝুর ভূমিকার প্রশংসা করা হয়েছে।

ঝু রোংজির সংক্ষিপ্ত পরিচয়

ঝু রোংজি ১৯২৮ সালে চীনের মধ্যাঞ্চলীয় হুনান প্রদেশের রাজধানী চাংশায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৫১ সালে তিনি সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন এবং সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। সেখানে তিনি আঞ্চলিক ও জাতীয় অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়নে কাজ করেন।

১৯৯১ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত তিনি চীনের অর্থনীতির দায়িত্বপ্রাপ্ত উপপ্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ১৯৯৮ সালে তিনি চীনের প্রধানমন্ত্রী হন এবং ২০০৩ সাল পর্যন্ত এ দায়িত্বে ছিলেন।

বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ