ঢাকা ০৩:৩০ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬, ৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

৬ হাজার রুপির দেনাই কি কঙ্গনার সহশিল্পীর মৃত্যুর কারণ?

মুম্বাইয়ের আন্ধেরি ওয়েস্টের একটি ফ্ল্যাটে ২০১৭ সালের ১২ জুন ২৭ বছর বয়সী অভিনেত্রী কৃতিকা চৌধুরীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। কয়েক দিন ধরে তার কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না।

ফ্ল্যাটের ভেতরে তখনও টেলিভিশন ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র চলছিল। মূল দরজায় বাইরে থেকে তালা দেওয়া ছিল।

প্রতিবেশীরা ফ্ল্যাট থেকে দুর্গন্ধ পাওয়ার পর পুলিশকে খবর দেন। পরে পুলিশ দরজা খুলে বিছানার ওপর কৃতিকার মরদেহ দেখতে পায়।

তার মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্ন ছিল। মরদেহের পাশে রক্তমাখা একটি ‘ব্রাস নাকেলস’ পাওয়া যায়। ১২ জুন বিকেল পৌনে ৪টার দিকে আন্ধেরি ওয়েস্টের শ্রী ভৈরবনাথ এসআরএ সোসাইটির বাসিন্দারা পুলিশকে খবর দেন। ভবনের পঞ্চম তলায় দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছিল।

প্রতিবেশীদের ধারণা ছিল, ৫০৩ নম্বর ফ্ল্যাট থেকেই দুর্গন্ধ আসছে। কৃতিকা ওই ফ্ল্যাটে একাই থাকতেন। প্রতিবেশীরা তাকে মাঝেমধ্যে আসা-যাওয়ার সময় দেখলেও তার ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে খুব বেশি জানতেন না। কয়েক দিন ধরে তাকে দেখা যাচ্ছিল না। তবে বন্ধ ফ্ল্যাটের ভেতর থেকে টেলিভিশনের শব্দ শোনা যাচ্ছিল।

উপপরিদর্শক শ্রীকান্ত যাদব ও তার দল ফ্ল্যাটে ঢুকে কৃতিকার মরদেহ উদ্ধার করে। তার পরনে ছিল রাতের পোশাক। মাথায় ছিল গুরুতর আঘাতের চিহ্ন। ফ্ল্যাট থেকে সন্দেহভাজন মাদক হিসেবে সাদা গুঁড়াও উদ্ধার করা হয়। বিছানার পাশে কৃতিকার মুঠোফোন পড়ে ছিল। পরিবারের সদস্যরা তখনও ফোনে তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছিলেন। কৃতিকার ভাই দীপক চৌধুরী জানান, ৮ জুন তিনি তার বোনের সঙ্গে শেষবার কথা বলেছিলেন। এরপর কৃতিকা আর তার ফোন ধরেননি।

মৃত্যুর কিছুদিন আগে কৃতিকা তার ২৭তম জন্মদিন পালন করেছিলেন। মরদেহ উদ্ধারের চার দিন আগে তার এক সাবেক বন্ধুও জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়ে বার্তা পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু সেই বার্তারও কোনো উত্তর দেননি কৃতিকা। ময়নাতদন্তে জানা যায়, মাথায় গুরুতর আঘাতের কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে। পুলিশের তদন্তে উঠে আসে, কৃতিকার মাথায় তিনবার আঘাত করা হয়েছিল। তদন্তকারীদের ধারণা, হত্যার পর সন্দেহ এড়াতে কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। হত্যাকারীরা ফ্ল্যাট থেকে বের হওয়ার সময় টেলিভিশন ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র চালু রেখে যায়। এরপর বাইরে থেকে দরজায় তালা দিয়ে চলে যায়। পুলিশের ধারণা ছিল, এতে হত্যার ঘটনা ধরা পড়তে সময় লাগবে এবং মরদেহের পচন প্রক্রিয়াও কিছুটা ধীর হতে পারে। ফ্ল্যাটে পাওয়া আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আলামত ছিল রক্তমাখা পুরুষের শার্ট। পরে এই শার্টই তদন্তে বড় সূত্র হয়ে ওঠে।

কৃতিকার বাড়ি ছিল উত্তরাখণ্ডের হরিদ্বারে। অভিনয়ের স্বপ্ন নিয়ে প্রথমে তিনি দিল্লিতে যান। সেখানে একটি মুঠোফোন নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন। পরে বিয়ে করে ২০১১ সালে মুম্বাইয়ে চলে আসেন। তবে সেই বিয়ে বেশিদিন টেকেনি। দিল্লিতে কাজ করার সময় বিজয় দ্বিবেদীর সঙ্গে কৃতিকার পরিচয় হয়। পরে তিনি জানতে পারেন, বিজয় আগে থেকেই বিবাহিত ছিলেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়, বিজয় প্রথম স্ত্রীকে তালাক দিয়ে কৃতিকাকে বিয়ে করেছিলেন। পরে কৃতিকা জানতে পারেন, বিজয় তার সঙ্গে প্রতারণা করছেন। এরপর তাদের সম্পর্ক ভেঙে যায়। পরে একটি চাঁদাবাজির মামলায় বিজয়কে গ্রেপ্তার করা হয়। কয়েকজন তারকার সঙ্গে কথিত আর্থিক প্রতারণার একটি মামলাতেও তার নাম এসেছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

কৃতিকার মৃত্যুর প্রায় ছয় মাস আগে বিজয় আবার তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন বলে জানা যায়। তিনি সম্পর্ক নতুন করে শুরু করতে চেয়েছিলেন। তবে কৃতিকা এতে রাজি হননি। ২৩ জুন পুলিশ বিজয়কে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল। তবে তদন্তের সূত্র পরে অন্যদিকে চলে যায়। বিবাহবিচ্ছেদের পর অভিনয় ও মডেলিংয়ে মন দেন কৃতিকা। তিনি ‘পরিচয়’ ও ‘সাবধান ইন্ডিয়া’সহ বিভিন্ন টেলিভিশন অনুষ্ঠানে কাজ করেন। বালাজির কয়েকটি প্রযোজনাতেও অভিনয় করেন। ২০১৩ সালের ‘রাজ্জো’ ছবিতে কঙ্গনা রানাউতের বোনের চরিত্রেও অভিনয় করেছিলেন তিনি।

কৃতিকার এক সাবেক বন্ধু দ্য কুইন্টকে জানিয়েছিলেন, তিনি মাদকাসক্তির সঙ্গে লড়াই করছিলেন। ওই বন্ধুর দাবি, কৃতিকা কয়েকবার আত্মহত্যার চেষ্টাও করেছিলেন। তার কবজিতে কেটে যাওয়ার দাগ ছিল বলেও জানান ওই বন্ধু। একবার মাদকাসক্ত অবস্থায় কৃতিকা ভবনের ছাদ থেকে লাফ দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন বলেও দাবি করা হয়। ওই সময় তার বন্ধু মুম্বাইয়ের বাইরে ছিলেন। তিনি কৃতিকার ভাইকে বিষয়টি জানিয়ে সাহায্যের জন্য পাঠান। ভাই সেখানে পৌঁছানোর সময় ভবনের নিচে অনেক মানুষ জড়ো হয়েছিল। পুলিশকেও খবর দেওয়া হয়েছিল। পরে কৃতিকার ভাই তাকে ছাদের কিনারা থেকে সরে আসতে রাজি করান এবং ফ্ল্যাটে নিয়ে যান। ঘটনাটি আবাসিক সমিতির সদস্যদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করে। পরে কৃতিকা অন্য একটি ফ্ল্যাটে চলে যান। এরপর তার ওই বন্ধুর সঙ্গে সম্পর্কও শেষ হয়ে যায়।

হত্যার আগের কয়েক দিনের ঘটনা খতিয়ে দেখতে গিয়ে পুলিশ ভবনের সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করে। সেখানে কৃতিকার সম্ভাব্য মৃত্যুর সময়ের কাছাকাছি দুই অজ্ঞাতপরিচয় পুরুষকে তার ফ্ল্যাট থেকে বের হতে দেখা যায়। এদিকে কৃতিকার ভাই পুলিশকে জানান, তার কিছু গয়না ও মূল্যবান জিনিসও পাওয়া যাচ্ছে না। ফ্ল্যাটে পাওয়া রক্তমাখা শার্টের উৎস খুঁজতে তদন্তকারীরা বিভিন্ন ব্যক্তি ও দোকানদারকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। শার্ট থেকে পাওয়া ডিএনএর নমুনাও তদন্তে ব্যবহার করা হয়। পরে তথ্যদাতাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ পানভেলে দুই সন্দেহভাজনের সন্ধান পায়। তাদের একজন নালাসোপারার বাসিন্দা শাকিল নাসিম এবং অন্যজন গোবিন্দির বাসিন্দা বাসুদেব বলে শনাক্ত করা হয়। পুলিশ তাদের খুঁজছে জানতে পেরে তারা জায়গা বদল করেছিলেন বলে অভিযোগ। প্রথমে তারা মালভানিতে লুকিয়ে ছিলেন। পরে পানভেলে চলে যান।

দুই সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তারের পর পুলিশ যে কারণের কথা জানায়, তা কৃতিকার পরিবারকে অবাক করে দেয়। পুলিশের দাবি, মাত্র ৬ হাজার রুপির পাওনা টাকা নিয়ে বিরোধের জেরে কৃতিকাকে হত্যা করা হয়েছিল। তদন্তকারীদের মতে, নাসিম মাদক বিক্রি করত। প্রায় এক বছর আগে সে কৃতিকাকে মাদক সরবরাহ করেছিল। এর বিনিময়ে কৃতিকার কাছে তার ৬ হাজার রুপি পাওনা ছিল বলে পুলিশ দাবি করে। পুলিশের ভাষ্য, কৃতিকা বারবার টাকা পরিশোধে দেরি করছিলেন। এদিকে মাদক পাচার ও গাড়ি চুরির একটি মামলায় নাসিম গ্রেপ্তার হয়েছিল। কারাগার থেকে বের হওয়ার পর তার টাকার প্রয়োজন ছিল। তাই সে কৃতিকার কাছে পাওনা টাকা আদায়ের চেষ্টা শুরু করে। কৃতিকার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে না পেরে পরিচিতদের মাধ্যমে তার ঠিকানা সংগ্রহ করে নাসিম বলে অভিযোগ পুলিশের।

প্রথমবার নাসিম কৃতিকার ফ্ল্যাটে গেলে তাকে কয়েক দিন পর আবার আসতে বলা হয়। পরে সে আবার সেখানে গেলে কৃতিকা টাকা দেওয়ার সময় আরো পিছিয়ে দেন বলে তদন্তে উঠে আসে। পুলিশের দাবি, ৮ জুন নাসিম ও বাসুদেব কৃতিকার ফ্ল্যাটে যায়। শুরুতে তাদের মধ্যে কোনো ঝামেলা ছিল না। তিনজনের মধ্যে কথা হয় এবং তারা একসঙ্গে রাতের খাবারও খান। পরে তাদের মধ্যে ঝগড়া শুরু হয়। তদন্তকারীদের অভিযোগ, একপর্যায়ে নাসিম সঙ্গে নিয়ে যাওয়া ‘ব্রাস নাকেলস’ দিয়ে কৃতিকার মাথায় আঘাত করে। তার মাথায় তিনবার আঘাত করা হয়। এতে তার মৃত্যু হয়। পুলিশ জানায়, নাসিম সঙ্গে করে অতিরিক্ত পোশাকও এনেছিল। কৃতিকার রক্ত তার শার্টে লেগে যাওয়ার পর সে শার্টটি খুলে ফ্ল্যাটে রেখে যায় বলে অভিযোগ। এরপর দুই ব্যক্তি টেলিভিশন ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র চালু করে ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে যায়। বাইরে থেকে দরজায় তালা দিয়ে তারা পালিয়ে যায় বলে পুলিশের দাবি।

তবে মাত্র ৬ হাজার রুপির জন্য কৃতিকাকে হত্যা করা হয়েছিল- পুলিশের এই ব্যাখ্যায় তার পরিবার পুরোপুরি সন্তুষ্ট ছিল না। পুলিশ কৃতিকার ফ্ল্যাট থেকে ২২ হাজার রুপি নগদ উদ্ধার করেছিল। পরে সেই টাকা পরিবারের কাছে দেওয়া হয়। কৃতিকার ভাই দীপক প্রশ্ন তোলেন, তার বোনের কাছে যখন ২২ হাজার রুপি ছিল, তখন ৬ হাজার রুপির একটি দেনা সহজেই পরিশোধ করা সম্ভব ছিল। তাহলে সেই টাকা নিয়ে কেন তাকে জীবন দিতে হবে? কৃতিকার মা ও ভাই তার মরদেহ নিতে মুম্বাই যান। মরদেহের অবস্থা খারাপ হয়ে যাওয়ায় আন্ধেরির একটি শ্মশানে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়।

মৃত্যুর আগে কৃতিকা একটি টেলিভিশন ধারাবাহিকে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজের সুযোগ পেয়েছিলেন বলে জানা যায়। তার ভাইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, কৃতিকা ভবিষ্যতে নিজে পরিচালনার কাজও করতে চেয়েছিলেন। অভিনয়ের স্বপ্ন নিয়ে বহু বছর ধরে তিনি ছোট ছোট চরিত্রের জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন। টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রে কয়েকটি কাজও পেয়েছিলেন। কিন্তু ২০১৭ সালের ৮ জুন রাতে তার ফ্ল্যাটে ঘটে যাওয়া ঘটনাই শেষ পর্যন্ত তার জীবন থামিয়ে দেয়। তদন্তে পুলিশ যে প্রধান আলামতগুলো পায়, তার মধ্যে ছিল সিসিটিভি ফুটেজ, রক্তমাখা শার্ট এবং দুই সন্দেহভাজনের গতিবিধি।

বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ

Tag :

৬ হাজার রুপির দেনাই কি কঙ্গনার সহশিল্পীর মৃত্যুর কারণ?

আপডেট সময় ০১:১৪:১২ অপরাহ্ন, শনিবার, ২২ অগাস্ট ২০২৬

মুম্বাইয়ের আন্ধেরি ওয়েস্টের একটি ফ্ল্যাটে ২০১৭ সালের ১২ জুন ২৭ বছর বয়সী অভিনেত্রী কৃতিকা চৌধুরীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। কয়েক দিন ধরে তার কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না।

ফ্ল্যাটের ভেতরে তখনও টেলিভিশন ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র চলছিল। মূল দরজায় বাইরে থেকে তালা দেওয়া ছিল।

প্রতিবেশীরা ফ্ল্যাট থেকে দুর্গন্ধ পাওয়ার পর পুলিশকে খবর দেন। পরে পুলিশ দরজা খুলে বিছানার ওপর কৃতিকার মরদেহ দেখতে পায়।

তার মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্ন ছিল। মরদেহের পাশে রক্তমাখা একটি ‘ব্রাস নাকেলস’ পাওয়া যায়। ১২ জুন বিকেল পৌনে ৪টার দিকে আন্ধেরি ওয়েস্টের শ্রী ভৈরবনাথ এসআরএ সোসাইটির বাসিন্দারা পুলিশকে খবর দেন। ভবনের পঞ্চম তলায় দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছিল।

প্রতিবেশীদের ধারণা ছিল, ৫০৩ নম্বর ফ্ল্যাট থেকেই দুর্গন্ধ আসছে। কৃতিকা ওই ফ্ল্যাটে একাই থাকতেন। প্রতিবেশীরা তাকে মাঝেমধ্যে আসা-যাওয়ার সময় দেখলেও তার ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে খুব বেশি জানতেন না। কয়েক দিন ধরে তাকে দেখা যাচ্ছিল না। তবে বন্ধ ফ্ল্যাটের ভেতর থেকে টেলিভিশনের শব্দ শোনা যাচ্ছিল।

উপপরিদর্শক শ্রীকান্ত যাদব ও তার দল ফ্ল্যাটে ঢুকে কৃতিকার মরদেহ উদ্ধার করে। তার পরনে ছিল রাতের পোশাক। মাথায় ছিল গুরুতর আঘাতের চিহ্ন। ফ্ল্যাট থেকে সন্দেহভাজন মাদক হিসেবে সাদা গুঁড়াও উদ্ধার করা হয়। বিছানার পাশে কৃতিকার মুঠোফোন পড়ে ছিল। পরিবারের সদস্যরা তখনও ফোনে তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছিলেন। কৃতিকার ভাই দীপক চৌধুরী জানান, ৮ জুন তিনি তার বোনের সঙ্গে শেষবার কথা বলেছিলেন। এরপর কৃতিকা আর তার ফোন ধরেননি।

মৃত্যুর কিছুদিন আগে কৃতিকা তার ২৭তম জন্মদিন পালন করেছিলেন। মরদেহ উদ্ধারের চার দিন আগে তার এক সাবেক বন্ধুও জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়ে বার্তা পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু সেই বার্তারও কোনো উত্তর দেননি কৃতিকা। ময়নাতদন্তে জানা যায়, মাথায় গুরুতর আঘাতের কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে। পুলিশের তদন্তে উঠে আসে, কৃতিকার মাথায় তিনবার আঘাত করা হয়েছিল। তদন্তকারীদের ধারণা, হত্যার পর সন্দেহ এড়াতে কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। হত্যাকারীরা ফ্ল্যাট থেকে বের হওয়ার সময় টেলিভিশন ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র চালু রেখে যায়। এরপর বাইরে থেকে দরজায় তালা দিয়ে চলে যায়। পুলিশের ধারণা ছিল, এতে হত্যার ঘটনা ধরা পড়তে সময় লাগবে এবং মরদেহের পচন প্রক্রিয়াও কিছুটা ধীর হতে পারে। ফ্ল্যাটে পাওয়া আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আলামত ছিল রক্তমাখা পুরুষের শার্ট। পরে এই শার্টই তদন্তে বড় সূত্র হয়ে ওঠে।

কৃতিকার বাড়ি ছিল উত্তরাখণ্ডের হরিদ্বারে। অভিনয়ের স্বপ্ন নিয়ে প্রথমে তিনি দিল্লিতে যান। সেখানে একটি মুঠোফোন নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন। পরে বিয়ে করে ২০১১ সালে মুম্বাইয়ে চলে আসেন। তবে সেই বিয়ে বেশিদিন টেকেনি। দিল্লিতে কাজ করার সময় বিজয় দ্বিবেদীর সঙ্গে কৃতিকার পরিচয় হয়। পরে তিনি জানতে পারেন, বিজয় আগে থেকেই বিবাহিত ছিলেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়, বিজয় প্রথম স্ত্রীকে তালাক দিয়ে কৃতিকাকে বিয়ে করেছিলেন। পরে কৃতিকা জানতে পারেন, বিজয় তার সঙ্গে প্রতারণা করছেন। এরপর তাদের সম্পর্ক ভেঙে যায়। পরে একটি চাঁদাবাজির মামলায় বিজয়কে গ্রেপ্তার করা হয়। কয়েকজন তারকার সঙ্গে কথিত আর্থিক প্রতারণার একটি মামলাতেও তার নাম এসেছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

কৃতিকার মৃত্যুর প্রায় ছয় মাস আগে বিজয় আবার তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন বলে জানা যায়। তিনি সম্পর্ক নতুন করে শুরু করতে চেয়েছিলেন। তবে কৃতিকা এতে রাজি হননি। ২৩ জুন পুলিশ বিজয়কে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল। তবে তদন্তের সূত্র পরে অন্যদিকে চলে যায়। বিবাহবিচ্ছেদের পর অভিনয় ও মডেলিংয়ে মন দেন কৃতিকা। তিনি ‘পরিচয়’ ও ‘সাবধান ইন্ডিয়া’সহ বিভিন্ন টেলিভিশন অনুষ্ঠানে কাজ করেন। বালাজির কয়েকটি প্রযোজনাতেও অভিনয় করেন। ২০১৩ সালের ‘রাজ্জো’ ছবিতে কঙ্গনা রানাউতের বোনের চরিত্রেও অভিনয় করেছিলেন তিনি।

কৃতিকার এক সাবেক বন্ধু দ্য কুইন্টকে জানিয়েছিলেন, তিনি মাদকাসক্তির সঙ্গে লড়াই করছিলেন। ওই বন্ধুর দাবি, কৃতিকা কয়েকবার আত্মহত্যার চেষ্টাও করেছিলেন। তার কবজিতে কেটে যাওয়ার দাগ ছিল বলেও জানান ওই বন্ধু। একবার মাদকাসক্ত অবস্থায় কৃতিকা ভবনের ছাদ থেকে লাফ দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন বলেও দাবি করা হয়। ওই সময় তার বন্ধু মুম্বাইয়ের বাইরে ছিলেন। তিনি কৃতিকার ভাইকে বিষয়টি জানিয়ে সাহায্যের জন্য পাঠান। ভাই সেখানে পৌঁছানোর সময় ভবনের নিচে অনেক মানুষ জড়ো হয়েছিল। পুলিশকেও খবর দেওয়া হয়েছিল। পরে কৃতিকার ভাই তাকে ছাদের কিনারা থেকে সরে আসতে রাজি করান এবং ফ্ল্যাটে নিয়ে যান। ঘটনাটি আবাসিক সমিতির সদস্যদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করে। পরে কৃতিকা অন্য একটি ফ্ল্যাটে চলে যান। এরপর তার ওই বন্ধুর সঙ্গে সম্পর্কও শেষ হয়ে যায়।

হত্যার আগের কয়েক দিনের ঘটনা খতিয়ে দেখতে গিয়ে পুলিশ ভবনের সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করে। সেখানে কৃতিকার সম্ভাব্য মৃত্যুর সময়ের কাছাকাছি দুই অজ্ঞাতপরিচয় পুরুষকে তার ফ্ল্যাট থেকে বের হতে দেখা যায়। এদিকে কৃতিকার ভাই পুলিশকে জানান, তার কিছু গয়না ও মূল্যবান জিনিসও পাওয়া যাচ্ছে না। ফ্ল্যাটে পাওয়া রক্তমাখা শার্টের উৎস খুঁজতে তদন্তকারীরা বিভিন্ন ব্যক্তি ও দোকানদারকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। শার্ট থেকে পাওয়া ডিএনএর নমুনাও তদন্তে ব্যবহার করা হয়। পরে তথ্যদাতাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ পানভেলে দুই সন্দেহভাজনের সন্ধান পায়। তাদের একজন নালাসোপারার বাসিন্দা শাকিল নাসিম এবং অন্যজন গোবিন্দির বাসিন্দা বাসুদেব বলে শনাক্ত করা হয়। পুলিশ তাদের খুঁজছে জানতে পেরে তারা জায়গা বদল করেছিলেন বলে অভিযোগ। প্রথমে তারা মালভানিতে লুকিয়ে ছিলেন। পরে পানভেলে চলে যান।

দুই সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তারের পর পুলিশ যে কারণের কথা জানায়, তা কৃতিকার পরিবারকে অবাক করে দেয়। পুলিশের দাবি, মাত্র ৬ হাজার রুপির পাওনা টাকা নিয়ে বিরোধের জেরে কৃতিকাকে হত্যা করা হয়েছিল। তদন্তকারীদের মতে, নাসিম মাদক বিক্রি করত। প্রায় এক বছর আগে সে কৃতিকাকে মাদক সরবরাহ করেছিল। এর বিনিময়ে কৃতিকার কাছে তার ৬ হাজার রুপি পাওনা ছিল বলে পুলিশ দাবি করে। পুলিশের ভাষ্য, কৃতিকা বারবার টাকা পরিশোধে দেরি করছিলেন। এদিকে মাদক পাচার ও গাড়ি চুরির একটি মামলায় নাসিম গ্রেপ্তার হয়েছিল। কারাগার থেকে বের হওয়ার পর তার টাকার প্রয়োজন ছিল। তাই সে কৃতিকার কাছে পাওনা টাকা আদায়ের চেষ্টা শুরু করে। কৃতিকার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে না পেরে পরিচিতদের মাধ্যমে তার ঠিকানা সংগ্রহ করে নাসিম বলে অভিযোগ পুলিশের।

প্রথমবার নাসিম কৃতিকার ফ্ল্যাটে গেলে তাকে কয়েক দিন পর আবার আসতে বলা হয়। পরে সে আবার সেখানে গেলে কৃতিকা টাকা দেওয়ার সময় আরো পিছিয়ে দেন বলে তদন্তে উঠে আসে। পুলিশের দাবি, ৮ জুন নাসিম ও বাসুদেব কৃতিকার ফ্ল্যাটে যায়। শুরুতে তাদের মধ্যে কোনো ঝামেলা ছিল না। তিনজনের মধ্যে কথা হয় এবং তারা একসঙ্গে রাতের খাবারও খান। পরে তাদের মধ্যে ঝগড়া শুরু হয়। তদন্তকারীদের অভিযোগ, একপর্যায়ে নাসিম সঙ্গে নিয়ে যাওয়া ‘ব্রাস নাকেলস’ দিয়ে কৃতিকার মাথায় আঘাত করে। তার মাথায় তিনবার আঘাত করা হয়। এতে তার মৃত্যু হয়। পুলিশ জানায়, নাসিম সঙ্গে করে অতিরিক্ত পোশাকও এনেছিল। কৃতিকার রক্ত তার শার্টে লেগে যাওয়ার পর সে শার্টটি খুলে ফ্ল্যাটে রেখে যায় বলে অভিযোগ। এরপর দুই ব্যক্তি টেলিভিশন ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র চালু করে ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে যায়। বাইরে থেকে দরজায় তালা দিয়ে তারা পালিয়ে যায় বলে পুলিশের দাবি।

তবে মাত্র ৬ হাজার রুপির জন্য কৃতিকাকে হত্যা করা হয়েছিল- পুলিশের এই ব্যাখ্যায় তার পরিবার পুরোপুরি সন্তুষ্ট ছিল না। পুলিশ কৃতিকার ফ্ল্যাট থেকে ২২ হাজার রুপি নগদ উদ্ধার করেছিল। পরে সেই টাকা পরিবারের কাছে দেওয়া হয়। কৃতিকার ভাই দীপক প্রশ্ন তোলেন, তার বোনের কাছে যখন ২২ হাজার রুপি ছিল, তখন ৬ হাজার রুপির একটি দেনা সহজেই পরিশোধ করা সম্ভব ছিল। তাহলে সেই টাকা নিয়ে কেন তাকে জীবন দিতে হবে? কৃতিকার মা ও ভাই তার মরদেহ নিতে মুম্বাই যান। মরদেহের অবস্থা খারাপ হয়ে যাওয়ায় আন্ধেরির একটি শ্মশানে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়।

মৃত্যুর আগে কৃতিকা একটি টেলিভিশন ধারাবাহিকে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজের সুযোগ পেয়েছিলেন বলে জানা যায়। তার ভাইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, কৃতিকা ভবিষ্যতে নিজে পরিচালনার কাজও করতে চেয়েছিলেন। অভিনয়ের স্বপ্ন নিয়ে বহু বছর ধরে তিনি ছোট ছোট চরিত্রের জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন। টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রে কয়েকটি কাজও পেয়েছিলেন। কিন্তু ২০১৭ সালের ৮ জুন রাতে তার ফ্ল্যাটে ঘটে যাওয়া ঘটনাই শেষ পর্যন্ত তার জীবন থামিয়ে দেয়। তদন্তে পুলিশ যে প্রধান আলামতগুলো পায়, তার মধ্যে ছিল সিসিটিভি ফুটেজ, রক্তমাখা শার্ট এবং দুই সন্দেহভাজনের গতিবিধি।

বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ