শিল্পবর্জ্য, অপরিশোধিত নর্দমার পানি, বেপরোয়া মাছ ধরা আর একের পর এক বিশাল বাঁধ নির্মাণের চাপে পড়ে প্রায় নিঃশ্বেস হতে বসেছিল এশিয়ার দীর্ঘতম নদী ইয়াংজি। প্রায় ৬ হাজার ৩০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদীকে বলা হয় চীনের ‘মা নদী’। বহু বছরের লাগামহীন দূষণ আর অব্যবস্থাপনায় নদীটির জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের চূড়ান্ত কিনারায় পৌঁছে গিয়েছিল। দূষণের প্রভাবে নদীর অনন্য প্রাণী সাদারঙা বাইজি ডলফিন ও বিশালাকার চাইনিজ প্যাডলফিশ প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
তবে সম্প্রতি চীন সরকারের নেওয়া কঠোর কিছু প্রশাসনিক নীতি ও সংরক্ষণমূলক ব্যবস্থার কারণে নদীটি আবার ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। খবর দ্য ইকোনমিস্টের।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ধ্বংসের হাত থেকে ইয়াংজিকে টেনে তোলার প্রধান চালিকাশক্তি হলো ২০২১ সাল থেকে নেওয়া একগুচ্ছ বিপ্লবী সিদ্ধান্ত। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভুমিকা রেখেছে ১০ বছরের জন্য বাণিজ্যিক মাছ ধরা পুরোপুরি বন্ধ করার ঘোষণা। ৫০-এর দশকে প্রতিবছর ইয়াংজি থেকে ৪ লাখ টনের বেশি মাছ ধরা হতো। কিন্তু ২০২১ সালে নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের ঠিক আগে সেই পরিমাণ কমে এক লাখ টনের নিচে নেমে আসে।
চীন, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সের গবেষকদের প্রকাশিত গবেষণায় দেখা যায়, দীর্ঘ সাত দশক ধরে কমতে থাকা ইয়াংজির মাছের মোট পরিমাণ বা ‘বায়োমাস’ ২০২১ সালের পর থেকে ২০০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এমনকি দুই দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো বিরল প্রজাতির স্টার্জন মাছকে প্রাকৃতিক পরিবেশে ডিম ছাড়তে দেখেছেন বিজ্ঞানী
নিষেধাজ্ঞা তদারকি করতে নদীতে সার্বক্ষণিক ড্রোন, নজরদারি ক্যামেরা ও টহল বাড়ানো হয়েছে। সেই সঙ্গে কঠোর জরিমানা নিশ্চিত করা হচ্ছে। এ ছাড়া নদীটির তীরবর্তী হাজার হাজার রাসায়নিক কারখানা বন্ধ কিংবা দূরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। নদীর উজানে মাটির ক্ষয় রোধন করতে ব্যাপকভাবে গাছ লাগানো হচ্ছে। নদীর অববাহিকার শহরগুলোতে বৃষ্টির পানি ধরে রাখতে কৃত্রিম জলাভূমি তৈরি করে সেগুলোকে ‘স্পঞ্জ সিটি’ হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে।
এই সমন্বিত প্রচেষ্টায় নতুন করে প্রাণ ফিরছে নদীর বাস্তুতন্ত্রেও । সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ইয়াংজি অববাহিকায় বর্তমানে ১,৪০০টির বেশি ফিনলেস পরপয়েস বাস করছে। ২০১৭ সালেও এর সংখ্যা নেমে এসেছিল মাত্র ১ হাজারে। স্থানীয়রা গোলগাল এই প্রাণীকে ‘নদীর শূকর’ নামে চেনে। ফিনলেস পরপয়েসের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া পুরো নদীর খাদ্যশৃঙ্খল ও বাস্তুতন্ত্র সুস্থ হওয়ার প্রধান লক্ষণ বলে মনে করছেন সংরক্ষণবিদেরা।
তবে পরিবেশ সুরক্ষার এই সাফল্যের অপর পাশে বড় ধরনের সামাজিক মূল্যও দিতে হয়েছে। হঠাৎ মাছ ধরা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার জেলে জীবিকা হারিয়েছেন। অনেক এলাকায় পর্যাপ্ত আর্থিক ক্ষতিপূরণ পাননি বলে অভিযোগ করেছেন সাবেক জেলেরা। বাধ্য হয়ে তাদের একটি বড় অংশ শহরে গিয়ে দিনমজুরের কাজ বেছে নিয়েছেন।
তবে পরিবেশবিদেরা বলছেন, সাফল্য সত্ত্বেও ইয়াংজির সামনে এখনো বড় বাধা জলবিদ্যুৎকেন্দ্র ও বাঁধ। থ্রি গর্জেস ড্যামসহ ইয়াংজি নদীতে বহু বড় বাঁধ রয়েছে, যা মাছের স্বাভাবিক প্রজনন ও চলাচলে বাধা তৈরি করে।
সম্প্রতি পয়াং হ্রদের মুখে নতুন একটি বাঁধ নির্মাণের অনুমোদনে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন গবেষকেরা। তাদের মতে, পুরোনো বাঁধগুলোতে মাছ চলাচলের পথ না রাখলে ইয়াংজি নদী পুরোপুরি পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে না।
বাংলা৭১নিউজ/জেএস



























