ঢাকা ০৩:০৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬, ২৯ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

১৯৩০ সালের এই ‍দিনে শুরু হয়েছিল বিশ্বকাপ ফুটবলের যাত্রা

নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে ১৯৩০ সালের ১৩ জুলাই ফুটবল বিশ্বকাপের প্রথম আসর বসেছিল দক্ষিণ আমেরিকার দেশ উরুগুয়েতে। অলিম্পিক ফেডারেশনের বাধা এবং ইংল্যান্ডের বিরোধিতার পরও জুলে রিমের চেষ্টায় এই প্রতিযোগিতার আয়োজন সফল হয়। আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দেওয়ার সমস্যার কারণে ইউরোপের অনেক দেশ এতে অংশ নিতে চায়নি। পরে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর সব খরচ উরুগুয়ে বহন করতে রাজি হলে তারা স্বাগতিক হওয়ার মর্যাদা পায়। সে বছরটি ছিল উরুগুয়ের স্বাধীনতার শততম বার্ষিকী। রাজধানী মন্তিভিদিওর তিনটি মাঠে সেবার খেলা হয়েছিল। তখন হয়তো কেউ কল্পনাও করেনি, এই প্রতিযোগিতা একদিন বিশ্বের সবচেয়ে বেশি দর্শকপ্রিয় ক্রীড়া আসরে পরিণত হবে।

প্রথম এই বিশ্বমঞ্চে মোট ১৩টি দেশ অংশ নেয়। এর মধ্যে ইউরোপের চারটি দেশ ছিল বেলজিয়াম, ফ্রান্স, রোমানিয়া ও যুগোস্লাভিয়া। লাতিন আমেরিকার ছিল সাতটি দল। সেগুলো হলো আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, বলিভিয়া, চিলি, প্যারাগুয়ে, পেরু ও উরুগুয়ে। বাকি দুটি দল ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকো। ১৮ দিনব্যাপী এই আসর ১৩ জুলাই শুরু হয়ে শেষ হয় ৩০ জুলাই। ১৩টি দলকে চার ভাগে ভাগ করে মোট ১৮টি ম্যাচ খেলা হয়।

বিশ্বকাপের ধারণা জন্ম নেয় বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে। সে সময় আন্তর্জাতিক ফুটবলের সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতা ছিল অলিম্পিক গেমস। কিন্তু ফুটবলের জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়তে থাকায় আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থা (ফিফা) একটি স্বতন্ত্র বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা আয়োজনের পরিকল্পনা করে। ফিফার তৎকালীন সভাপতি জুলে রিমের উদ্যোগে ১৯২৮ সালে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, প্রতি চার বছর অন্তর বিশ্বের সেরা ফুটবল দল নির্ধারণে একটি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট আয়োজন করা হবে।

ফ্রান্স ও মেক্সিকোর ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপের যাত্রা শুরু হয়। উদ্বোধনী ম্যাচে ফ্রান্স ৪ থেকে ১ গোলে জয় পায়। এই উদ্বোধনী ম্যাচটি মাঠে বসে উপভোগ করেছিলেন ৪ হাজার ৪৪৪ জন দর্শক। গ্রুপ পর্বের বাধা পেরিয়ে সেমিফাইনালে উঠেছিল আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুগোস্লাভিয়া। প্রথম সেমিফাইনালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ৬ থেকে ১ গোলে হারিয়ে ফাইনালে ওঠে আর্জেন্টিনা। দ্বিতীয় সেমিফাইনালে যুগোস্লাভিয়াকে একই ব্যবধানে হারিয়ে ফাইনালে যায় উরুগুয়ে।

৩০ জুলাই মন্তিভিদিওর সেন্তেনারিও স্টেডিয়ামে প্রথম ফাইনাল খেলা হয়। ৬৮ হাজার ৩৪৬ জন দর্শক মাঠে বসে ফাইনাল ম্যাচটি দেখেন। ম্যাচে উরুগুয়ে প্রথমে এগিয়ে গেলেও প্রথমার্ধে ২ থেকে ১ ব্যবধানে লিড নেয় আর্জেন্টিনা। তবে বিরতির পর উরুগুয়ে আরও তিনটি গোল দিয়ে ৪ থেকে ২ ব্যবধানে ম্যাচ জিতে প্রথম বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে এবং আর্জেন্টিনা রানার্স-আপ হয়। প্রথম বিশ্বকাপের কোনো তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ ছিল না। তবে গ্রুপ পর্বের ফলাফল বিবেচনা করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে তৃতীয় স্থান দেওয়া হয়। এই আসরে মোট ৭০টি গোল হয়। বিশ্বকাপের ইতিহাসের প্রথম হ্যাটট্রিক করেন যুক্তরাষ্ট্রের বার্ট প্যাটেনোড।

আসরে খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত নৈপুণ্যও আলাদাভাবে নজর কেড়েছিল। টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে গোল্ডেন বল লাভ করেন উরুগুয়ের হোসে নাসাজ্জি। সবচেয়ে বেশি আটটি গোল করে সেরা গোলদাতার পুরস্কার তথা গোল্ডেন বুট জিতে নেন আর্জেন্টিনার গুইলের্মো স্তাবিল। এ ছাড়া, চমৎকার গোলরক্ষণের স্বীকৃতিস্বরূপ সেরা গোলরক্ষকের পুরস্কার গোল্ডেন গ্লাভস পান উরুগুয়ের এনরিকে বালেস্ত্রেরো।

প্রথম বিশ্বকাপের পর ১৯৩৪ ও ১৯৩৮ সালে ইতালি টানা দুটি শিরোপা জিতে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে ১৯৪২ ও ১৯৪৬ সালের বিশ্বকাপ আয়োজন সম্ভব হয়নি। যুদ্ধ শেষে ১৯৫০ সালে ব্রাজিলে আবারও ফিরে আসে বিশ্বকাপ। ১৯৫০ সালের সেই বিশ্বকাপ ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম নাটকীয় অধ্যায়। রিও ডি জেনিরোর মারাকানা স্টেডিয়ামে প্রায় দুই লাখ দর্শকের সামনে শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে স্বাগতিক ব্রাজিলকে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয় উরুগুয়ে। ইতিহাসে এই ঘটনাটি ‘মারাকানাজো’ নামে পরিচিত।

বিশ্বকাপের প্রায় শতবর্ষের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত ২২টি আসর অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র আটটি দেশ শিরোপা জিততে পেরেছে। এর মধ্যে পাঁচবার শিরোপা জিতে ইতিহাসের সবচেয়ে সফল দল ব্রাজিল। ১৯৫৮ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে পেলের আবির্ভাব বিশ্ব ফুটবলের গতিপথ বদলে দেয়। তার নেতৃত্বে ব্রাজিল ১৯৫৮, ১৯৬২ ও ১৯৭০ সালে বিশ্বকাপ জেতে। পরবর্তীতে ১৯৯৪ ও ২০০২ সালেও শিরোপা জেতে তারা। এখন পর্যন্ত আর কোনো দেশ পাঁচবার বিশ্বকাপ জিততে পারেনি।

ব্রাজিলের পর সবচেয়ে সফল দেশ জার্মানি ও ইতালি। দুই দেশই চারবার করে বিশ্বকাপ জিতেছে। জার্মানির শিরোপাগুলো আসে ১৯৫৪, ১৯৭৪, ১৯৯০ ও ২০১৪ সালে। অন্যদিকে ইতালি চ্যাম্পিয়ন হয় ১৯৩৪, ১৯৩৮, ১৯৮২ ও ২০০৬ সালে। আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জিতেছে তিনবার। ১৯৭৮ সালে নিজেদের মাটিতে প্রথমবারের মতো শিরোপা জয়ের স্বাদ পায় তারা। এরপর ১৯৮৬ সালে দিয়েগো ম্যারাডোনার নেতৃত্বে দ্বিতীয় শিরোপা আসে। দীর্ঘ ৩৬ বছরের অপেক্ষার পর ২০২২ সালে লিওনেল মেসির নেতৃত্বে তৃতীয়বারের মতো বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয় আর্জেন্টিনা।

এ ছাড়া, ফ্রান্স ১৯৯৮ সালে নিজেদের দেশে প্রথমবার শিরোপা জয়ের পর ২০১৮ সালে দ্বিতীয়বার বিশ্বসেরা হয়। ইংল্যান্ডের একমাত্র বিশ্বকাপ আসে ১৯৬৬ সালে, আর স্পেন চ্যাম্পিয়ন হয় ২০১০ সালে। এই পথচলায় পেলে, ম্যারাডোনা, জিনেদিন জিদান, রোনালদো, রোনালদিনিও, মিরোস্লাভ ক্লোসে, আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা, কিলিয়ান এমবাপ্পে ও লিওনেল মেসির মতো তারকারা এই মঞ্চকে মহিমান্বিত করেছেন।

বিশ্বকাপের পথচলায় সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন এসেছে অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যায়। প্রথম আসরে ১৩টি দল খেললেও পরে সেই সংখ্যা ১৬, ২৪ ও ৩২ এ উন্নীত হয়। ১৯৯৮ সাল থেকে ২০২২ পর্যন্ত ৩২ দলের বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে ২০২৬ সালে শুরু হয়েছে নতুন যুগ। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে এবারের বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো অংশ নিচ্ছে ৪৮টি দল।

১৯৩০ সালে ছোট পরিসরে যাত্রা শুরু করা বিশ্বকাপ এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া উৎসবে পরিণত হয়েছে। যুদ্ধ, রাজনৈতিক সংকট, কিংবদন্তির উত্থান-পতন, অশ্রু ও আনন্দ; সবকিছুর সাক্ষী এই টুর্নামেন্ট। ২০২৬ সালে ২৩তম আসরের হাত ধরে ফুটবলের এই মহাকাব্যে যোগ হয়েছে নতুন এক অধ্যায়। আর বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি দর্শক মেতে উঠেছে নতুন ফুটবল সম্রাটকে বরণ করে নেওয়ার উল্লাসে।

ফুটবল বিশ্বকাপ বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রীড়া উৎসব। প্রতি চার বছর পরপর এই আসরকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে তুমুল উন্মাদনা ও আবেগের সৃষ্টি হয়। বিশ্বের নানা প্রান্তের কোটি কোটি মানুষ নিজেদের প্রিয় দলের সাফল্য দেখার জন্য অপেক্ষা করেন। প্রায় এক শতাব্দীর দীর্ঘ পথচলায় বিশ্বকাপ হয়ে উঠেছে ক্রীড়া জগতের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ মঞ্চ। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে ২০২৬ সালে অনুষ্ঠিত হচ্ছে এর ২৩তম আসর।

বাংলা৭১নিউজ/জেএস

Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ

১৯৩০ সালের এই ‍দিনে শুরু হয়েছিল বিশ্বকাপ ফুটবলের যাত্রা

আপডেট সময় ০১:৩০:১০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬

নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে ১৯৩০ সালের ১৩ জুলাই ফুটবল বিশ্বকাপের প্রথম আসর বসেছিল দক্ষিণ আমেরিকার দেশ উরুগুয়েতে। অলিম্পিক ফেডারেশনের বাধা এবং ইংল্যান্ডের বিরোধিতার পরও জুলে রিমের চেষ্টায় এই প্রতিযোগিতার আয়োজন সফল হয়। আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দেওয়ার সমস্যার কারণে ইউরোপের অনেক দেশ এতে অংশ নিতে চায়নি। পরে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর সব খরচ উরুগুয়ে বহন করতে রাজি হলে তারা স্বাগতিক হওয়ার মর্যাদা পায়। সে বছরটি ছিল উরুগুয়ের স্বাধীনতার শততম বার্ষিকী। রাজধানী মন্তিভিদিওর তিনটি মাঠে সেবার খেলা হয়েছিল। তখন হয়তো কেউ কল্পনাও করেনি, এই প্রতিযোগিতা একদিন বিশ্বের সবচেয়ে বেশি দর্শকপ্রিয় ক্রীড়া আসরে পরিণত হবে।

প্রথম এই বিশ্বমঞ্চে মোট ১৩টি দেশ অংশ নেয়। এর মধ্যে ইউরোপের চারটি দেশ ছিল বেলজিয়াম, ফ্রান্স, রোমানিয়া ও যুগোস্লাভিয়া। লাতিন আমেরিকার ছিল সাতটি দল। সেগুলো হলো আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, বলিভিয়া, চিলি, প্যারাগুয়ে, পেরু ও উরুগুয়ে। বাকি দুটি দল ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকো। ১৮ দিনব্যাপী এই আসর ১৩ জুলাই শুরু হয়ে শেষ হয় ৩০ জুলাই। ১৩টি দলকে চার ভাগে ভাগ করে মোট ১৮টি ম্যাচ খেলা হয়।

বিশ্বকাপের ধারণা জন্ম নেয় বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে। সে সময় আন্তর্জাতিক ফুটবলের সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতা ছিল অলিম্পিক গেমস। কিন্তু ফুটবলের জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়তে থাকায় আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থা (ফিফা) একটি স্বতন্ত্র বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা আয়োজনের পরিকল্পনা করে। ফিফার তৎকালীন সভাপতি জুলে রিমের উদ্যোগে ১৯২৮ সালে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, প্রতি চার বছর অন্তর বিশ্বের সেরা ফুটবল দল নির্ধারণে একটি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট আয়োজন করা হবে।

ফ্রান্স ও মেক্সিকোর ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপের যাত্রা শুরু হয়। উদ্বোধনী ম্যাচে ফ্রান্স ৪ থেকে ১ গোলে জয় পায়। এই উদ্বোধনী ম্যাচটি মাঠে বসে উপভোগ করেছিলেন ৪ হাজার ৪৪৪ জন দর্শক। গ্রুপ পর্বের বাধা পেরিয়ে সেমিফাইনালে উঠেছিল আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুগোস্লাভিয়া। প্রথম সেমিফাইনালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ৬ থেকে ১ গোলে হারিয়ে ফাইনালে ওঠে আর্জেন্টিনা। দ্বিতীয় সেমিফাইনালে যুগোস্লাভিয়াকে একই ব্যবধানে হারিয়ে ফাইনালে যায় উরুগুয়ে।

৩০ জুলাই মন্তিভিদিওর সেন্তেনারিও স্টেডিয়ামে প্রথম ফাইনাল খেলা হয়। ৬৮ হাজার ৩৪৬ জন দর্শক মাঠে বসে ফাইনাল ম্যাচটি দেখেন। ম্যাচে উরুগুয়ে প্রথমে এগিয়ে গেলেও প্রথমার্ধে ২ থেকে ১ ব্যবধানে লিড নেয় আর্জেন্টিনা। তবে বিরতির পর উরুগুয়ে আরও তিনটি গোল দিয়ে ৪ থেকে ২ ব্যবধানে ম্যাচ জিতে প্রথম বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে এবং আর্জেন্টিনা রানার্স-আপ হয়। প্রথম বিশ্বকাপের কোনো তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ ছিল না। তবে গ্রুপ পর্বের ফলাফল বিবেচনা করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে তৃতীয় স্থান দেওয়া হয়। এই আসরে মোট ৭০টি গোল হয়। বিশ্বকাপের ইতিহাসের প্রথম হ্যাটট্রিক করেন যুক্তরাষ্ট্রের বার্ট প্যাটেনোড।

আসরে খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত নৈপুণ্যও আলাদাভাবে নজর কেড়েছিল। টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে গোল্ডেন বল লাভ করেন উরুগুয়ের হোসে নাসাজ্জি। সবচেয়ে বেশি আটটি গোল করে সেরা গোলদাতার পুরস্কার তথা গোল্ডেন বুট জিতে নেন আর্জেন্টিনার গুইলের্মো স্তাবিল। এ ছাড়া, চমৎকার গোলরক্ষণের স্বীকৃতিস্বরূপ সেরা গোলরক্ষকের পুরস্কার গোল্ডেন গ্লাভস পান উরুগুয়ের এনরিকে বালেস্ত্রেরো।

প্রথম বিশ্বকাপের পর ১৯৩৪ ও ১৯৩৮ সালে ইতালি টানা দুটি শিরোপা জিতে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে ১৯৪২ ও ১৯৪৬ সালের বিশ্বকাপ আয়োজন সম্ভব হয়নি। যুদ্ধ শেষে ১৯৫০ সালে ব্রাজিলে আবারও ফিরে আসে বিশ্বকাপ। ১৯৫০ সালের সেই বিশ্বকাপ ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম নাটকীয় অধ্যায়। রিও ডি জেনিরোর মারাকানা স্টেডিয়ামে প্রায় দুই লাখ দর্শকের সামনে শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে স্বাগতিক ব্রাজিলকে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয় উরুগুয়ে। ইতিহাসে এই ঘটনাটি ‘মারাকানাজো’ নামে পরিচিত।

বিশ্বকাপের প্রায় শতবর্ষের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত ২২টি আসর অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র আটটি দেশ শিরোপা জিততে পেরেছে। এর মধ্যে পাঁচবার শিরোপা জিতে ইতিহাসের সবচেয়ে সফল দল ব্রাজিল। ১৯৫৮ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে পেলের আবির্ভাব বিশ্ব ফুটবলের গতিপথ বদলে দেয়। তার নেতৃত্বে ব্রাজিল ১৯৫৮, ১৯৬২ ও ১৯৭০ সালে বিশ্বকাপ জেতে। পরবর্তীতে ১৯৯৪ ও ২০০২ সালেও শিরোপা জেতে তারা। এখন পর্যন্ত আর কোনো দেশ পাঁচবার বিশ্বকাপ জিততে পারেনি।

ব্রাজিলের পর সবচেয়ে সফল দেশ জার্মানি ও ইতালি। দুই দেশই চারবার করে বিশ্বকাপ জিতেছে। জার্মানির শিরোপাগুলো আসে ১৯৫৪, ১৯৭৪, ১৯৯০ ও ২০১৪ সালে। অন্যদিকে ইতালি চ্যাম্পিয়ন হয় ১৯৩৪, ১৯৩৮, ১৯৮২ ও ২০০৬ সালে। আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জিতেছে তিনবার। ১৯৭৮ সালে নিজেদের মাটিতে প্রথমবারের মতো শিরোপা জয়ের স্বাদ পায় তারা। এরপর ১৯৮৬ সালে দিয়েগো ম্যারাডোনার নেতৃত্বে দ্বিতীয় শিরোপা আসে। দীর্ঘ ৩৬ বছরের অপেক্ষার পর ২০২২ সালে লিওনেল মেসির নেতৃত্বে তৃতীয়বারের মতো বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয় আর্জেন্টিনা।

এ ছাড়া, ফ্রান্স ১৯৯৮ সালে নিজেদের দেশে প্রথমবার শিরোপা জয়ের পর ২০১৮ সালে দ্বিতীয়বার বিশ্বসেরা হয়। ইংল্যান্ডের একমাত্র বিশ্বকাপ আসে ১৯৬৬ সালে, আর স্পেন চ্যাম্পিয়ন হয় ২০১০ সালে। এই পথচলায় পেলে, ম্যারাডোনা, জিনেদিন জিদান, রোনালদো, রোনালদিনিও, মিরোস্লাভ ক্লোসে, আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা, কিলিয়ান এমবাপ্পে ও লিওনেল মেসির মতো তারকারা এই মঞ্চকে মহিমান্বিত করেছেন।

বিশ্বকাপের পথচলায় সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন এসেছে অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যায়। প্রথম আসরে ১৩টি দল খেললেও পরে সেই সংখ্যা ১৬, ২৪ ও ৩২ এ উন্নীত হয়। ১৯৯৮ সাল থেকে ২০২২ পর্যন্ত ৩২ দলের বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে ২০২৬ সালে শুরু হয়েছে নতুন যুগ। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে এবারের বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো অংশ নিচ্ছে ৪৮টি দল।

১৯৩০ সালে ছোট পরিসরে যাত্রা শুরু করা বিশ্বকাপ এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া উৎসবে পরিণত হয়েছে। যুদ্ধ, রাজনৈতিক সংকট, কিংবদন্তির উত্থান-পতন, অশ্রু ও আনন্দ; সবকিছুর সাক্ষী এই টুর্নামেন্ট। ২০২৬ সালে ২৩তম আসরের হাত ধরে ফুটবলের এই মহাকাব্যে যোগ হয়েছে নতুন এক অধ্যায়। আর বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি দর্শক মেতে উঠেছে নতুন ফুটবল সম্রাটকে বরণ করে নেওয়ার উল্লাসে।

ফুটবল বিশ্বকাপ বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রীড়া উৎসব। প্রতি চার বছর পরপর এই আসরকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে তুমুল উন্মাদনা ও আবেগের সৃষ্টি হয়। বিশ্বের নানা প্রান্তের কোটি কোটি মানুষ নিজেদের প্রিয় দলের সাফল্য দেখার জন্য অপেক্ষা করেন। প্রায় এক শতাব্দীর দীর্ঘ পথচলায় বিশ্বকাপ হয়ে উঠেছে ক্রীড়া জগতের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ মঞ্চ। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে ২০২৬ সালে অনুষ্ঠিত হচ্ছে এর ২৩তম আসর।

বাংলা৭১নিউজ/জেএস