ঢাকা ১১:০৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬, ৩১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঝড়ের খেয়ায় সমাজতন্ত্র: ভাঙাগড়ার রাজনীতিতে কেমন আছে সিপিবি?

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন বিশ্ব রাজনীতির সমীকরণ বদলে দিয়েছিল। সেই ধাক্কা এসে লেগেছিল এ দেশের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনেও। ষাটের দশকে বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের দুই প্রধান স্তম্ভ- সোভিয়েত ইউনিয়ন (মস্কো) এবং চীন (পিকিং)- এর মধ্যে তীব্র নীতিগত ও আদর্শিক বিরোধ তৈরি হয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও বুর্জোয়া রাজনৈতিকদলগুলোর সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে আন্দোলনের নীতি গ্রহণ করে। অন্যদিকে, চীন একে ‘সংশোধনবাদ’ আখ্যা দিয়ে সশস্ত্র ক্রান্তীয় বিপ্লবের নীতি প্রচার করে। এই দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করেই প্রথম দফায় ভাঙনের কবলে পড়েছিল দলটি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধে অংশ গ্রহণ নিয়েও মস্কো ও পিকিংপন্থীদের মধ্যে ছিল বিপরীতমুখী অবস্থান। স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৯৩ সালের ১৫ জুন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) আরেকবার  ঐতিহাসিক ভাঙনের মুখে পড়ে। তৎকালীন কেন্দ্রীয় কমিটির একটি বড় অংশ ভিন্ন পথ বেছে নেয়। আজ তিন দশকেরও বেশি সময় পর এসে প্রশ্ন জাগে-কেমন আছে সেই ঐতিহ্যবাহী সিপিবি? কেমন আছেন দলছুট নেতারা আর দলটির বর্তমান অবস্থানই বা কী?

জন্ম ও গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) ইতিহাস এ দেশের মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ১৯৪৮ সালের ৬ মার্চ অবিভক্ত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির পাকিস্তানি শাখা হিসেবে পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি’ গঠিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে এটি ‘বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)’ নামে আত্মপ্রকাশ করে।

শুরু থেকেই দলটি এ দেশের শ্রমিক, কৃষক ও মেহনতি মানুষের অধিকার রক্ষা এবং প্রগতিশীল আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে আসছিল। তেভাগা আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনসহ প্রতিটি জাতীয় সংকটে সিপিবির ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য।

আন্ডারগ্রাউন্ডের রাজনীতি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই শাসকগোষ্ঠীর চরম দমন-পীড়নের শিকার হতে হয়েছিল দলটিকে। ১৯৫৪ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ফলে দলটির শীর্ষ নেতাদের দীর্ঘ সময় ধরে আত্মগোপনে বা ‘আন্ডারগ্রাউন্ডে’ থেকে রাজনীতি পরিচালনা করতে হয়েছিল। আইয়ুব খানের সামরিক শাসন আমলে এবং পরবর্তী সময়েও বৈরী পরিস্থিতির কারণে গোপনে থেকেই তারা জনমানুষকে সংগঠিত করার কঠিন কাজটি করেছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধে ঐতিহাসিক ভূমিকা

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সিপিবির ভূমিকা ছিল অনন্য। দলটি ন্যাপ এবং ছাত্র ইউনিয়নের

সাথে যৌথভাবে ‘ন্যাপ-সিপিবি-ছাত্র ইউনিয়ন যৌথ গেরিলা বাহিনী’ গঠন করে সরাসরি পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেয়। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে, বিশেষ করে

সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর সমর্থন আদায়ে সিপিবির কূটনৈতিক তৎপরতা বাংলাদেশের স্বাধীনতার পথকে সুগম করেছিল।

মস্কো-পিকিং দ্বন্দ্বে প্রথম ভাঙন

১৯৬৬ সালে অবিভক্ত ‘পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি’র ঐতিহাসিক ভাঙনটি ছিল তৎকালীন পূর্ব বাংলার সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্ট। মূলতএই ভাঙনটি ঘটেছিল কোনো অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে নয়, আন্তর্জাতিক আদর্শিক দ্বন্দ্বে দলটির কেন্দ্রীয় নেতাদের বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। একদল ছিল মস্কোপন্থী এবং আরেক গ্রুপ ছিল চীনপন্থী।  

মস্কো বনাম পিকিং বিতর্ক: ষাটের দশকে বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের দুই প্রধান- স্তম্ভসোভিয়েত ইউনিয়ন (মস্কো) এবং চীন (পিকিং)- এর মধ্যে তীব্রনীতিগত ও আদর্শিক বিরোধতৈরি হয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও বুর্জোয়া রাজনৈতিকদলগুলোর সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে আন্দোলনের নীতি গ্রহণ করে। অন্যদিকে, চীন একে ‘সংশোধনবাদ’ আখ্যা দিয়ে সশস্ত্র ক্রান্তীয় বিপ্লবের নীতি প্রচার করে।

জাতীয় প্রশ্নে দ্বিমত (পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা): এ দেশের স্বাধীনতারপ্রশ্ন নিয়েও দুই পক্ষের ভিন্ন অবস্থান ছিল। রুশপন্থীরা মনে করত, আওয়ামী লীগের মতো জাতীয়তাবাদী দলের সঙ্গে মিলে স্বায়ত্তশাসন ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনজোরদার করা উচিত। অপরদিকে, চীনপন্থীরা আইয়ুব খানের তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের চীন-ঘেঁষা পররাষ্ট্রনীতির কারণে পাকিস্তান ভাঙার চেয়ে সরাসরি কৃষক-শ্রমিক বিপ্লবের ওপর বেশি জোর দিতে চেয়েছিল।এই দুই ভিন্ন মতাদর্শের চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে ১৯৬৬ সালে কমিউনিস্ট পার্টি আনুষ্ঠানিকভাবে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়।

রুশপন্থীবা মস্কোপন্থী (যা পরে ‘সিপিবি’হয়) তারা সোভিয়েত ইউনিয়নের রাজনৈতিক লাইন অনুসরণ করেন এবং বুর্জোয়া দলগুলোর সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের পক্ষে অবস্থান নেন। তারা নিজেদের মূল সংগঠন দাবি করে পুরোনো নামই ধরে রাখেন।

দলের নাম সিপিবি: পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (স্বাধীনতার পর ১৯৭১ সালেনাম বদলে হয় বাংলাদেশের কমিউনিস্টপার্টি- সিপিবি)। নেতৃত্বে ছিলেন- কমরেড মণি সিংহ (তৎকালীন প্রধান তাত্ত্বিক ও নেতা) খোকারায়অনিল মুখার্জিজ্ঞান চক্রবর্তীপরবর্তী সময়ে এ ধারার হালধরেন কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ।

চীনপন্থী বা পিকিংপন্থী (নতুন দল) তারা চীনের মাও সেতুং-এর বিপ্লবী আদর্শও সশস্ত্র কৃষি বিপ্লবের লাইন বেছে নেন। তারা পুরোনো কমিটি বিলুপ্ত করে সম্পূর্ণ নতুন একটি দল গঠন করেন।

আরেক দলের নাম এমএল: পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী)- সংক্ষেপে ইপিসিপি (এম-এল)। নেতৃত্বে ছিলেন-  সুখেন্দুদস্তিদার (নতুন দলের সাধারণ সম্পাদক হন) কমরেড মোহাম্মদ তোয়াহা, আবদুল হক, মোহাম্মদ দানেশ (পরবর্তীতে আলাদা হন)।

আবদুল মতিন পরবর্তী প্রভাব: ১৯৬৬ সালের এই ভাঙনের পরকমিউনিস্ট আন্দোলন মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে রুশপন্থী অংশ (সিপিবি) সরাসরি অংশ নিলেও চীনপন্থী বা মাওবাদী অংশটিআন্তর্জাতিক রাজনীতির সমীকরণের কারণে বিভ্রান্তিতে পড়ে এবং পরবর্তীতে নিজেরাও শতধাবিভক্ত হয়ে যায়।

নব্বইয়ের দশকে দ্বিতীয় ভাঙ্ন

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন এবং বিশ্বজুড়ে সমাজতন্ত্রের বিপর্যয়ের পর সিপিবির ভেতরে আদর্শিক বিতর্ক তীব্র আকার ধারণ করে। দলের একটি বড় অংশ সমাজতন্ত্রের সনাতন ধারা বদলে পার্টিকে বুর্জোয়া ধারার আদলে যুগোপযোগী ও সংস্কার করার পক্ষে অবস্থান নেয়।

১৫ জুনের ভাঙন: ১৯৯৩ সালের ১৫ জুন তৎকালীন সিপিবির বিশেষ জাতীয় সম্মেলন (বিশেষ কংগ্রেস) অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনের সময় তৎকালীন কেন্দ্রীয় কমিটির ৭৫ জন সদস্যের মধ্যে সাইফুদ্দিন আহমেদ মানিক এবং নুরুল ইসলাম নাহিদের নেতৃত্বে ৫৩ জন সংস্কারপন্থী নেতা দল থেকে পৃথক অবস্থান নেন।

নেতৃত্বের পুনর্বিন্যাস: এই বিশেষ কংগ্রেসে ভাঙনের পর সিপিবির হাল ধরেন সহিদুল্লাহ চৌধুরী (সভাপতি) এবং মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম (সাধারণ সম্পাদক)। অন্যদিকে সিপিবি ছেড়ে দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ নেতারা বিভিন্ন রাজনৈতিক ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়েন।

দলছুট নেতাদের অবস্থান: ১৯৯৩ সালের ২৯ আগস্ট সাইফুদ্দিন আহমেদ মানিক, নুরুল ইসলাম নাহিদসহ একটি বড় অংশ ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে নবগঠিত ‘গণফোরাম’-এ যোগ দেন। সাইফুদ্দিন মানিক আমৃত্যু (২০০৮) এই দলের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। (পরবর্তীতে নুরুল ইসলাম নাহিদ ও আবদুল মান্নান আওয়ামী লীগে যোগ দেন)।

কমিউনিস্ট কেন্দ্র গঠন: ডা. ওয়াজেদুল ইসলাম এবং অজয় রায়ের নেতৃত্বে একটি অংশ গঠন করে ‘কমিউনিস্ট কেন্দ্র’, যা বর্তমানে ক্ষমতাসীন মহাজোটের শরিক দল।

অন্যান্য: কয়েকজন নেতা পরবর্তীতে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মূলধারার রাজনীতিতে যুক্ত হন।

সিপিবির বর্তমান অবস্থা ও সংকট

আদর্শিক ভাঙনের পরও সিপিবি তার নিজস্ব মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী ধারা বজায় রেখে রাজনীতিতে সক্রিয় রয়েছে। তবে দলটির ভেতরেও মাঝেমধ্যে অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও নেতৃত্ব নিয়ে টানাপোড়েন দেখা যায়। যেমন, দলের তিনবারের সাবেক সভাপতি ও বর্তমান উপদেষ্টা মনজুরুল আহসান খানকে পার্টির কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে সমস্ত প্রতিকূলতা ও ভাঙন সত্ত্বেও সিপিবির বর্তমান নেতৃত্ব আশাবাদী। দলটির কেন্দ্রীয় নেতাদের মতে, ১৯৯৩ সালে অনেক গুরুত্বপূর্ণ নেতা দল ছেড়ে গেলেও সিপিবির আদর্শিক ভিত্তি নড়ে যায়নি। রাজপথে মেহনতি মানুষের অধিকারের লড়াইয়ে এবং প্রগতিশীল বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তুলতে সিপিবি এখনও রাজপথে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে চলেছে।

পুনশ্চ

১৯৯৩ সালের বিভাজন বাংলাদেশের বামপন্থী আন্দোলনের গতিপথকে অনেকটাই দুর্বল করে দিয়েছিল সন্দেহ নেই। তবে তিন দশক ধরে টিকে থাকা সিপিবি প্রমাণ করেছে যে, ব্যক্তি চলে গেলেও আদর্শের লড়াই শেষ হয়ে যায় না। প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও দলটি এখনো এ দেশের শোষিত মানুষের পক্ষে তাদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে।

বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি

Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ

ঝড়ের খেয়ায় সমাজতন্ত্র: ভাঙাগড়ার রাজনীতিতে কেমন আছে সিপিবি?

আপডেট সময় ০৯:৫৮:১৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন বিশ্ব রাজনীতির সমীকরণ বদলে দিয়েছিল। সেই ধাক্কা এসে লেগেছিল এ দেশের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনেও। ষাটের দশকে বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের দুই প্রধান স্তম্ভ- সোভিয়েত ইউনিয়ন (মস্কো) এবং চীন (পিকিং)- এর মধ্যে তীব্র নীতিগত ও আদর্শিক বিরোধ তৈরি হয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও বুর্জোয়া রাজনৈতিকদলগুলোর সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে আন্দোলনের নীতি গ্রহণ করে। অন্যদিকে, চীন একে ‘সংশোধনবাদ’ আখ্যা দিয়ে সশস্ত্র ক্রান্তীয় বিপ্লবের নীতি প্রচার করে। এই দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করেই প্রথম দফায় ভাঙনের কবলে পড়েছিল দলটি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধে অংশ গ্রহণ নিয়েও মস্কো ও পিকিংপন্থীদের মধ্যে ছিল বিপরীতমুখী অবস্থান। স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৯৩ সালের ১৫ জুন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) আরেকবার  ঐতিহাসিক ভাঙনের মুখে পড়ে। তৎকালীন কেন্দ্রীয় কমিটির একটি বড় অংশ ভিন্ন পথ বেছে নেয়। আজ তিন দশকেরও বেশি সময় পর এসে প্রশ্ন জাগে-কেমন আছে সেই ঐতিহ্যবাহী সিপিবি? কেমন আছেন দলছুট নেতারা আর দলটির বর্তমান অবস্থানই বা কী?

জন্ম ও গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) ইতিহাস এ দেশের মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ১৯৪৮ সালের ৬ মার্চ অবিভক্ত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির পাকিস্তানি শাখা হিসেবে পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি’ গঠিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে এটি ‘বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)’ নামে আত্মপ্রকাশ করে।

শুরু থেকেই দলটি এ দেশের শ্রমিক, কৃষক ও মেহনতি মানুষের অধিকার রক্ষা এবং প্রগতিশীল আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে আসছিল। তেভাগা আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনসহ প্রতিটি জাতীয় সংকটে সিপিবির ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য।

আন্ডারগ্রাউন্ডের রাজনীতি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই শাসকগোষ্ঠীর চরম দমন-পীড়নের শিকার হতে হয়েছিল দলটিকে। ১৯৫৪ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ফলে দলটির শীর্ষ নেতাদের দীর্ঘ সময় ধরে আত্মগোপনে বা ‘আন্ডারগ্রাউন্ডে’ থেকে রাজনীতি পরিচালনা করতে হয়েছিল। আইয়ুব খানের সামরিক শাসন আমলে এবং পরবর্তী সময়েও বৈরী পরিস্থিতির কারণে গোপনে থেকেই তারা জনমানুষকে সংগঠিত করার কঠিন কাজটি করেছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধে ঐতিহাসিক ভূমিকা

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সিপিবির ভূমিকা ছিল অনন্য। দলটি ন্যাপ এবং ছাত্র ইউনিয়নের

সাথে যৌথভাবে ‘ন্যাপ-সিপিবি-ছাত্র ইউনিয়ন যৌথ গেরিলা বাহিনী’ গঠন করে সরাসরি পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেয়। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে, বিশেষ করে

সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর সমর্থন আদায়ে সিপিবির কূটনৈতিক তৎপরতা বাংলাদেশের স্বাধীনতার পথকে সুগম করেছিল।

মস্কো-পিকিং দ্বন্দ্বে প্রথম ভাঙন

১৯৬৬ সালে অবিভক্ত ‘পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি’র ঐতিহাসিক ভাঙনটি ছিল তৎকালীন পূর্ব বাংলার সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্ট। মূলতএই ভাঙনটি ঘটেছিল কোনো অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে নয়, আন্তর্জাতিক আদর্শিক দ্বন্দ্বে দলটির কেন্দ্রীয় নেতাদের বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। একদল ছিল মস্কোপন্থী এবং আরেক গ্রুপ ছিল চীনপন্থী।  

মস্কো বনাম পিকিং বিতর্ক: ষাটের দশকে বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের দুই প্রধান- স্তম্ভসোভিয়েত ইউনিয়ন (মস্কো) এবং চীন (পিকিং)- এর মধ্যে তীব্রনীতিগত ও আদর্শিক বিরোধতৈরি হয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও বুর্জোয়া রাজনৈতিকদলগুলোর সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে আন্দোলনের নীতি গ্রহণ করে। অন্যদিকে, চীন একে ‘সংশোধনবাদ’ আখ্যা দিয়ে সশস্ত্র ক্রান্তীয় বিপ্লবের নীতি প্রচার করে।

জাতীয় প্রশ্নে দ্বিমত (পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা): এ দেশের স্বাধীনতারপ্রশ্ন নিয়েও দুই পক্ষের ভিন্ন অবস্থান ছিল। রুশপন্থীরা মনে করত, আওয়ামী লীগের মতো জাতীয়তাবাদী দলের সঙ্গে মিলে স্বায়ত্তশাসন ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনজোরদার করা উচিত। অপরদিকে, চীনপন্থীরা আইয়ুব খানের তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের চীন-ঘেঁষা পররাষ্ট্রনীতির কারণে পাকিস্তান ভাঙার চেয়ে সরাসরি কৃষক-শ্রমিক বিপ্লবের ওপর বেশি জোর দিতে চেয়েছিল।এই দুই ভিন্ন মতাদর্শের চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে ১৯৬৬ সালে কমিউনিস্ট পার্টি আনুষ্ঠানিকভাবে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়।

রুশপন্থীবা মস্কোপন্থী (যা পরে ‘সিপিবি’হয়) তারা সোভিয়েত ইউনিয়নের রাজনৈতিক লাইন অনুসরণ করেন এবং বুর্জোয়া দলগুলোর সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের পক্ষে অবস্থান নেন। তারা নিজেদের মূল সংগঠন দাবি করে পুরোনো নামই ধরে রাখেন।

দলের নাম সিপিবি: পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (স্বাধীনতার পর ১৯৭১ সালেনাম বদলে হয় বাংলাদেশের কমিউনিস্টপার্টি- সিপিবি)। নেতৃত্বে ছিলেন- কমরেড মণি সিংহ (তৎকালীন প্রধান তাত্ত্বিক ও নেতা) খোকারায়অনিল মুখার্জিজ্ঞান চক্রবর্তীপরবর্তী সময়ে এ ধারার হালধরেন কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ।

চীনপন্থী বা পিকিংপন্থী (নতুন দল) তারা চীনের মাও সেতুং-এর বিপ্লবী আদর্শও সশস্ত্র কৃষি বিপ্লবের লাইন বেছে নেন। তারা পুরোনো কমিটি বিলুপ্ত করে সম্পূর্ণ নতুন একটি দল গঠন করেন।

আরেক দলের নাম এমএল: পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী)- সংক্ষেপে ইপিসিপি (এম-এল)। নেতৃত্বে ছিলেন-  সুখেন্দুদস্তিদার (নতুন দলের সাধারণ সম্পাদক হন) কমরেড মোহাম্মদ তোয়াহা, আবদুল হক, মোহাম্মদ দানেশ (পরবর্তীতে আলাদা হন)।

আবদুল মতিন পরবর্তী প্রভাব: ১৯৬৬ সালের এই ভাঙনের পরকমিউনিস্ট আন্দোলন মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে রুশপন্থী অংশ (সিপিবি) সরাসরি অংশ নিলেও চীনপন্থী বা মাওবাদী অংশটিআন্তর্জাতিক রাজনীতির সমীকরণের কারণে বিভ্রান্তিতে পড়ে এবং পরবর্তীতে নিজেরাও শতধাবিভক্ত হয়ে যায়।

নব্বইয়ের দশকে দ্বিতীয় ভাঙ্ন

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন এবং বিশ্বজুড়ে সমাজতন্ত্রের বিপর্যয়ের পর সিপিবির ভেতরে আদর্শিক বিতর্ক তীব্র আকার ধারণ করে। দলের একটি বড় অংশ সমাজতন্ত্রের সনাতন ধারা বদলে পার্টিকে বুর্জোয়া ধারার আদলে যুগোপযোগী ও সংস্কার করার পক্ষে অবস্থান নেয়।

১৫ জুনের ভাঙন: ১৯৯৩ সালের ১৫ জুন তৎকালীন সিপিবির বিশেষ জাতীয় সম্মেলন (বিশেষ কংগ্রেস) অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনের সময় তৎকালীন কেন্দ্রীয় কমিটির ৭৫ জন সদস্যের মধ্যে সাইফুদ্দিন আহমেদ মানিক এবং নুরুল ইসলাম নাহিদের নেতৃত্বে ৫৩ জন সংস্কারপন্থী নেতা দল থেকে পৃথক অবস্থান নেন।

নেতৃত্বের পুনর্বিন্যাস: এই বিশেষ কংগ্রেসে ভাঙনের পর সিপিবির হাল ধরেন সহিদুল্লাহ চৌধুরী (সভাপতি) এবং মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম (সাধারণ সম্পাদক)। অন্যদিকে সিপিবি ছেড়ে দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ নেতারা বিভিন্ন রাজনৈতিক ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়েন।

দলছুট নেতাদের অবস্থান: ১৯৯৩ সালের ২৯ আগস্ট সাইফুদ্দিন আহমেদ মানিক, নুরুল ইসলাম নাহিদসহ একটি বড় অংশ ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে নবগঠিত ‘গণফোরাম’-এ যোগ দেন। সাইফুদ্দিন মানিক আমৃত্যু (২০০৮) এই দলের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। (পরবর্তীতে নুরুল ইসলাম নাহিদ ও আবদুল মান্নান আওয়ামী লীগে যোগ দেন)।

কমিউনিস্ট কেন্দ্র গঠন: ডা. ওয়াজেদুল ইসলাম এবং অজয় রায়ের নেতৃত্বে একটি অংশ গঠন করে ‘কমিউনিস্ট কেন্দ্র’, যা বর্তমানে ক্ষমতাসীন মহাজোটের শরিক দল।

অন্যান্য: কয়েকজন নেতা পরবর্তীতে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মূলধারার রাজনীতিতে যুক্ত হন।

সিপিবির বর্তমান অবস্থা ও সংকট

আদর্শিক ভাঙনের পরও সিপিবি তার নিজস্ব মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী ধারা বজায় রেখে রাজনীতিতে সক্রিয় রয়েছে। তবে দলটির ভেতরেও মাঝেমধ্যে অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও নেতৃত্ব নিয়ে টানাপোড়েন দেখা যায়। যেমন, দলের তিনবারের সাবেক সভাপতি ও বর্তমান উপদেষ্টা মনজুরুল আহসান খানকে পার্টির কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে সমস্ত প্রতিকূলতা ও ভাঙন সত্ত্বেও সিপিবির বর্তমান নেতৃত্ব আশাবাদী। দলটির কেন্দ্রীয় নেতাদের মতে, ১৯৯৩ সালে অনেক গুরুত্বপূর্ণ নেতা দল ছেড়ে গেলেও সিপিবির আদর্শিক ভিত্তি নড়ে যায়নি। রাজপথে মেহনতি মানুষের অধিকারের লড়াইয়ে এবং প্রগতিশীল বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তুলতে সিপিবি এখনও রাজপথে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে চলেছে।

পুনশ্চ

১৯৯৩ সালের বিভাজন বাংলাদেশের বামপন্থী আন্দোলনের গতিপথকে অনেকটাই দুর্বল করে দিয়েছিল সন্দেহ নেই। তবে তিন দশক ধরে টিকে থাকা সিপিবি প্রমাণ করেছে যে, ব্যক্তি চলে গেলেও আদর্শের লড়াই শেষ হয়ে যায় না। প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও দলটি এখনো এ দেশের শোষিত মানুষের পক্ষে তাদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে।

বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি