ঢাকা ০৯:৫২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬, ২৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo একই দিনে আদালতে সাতক্ষীরার আলোচিত ৩ নজরুল ইসলাম, দুজন কারাগারে Logo জুলাই যোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের জন্য বিমান ভাড়ায় ৫০ শতাংশ ছাড় Logo বঙ্গভবনসহ ৫ দফতরে সিংহভাগ সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের নির্দেশ Logo বুধবার দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ Logo খালেদা জিয়ার উপহারের বাস পুনরায় নামকরণ করল ছাত্রদল Logo ব্রিকস ও দ্বিপক্ষীয় সফরে তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে: ভারত Logo যুদ্ধাপরাধের মামলায় বাশার আল-আসাদের মৃত্যুদণ্ড Logo উৎক্ষেপণের ৮৫ সেকেন্ডের মধ্যেই চীনা রকেটের ভয়াবহ বিস্ফোরণ Logo ‘সরকারের ১৮০ দিন পূর্তি উপলক্ষে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিতে পারেন প্রধানমন্ত্রী’ Logo রোহিঙ্গাদের জন্য আরও সুইডিশ সহায়তা চাইলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী 

মাটি ও মানুষের চিত্রশিল্পী এস এম সুলতান: এক মহাকাব্যিক প্রতিভার গল্প

বাংলার মাটি, নদী, গ্রামীণ জীবন এবং খেটে খাওয়া মেহনতি মানুষের ঘাম-রক্ত ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলে যিনি বিশ্বদরবারে বাংলাদেশকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, তিনি হলেন কিংবদন্তি চিত্রশিল্পী এস এম সুলতান (শেখ মোহাম্মদ সুলতান)। ১৯২৩ সালের ১০ আগস্ট নড়াইল জেলার মাছিমদিয়া গ্রামে জন্ম নেওয়া এই গুণী শিল্পী কেবল একজন চিত্রশিল্পীই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন বাংলার গ্রামীণ সংস্কৃতির এক অনন্য দার্শনিক ও রূপকার।

অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়ার কারণে সুলতান এর শৈশব কেটেছে অভাব-অনটনের মধ্য দিয়ে। স্থানীয় চারুকলার প্রতি তাঁর অনুরাগ ছোটবেলা থেকেই লক্ষ্য করা যায়। তাঁর পিতা মেছের আলী ছিলেন একজন রাজমিস্ত্রী। আর মাতার নাম মালেকা খাতুন। পিতার সাথে কাজ করতে গিয়ে কিশোর সুলতান ইট-কাঠের রাজমিস্ত্রির কাজের পাশাপাশি চারুকলার প্রাথমিক পাঠ নিতে শুরু করেন।

১৯৩৮ সালে কোলকাতায় গিয়ে প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী ও শিক্ষাবিদ চারুচন্দ্র বিশ্বাসের সহায়তা এবং বিশিষ্ট শিল্পানুরাগী শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সহযোগিতায় তিনি তৎকালীন কলকাতা গভর্নমেন্ট স্কুল অফ আর্টসে ভর্তি হন।

তবে প্রচলিত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থার ধরাবাঁধা নিয়ম তাঁর স্বাধীনচেতা মনের সাথে খাপ খায়নি। ফলে পড়াশোনা শেষ না করেই তিনি ১৯৪৩ সালের দিকে ভারত ভ্রমণে বেরিয়ে পড়েন।

দীর্ঘ সময় তিনি যাযাবরের মতো ঘুরে বেড়ান ভারত ও পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রান্তে। এই সময় তিনি সৈন্যশিবিরে ছবি এঁকে জীবিকা নির্বাহ করেছেন এবং নানা ধরনের মানুষের জীবনযাত্রা খুব কাছ থেকে অবলোকন করেছেন, যা পরবর্তীতে তাঁর চিত্রকর্মে গভীর প্রভাব ফেলে।

এস এম সুলতানের চিত্রকর্মের মূল বৈশিষ্ট্য হলো বাংলার কৃষক, জেলে, কামার, কুমারসহ খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ।

পাশ্চাত্য শিল্পরীতিতে যেখানে দুর্বল বা সাধারণ মানুষকে চিত্রায়িত করা হতো, সুলতান তার উল্টো পথে হেঁটে বাংলার কৃষকদের ফুটিয়ে তুলেছেন অত্যন্ত শক্তিশালী, পেশিবহুল এবং বীরের মতো। তাঁর দৃষ্টিতে বাংলার কৃষকরাই এ দেশের মূল চালিকাশক্তি এবং তারা শারীরিকভাবে ও মানসিকভাবে শক্তিশালী।

তাঁর ক্যানভাসে আবহমান বাংলার সোনালী ধান, সবুজ প্রকৃতি, নদী এবং গ্রামীণ উৎসবের রঙ অত্যন্ত জীবন্ত হয়ে উঠত।

তাঁর অনেক চিত্রকর্মে একসঙ্গে বহু মানুষের উপস্থিতি এবং কর্মব্যস্ততা লক্ষ্য করা যায়, যা বাংলার গ্রামীণ জীবনের এক একটি মহাকাব্যিক দৃশ্য বলে মনে হয়।

১৯৫০ সালে আন্তর্জাতিক শিল্প সম্মেলন উপলক্ষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরে তাঁর চিত্রকর্মের একক প্রদর্শনী হয়। এরপর ওয়াশিংটন, শিকাগো এবং বস্টনসহ বিভিন্ন শহরে তাঁর চিত্রকর্ম প্রদর্শিত হয় এবং তিনি আন্তর্জাতিক শিল্পকলা মহলে দারুণ প্রশংসিত হন।

ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও তাঁর চিত্রকর্ম ব্যাপক সমাদর লাভ করে। বিশ্বখ্যাত চিত্রশিল্পী পাবলো পিকাসো ও সালভাদর দালির সমসাময়িক হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তিনি নিজের একটি স্বতন্ত্র ও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছিলেন।

বাংলার শিল্প সংস্কৃতিতে অনবদ্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এস এম সুলতান একাধিক মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারে ভূষিত হন। তিনি একুশে পদক (১৯৮২),  স্বাধীনতা পদক (১৯৯৩), বাংলাদেশ চারুশিল্পী সংসদ সম্মাননা পান। তাকে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক ‘ম্যান অব দ্য ইয়ার’ (১৯৮৪) ঘোষণা করা হয়।

জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি সাধারণ মানুষের মাঝেই বসবাস করেছেন। নড়াইলের মাছিমদিয়া গ্রামে তিনি গড়ে তুলেছিলেন শিশুস্বর্গ ও চারুপিঠ। ১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর যশোর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে এই মহান শিল্পী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। নড়াইল শহরের মাছিমদিয়ায় তাঁর প্রিয় সংগ্রহশালা ও সমাধিস্থলের পাশেই তাঁকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।

এস এম সুলতান কেবল একজন চিত্রশিল্পী নন, তিনি ছিলেন বাংলার মাটি ও মানুষের প্রাণের স্পন্দন। তাঁর সৃষ্টিতে সাধারণ মানুষ যেভাবে দেবতুল্য শক্তি ও মর্যাদায় ভূষিত হয়েছে, তা বিশ্বশিল্পের ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত। বাংলা শিল্পসাহিত্যের ইতিহাসে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

 

Tag :

একই দিনে আদালতে সাতক্ষীরার আলোচিত ৩ নজরুল ইসলাম, দুজন কারাগারে

মাটি ও মানুষের চিত্রশিল্পী এস এম সুলতান: এক মহাকাব্যিক প্রতিভার গল্প

আপডেট সময় ০৬:০১:১৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬

বাংলার মাটি, নদী, গ্রামীণ জীবন এবং খেটে খাওয়া মেহনতি মানুষের ঘাম-রক্ত ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলে যিনি বিশ্বদরবারে বাংলাদেশকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, তিনি হলেন কিংবদন্তি চিত্রশিল্পী এস এম সুলতান (শেখ মোহাম্মদ সুলতান)। ১৯২৩ সালের ১০ আগস্ট নড়াইল জেলার মাছিমদিয়া গ্রামে জন্ম নেওয়া এই গুণী শিল্পী কেবল একজন চিত্রশিল্পীই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন বাংলার গ্রামীণ সংস্কৃতির এক অনন্য দার্শনিক ও রূপকার।

অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়ার কারণে সুলতান এর শৈশব কেটেছে অভাব-অনটনের মধ্য দিয়ে। স্থানীয় চারুকলার প্রতি তাঁর অনুরাগ ছোটবেলা থেকেই লক্ষ্য করা যায়। তাঁর পিতা মেছের আলী ছিলেন একজন রাজমিস্ত্রী। আর মাতার নাম মালেকা খাতুন। পিতার সাথে কাজ করতে গিয়ে কিশোর সুলতান ইট-কাঠের রাজমিস্ত্রির কাজের পাশাপাশি চারুকলার প্রাথমিক পাঠ নিতে শুরু করেন।

১৯৩৮ সালে কোলকাতায় গিয়ে প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী ও শিক্ষাবিদ চারুচন্দ্র বিশ্বাসের সহায়তা এবং বিশিষ্ট শিল্পানুরাগী শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সহযোগিতায় তিনি তৎকালীন কলকাতা গভর্নমেন্ট স্কুল অফ আর্টসে ভর্তি হন।

তবে প্রচলিত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থার ধরাবাঁধা নিয়ম তাঁর স্বাধীনচেতা মনের সাথে খাপ খায়নি। ফলে পড়াশোনা শেষ না করেই তিনি ১৯৪৩ সালের দিকে ভারত ভ্রমণে বেরিয়ে পড়েন।

দীর্ঘ সময় তিনি যাযাবরের মতো ঘুরে বেড়ান ভারত ও পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রান্তে। এই সময় তিনি সৈন্যশিবিরে ছবি এঁকে জীবিকা নির্বাহ করেছেন এবং নানা ধরনের মানুষের জীবনযাত্রা খুব কাছ থেকে অবলোকন করেছেন, যা পরবর্তীতে তাঁর চিত্রকর্মে গভীর প্রভাব ফেলে।

এস এম সুলতানের চিত্রকর্মের মূল বৈশিষ্ট্য হলো বাংলার কৃষক, জেলে, কামার, কুমারসহ খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ।

পাশ্চাত্য শিল্পরীতিতে যেখানে দুর্বল বা সাধারণ মানুষকে চিত্রায়িত করা হতো, সুলতান তার উল্টো পথে হেঁটে বাংলার কৃষকদের ফুটিয়ে তুলেছেন অত্যন্ত শক্তিশালী, পেশিবহুল এবং বীরের মতো। তাঁর দৃষ্টিতে বাংলার কৃষকরাই এ দেশের মূল চালিকাশক্তি এবং তারা শারীরিকভাবে ও মানসিকভাবে শক্তিশালী।

তাঁর ক্যানভাসে আবহমান বাংলার সোনালী ধান, সবুজ প্রকৃতি, নদী এবং গ্রামীণ উৎসবের রঙ অত্যন্ত জীবন্ত হয়ে উঠত।

তাঁর অনেক চিত্রকর্মে একসঙ্গে বহু মানুষের উপস্থিতি এবং কর্মব্যস্ততা লক্ষ্য করা যায়, যা বাংলার গ্রামীণ জীবনের এক একটি মহাকাব্যিক দৃশ্য বলে মনে হয়।

১৯৫০ সালে আন্তর্জাতিক শিল্প সম্মেলন উপলক্ষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরে তাঁর চিত্রকর্মের একক প্রদর্শনী হয়। এরপর ওয়াশিংটন, শিকাগো এবং বস্টনসহ বিভিন্ন শহরে তাঁর চিত্রকর্ম প্রদর্শিত হয় এবং তিনি আন্তর্জাতিক শিল্পকলা মহলে দারুণ প্রশংসিত হন।

ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও তাঁর চিত্রকর্ম ব্যাপক সমাদর লাভ করে। বিশ্বখ্যাত চিত্রশিল্পী পাবলো পিকাসো ও সালভাদর দালির সমসাময়িক হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তিনি নিজের একটি স্বতন্ত্র ও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছিলেন।

বাংলার শিল্প সংস্কৃতিতে অনবদ্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এস এম সুলতান একাধিক মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারে ভূষিত হন। তিনি একুশে পদক (১৯৮২),  স্বাধীনতা পদক (১৯৯৩), বাংলাদেশ চারুশিল্পী সংসদ সম্মাননা পান। তাকে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক ‘ম্যান অব দ্য ইয়ার’ (১৯৮৪) ঘোষণা করা হয়।

জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি সাধারণ মানুষের মাঝেই বসবাস করেছেন। নড়াইলের মাছিমদিয়া গ্রামে তিনি গড়ে তুলেছিলেন শিশুস্বর্গ ও চারুপিঠ। ১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর যশোর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে এই মহান শিল্পী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। নড়াইল শহরের মাছিমদিয়ায় তাঁর প্রিয় সংগ্রহশালা ও সমাধিস্থলের পাশেই তাঁকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।

এস এম সুলতান কেবল একজন চিত্রশিল্পী নন, তিনি ছিলেন বাংলার মাটি ও মানুষের প্রাণের স্পন্দন। তাঁর সৃষ্টিতে সাধারণ মানুষ যেভাবে দেবতুল্য শক্তি ও মর্যাদায় ভূষিত হয়েছে, তা বিশ্বশিল্পের ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত। বাংলা শিল্পসাহিত্যের ইতিহাসে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।