ঢাকা ১০:১৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬, ৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বিপ্লবের রাজপুত্র চন্দ্রশেখর আজাদ

ব্রিটিশের ঘুম হারাম করা এক অসম সাহসী বীর

ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে চন্দ্রশেখর আজাদ এক মহাকাব্যিক নাম।

ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে চন্দ্রশেখর আজাদ এক মহাকাব্যিক নাম। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের শক্ত ভিত কাঁপিয়ে দেওয়া সশস্ত্র বিপ্লবী সংগঠন হিন্দুস্তান সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন (এইচএসআরএ)-এর তিনি ছিলেন প্রধান কাণ্ডারী। জীবন দিয়ে হলেও ব্রিটিশের হাতে ধরা না দেওয়ার যে শপথ তিনি নিয়েছিলেন, তা শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত পালন করেছিলেন।

চন্দ্রশেখর আজাদ ১৯০৬ সালের ২৩ জুলাই মধ্যপ্রদেশের আলিয়ারাজপুর জেলার (বর্তমান ঝাবুয়া জেলা) ভাবরা গ্রামে এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ছিলেন পণ্ডিত সীতারাম তিওয়ারি এবং মাতা জাহ্নবী দেবী। তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল উত্তরপ্রদেশের উন্নাও জেলার বদরকা গ্রামে। তবে তীব্র আর্থিক অনটনের কারণে তাঁর বাবা মধ্যপ্রদেশের ভাবরা গ্রামে এসে বসতি স্থাপন করেন। চন্দ্রশেখর আজাদের শৈশব কাটে ঝাবুয়ার আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায়, যেখানে তিনি ভিল তরুণদের কাছ থেকে তিরন্দাজি ও নিখুঁত লক্ষ্যভেদের প্রশিক্ষণ পান—যা পরবর্তীতে তাঁর বিপ্লবী জীবনের প্রধান অস্ত্র হয়ে ওঠে।

চন্দ্রশেখরের মা চেয়েছিলেন ছেলে একজন মস্ত বড় সংস্কৃত পণ্ডিত হোক। তাই তাঁকে বারাণসীর (কাশী) কাশী বিদ্যাপীঠে পড়তে পাঠানো হয়। কিন্তু ১৯২১ সালে যখন মহাত্মা গান্ধী অসহযোগ আন্দোলন আহ্বান করেন, মাত্র ১৫ বছর বয়সের কিশোর চন্দ্রশেখর পড়াশোনা ছেড়ে রাজপথে নেমে পড়েন। আন্দোলনে অংশ নেওয়ায় ব্রিটিশ পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করে বিচারকের সামনে হাজির করে।

আদালতে বালক চন্দ্রশেখর যে অদম্য সাহস দেখিয়েছিলেন, তা ইতিহাসে বিরল। 

 বিচারক প্রশ্ন করলেন: “তোমার নাম কী?”

 উত্তর: “আজাদ” (স্বাধীন)।

 প্রশ্ন: “তোমার বাবার নাম কী?”

উত্তর: “স্বাতন্ত্র্য” (স্বাধীনতা)।

প্রশ্ন: “তোমার ঠিকানা কোথায়?”

উত্তর: “জেলখানা” (কারাগার)

আদালতের বিচারক ক্ষুব্ধ হয়ে ১৫ বছরের এই কিশোরকে ১৫ চাবুক (কোড়কা) মারার শাস্তি দেন। কারাগারে যখন তাঁর উলঙ্গ পিঠে একেকটি সপাং চাবুক পড়ছিল, প্রতিটি আঘাতে চামড়া ফেটে রক্ত গড়িয়ে পড়ছিল, তখনো এই অকুতোভয় বালক আর্তনাদ না করে গর্জে উঠছিলেন- “ভারত মাতা কি জয়!” এই ঘটনার পর থেকেই সাধারণ মানুষের মুখে তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়ে ‘চন্দ্রশেখর আজাদ’ হিসেবে।

১৯২২ সালে চৌরীচৌরার সহিংসতার পর মহাত্মা গান্ধী হঠাৎ অসহযোগ আন্দোলন তুলে নিলে চন্দ্রশেখর অত্যন্ত হতাশ হন। তিনি বুঝতে পারেন, কেবল অনশন বা অহিংসায় পরাধীনতার শিকল ভাঙা সম্ভব নয়।

  ১৯২৪ রামপ্রসাদ বিসমিল ও শচীন সান্যাল গঠিত ‘হিন্দুস্তান রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন’-এ যোগ দেন আজাদ। বিপ্লব পরিচালনার অর্থের জন্য ১৯২৫ সালে তাঁরা কাকোরী ট্রেন ডাকাতি পরিচালনা করেন। বিসমিল, আশফাকউল্লা খান সহ অনেকেই ধরা পড়লেও পুলিশ আজাদের সীমানাও ছুঁতে পারেনি।

সহযোদ্ধারা ফাঁসি ও কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলে আজাদ সংগঠন পুনর্গঠন করেন। দিল্লিতে ভগৎ সিং, সুখদেব, রাজগুরুর মতো তরুণদের নিয়ে গঠন করেন হিন্দুস্তান সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন (এইচএসআরএ)।

 লালা লাজপত রায়ের নির্মম হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নিতে ভগৎ সিং ও রাজগুরু ব্রিটিশ পুলিশ অফিসার সন্ডার্সকে হত্যা করেন। পুরো অপারেশনের মূল পরিকল্পনাকারী ও ব্যাকআপ কভার ছিলেন মাস্টারশুটার আজাদ।

ব্রিটিশ পুলিশের তালিকায় আজাদ ছিলেন এক নম্বর মোস্ট ওয়ান্টেড বিপ্লবী। ১৯৩১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি, সহযোদ্ধা যশপালের সাথে বৈঠক করতে এলাহাবাদের (বর্তমান প্রয়াগরাজ) অলফ্রেড পার্কে গিয়েছিলেন তিনি। এক অর্থলোভী গাদ্দারের খবরে পুলিশ পার্কটি চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে।

পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জে যুদ্ধ শুরু হয়। একাকী আজাদ গাছের আড়াল নিয়ে পুলিশের সুসজ্জিত বাহিনীর বিরুদ্ধে নিজের পিস্তল হাতে যুদ্ধ চালিয়ে যান। বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে তিনি গুলি করে পরাস্ত করেন।

১৯৩১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অলফ্রেড পার্কে অবস্থান করছিলেন। পুলিশ তাকে চারদিক থেকে ঘেরাও করেন।  একাকী লড়াই করে৩ জন পুলিশ সদস্যকে পরাস্ত করেন। পরিস্থিতি যখন আর অনুকুলে ছিলনা। যখন দেখলেন পিস্তলে মাত্র একটি গুলি অবশিষ্ট রয়েছে, তিনি তাঁর পুরনো প্রতিজ্ঞা স্মরণ করলেন- “আমি মুক্ত হয়ে জন্মেছি, মুক্ত হয়েই বাঁচব, কোনো ইংরেজ আমাকে জীবিত ধরতে পারবে না।” নিজের মাথায় শেষ গুলিটি চালিয়ে মাত্রপ ২৪ বছর বয়সে তিনি শাহাদাত বরণ করেন।

চন্দ্রশেখর আজাদের আত্মত্যাগের ঘটনায় স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল পুরো ভারত। আজ এলাহাবাদের সেই অলফ্রেড পার্কের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয়েছে ‘চন্দ্রশেখর আজাদ পার্ক’। ভারতর্ষের স্বাধীনতার ইতিহাস যতদিন থাকবে, আজাদের এই অদম্য সাহসিকতা প্রতিটি প্রজন্মের কাছে স্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদার এক উজ্জ্বল প্রতীক হয়ে থাকবে।

বাংলা৭১নিউজ/এসএাচিবি

 

 

 

Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ

বিপ্লবের রাজপুত্র চন্দ্রশেখর আজাদ

ব্রিটিশের ঘুম হারাম করা এক অসম সাহসী বীর

আপডেট সময় ১১:১৪:২৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬

ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে চন্দ্রশেখর আজাদ এক মহাকাব্যিক নাম। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের শক্ত ভিত কাঁপিয়ে দেওয়া সশস্ত্র বিপ্লবী সংগঠন হিন্দুস্তান সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন (এইচএসআরএ)-এর তিনি ছিলেন প্রধান কাণ্ডারী। জীবন দিয়ে হলেও ব্রিটিশের হাতে ধরা না দেওয়ার যে শপথ তিনি নিয়েছিলেন, তা শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত পালন করেছিলেন।

চন্দ্রশেখর আজাদ ১৯০৬ সালের ২৩ জুলাই মধ্যপ্রদেশের আলিয়ারাজপুর জেলার (বর্তমান ঝাবুয়া জেলা) ভাবরা গ্রামে এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ছিলেন পণ্ডিত সীতারাম তিওয়ারি এবং মাতা জাহ্নবী দেবী। তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল উত্তরপ্রদেশের উন্নাও জেলার বদরকা গ্রামে। তবে তীব্র আর্থিক অনটনের কারণে তাঁর বাবা মধ্যপ্রদেশের ভাবরা গ্রামে এসে বসতি স্থাপন করেন। চন্দ্রশেখর আজাদের শৈশব কাটে ঝাবুয়ার আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায়, যেখানে তিনি ভিল তরুণদের কাছ থেকে তিরন্দাজি ও নিখুঁত লক্ষ্যভেদের প্রশিক্ষণ পান—যা পরবর্তীতে তাঁর বিপ্লবী জীবনের প্রধান অস্ত্র হয়ে ওঠে।

চন্দ্রশেখরের মা চেয়েছিলেন ছেলে একজন মস্ত বড় সংস্কৃত পণ্ডিত হোক। তাই তাঁকে বারাণসীর (কাশী) কাশী বিদ্যাপীঠে পড়তে পাঠানো হয়। কিন্তু ১৯২১ সালে যখন মহাত্মা গান্ধী অসহযোগ আন্দোলন আহ্বান করেন, মাত্র ১৫ বছর বয়সের কিশোর চন্দ্রশেখর পড়াশোনা ছেড়ে রাজপথে নেমে পড়েন। আন্দোলনে অংশ নেওয়ায় ব্রিটিশ পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করে বিচারকের সামনে হাজির করে।

আদালতে বালক চন্দ্রশেখর যে অদম্য সাহস দেখিয়েছিলেন, তা ইতিহাসে বিরল। 

 বিচারক প্রশ্ন করলেন: “তোমার নাম কী?”

 উত্তর: “আজাদ” (স্বাধীন)।

 প্রশ্ন: “তোমার বাবার নাম কী?”

উত্তর: “স্বাতন্ত্র্য” (স্বাধীনতা)।

প্রশ্ন: “তোমার ঠিকানা কোথায়?”

উত্তর: “জেলখানা” (কারাগার)

আদালতের বিচারক ক্ষুব্ধ হয়ে ১৫ বছরের এই কিশোরকে ১৫ চাবুক (কোড়কা) মারার শাস্তি দেন। কারাগারে যখন তাঁর উলঙ্গ পিঠে একেকটি সপাং চাবুক পড়ছিল, প্রতিটি আঘাতে চামড়া ফেটে রক্ত গড়িয়ে পড়ছিল, তখনো এই অকুতোভয় বালক আর্তনাদ না করে গর্জে উঠছিলেন- “ভারত মাতা কি জয়!” এই ঘটনার পর থেকেই সাধারণ মানুষের মুখে তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়ে ‘চন্দ্রশেখর আজাদ’ হিসেবে।

১৯২২ সালে চৌরীচৌরার সহিংসতার পর মহাত্মা গান্ধী হঠাৎ অসহযোগ আন্দোলন তুলে নিলে চন্দ্রশেখর অত্যন্ত হতাশ হন। তিনি বুঝতে পারেন, কেবল অনশন বা অহিংসায় পরাধীনতার শিকল ভাঙা সম্ভব নয়।

  ১৯২৪ রামপ্রসাদ বিসমিল ও শচীন সান্যাল গঠিত ‘হিন্দুস্তান রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন’-এ যোগ দেন আজাদ। বিপ্লব পরিচালনার অর্থের জন্য ১৯২৫ সালে তাঁরা কাকোরী ট্রেন ডাকাতি পরিচালনা করেন। বিসমিল, আশফাকউল্লা খান সহ অনেকেই ধরা পড়লেও পুলিশ আজাদের সীমানাও ছুঁতে পারেনি।

সহযোদ্ধারা ফাঁসি ও কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলে আজাদ সংগঠন পুনর্গঠন করেন। দিল্লিতে ভগৎ সিং, সুখদেব, রাজগুরুর মতো তরুণদের নিয়ে গঠন করেন হিন্দুস্তান সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন (এইচএসআরএ)।

 লালা লাজপত রায়ের নির্মম হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নিতে ভগৎ সিং ও রাজগুরু ব্রিটিশ পুলিশ অফিসার সন্ডার্সকে হত্যা করেন। পুরো অপারেশনের মূল পরিকল্পনাকারী ও ব্যাকআপ কভার ছিলেন মাস্টারশুটার আজাদ।

ব্রিটিশ পুলিশের তালিকায় আজাদ ছিলেন এক নম্বর মোস্ট ওয়ান্টেড বিপ্লবী। ১৯৩১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি, সহযোদ্ধা যশপালের সাথে বৈঠক করতে এলাহাবাদের (বর্তমান প্রয়াগরাজ) অলফ্রেড পার্কে গিয়েছিলেন তিনি। এক অর্থলোভী গাদ্দারের খবরে পুলিশ পার্কটি চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে।

পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জে যুদ্ধ শুরু হয়। একাকী আজাদ গাছের আড়াল নিয়ে পুলিশের সুসজ্জিত বাহিনীর বিরুদ্ধে নিজের পিস্তল হাতে যুদ্ধ চালিয়ে যান। বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে তিনি গুলি করে পরাস্ত করেন।

১৯৩১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অলফ্রেড পার্কে অবস্থান করছিলেন। পুলিশ তাকে চারদিক থেকে ঘেরাও করেন।  একাকী লড়াই করে৩ জন পুলিশ সদস্যকে পরাস্ত করেন। পরিস্থিতি যখন আর অনুকুলে ছিলনা। যখন দেখলেন পিস্তলে মাত্র একটি গুলি অবশিষ্ট রয়েছে, তিনি তাঁর পুরনো প্রতিজ্ঞা স্মরণ করলেন- “আমি মুক্ত হয়ে জন্মেছি, মুক্ত হয়েই বাঁচব, কোনো ইংরেজ আমাকে জীবিত ধরতে পারবে না।” নিজের মাথায় শেষ গুলিটি চালিয়ে মাত্রপ ২৪ বছর বয়সে তিনি শাহাদাত বরণ করেন।

চন্দ্রশেখর আজাদের আত্মত্যাগের ঘটনায় স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল পুরো ভারত। আজ এলাহাবাদের সেই অলফ্রেড পার্কের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয়েছে ‘চন্দ্রশেখর আজাদ পার্ক’। ভারতর্ষের স্বাধীনতার ইতিহাস যতদিন থাকবে, আজাদের এই অদম্য সাহসিকতা প্রতিটি প্রজন্মের কাছে স্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদার এক উজ্জ্বল প্রতীক হয়ে থাকবে।

বাংলা৭১নিউজ/এসএাচিবি