ঢাকা ০২:৪৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬, ২৮ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জন্মদিনে ওলে সোয়েনকা: শিকল ভাঙা সাহিত্যের এক অবিনাশী কণ্ঠস্বর

ওলে সোয়েনকা (Wole Soyinka) । ১৯৩৪ সালের ১৩ জুলাই নাইজেরিয়ায় জন্ম। একজন কৃষ্ণাঙ্গ সাহিত্যিক। সাহিত্যে তিনি যেমন ছিলেন শব্দের কারিগর, তেমনি শোষণের বিরুদ্ধে ছিলেন এক জীবন্ত কণ্ঠস্বর। তাঁর সাহিত্যকর্ম বিশ্বমঞ্চে আফ্রিকার ঐতিহ্যকে তুলে ধরেছে। আর মানবাধিকার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁর আজীবন লড়াই তাঁকে পরিণত করেছে এক কিংবদন্তিতে। তিনি  ১৯৮৬ সালে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকান হিসেবে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।  আজ ১৩ জুলাই, এই মহান লেখকের ৯২তম জন্মবার্ষিকী। 

জন্ম ও শৈশব

ওলে সোয়েনকা তৎকালীন ব্রিটিশ উপনিবেশভুক্ত নাইজেরিয়ার আবেওকুটা শহরের একটি ইয়োরুবা  পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা স্যামুয়েল আয়োদেলে সোয়েনকা ছিলেন একজন স্কুলপ্রধান এবং মা গ্রেস এনিওলা সোয়েনকা ছিলেন একজন ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক কর্মী।

পারিবারিক আবহে একদিকে যেমন ছিল খ্রিস্টীয় সংস্কৃতির প্রভাব, অন্যদিকে ছিল ইয়োরুবা অঞ্চলের স্থানীয় ঐতিহ্য ও মিথলজি। এই দুই সংস্কৃতির মিশ্রণ সোয়েনকার শৈশবকে দারুণভাবে প্রভাবিত করে, যা পরবর্তীতে তাঁর সাহিত্যকর্মেও গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

শিক্ষাজীবন 

আবেওকুটা ও ইবাদানের স্থানীয় স্কুলে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করে সোয়েনকা ১৯৫২ সালে ইউনিভার্সিটি কলেজ ইবাদানে ভর্তি হন। পরবর্তীতে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাজ্যে যান এবং লিডস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন।

যুক্তরাজ্যে থাকাকালীনই তিনি লন্ডনের ‘রয়্যাল কোর্ট থিয়েটার’-এ নাট্যকার হিসেবে কাজ শুরু করেন। ১৯৬০ সালে নাইজেরিয়া স্বাধীনতা লাভ করলে তিনি দেশে ফিরে আসেন এবং নিজস্ব নাট্যদল গঠন করে আফ্রিকান থিয়েটারকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান।

নির্বাসনের দিনগুলো

ওলে সোয়েনকার জীবন কেবল নাটক বা কবিতার পাতায় সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা ছিল রাজপথের সংগ্রামের গল্প। ১৯৬৭ সালে নাইজেরিয়ার গৃহযুদ্ধ (বিয়াফ্রান যুদ্ধ) চলাকালীন তিনি শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন এবং সরকারের কঠোর সমালোচনা করেন। ফলস্বরূপ, তৎকালীন সামরিক সরকার তাঁকে গ্রেফতার করে। কোনো আনুষ্ঠানিক বিচার ছাড়াই দীর্ঘ ২২ মাস তাঁকে নির্জন কারাকক্ষে বন্দী করে রাখা হয়।

কারাগারের সেই দুঃসহ দিনগুলোতে কাগজের অভাবে সিগারেটের প্যাকেট ও টয়লেট পেপারে গোপনে কবিতা লিখতেন সোয়েনকা, যা পরবর্তীতে তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘দ্য ম্যান ডাইড’ (The Man Died) হিসেবে প্রকাশিত হয়। ১৯৯০-এর দশকে নাইজেরিয়ার স্বৈরশাসক সানি আবাকার নিষ্ঠুর শাসনের বিরুদ্ধে সোয়েনকা তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। প্রাণনাশের হুমকির মুখে ১৯৯৪ সালে তিনি পায়ে হেঁটে সীমান্ত পার হয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন এবং দীর্ঘদিন নির্বাসিত জীবন কাটান।

পারিবারিক জীবন

ব্যক্তিগত জীবনে ওলে সোয়েনকা তিনবার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁর প্রথম স্ত্রী ছিলেন ব্রিটিশ লেখক মাল্টি ল্যাথ্রপ, দ্বিতীয় স্ত্রী ওলাউইন সিগিল্ড এবং পরবর্তীতে তিনি ফোলাকে বিয়ে করেন। তিনি বেশ কয়েকজন সন্তানের জনক। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নির্বাসনের কারণে তাঁর পারিবারিক জীবনে বহু ঝড়-ঝাপটা গেছে, তবে স্বদেশের প্রতি তাঁর টান ও পরিবারের সমর্থন তাঁকে সবসময় শক্তি জুগিয়েছে।

ওলে সোয়েনকার সাহিত্য

ওলে সোয়েনকার সাহিত্য এবং রাজনৈতিক দর্শনের মূল ভিত্তিই ছিল- অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরব না থাকা এবং মানুষের স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলা। তাঁর লেখার এমন কিছু স্মরণীয় উক্তি নিচে তুলে ধরা হলো-

“The man dies in all who keep silent in the face of tyranny.”

(স্বৈরাচারের মুখে যারা নীরব থাকে, তাদের ভেতরের মানুষটি মরে যায়।)

‘দ্য ম্যান ডাইড’ (কারাগারের ডায়েরি)

প্রেক্ষাপট: এটি সোয়েনকার সবচেয়ে বিখ্যাত উক্তি। নাইজেরিয়ার গৃহযুদ্ধের সময় যখন চারপাশের মানুষ ভয়ে চুপ ছিল, তখন তিনি এই বার্তা দিয়েছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, অন্যায় দেখে চুপ থাকা মানেই নিজের বিবেককে হত্যা করা। তাঁর এই আপসহীন অবস্থানের কারণেই সামরিক সরকার তাঁকে ২২ মাস নির্জন কারাকক্ষে বন্দী করে রেখেছিল।

“Justice is the first condition of humanity.”

(ন্যায়বিচার হলো মানবতার প্রথম শর্ত।)

প্রেক্ষাপট: শাসকেরা যখনই ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে সাধারণ মানুষের ওপর নির্যাতন চালিয়েছে, সোয়েনকা তখনই ন্যায়বিচারের দাবি তুলেছেন। তিনি স্পষ্ট করেছিলেন যে, একটি সমাজ বা রাষ্ট্রে যদি ন্যায়বিচার না থাকে, তবে সেখানে মানবতা টিকতে পারে না। তাঁর এই বক্তব্য শাসকদের ক্ষমতার ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল।

“Books and all forms of writing are terror to those who wish to suppress the truth.”

(যারা সত্যকে দমন করতে চায়, তাদের কাছে বই এবং সব ধরণের লেখালেখি হলো এক আতঙ্কের নাম।)

প্রেক্ষাপট: কারাগারে যখন তাঁকে কলম ও কাগজ দেওয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, তখন তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে শাসকেরা মুক্ত চিন্তাকে কতটা ভয় পায়। সোয়েনকা স্যুপের কয়লা আর সিগারেটের প্যাকেটের কাগজে লিখে প্রমাণ করেছিলেন যে, শরীরকে বন্দী করা গেলেও চিন্তাকে শিকল পরানো যায় না।

“A tiger does not proclaim his tigritude, he pounces.”

(একটি বাঘকে কখনো চিৎকার করে তার ‘বাঘত্ব’ প্রমাণ করতে হয় না, সে সরাসরি শিকারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।)

প্রেক্ষাপট: ষাটের দশকে আফ্রিকান লেখকদের ‘নেগ্রিচিউড’ (কৃষ্ণাঙ্গ আত্মপরিচয় আন্দোলন) যখন তুঙ্গে, তখন সোয়েনকা এই চমৎকার রূপকটি ব্যবহার করেন। তিনি বুঝিয়েছিলেন, কৃষ্ণাঙ্গদের শ্রেষ্ঠত্ব শুধু মুখে বা তত্ত্বে প্রচার করার বিষয় নয়, বরং তা কাজে ও সৃষ্টিশীলতায় প্রমাণ করতে হবে। তাঁর এই প্রগতিশীল ও বাস্তববাদী ভাবনা অনেক রক্ষণশীল নেতার পছন্দ ছিল না।

“Power is illusion; it is a temporary lease from the absolute reality of human resilience.”

(ক্ষমতা হলো একটা মোহ; মানুষের টিকে থাকার চরম বাস্তবতার কাছ থেকে এটি সাময়িক সময়ের জন্য নেওয়া একটি ইজারা মাত্র।)

প্রেক্ষাপট: স্বৈরশাসক সানি আবাকার নিষ্ঠুর শাসনের বিরুদ্ধে সোয়েনকা যখন তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন, তখন তিনি শাসকদের মনে করিয়ে দেন যে কোনো বন্ধুক বা ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। এই ধরণের নির্ভীক বাণী তাঁকে শাসকদের প্রধান শত্রুতে পরিণত করেছিল, যার কারণে পরবর্তীতে তাঁকে দেশ ছেড়ে পালিয়ে জীবন বাঁচাতে হয়েছিল।

নোবেলপ্রাপ্তি

১৯৮৬ সালে সুইডিশ একাডেমি সোয়েনকাকে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করে। একাডেমি তাঁর মূল্যায়নে বলে-

“তিনি এক বিস্তৃত সাংস্কৃতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এবং কাব্যিক গুণসম্পন্ন নাটকের মাধ্যমে মানুষের অস্তিত্বের নাটকীয় রূপ তুলে ধরেছেন।”

বর্তমানে জীবনের শেষলগ্নে এসেও তিনি সমান সক্রিয়। জীবনের একটি বড় সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন নামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (যেমন হার্ভার্ড, ইয়েল, ও ইমোরি বিশ্ববিদ্যালয়) অধ্যাপনা করে কাটালেও, স্বৈরাচারের পতনের পর তিনি প্রিয় মাতৃভূমি নাইজেরিয়ায় ফিরে আসেন। জীবনের শেষ দিনগুলোতে তিনি লেখালেখি, তরুণ সমাজকে উদ্বুদ্ধ করা এবং বিশ্বজুড়ে মানবাধিকারের পক্ষে কথা বলা অব্যাহত রেখেছেন।

পুনশ্চ

ওলে সোয়েনকা কেবল নাইজেরিয়া বা আফ্রিকার নন, তিনি সমগ্র বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের প্রতিনিধি। ৯২ বছরে পদার্পণ করা এই কলমযোদ্ধার জন্মদিনে বিনম্র শ্রদ্ধা।

বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি

Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ

জন্মদিনে ওলে সোয়েনকা: শিকল ভাঙা সাহিত্যের এক অবিনাশী কণ্ঠস্বর

আপডেট সময় ০১:০০:১৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬

ওলে সোয়েনকা (Wole Soyinka) । ১৯৩৪ সালের ১৩ জুলাই নাইজেরিয়ায় জন্ম। একজন কৃষ্ণাঙ্গ সাহিত্যিক। সাহিত্যে তিনি যেমন ছিলেন শব্দের কারিগর, তেমনি শোষণের বিরুদ্ধে ছিলেন এক জীবন্ত কণ্ঠস্বর। তাঁর সাহিত্যকর্ম বিশ্বমঞ্চে আফ্রিকার ঐতিহ্যকে তুলে ধরেছে। আর মানবাধিকার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁর আজীবন লড়াই তাঁকে পরিণত করেছে এক কিংবদন্তিতে। তিনি  ১৯৮৬ সালে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকান হিসেবে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।  আজ ১৩ জুলাই, এই মহান লেখকের ৯২তম জন্মবার্ষিকী। 

জন্ম ও শৈশব

ওলে সোয়েনকা তৎকালীন ব্রিটিশ উপনিবেশভুক্ত নাইজেরিয়ার আবেওকুটা শহরের একটি ইয়োরুবা  পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা স্যামুয়েল আয়োদেলে সোয়েনকা ছিলেন একজন স্কুলপ্রধান এবং মা গ্রেস এনিওলা সোয়েনকা ছিলেন একজন ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক কর্মী।

পারিবারিক আবহে একদিকে যেমন ছিল খ্রিস্টীয় সংস্কৃতির প্রভাব, অন্যদিকে ছিল ইয়োরুবা অঞ্চলের স্থানীয় ঐতিহ্য ও মিথলজি। এই দুই সংস্কৃতির মিশ্রণ সোয়েনকার শৈশবকে দারুণভাবে প্রভাবিত করে, যা পরবর্তীতে তাঁর সাহিত্যকর্মেও গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

শিক্ষাজীবন 

আবেওকুটা ও ইবাদানের স্থানীয় স্কুলে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করে সোয়েনকা ১৯৫২ সালে ইউনিভার্সিটি কলেজ ইবাদানে ভর্তি হন। পরবর্তীতে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাজ্যে যান এবং লিডস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন।

যুক্তরাজ্যে থাকাকালীনই তিনি লন্ডনের ‘রয়্যাল কোর্ট থিয়েটার’-এ নাট্যকার হিসেবে কাজ শুরু করেন। ১৯৬০ সালে নাইজেরিয়া স্বাধীনতা লাভ করলে তিনি দেশে ফিরে আসেন এবং নিজস্ব নাট্যদল গঠন করে আফ্রিকান থিয়েটারকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান।

নির্বাসনের দিনগুলো

ওলে সোয়েনকার জীবন কেবল নাটক বা কবিতার পাতায় সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা ছিল রাজপথের সংগ্রামের গল্প। ১৯৬৭ সালে নাইজেরিয়ার গৃহযুদ্ধ (বিয়াফ্রান যুদ্ধ) চলাকালীন তিনি শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন এবং সরকারের কঠোর সমালোচনা করেন। ফলস্বরূপ, তৎকালীন সামরিক সরকার তাঁকে গ্রেফতার করে। কোনো আনুষ্ঠানিক বিচার ছাড়াই দীর্ঘ ২২ মাস তাঁকে নির্জন কারাকক্ষে বন্দী করে রাখা হয়।

কারাগারের সেই দুঃসহ দিনগুলোতে কাগজের অভাবে সিগারেটের প্যাকেট ও টয়লেট পেপারে গোপনে কবিতা লিখতেন সোয়েনকা, যা পরবর্তীতে তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘দ্য ম্যান ডাইড’ (The Man Died) হিসেবে প্রকাশিত হয়। ১৯৯০-এর দশকে নাইজেরিয়ার স্বৈরশাসক সানি আবাকার নিষ্ঠুর শাসনের বিরুদ্ধে সোয়েনকা তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। প্রাণনাশের হুমকির মুখে ১৯৯৪ সালে তিনি পায়ে হেঁটে সীমান্ত পার হয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন এবং দীর্ঘদিন নির্বাসিত জীবন কাটান।

পারিবারিক জীবন

ব্যক্তিগত জীবনে ওলে সোয়েনকা তিনবার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁর প্রথম স্ত্রী ছিলেন ব্রিটিশ লেখক মাল্টি ল্যাথ্রপ, দ্বিতীয় স্ত্রী ওলাউইন সিগিল্ড এবং পরবর্তীতে তিনি ফোলাকে বিয়ে করেন। তিনি বেশ কয়েকজন সন্তানের জনক। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নির্বাসনের কারণে তাঁর পারিবারিক জীবনে বহু ঝড়-ঝাপটা গেছে, তবে স্বদেশের প্রতি তাঁর টান ও পরিবারের সমর্থন তাঁকে সবসময় শক্তি জুগিয়েছে।

ওলে সোয়েনকার সাহিত্য

ওলে সোয়েনকার সাহিত্য এবং রাজনৈতিক দর্শনের মূল ভিত্তিই ছিল- অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরব না থাকা এবং মানুষের স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলা। তাঁর লেখার এমন কিছু স্মরণীয় উক্তি নিচে তুলে ধরা হলো-

“The man dies in all who keep silent in the face of tyranny.”

(স্বৈরাচারের মুখে যারা নীরব থাকে, তাদের ভেতরের মানুষটি মরে যায়।)

‘দ্য ম্যান ডাইড’ (কারাগারের ডায়েরি)

প্রেক্ষাপট: এটি সোয়েনকার সবচেয়ে বিখ্যাত উক্তি। নাইজেরিয়ার গৃহযুদ্ধের সময় যখন চারপাশের মানুষ ভয়ে চুপ ছিল, তখন তিনি এই বার্তা দিয়েছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, অন্যায় দেখে চুপ থাকা মানেই নিজের বিবেককে হত্যা করা। তাঁর এই আপসহীন অবস্থানের কারণেই সামরিক সরকার তাঁকে ২২ মাস নির্জন কারাকক্ষে বন্দী করে রেখেছিল।

“Justice is the first condition of humanity.”

(ন্যায়বিচার হলো মানবতার প্রথম শর্ত।)

প্রেক্ষাপট: শাসকেরা যখনই ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে সাধারণ মানুষের ওপর নির্যাতন চালিয়েছে, সোয়েনকা তখনই ন্যায়বিচারের দাবি তুলেছেন। তিনি স্পষ্ট করেছিলেন যে, একটি সমাজ বা রাষ্ট্রে যদি ন্যায়বিচার না থাকে, তবে সেখানে মানবতা টিকতে পারে না। তাঁর এই বক্তব্য শাসকদের ক্ষমতার ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল।

“Books and all forms of writing are terror to those who wish to suppress the truth.”

(যারা সত্যকে দমন করতে চায়, তাদের কাছে বই এবং সব ধরণের লেখালেখি হলো এক আতঙ্কের নাম।)

প্রেক্ষাপট: কারাগারে যখন তাঁকে কলম ও কাগজ দেওয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, তখন তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে শাসকেরা মুক্ত চিন্তাকে কতটা ভয় পায়। সোয়েনকা স্যুপের কয়লা আর সিগারেটের প্যাকেটের কাগজে লিখে প্রমাণ করেছিলেন যে, শরীরকে বন্দী করা গেলেও চিন্তাকে শিকল পরানো যায় না।

“A tiger does not proclaim his tigritude, he pounces.”

(একটি বাঘকে কখনো চিৎকার করে তার ‘বাঘত্ব’ প্রমাণ করতে হয় না, সে সরাসরি শিকারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।)

প্রেক্ষাপট: ষাটের দশকে আফ্রিকান লেখকদের ‘নেগ্রিচিউড’ (কৃষ্ণাঙ্গ আত্মপরিচয় আন্দোলন) যখন তুঙ্গে, তখন সোয়েনকা এই চমৎকার রূপকটি ব্যবহার করেন। তিনি বুঝিয়েছিলেন, কৃষ্ণাঙ্গদের শ্রেষ্ঠত্ব শুধু মুখে বা তত্ত্বে প্রচার করার বিষয় নয়, বরং তা কাজে ও সৃষ্টিশীলতায় প্রমাণ করতে হবে। তাঁর এই প্রগতিশীল ও বাস্তববাদী ভাবনা অনেক রক্ষণশীল নেতার পছন্দ ছিল না।

“Power is illusion; it is a temporary lease from the absolute reality of human resilience.”

(ক্ষমতা হলো একটা মোহ; মানুষের টিকে থাকার চরম বাস্তবতার কাছ থেকে এটি সাময়িক সময়ের জন্য নেওয়া একটি ইজারা মাত্র।)

প্রেক্ষাপট: স্বৈরশাসক সানি আবাকার নিষ্ঠুর শাসনের বিরুদ্ধে সোয়েনকা যখন তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন, তখন তিনি শাসকদের মনে করিয়ে দেন যে কোনো বন্ধুক বা ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। এই ধরণের নির্ভীক বাণী তাঁকে শাসকদের প্রধান শত্রুতে পরিণত করেছিল, যার কারণে পরবর্তীতে তাঁকে দেশ ছেড়ে পালিয়ে জীবন বাঁচাতে হয়েছিল।

নোবেলপ্রাপ্তি

১৯৮৬ সালে সুইডিশ একাডেমি সোয়েনকাকে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করে। একাডেমি তাঁর মূল্যায়নে বলে-

“তিনি এক বিস্তৃত সাংস্কৃতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এবং কাব্যিক গুণসম্পন্ন নাটকের মাধ্যমে মানুষের অস্তিত্বের নাটকীয় রূপ তুলে ধরেছেন।”

বর্তমানে জীবনের শেষলগ্নে এসেও তিনি সমান সক্রিয়। জীবনের একটি বড় সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন নামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (যেমন হার্ভার্ড, ইয়েল, ও ইমোরি বিশ্ববিদ্যালয়) অধ্যাপনা করে কাটালেও, স্বৈরাচারের পতনের পর তিনি প্রিয় মাতৃভূমি নাইজেরিয়ায় ফিরে আসেন। জীবনের শেষ দিনগুলোতে তিনি লেখালেখি, তরুণ সমাজকে উদ্বুদ্ধ করা এবং বিশ্বজুড়ে মানবাধিকারের পক্ষে কথা বলা অব্যাহত রেখেছেন।

পুনশ্চ

ওলে সোয়েনকা কেবল নাইজেরিয়া বা আফ্রিকার নন, তিনি সমগ্র বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের প্রতিনিধি। ৯২ বছরে পদার্পণ করা এই কলমযোদ্ধার জন্মদিনে বিনম্র শ্রদ্ধা।

বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি