ঢাকা ০৮:২৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬, ২৫ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
কাপড়ের ভাঁজে আধুনিকতার সেলাই

ইলিয়াস হাউ এবং একটি বিপ্লবের গল্প

আজ ৯ই জুলাই। ১৮১৯ সালে আজকের এই দিনে আমেরিকার ম্যাসাচুসেটসে জন্ম নিয়েছিলেন এমন এক ব্যক্তি, যার হাত ধরে মানুষের পোশাক পরিধানের এবং তৈরির ইতিহাস চিরতরে বদলে গিয়েছিল। তিনি ইলিয়াস হাউ (Elias Howe)। আধুনিক ‘লকস্টিচ’ সেলাই মেশিনের আবিষ্কারক। আজ তার জন্মবার্ষিকীতে কাপড়ের প্রতিটি সুক্ষ্ম সেলাইয়ে মিশে থাকা এই মহান উদ্ভাবকের জীবন, তীব্র সংগ্রাম, ব্যর্থতা ও চূড়ান্ত সাফল্যের খতিয়ান নিয়েই এই প্রতিবেদন।

শুরুর জীবন ও অভাবের তাড়না

ইলিয়াস হাউ-এর শৈশব ও প্রথম জীবন কেটেছে ম্যাসাচুসেটসের এক সাধারণ খামারে। ছোটবেলা থেকেই তিনি শারীরিক ও শারীরবৃত্তীয় নানা সমস্যায় ভুগতেন, যার ফলে কঠোর পরিশ্রমের কাজ করা তার পক্ষে কঠিন ছিল। ১৮৩৫ সালে তিনি একটি টেক্সটাইল কারখানায় শিক্ষানবিস হিসেবে কাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে বস্টনের এক মেকানিক শপে কাজ করার সময় তিনি প্রথম শুনতে পান- যে ব্যক্তি একটি ব্যবহারোপযোগী সেলাই মেশিন তৈরি করতে পারবে, সে বিপুল সম্পত্তির মালিক হবে। এই একটি কথাই দরিদ্র, বিবাহিত এবং তিন সন্তানের জনক ইলিয়াস হাউ-এর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

লকস্টিচ প্রযুক্তির জন্ম

হাউ-এর আগে অনেকেই সেলাই মেশিন তৈরির চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তাদের মেশিনগুলো মানুষের হাতের সেলাইকে হুবহু নকল করার চেষ্টা করায় বারবার ব্যর্থ হচ্ছিল। হাউ একদম ভিন্নভাবে চিন্তা করলেন। তিনি দুটি ভিন্ন সুতা এবং একটি চোখের মতো ছিদ্রযুক্ত সূচ (Eye-pointed needle) ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেন।

এই পদ্ধতিতে সুইটি কাপড়ের নিচে গিয়ে একটি লুপ বা ফাঁস তৈরি করে এবং নিচ থেকে একটি শাটল অন্য একটি সুতা নিয়ে সেই লুপের ভেতর দিয়ে চলে যায়। ফলে কাপড়ের দুই দিক থেকেই সেলাইটি লক বা আটকে যায়। একেই বলা হয় ‘লকস্টিচ’। ১৮৪৬ সালে তিনি এই অভিনব প্রযুক্তির পেটেন্ট লাভ করেন।

চরম ব্যর্থতা, চুরি ও আইনি লড়াইয়

পেটেন্ট পেলেই যে সাফল্য আসে না, ইলিয়াস হাউ-এর জীবন তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। তার জীবনের দীর্ঘ একটা সময় কেটেছে চরম দারিদ্র্য ও ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে:

বাজারের প্রত্যাখ্যান: হাউ-এর আবিষ্কৃত মেশিনটি ছিল অত্যন্ত দামি (প্রায় ৩০০ ডলার, যা তখনকার সময়ে বিপুল অর্থ)। তাছাড়া দর্জিরা ভয় পেয়েছিলেন যে এই মেশিন তাদের চাকরি কেড়ে নেবে। ফলে আমেরিকায় তিনি একটি মেশিনও বিক্রি করতে পারলেন না।

লন্ডনে প্রতারণা: ভাগ্যের অন্বেষণে তিনি ইংল্যান্ডে যান এবং এক করসেট নির্মাতার কাছে মাত্র ২৫০ পাউন্ডে তার মেশিনের স্বত্ব বিক্রি করে দেন। সেখানেও প্রতারিত ও চরম অর্থকষ্টে পড়ে ১৮৪৯ সালে তিনি যখন শূন্য পকেটে আমেরিকায় ফিরে আসেন, তখন তার স্ত্রী যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুশয্যায়। স্ত্রীর শেষকৃত্যে যাওয়ার মতো ভালো পোশাকও তখন চেরির ছিল না।

পেটেন্ট চুরি: আমেরিকায় ফিরে হাউ হতভম্ব হয়ে দেখেন, তার অনুপস্থিতিতে আইজ্যাক সিঙ্গার (Isaac Singer) সহ বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী তার লকস্টিচ প্রযুক্তি হুবহু চুরি করে দেদারসে সেলাই মেশিন বিক্রি করছেন এবং বিপুল মুনাফা কামাচ্ছেন।

ঘুরে দাঁড়ানো এবং চূড়ান্ত বিজয়

সব হারিয়েও ইলিয়াস হাউ দমে যাননি। বন্ধুদের কাছ থেকে টাকা ধার করে তিনি আইজ্যাক সিঙ্গারের বিরুদ্ধে আমেরিকার ইতিহাসে অন্যতম দীর্ঘ ও বিখ্যাত পেটেন্ট যুদ্ধ (Patent War) শুরু করেন। ১৮৫৪ সালে দীর্ঘ লড়াই শেষে আদালত রায় দেয়- বাজারে যত সেলাই মেশিন বিক্রি হচ্ছে, তার মূল প্রযুক্তির মালিক ইলিয়াস হাউ। আদালত আদেশ দেয়, উৎপাদিত প্রতি মেশিনের রয়্যালটি হিসেবে হাউ-কে লভ্যাংশ দিতে হবে।

রাতরাতি হাউ-এর ভাগ্য বদলে যায়। যে মানুষটি একসময় স্ত্রীর কবরে যাওয়ার কাপড় কিনতে পারতেন না, তিনি আমেরিকার অন্যতম শীর্ষ ধনীতে পরিণত হন। প্রতি সপ্তাহে তার আয় দাঁড়ায় হাজার হাজার ডলারে। ১৮৬১ সালের আমেরিকার গৃহযুদ্ধের সময় তিনি নিজের টাকায় ইউনিয়নের জন্য একটি সম্পূর্ণ সামরিক রেজিমেন্ট গঠন করে দিয়েছিলেন এবং নিজে সেখানে সাধারণ সৈনিক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন।

ইতিহাসের চিরন্তন সত্য

১৮৬৭ সালের ৩ অক্টোবর মাত্র ৪৮ বছর বয়সে এই মহান উদ্ভাবক মারা যান। কিন্তু তার রেখে যাওয়া লকস্টিচ প্রযুক্তি আজও- ১৬০ বছরেরও বেশি সময় পর বিশ্বের কোটি কোটি আধুনিক পোশাক কারখানায় এবং দর্জির দোকানে অবিরাম ব্যবহৃত হয়ে চলেছে। ইলিয়াস হাউ প্রমাণ করে গেছেন, উদ্ভাবন শুধু মেধার জোরে হয় না, তার জন্য লাগে বুকভরা ধৈর্য আর লড়াই করার অদম্য মানসিকতা।

বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি

Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ

কাপড়ের ভাঁজে আধুনিকতার সেলাই

ইলিয়াস হাউ এবং একটি বিপ্লবের গল্প

আপডেট সময় ০৭:১৬:০৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই ২০২৬

আজ ৯ই জুলাই। ১৮১৯ সালে আজকের এই দিনে আমেরিকার ম্যাসাচুসেটসে জন্ম নিয়েছিলেন এমন এক ব্যক্তি, যার হাত ধরে মানুষের পোশাক পরিধানের এবং তৈরির ইতিহাস চিরতরে বদলে গিয়েছিল। তিনি ইলিয়াস হাউ (Elias Howe)। আধুনিক ‘লকস্টিচ’ সেলাই মেশিনের আবিষ্কারক। আজ তার জন্মবার্ষিকীতে কাপড়ের প্রতিটি সুক্ষ্ম সেলাইয়ে মিশে থাকা এই মহান উদ্ভাবকের জীবন, তীব্র সংগ্রাম, ব্যর্থতা ও চূড়ান্ত সাফল্যের খতিয়ান নিয়েই এই প্রতিবেদন।

শুরুর জীবন ও অভাবের তাড়না

ইলিয়াস হাউ-এর শৈশব ও প্রথম জীবন কেটেছে ম্যাসাচুসেটসের এক সাধারণ খামারে। ছোটবেলা থেকেই তিনি শারীরিক ও শারীরবৃত্তীয় নানা সমস্যায় ভুগতেন, যার ফলে কঠোর পরিশ্রমের কাজ করা তার পক্ষে কঠিন ছিল। ১৮৩৫ সালে তিনি একটি টেক্সটাইল কারখানায় শিক্ষানবিস হিসেবে কাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে বস্টনের এক মেকানিক শপে কাজ করার সময় তিনি প্রথম শুনতে পান- যে ব্যক্তি একটি ব্যবহারোপযোগী সেলাই মেশিন তৈরি করতে পারবে, সে বিপুল সম্পত্তির মালিক হবে। এই একটি কথাই দরিদ্র, বিবাহিত এবং তিন সন্তানের জনক ইলিয়াস হাউ-এর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

লকস্টিচ প্রযুক্তির জন্ম

হাউ-এর আগে অনেকেই সেলাই মেশিন তৈরির চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তাদের মেশিনগুলো মানুষের হাতের সেলাইকে হুবহু নকল করার চেষ্টা করায় বারবার ব্যর্থ হচ্ছিল। হাউ একদম ভিন্নভাবে চিন্তা করলেন। তিনি দুটি ভিন্ন সুতা এবং একটি চোখের মতো ছিদ্রযুক্ত সূচ (Eye-pointed needle) ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেন।

এই পদ্ধতিতে সুইটি কাপড়ের নিচে গিয়ে একটি লুপ বা ফাঁস তৈরি করে এবং নিচ থেকে একটি শাটল অন্য একটি সুতা নিয়ে সেই লুপের ভেতর দিয়ে চলে যায়। ফলে কাপড়ের দুই দিক থেকেই সেলাইটি লক বা আটকে যায়। একেই বলা হয় ‘লকস্টিচ’। ১৮৪৬ সালে তিনি এই অভিনব প্রযুক্তির পেটেন্ট লাভ করেন।

চরম ব্যর্থতা, চুরি ও আইনি লড়াইয়

পেটেন্ট পেলেই যে সাফল্য আসে না, ইলিয়াস হাউ-এর জীবন তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। তার জীবনের দীর্ঘ একটা সময় কেটেছে চরম দারিদ্র্য ও ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে:

বাজারের প্রত্যাখ্যান: হাউ-এর আবিষ্কৃত মেশিনটি ছিল অত্যন্ত দামি (প্রায় ৩০০ ডলার, যা তখনকার সময়ে বিপুল অর্থ)। তাছাড়া দর্জিরা ভয় পেয়েছিলেন যে এই মেশিন তাদের চাকরি কেড়ে নেবে। ফলে আমেরিকায় তিনি একটি মেশিনও বিক্রি করতে পারলেন না।

লন্ডনে প্রতারণা: ভাগ্যের অন্বেষণে তিনি ইংল্যান্ডে যান এবং এক করসেট নির্মাতার কাছে মাত্র ২৫০ পাউন্ডে তার মেশিনের স্বত্ব বিক্রি করে দেন। সেখানেও প্রতারিত ও চরম অর্থকষ্টে পড়ে ১৮৪৯ সালে তিনি যখন শূন্য পকেটে আমেরিকায় ফিরে আসেন, তখন তার স্ত্রী যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুশয্যায়। স্ত্রীর শেষকৃত্যে যাওয়ার মতো ভালো পোশাকও তখন চেরির ছিল না।

পেটেন্ট চুরি: আমেরিকায় ফিরে হাউ হতভম্ব হয়ে দেখেন, তার অনুপস্থিতিতে আইজ্যাক সিঙ্গার (Isaac Singer) সহ বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী তার লকস্টিচ প্রযুক্তি হুবহু চুরি করে দেদারসে সেলাই মেশিন বিক্রি করছেন এবং বিপুল মুনাফা কামাচ্ছেন।

ঘুরে দাঁড়ানো এবং চূড়ান্ত বিজয়

সব হারিয়েও ইলিয়াস হাউ দমে যাননি। বন্ধুদের কাছ থেকে টাকা ধার করে তিনি আইজ্যাক সিঙ্গারের বিরুদ্ধে আমেরিকার ইতিহাসে অন্যতম দীর্ঘ ও বিখ্যাত পেটেন্ট যুদ্ধ (Patent War) শুরু করেন। ১৮৫৪ সালে দীর্ঘ লড়াই শেষে আদালত রায় দেয়- বাজারে যত সেলাই মেশিন বিক্রি হচ্ছে, তার মূল প্রযুক্তির মালিক ইলিয়াস হাউ। আদালত আদেশ দেয়, উৎপাদিত প্রতি মেশিনের রয়্যালটি হিসেবে হাউ-কে লভ্যাংশ দিতে হবে।

রাতরাতি হাউ-এর ভাগ্য বদলে যায়। যে মানুষটি একসময় স্ত্রীর কবরে যাওয়ার কাপড় কিনতে পারতেন না, তিনি আমেরিকার অন্যতম শীর্ষ ধনীতে পরিণত হন। প্রতি সপ্তাহে তার আয় দাঁড়ায় হাজার হাজার ডলারে। ১৮৬১ সালের আমেরিকার গৃহযুদ্ধের সময় তিনি নিজের টাকায় ইউনিয়নের জন্য একটি সম্পূর্ণ সামরিক রেজিমেন্ট গঠন করে দিয়েছিলেন এবং নিজে সেখানে সাধারণ সৈনিক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন।

ইতিহাসের চিরন্তন সত্য

১৮৬৭ সালের ৩ অক্টোবর মাত্র ৪৮ বছর বয়সে এই মহান উদ্ভাবক মারা যান। কিন্তু তার রেখে যাওয়া লকস্টিচ প্রযুক্তি আজও- ১৬০ বছরেরও বেশি সময় পর বিশ্বের কোটি কোটি আধুনিক পোশাক কারখানায় এবং দর্জির দোকানে অবিরাম ব্যবহৃত হয়ে চলেছে। ইলিয়াস হাউ প্রমাণ করে গেছেন, উদ্ভাবন শুধু মেধার জোরে হয় না, তার জন্য লাগে বুকভরা ধৈর্য আর লড়াই করার অদম্য মানসিকতা।

বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি