উচ্চমূল্যের বাজারে যখন প্রতিদিনের চাল-ডাল আর সন্তানের স্কুলের খরচ মেটাতেই নাভিশ্বাস উঠছে দেশের সিংহভাগ মানুষের, তখন ‘সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ছে’- এমন একটি খবর সাধারণ নাগরিকদের মনে স্বস্তির চেয়ে বেশি তৈরি করছে এক অজানা আতঙ্ক। ঢাকার মুগদা এলাকায় বাস করেন জামাল উদ্দীন। রিক্সা শ্রমিক। স্ত্রী ফাতেমা বেগম গার্মেন্ট কর্মী। সংসারে তিন সন্তান ছাড়াও বয়স্ক বাবা-মা। তার চিন্তা সরকারি লোকজনের বেতন বাড়লে তাদের কি হবে? তার মতো কোটি কোটি বেসরকারি খাতের শ্রমজীবী, কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সবার কপালে চিন্তার ভাঁজ।
দেশের ৯৫ শতাংশ কর্মজীবী মানুষের একটাই আকুতি, ‘আমাদের আয় তো বাড়ছে না, তবে আমরা বাঁচব কীভাবে?’ পরিস্থিতি যখন এই জায়গায়, সেখানে সরকারি কর্মজীবীরা নতুন পে-স্কেলের দাবিতে প্রয়োজনে রাস্তায় নামার পরিকল্পনাও এঁটেছে। পে-স্কেল বাস্তবায়ন কমিটিতে যারা থাকেন তারাও সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা। তারাও চাচ্ছেন এই পে-স্কেল বাস্তায়ন হোক। আবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও আশ্বাস দিয়েছেন তাদের পে-স্কেল বাস্তবায়ন করবেন। কিন্ত এটা বাস্তবায়নে যে বিপুল পরিমান অর্থের প্রয়োজন তার যোগান কে দেবেন?
একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের বেতন বাড়ানো অত্যন্ত যৌক্তিক এবং সময়ের দাবি। বিগত ১১ বছর ধরে বড় কোনো বেতন কাঠামো না আসায় সাড়ে ১৪ লাখের বেশি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংসার চালাতেও কষ্ট হচ্ছিল। কিন্তু এই মুদ্রাস্ফীতির বাজারে এই সিদ্ধান্তটি সাধারণ মানুষের জীবনের ওপর কী প্রভাব ফেলবে, তা অত্যন্ত মানবিক ও সংবেদনশীলতার সাথে বিবেচনা করা জরুরি।
বাজারের মনস্তত্ত্ব ও সাধারণ মানুষের ‘ঘাম’
অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির খবর বাজারে আসার সাথে সাথেই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আরও এক দফা বাড়িয়ে দেওয়ার একটি অশুভ প্রতিযোগিতা শুরু হয়। অথচ দেশের প্রায় ৭ কোটি বেসরকারি খাতের শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের বেতন এক টাকাও বাড়ছে না। বরং দ্রব্যমূল্যের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, শিল্প-কারখানায় বেতন বকেয়া, অসংখ্য শ্রমিকের বেকারত্ব ও প্রতিষ্ঠাণ বন্ধ হয়ে যাওয়ার বিরূপ প্রভাবে এমনিতেই তারা নাকাল। পে-স্কেল বাস্তবায়ন হলে সরকারি চাকরিজীবীদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে- ্বএটা ঠিক। তবে একই বাজারের আগুনে পুড়তে হবে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত বিশাল এক জনগোষ্ঠীকে। যদি এখনই অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট এবং কৃত্রিম সংকট কঠোর হস্তে দমন করা না যায়, তবে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ও ভোগান্তি মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
বৈষম্য ও দারিদ্র্য বৃদ্ধির শঙ্কা
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২২ সালে দেশে যেখানে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮.৭ শতাংশ, ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১.৪ শতাংশে। সরকারি ও বেসরকারি খাতের আয়ের এই বিশাল ব্যবধান সমাজে এক ধরনের তীব্র অর্থনৈতিক বৈষম্য তৈরি করছে। অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং বেসরকারি খাতের আয়ের সমন্বয় না করা হলে এই দারিদ্র্যের হার আরও জ্যামিতিক হারে বাড়তে পারে।
সরকারের ‘ধাপে ধাপে’ বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত
তবে আশার কথা হলো, চলমান অর্থনৈতিক সংকট এবং সাধারণ মানুষের এই উদ্বেগের বিষয়টি অনুধাবন করতে পেরেছে বর্তমান সরকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এবং অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, নতুন পে-স্কেল একবারে চাপিয়ে না দিয়ে ২০২৬ সালের পহেলা জুলাই থেকে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম দুই অর্থবছরে কেবল মূল বেতন বা বেসিক ৫০ শতাংশ করে বাড়ানো হবে এবং পরবর্তী সময়ে ভাতাগুলো কার্যকর করা হবে। সরকারের এই ‘ধাপে ধাপে’ এগোনোর কৌশল যদি সফল হয়, তবে বাজারে এককালীন বড় কোনো ধাক্কা লাগবে না এবং তারল্য সংকট বা মুদ্রাস্ফীতির চাপ কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।
সাধারণ মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত হোক
নতুন পে-স্কেল যেন কোনোভাবেই সাধারণ মানুষের যন্ত্রণার কারণ না হয়, সেজন্য সরকারকে অবিলম্বে কিছু সুরক্ষামূলক পদক্ষেপ নিতে হবে। পে-স্কেলের অজুহাতে যেন কোনো ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে না পারে, তার জন্য টিসিবি-এর মাধ্যমে ওএমএস কার্যক্রম আরও জোরদার করতে হবে। প্রয়োজনে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য রেশন কার্ড ও সামাজিক সুরক্ষা ভাতার আওতা আরও বাড়াতে হবে, যেন বাজারের এই ঊর্ধ্বগতি তারা সামাল দিতে পারেন।
সরকারি ভাষ্য
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেছেন– ‘ইশতাহারে বলা হয়েছে যে যথাসময়ে বাস্তবায়ন করা হবে এবং সেই অনুযায়ীই একটা রিভিউ করা হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা কয়েকটা ধাপে পে-স্কেল বাস্তবায়ন করবো, প্রথমেই বেতন বা বেসিকটা বাড়ানো হবে।’
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সংসদে দেওয়া তার বাজেট বক্তব্যে বলেছেন, ‘সরকারি কর্মচারীরা বিগত প্রায় ১১ বছর যাবৎ একই বেতন কাঠামোতে বেতন-ভাতা পাচ্ছেন। ইতোমধ্যে মূল্যস্ফীতিজনিত কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। আমরা সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো আগামী পহেলা জুলাই ২০২৬ হতে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করার ঘোষণা দিচ্ছি।’
পরিশেষ
একটি রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্যই হলো তার প্রতিটি নাগরিকের অন্ন, বস্ত্র ও বাসস্থানের নিশ্চয়তা দেওয়া। সরকারি কর্মচারীদের মুখে যেমন হাসি ফোটানো রাষ্ট্রের দায়িত্ব, ঠিক তেমনি ঢাকার মুগদা এলাকার রিক্সা শ্রমিক জামাল উদ্দীন ও তার স্ত্রী গার্মেন্ট কর্মী ফাতেমা বেগম এর মতো কোটি কোটি সাধারণ মানুষের থালায় যেন দু’মুঠো অন্ন নিশ্চিত থাকে- সেটি দেখাও রাষ্ট্রের পরম কর্তব্য। সরকারি সিদ্ধান্তের এই রূপান্তর যেন দেশের প্রতিটি সাধারণ মানুষের জন্য কল্যাণ ও স্বস্তি বয়ে আনে, এটাই হোক মানবিক বাংলাদেশের মূল প্রতিপাদ্য।
বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি





















