ঢাকা ০৯:৫৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬, ৩১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সবুজ ক্যানভাসে স্প্যানিশ আলপনা

ফরাসি দর্প চূর্ণ করে ১৬ বছর পর বিশ্বমঞ্চের ফাইনালে আর্মাডারা

রাত তখন রূপকথার পোশাকে সেজেছে। মাঠের সবুজ ঘাস যেন হয়ে উঠেছিল এক যুদ্ধক্ষেত্র, যেখানে একদিকে ছিল ফরাসিদের ক্ষিপ্র গতি আর পেশিশক্তি, অন্যদিকে স্প্যানিশদের পায়ে পায়ে বোনা নান্দনিক কবিতার ছন্দ। হট ফেভারিটের তকমা গায়ে সেঁটে যে দুটি দল বিশ্বজয়ের মহাকাব্য লিখতে এসেছিল, তাদের প্রথম সেমিফাইনালে দেখা গেল এক নির্মম কিন্তু সুন্দর বৈপরীত্য। কিলিয়ান এমবাপ্পে আর উসমান ডেম্বেলেরা স্প্যানিশ ঝড়ের সামনে দাঁড়াতেই পারলেন না। ফরাসিদের ২-০ গোলে ধূলিসাৎ করে দীর্ঘ ১৬ বছর পর বিশ্বকাপের ফাইনালের মঞ্চে নিজেদের লাল-হলুদ পতাকা ওড়ালো স্পেন। সেই ২০১০ সালের জোহানেসবার্গের সোনালী রাতের পর, আবারও এক নতুন বসন্তের ডাক লামিনে ইয়ামালদের আঙিনায়।

নান্দনিকতার প্রারম্ভ

ম্যাচের শুরু থেকেই বাতাসের গতিতে ছিল বারুদের গন্ধ। কেউ কাউকে এক চুল জমি ছাড়তে রাজি নয়। ১০ মিনিটের মাথায় ফ্রান্সের দুর্গের ঠিক বাইরে একটি ফ্রি-কিক পায় স্পেন। কিন্তু ফরাসিদের জমাট রক্ষণ সে যাত্রায় স্প্যানিশদের শিল্পের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তবে তা ছিল ঝড়ের আগের পূর্বাভাস মাত্র। স্পেনের মাঝমাঠের নিখুঁত পাসিং আর বলের ওপর রাজকীয় নিয়ন্ত্রণ ফরাসিদের ডিফেন্সকে ক্রমান্বয়ে অবশ করে দিচ্ছিল।

পেনাল্টির মহাকাব্য 

ম্যাচের বয়স যখন ঠিক ২০ মিনিট, তখন মাঠের ডানপ্রান্তে এক জাদুকরী দৃশ্যের অবতারণা করলেন তরুণ তুর্কি লামিনে ইয়ামাল। ফরাসি বক্সের ভেতর বিদ্যুৎ গতিতে ঢুকে পড়া ইয়ামালকে অবৈধভাবে রুখতে গিয়ে ফাউল করে বসেন ফরাসি ডিফেন্ডার। রেফারির বাঁশি যেন ফরাসি গ্যালারিতে এক লহমায় স্তব্ধতার চাদর বিছিয়ে দিল। পেনাল্টির অমোঘ সিদ্ধান্ত!

১২ গজ দূরের সেই বিন্দুতে বল বসিয়ে যখন মিকেল ওইয়ারসাবাল দাঁড়ালেন, তার চোখে ছিল হিমশীতল স্তব্ধতা। ফরাসি গোলরক্ষক মাইগনানকে সম্পূর্ণ ভুল দিকে পাঠিয়ে এক নিখুঁত ও মায়াবী শটে বল জালে জড়ালেন তিনি। ১-০ গোলে এগিয়ে গিয়ে স্প্যানিশ আর্মাডারা যেন উৎসবের প্রথম সুরটি বেঁধে দিল।

অফসাইডের দীর্ঘশ্বাস ও ফরাসি হতাশা

৩৬ মিনিটে ম্যাচের পারদ চড়ল আরও একধাপ। দূরপাল্লার এক নিখুঁত ক্রস বুক দিয়ে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ফ্রান্সের জাল দ্বিতীয়বারের মতো কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন স্প্যানিশ ফরোয়ার্ড অ্যালেক্স বায়েনা। গোল উদযাপনের মাতামাতির মাঝেই রেফারির অফসাইডের বাঁশি স্প্যানিশদের সেই আনন্দকে ক্ষণিকের জন্য স্তিমিত করে। বিরতির ঠিক আগ মুহূর্তে ফ্রান্সের বারকোলা বক্সের বাইরে থেকে এক ডানপায়ের বাঁকানো শটে সমতা ফেরাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু বল গোলবারের অনেক উপর দিয়ে মহাশূন্যে হারিয়ে যায়। ফরাসিদের চোখে তখন প্রথমার্ধ শেষের হতাশা আর ১-০ গোলে পিছিয়ে থাকার গ্লানি।

ফরাসি দুর্গের পতন

বিরতি থেকে ফিরে ফ্রান্স যখন নিজেদের হারিয়ে যাওয়া ছন্দ খুঁজছিল, ঠিক তখনই স্পেনের রণকৌশল ফরাসিদের কফিনে দ্বিতীয় পেরেকটি ঠুকে দেয়। ম্যাচের ৫৮ মিনিটে এক নিখুঁত ও গতিশীল আক্রমণ থেকে ফ্রান্সের জালে বল পাঠিয়ে ব্যবধান ২-০ করেন পেদ্রো পোরো। এই গোলটি যেন ছিল ফরাসিদের অহংকারে এক চূড়ান্ত কুঠারাঘাত।

ডিফেন্সের দেয়াল

দুই গোলে পিছিয়ে পড়ে আহত সিংহের মতো গর্জে উঠতে চেয়েছিল ফ্রান্স। ৬৮ মিনিটে বক্সের কোণ থেকে কিলিয়ান এমবাপ্পে এক কামানের গোলার মতো শট নিয়েছিলেন। কিন্তু স্পেনের ডিফেন্ডার মার্ক কুকুরেয়া যেন সেদিন নিজের শরীরকে এক দুর্ভেদ্য দেয়ালে পরিণত করেছিলেন। অসাধারণ এক ব্লকে তিনি রুখে দেন ফরাসি অধিনায়কের শেষ আশাটুকুও। ৮০ মিনিটে মাঠ কাঁপাতে নামা ফেরান তোরেসের একটি হেড গোলবারের ইঞ্চি খানেক পাশ দিয়ে চলে না গেলে ফ্রান্সের পরাজয়ের ব্যবধান আরও বড় হতে পারত।

ম্যাচের শেষ ১০ মিনিট ফ্রান্স মুহুর্মুহু আক্রমণ শানিয়েছে, কিন্তু স্প্যানিশ গোলরক্ষক উনাই সিমন আর ডিফেন্ডার কুকুরেয়ার অদৃশ্য দেয়ালে আছড়ে পড়ে বারবার দিক হারিয়েছে ফরাসিদের সব প্রচেষ্টা। শেষ বাঁশি বাজার সাথে সাথেই নিশ্চিত হয় স্পেনের ২-০ গোলের এক ক্ল্যাসিক জয়।

এক নতুন সূর্যোদয়

২০১০ সালের সেই অবিস্মরণীয় ফাইনালে নেদারল্যান্ডসকে ১-০ গোলে হারিয়ে বিশ্বজয় করেছিল স্পেন। দীর্ঘ ১৬টি বছর ধরে স্প্যানিশ ফুটবল প্রেমীরা চাতক পাখির মতো চেয়েছিল আরেকটি ফাইনালের জন্য, আরেকটি বিশ্বজয়ের মহাকাব্যের জন্য। আজ লামিনে ইয়ামাল, ওইয়ারসাবাল আর পেদ্রো পোরোদের হাত ধরে সেই স্বপ্ন আবারও জীবন্ত হয়ে উঠেছে। আর মাত্র একটি ম্যাচ, একটি ৯০ মিনিটের লড়াই; তারপরেই হয়তো বিশ্ব ফুটবলের রাজদণ্ড আবারও ফিরে যাবে তার যোগ্য উত্তরসূরিদের হাতে।

বাংলা৭১নিউজ/এসএস

Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ

সবুজ ক্যানভাসে স্প্যানিশ আলপনা

ফরাসি দর্প চূর্ণ করে ১৬ বছর পর বিশ্বমঞ্চের ফাইনালে আর্মাডারা

আপডেট সময় ০৪:০৪:৩৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬

রাত তখন রূপকথার পোশাকে সেজেছে। মাঠের সবুজ ঘাস যেন হয়ে উঠেছিল এক যুদ্ধক্ষেত্র, যেখানে একদিকে ছিল ফরাসিদের ক্ষিপ্র গতি আর পেশিশক্তি, অন্যদিকে স্প্যানিশদের পায়ে পায়ে বোনা নান্দনিক কবিতার ছন্দ। হট ফেভারিটের তকমা গায়ে সেঁটে যে দুটি দল বিশ্বজয়ের মহাকাব্য লিখতে এসেছিল, তাদের প্রথম সেমিফাইনালে দেখা গেল এক নির্মম কিন্তু সুন্দর বৈপরীত্য। কিলিয়ান এমবাপ্পে আর উসমান ডেম্বেলেরা স্প্যানিশ ঝড়ের সামনে দাঁড়াতেই পারলেন না। ফরাসিদের ২-০ গোলে ধূলিসাৎ করে দীর্ঘ ১৬ বছর পর বিশ্বকাপের ফাইনালের মঞ্চে নিজেদের লাল-হলুদ পতাকা ওড়ালো স্পেন। সেই ২০১০ সালের জোহানেসবার্গের সোনালী রাতের পর, আবারও এক নতুন বসন্তের ডাক লামিনে ইয়ামালদের আঙিনায়।

নান্দনিকতার প্রারম্ভ

ম্যাচের শুরু থেকেই বাতাসের গতিতে ছিল বারুদের গন্ধ। কেউ কাউকে এক চুল জমি ছাড়তে রাজি নয়। ১০ মিনিটের মাথায় ফ্রান্সের দুর্গের ঠিক বাইরে একটি ফ্রি-কিক পায় স্পেন। কিন্তু ফরাসিদের জমাট রক্ষণ সে যাত্রায় স্প্যানিশদের শিল্পের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তবে তা ছিল ঝড়ের আগের পূর্বাভাস মাত্র। স্পেনের মাঝমাঠের নিখুঁত পাসিং আর বলের ওপর রাজকীয় নিয়ন্ত্রণ ফরাসিদের ডিফেন্সকে ক্রমান্বয়ে অবশ করে দিচ্ছিল।

পেনাল্টির মহাকাব্য 

ম্যাচের বয়স যখন ঠিক ২০ মিনিট, তখন মাঠের ডানপ্রান্তে এক জাদুকরী দৃশ্যের অবতারণা করলেন তরুণ তুর্কি লামিনে ইয়ামাল। ফরাসি বক্সের ভেতর বিদ্যুৎ গতিতে ঢুকে পড়া ইয়ামালকে অবৈধভাবে রুখতে গিয়ে ফাউল করে বসেন ফরাসি ডিফেন্ডার। রেফারির বাঁশি যেন ফরাসি গ্যালারিতে এক লহমায় স্তব্ধতার চাদর বিছিয়ে দিল। পেনাল্টির অমোঘ সিদ্ধান্ত!

১২ গজ দূরের সেই বিন্দুতে বল বসিয়ে যখন মিকেল ওইয়ারসাবাল দাঁড়ালেন, তার চোখে ছিল হিমশীতল স্তব্ধতা। ফরাসি গোলরক্ষক মাইগনানকে সম্পূর্ণ ভুল দিকে পাঠিয়ে এক নিখুঁত ও মায়াবী শটে বল জালে জড়ালেন তিনি। ১-০ গোলে এগিয়ে গিয়ে স্প্যানিশ আর্মাডারা যেন উৎসবের প্রথম সুরটি বেঁধে দিল।

অফসাইডের দীর্ঘশ্বাস ও ফরাসি হতাশা

৩৬ মিনিটে ম্যাচের পারদ চড়ল আরও একধাপ। দূরপাল্লার এক নিখুঁত ক্রস বুক দিয়ে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ফ্রান্সের জাল দ্বিতীয়বারের মতো কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন স্প্যানিশ ফরোয়ার্ড অ্যালেক্স বায়েনা। গোল উদযাপনের মাতামাতির মাঝেই রেফারির অফসাইডের বাঁশি স্প্যানিশদের সেই আনন্দকে ক্ষণিকের জন্য স্তিমিত করে। বিরতির ঠিক আগ মুহূর্তে ফ্রান্সের বারকোলা বক্সের বাইরে থেকে এক ডানপায়ের বাঁকানো শটে সমতা ফেরাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু বল গোলবারের অনেক উপর দিয়ে মহাশূন্যে হারিয়ে যায়। ফরাসিদের চোখে তখন প্রথমার্ধ শেষের হতাশা আর ১-০ গোলে পিছিয়ে থাকার গ্লানি।

ফরাসি দুর্গের পতন

বিরতি থেকে ফিরে ফ্রান্স যখন নিজেদের হারিয়ে যাওয়া ছন্দ খুঁজছিল, ঠিক তখনই স্পেনের রণকৌশল ফরাসিদের কফিনে দ্বিতীয় পেরেকটি ঠুকে দেয়। ম্যাচের ৫৮ মিনিটে এক নিখুঁত ও গতিশীল আক্রমণ থেকে ফ্রান্সের জালে বল পাঠিয়ে ব্যবধান ২-০ করেন পেদ্রো পোরো। এই গোলটি যেন ছিল ফরাসিদের অহংকারে এক চূড়ান্ত কুঠারাঘাত।

ডিফেন্সের দেয়াল

দুই গোলে পিছিয়ে পড়ে আহত সিংহের মতো গর্জে উঠতে চেয়েছিল ফ্রান্স। ৬৮ মিনিটে বক্সের কোণ থেকে কিলিয়ান এমবাপ্পে এক কামানের গোলার মতো শট নিয়েছিলেন। কিন্তু স্পেনের ডিফেন্ডার মার্ক কুকুরেয়া যেন সেদিন নিজের শরীরকে এক দুর্ভেদ্য দেয়ালে পরিণত করেছিলেন। অসাধারণ এক ব্লকে তিনি রুখে দেন ফরাসি অধিনায়কের শেষ আশাটুকুও। ৮০ মিনিটে মাঠ কাঁপাতে নামা ফেরান তোরেসের একটি হেড গোলবারের ইঞ্চি খানেক পাশ দিয়ে চলে না গেলে ফ্রান্সের পরাজয়ের ব্যবধান আরও বড় হতে পারত।

ম্যাচের শেষ ১০ মিনিট ফ্রান্স মুহুর্মুহু আক্রমণ শানিয়েছে, কিন্তু স্প্যানিশ গোলরক্ষক উনাই সিমন আর ডিফেন্ডার কুকুরেয়ার অদৃশ্য দেয়ালে আছড়ে পড়ে বারবার দিক হারিয়েছে ফরাসিদের সব প্রচেষ্টা। শেষ বাঁশি বাজার সাথে সাথেই নিশ্চিত হয় স্পেনের ২-০ গোলের এক ক্ল্যাসিক জয়।

এক নতুন সূর্যোদয়

২০১০ সালের সেই অবিস্মরণীয় ফাইনালে নেদারল্যান্ডসকে ১-০ গোলে হারিয়ে বিশ্বজয় করেছিল স্পেন। দীর্ঘ ১৬টি বছর ধরে স্প্যানিশ ফুটবল প্রেমীরা চাতক পাখির মতো চেয়েছিল আরেকটি ফাইনালের জন্য, আরেকটি বিশ্বজয়ের মহাকাব্যের জন্য। আজ লামিনে ইয়ামাল, ওইয়ারসাবাল আর পেদ্রো পোরোদের হাত ধরে সেই স্বপ্ন আবারও জীবন্ত হয়ে উঠেছে। আর মাত্র একটি ম্যাচ, একটি ৯০ মিনিটের লড়াই; তারপরেই হয়তো বিশ্ব ফুটবলের রাজদণ্ড আবারও ফিরে যাবে তার যোগ্য উত্তরসূরিদের হাতে।

বাংলা৭১নিউজ/এসএস