ঢাকা ০১:৫৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ২২ অগাস্ট ২০২৬, ৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo ঢাকার ৪১৬ বছর পূর্তিতে নৌকা বাইচে মুখরিত বুড়িগঙ্গা Logo এক বছর পার হলে নিতে পারবে কলেরার টিকা Logo ছাত্রলীগ নেত্রীর ফেসবুকে ‘বিস্ফোরক মন্তব্য’, কড়া জবাব ছাত্রদলের নেত্রীর Logo কলকাতায় অগ্নিকাণ্ডে নিহত ৫ জনের মরদেহ নিতে বেনাপোলে স্বজনের অপেক্ষা Logo পাকিস্তানে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে নিহত ৪৯ Logo জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সমাধিতে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রীর শ্রদ্ধা Logo ৬ হাজার রুপির দেনাই কি কঙ্গনার সহশিল্পীর মৃত্যুর কারণ? Logo পে স্কেলের দ্রুত প্রজ্ঞাপন জারি নিয়ে রাষ্ট্রপতির সুদৃষ্টি চাইলেন সরকারি কর্মচারীরা Logo ২৮ রানে ৫ উইকেট হারালো অস্ট্রেলিয়া, ম্যাচে ফিরলো বাংলাদেশ Logo দল থেকে বাদ পড়লেন কারাগারে থাকা ভারতীয় ক্রিকেটার অভিষেক

কণিকা মণ্ডলের করুণ মৃত্যু ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কড়া বার্তা

রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দিতে সিজারিয়ান অপারেশনের পর গত ১৯ আগস্ট গৃহবধূ কণিকা মণ্ডলের (৩৫) মৃত্যু নিঃসন্দেহে একটি মর্মান্তিক ঘটনা। একটি পরিবার হারিয়েছে তাদের প্রিয়জনকে, একটি নবজাতক জন্মের পরই হারিয়েছে তার মাকে।

কিন্তু এই মৃত্যুর সঙ্গে যখন চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ যুক্ত হয়, তখন ঘটনাটি আর শুধু একটি পরিবারের ব্যক্তিগত শোকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার নিরাপত্তা, পেশাগত দায়িত্ববোধ, তদারকি এবং জবাবদিহির প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে।

এমন একটি সংবেদনশীল ঘটনার পর স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। ঘটনার ২ দিন পর শুক্রবার সকালে (২১ আগস্ট) তিনি কণিকার পরিবারের সঙ্গে দেখা করে স্পষ্টভাবে বলেছেন, চিকিৎসায় অবহেলা কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না।

একজন মায়ের মৃত্যুতে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ভুক্তভোগীর পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস যেন, স্বাস্থ্যসেবা খাতের প্রতি আস্থা ফিরাতে দায়িত্বশীল আচরণ।

পাশাপাশি কণিকার পরিবারকে আশ্বাস দিয়েছেন তার চিকিৎসায় অবহেলার সঙ্গে কেউ জড়িত থাকলে বিধি অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, ঘটনাটি তদন্তে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং আগামী পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

একজন দায়িত্বশীল স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছ থেকে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশাও এমনই হওয়া উচিত।

কারণ রাষ্ট্রের একজন নাগরিক চিকিৎসা নিতে গিয়ে যদি অবহেলার শিকার হন, তাহলে সেটি শুধু চিকিৎসক ও রোগীর মধ্যকার সম্পর্কের বিষয় নয়; এর সঙ্গে রাষ্ট্রের স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাও জড়িয়ে যায়। মানুষ যখন হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে থাকেন কিংবা অস্ত্রোপচারের টেবিলে যান, তখন নিজের জীবন অনেকাংশেই চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যকর্মীদের দক্ষতা, সতর্কতা এবং দায়িত্ববোধের ওপর নির্ভর করে।

কণিকার পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, গত ৭ জুলাই অস্ত্রোপচারের পর তার পেটের ভেতরে গজ-ব্যান্ডেজ থেকে যায়। পরবর্তীতে শারীরিক জটিলতা বাড়লে অন্য হাসপাতালে সিটি স্ক্যানের মাধ্যমে পেটের ভেতরে কিছু থাকার বিষয়টি জানা যায় এবং পুনরায় অস্ত্রোপচার করে গজ-ব্যান্ডেজ বের করা হয়। এরপরও তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে এবং কয়েকদিন আইসিইউতে চিকিৎসাধীন থাকার পর তার মৃত্যু হয়।

তবে, অভিযোগের সত্যতা ও ঘটনার প্রকৃত কারণ নিরপেক্ষ তদন্তেই নির্ধারিত হওয়া জরুরি। কারণ চিকিৎসা একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও জটিল বিষয়। কোনো মৃত্যুর ঘটনায় আবেগের বশবর্তী হয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ যেমন নেই, তেমনি গুরুতর অবহেলার অভিযোগকে পেশাগত সহমর্মিতার নামে আড়াল করারও সুযোগ থাকা উচিত নয়। তদন্তে যদি কারও গাফিলতি বা দায়িত্বহীনতা প্রমাণিত হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।

অস্ত্রোপচারের সময় রোগীর পেটে ব্যবহৃত গজ রেখে সেলাই করার অভিযোগ কোনো সাধারণ বিষয় নয়। এমন ঘটনা ঘটলে প্রশ্ন উঠবে—অপারেশনের আগে এবং পরে ব্যবহৃত গজের হিসাব করা হয়েছিল কি না? অপারেশন থিয়েটারে দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য কর্মীদের মধ্যে প্রয়োজনীয় সমন্বয় ছিল কি না? অস্ত্রোপচার শেষে নির্ধারিত নিরাপত্তা প্রটোকল অনুসরণ করা হয়েছিল কি না? রোগীর অবস্থা খারাপ হওয়ার পর যথাসময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল কি না? এসব প্রশ্নের উত্তর বের করাই তদন্ত কমিটির প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত।

চিকিৎসা ব্যবস্থায় ভুলের সম্ভাবনা একেবারে শূন্যে নামিয়ে আনা কঠিন হতে পারে, কিন্তু এমন অনেক ভুল রয়েছে, যা কার্যকর ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’ ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিরোধ করা সম্ভব। বিশেষ করে অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত গজ, যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য উপকরণের হিসাব নিশ্চিত করার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে নানা ধরনের নিরাপত্তা প্রটোকল অনুসরণ করা হয়। অপারেশনের শুরুতে, মাঝপথে এবং শেষে প্রয়োজনীয় গণনা ও যাচাইয়ের ব্যবস্থা থাকলে অনেক বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব।

বাংলাদেশের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতেও এ ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থা আরো কঠোরভাবে কার্যকর করা প্রয়োজন। প্রতিটি অস্ত্রোপচারে লিখিত বা ডিজিটাল চেকলিস্ট ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। অপারেশনে ব্যবহৃত গজ ও যন্ত্রপাতির হিসাব একজনের ওপর ছেড়ে না দিয়ে একাধিক দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির মাধ্যমে যাচাইয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। অপারেশন শেষে রোগীকে স্থানান্তরের আগেও চূড়ান্ত নিরাপত্তা পরীক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি।

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ তাই কেবল মানবিক সহানুভূতির প্রকাশ নয়; এটি প্রশাসনিকভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও বহন করে। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ভঙ্গুর স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রতি আস্থা ফিরাতে কাজ করতে দেখা যাচ্ছে, যা স্বাস্থ্যসেবার জন্য খুবই ভালো দিক। তার জায়গায় তিনি সফল হলে স্বাস্থ্যসেবায় নতুন মাত্রা যোগ হবে। ব্যর্থ হলে আবারো অন্য কণিকার লাশ জাতি উপহার পাবে।

এটাও ঠিক, যখন একজন মন্ত্রী সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের কথা শোনেন, তখন স্বাস্থ্য প্রশাসনের নিচের স্তর পর্যন্ত একটি স্পষ্ট সংকেত পৌঁছায়—গুরুতর অভিযোগ আর সহজে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

তবে, এই দায়িত্বশীলতার প্রকৃত মূল্যায়ন হবে পরবর্তী পদক্ষেপে। তদন্ত কমিটি গঠন একটি গুরুত্বপূর্ণ শুরু, কিন্তু সেটিই শেষ কথা নয়। তদন্ত প্রতিবেদন সময়মতো প্রকাশ বা সংশ্লিষ্টদের কাছে উপস্থাপন, দায় নির্ধারণ এবং প্রমাণিত অপরাধের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। শুধু তদন্ত কমিটি গঠন করে পরে বিষয়টি চাপা পড়ে গেলে মানুষের আস্থা আরো ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভুলের ক্ষেত্রে দায় নির্ধারণের পাশাপাশি ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা প্রতিরোধের ব্যবস্থা গ্রহণ করা। একজন ব্যক্তির শাস্তি কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার বিচার নিশ্চিত করতে পারে, কিন্তু পুরো ব্যবস্থার দুর্বলতা চিহ্নিত না করলে একই ভুল অন্য কোথাও আবার ঘটতে পারে। তাই কনিকার মৃত্যুর ঘটনাকে একটি ‘কেস স্টাডি’ হিসেবে বিবেচনা করে দেশের হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর অস্ত্রোপচার-সংক্রান্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা পুনর্মূল্যায়ন করা যেতে পারে।

কোথায় প্রশিক্ষিত জনবলের ঘাটতি রয়েছে, কোথায় অপারেশন থিয়েটারের মান নিয়ন্ত্রণ দুর্বল, কোন প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা প্রটোকল কাগজে আছে কিন্তু বাস্তবে কার্যকর নয়—এসব বিষয় নিয়মিত অডিটের মাধ্যমে চিহ্নিত করতে হবে। সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর ক্ষেত্রেও সমান কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।

স্বাস্থ্যসেবায় মানুষের আস্থা মূলত দুটি বিষয়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে—দক্ষতা ও জবাবদিহি। চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীদের পেশাগত দক্ষতা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেই দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ববোধ, সতর্কতা ও মানবিকতাও সমান জরুরি। আবার কোনো ভুল হলে সেটি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা না গেলে মানুষের আস্থা ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে।

স্বাস্থ্যখাতে কাজ করা চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্ট, ওটি সহকারীসহ সংশ্লিষ্ট সবাই মানুষের জীবন নিয়ে কাজ করেন। তাই তাদের সামান্য অসতর্কতারও মূল্য অনেক সময় অপূরণীয় হতে পারে। একজন রোগীর মৃত্যু কখনোই কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি পরিবার, স্বজনদের স্বপ্ন এবং অনেক মানুষের ভবিষ্যৎ।

কনিকার মৃত্যু সেই কঠিন বাস্তবতাই আবার সামনে এনেছে। হারানো মানুষটিকে আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। কিন্তু তার মৃত্যুর ঘটনার সঠিক তদন্ত হলে, দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হলে এবং হাসপাতালগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা আরো শক্তিশালী করা গেলে ভবিষ্যতে অন্য কোনো পরিবার হয়তো একই ধরনের শোক থেকে রক্ষা পাবে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ভুক্তভোগী পরিবারের পাশে দাঁড়ানো তাই একটি ইতিবাচক ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ। কিন্তু সেই দায়িত্বশীলতার পূর্ণতা আসবে তখনই, যখন তদন্ত হবে নিরপেক্ষ, সত্য উদ্ঘাটিত হবে নির্ভয়ে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে দৃশ্যমানভাবে। সাধারণ মানুষ শুধু সহানুভূতির কথা শুনতে চায় না; তারা দেখতে চায় ন্যায়বিচার। আমরা বিশ্বাস করি, তিনি সেই কাজটি করে স্বাস্থ্যসেবা খাতে আস্থার পরিণত করবেন।

একটি আধুনিক ও জনবান্ধব স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভিত্তি হওয়া উচিত রোগীর নিরাপত্তা, চিকিৎসাকর্মীদের দায়িত্ববোধ এবং ভুলের ক্ষেত্রে কঠোর জবাবদিহি। রাজবাড়ীর এই মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের আবারো সেই সত্য মনে করিয়ে দিল।

এখন সময় শুধু শোক প্রকাশের নয়। সময় কার্যকর তদন্তের, কঠোর সিদ্ধান্তের এবং হাসপাতালগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নতুন করে পর্যালোচনার। কারণ একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্র কেবল মানুষের কষ্টে সহানুভূতি প্রকাশ করে না; সেই কষ্টের কারণ খুঁজে বের করে এবং ভবিষ্যতে তা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপও নেয়।

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্য ও ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ তাই একটি বড় পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে। তবে, সেই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নিতে হলে প্রয়োজন প্রতিশ্রুতির ধারাবাহিকতা। চিকিৎসায় অবহেলা প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা এবং একই সঙ্গে সারা দেশের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কার্যকর উদ্যোগ—এই দুইয়ের সমন্বয়ই হতে পারে কনিকার মৃত্যুর ঘটনায় রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জবাব।

চিকিৎসা নিতে গিয়ে কোনো মানুষ যেন অবহেলার কারণে প্রাণ না হারান—এটি শুধু একটি পরিবারের দাবি নয়, এটি দেশের প্রতিটি নাগরিকের অধিকার।

বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ

Tag :

ঢাকার ৪১৬ বছর পূর্তিতে নৌকা বাইচে মুখরিত বুড়িগঙ্গা

আপডেট সময় ১২:৩২:০৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ২২ অগাস্ট ২০২৬

কণিকা মণ্ডলের করুণ মৃত্যু ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কড়া বার্তা

রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দিতে সিজারিয়ান অপারেশনের পর গত ১৯ আগস্ট গৃহবধূ কণিকা মণ্ডলের (৩৫) মৃত্যু নিঃসন্দেহে একটি মর্মান্তিক ঘটনা। একটি পরিবার হারিয়েছে তাদের প্রিয়জনকে, একটি নবজাতক জন্মের পরই হারিয়েছে তার মাকে।

কিন্তু এই মৃত্যুর সঙ্গে যখন চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ যুক্ত হয়, তখন ঘটনাটি আর শুধু একটি পরিবারের ব্যক্তিগত শোকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার নিরাপত্তা, পেশাগত দায়িত্ববোধ, তদারকি এবং জবাবদিহির প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে।

এমন একটি সংবেদনশীল ঘটনার পর স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। ঘটনার ২ দিন পর শুক্রবার সকালে (২১ আগস্ট) তিনি কণিকার পরিবারের সঙ্গে দেখা করে স্পষ্টভাবে বলেছেন, চিকিৎসায় অবহেলা কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না।

একজন মায়ের মৃত্যুতে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ভুক্তভোগীর পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস যেন, স্বাস্থ্যসেবা খাতের প্রতি আস্থা ফিরাতে দায়িত্বশীল আচরণ।

পাশাপাশি কণিকার পরিবারকে আশ্বাস দিয়েছেন তার চিকিৎসায় অবহেলার সঙ্গে কেউ জড়িত থাকলে বিধি অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, ঘটনাটি তদন্তে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং আগামী পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

একজন দায়িত্বশীল স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছ থেকে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশাও এমনই হওয়া উচিত।

কারণ রাষ্ট্রের একজন নাগরিক চিকিৎসা নিতে গিয়ে যদি অবহেলার শিকার হন, তাহলে সেটি শুধু চিকিৎসক ও রোগীর মধ্যকার সম্পর্কের বিষয় নয়; এর সঙ্গে রাষ্ট্রের স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাও জড়িয়ে যায়। মানুষ যখন হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে থাকেন কিংবা অস্ত্রোপচারের টেবিলে যান, তখন নিজের জীবন অনেকাংশেই চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যকর্মীদের দক্ষতা, সতর্কতা এবং দায়িত্ববোধের ওপর নির্ভর করে।

কণিকার পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, গত ৭ জুলাই অস্ত্রোপচারের পর তার পেটের ভেতরে গজ-ব্যান্ডেজ থেকে যায়। পরবর্তীতে শারীরিক জটিলতা বাড়লে অন্য হাসপাতালে সিটি স্ক্যানের মাধ্যমে পেটের ভেতরে কিছু থাকার বিষয়টি জানা যায় এবং পুনরায় অস্ত্রোপচার করে গজ-ব্যান্ডেজ বের করা হয়। এরপরও তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে এবং কয়েকদিন আইসিইউতে চিকিৎসাধীন থাকার পর তার মৃত্যু হয়।

তবে, অভিযোগের সত্যতা ও ঘটনার প্রকৃত কারণ নিরপেক্ষ তদন্তেই নির্ধারিত হওয়া জরুরি। কারণ চিকিৎসা একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও জটিল বিষয়। কোনো মৃত্যুর ঘটনায় আবেগের বশবর্তী হয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ যেমন নেই, তেমনি গুরুতর অবহেলার অভিযোগকে পেশাগত সহমর্মিতার নামে আড়াল করারও সুযোগ থাকা উচিত নয়। তদন্তে যদি কারও গাফিলতি বা দায়িত্বহীনতা প্রমাণিত হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।

অস্ত্রোপচারের সময় রোগীর পেটে ব্যবহৃত গজ রেখে সেলাই করার অভিযোগ কোনো সাধারণ বিষয় নয়। এমন ঘটনা ঘটলে প্রশ্ন উঠবে—অপারেশনের আগে এবং পরে ব্যবহৃত গজের হিসাব করা হয়েছিল কি না? অপারেশন থিয়েটারে দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য কর্মীদের মধ্যে প্রয়োজনীয় সমন্বয় ছিল কি না? অস্ত্রোপচার শেষে নির্ধারিত নিরাপত্তা প্রটোকল অনুসরণ করা হয়েছিল কি না? রোগীর অবস্থা খারাপ হওয়ার পর যথাসময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল কি না? এসব প্রশ্নের উত্তর বের করাই তদন্ত কমিটির প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত।

চিকিৎসা ব্যবস্থায় ভুলের সম্ভাবনা একেবারে শূন্যে নামিয়ে আনা কঠিন হতে পারে, কিন্তু এমন অনেক ভুল রয়েছে, যা কার্যকর ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’ ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিরোধ করা সম্ভব। বিশেষ করে অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত গজ, যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য উপকরণের হিসাব নিশ্চিত করার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে নানা ধরনের নিরাপত্তা প্রটোকল অনুসরণ করা হয়। অপারেশনের শুরুতে, মাঝপথে এবং শেষে প্রয়োজনীয় গণনা ও যাচাইয়ের ব্যবস্থা থাকলে অনেক বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব।

বাংলাদেশের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতেও এ ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থা আরো কঠোরভাবে কার্যকর করা প্রয়োজন। প্রতিটি অস্ত্রোপচারে লিখিত বা ডিজিটাল চেকলিস্ট ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। অপারেশনে ব্যবহৃত গজ ও যন্ত্রপাতির হিসাব একজনের ওপর ছেড়ে না দিয়ে একাধিক দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির মাধ্যমে যাচাইয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। অপারেশন শেষে রোগীকে স্থানান্তরের আগেও চূড়ান্ত নিরাপত্তা পরীক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি।

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ তাই কেবল মানবিক সহানুভূতির প্রকাশ নয়; এটি প্রশাসনিকভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও বহন করে। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ভঙ্গুর স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রতি আস্থা ফিরাতে কাজ করতে দেখা যাচ্ছে, যা স্বাস্থ্যসেবার জন্য খুবই ভালো দিক। তার জায়গায় তিনি সফল হলে স্বাস্থ্যসেবায় নতুন মাত্রা যোগ হবে। ব্যর্থ হলে আবারো অন্য কণিকার লাশ জাতি উপহার পাবে।

এটাও ঠিক, যখন একজন মন্ত্রী সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের কথা শোনেন, তখন স্বাস্থ্য প্রশাসনের নিচের স্তর পর্যন্ত একটি স্পষ্ট সংকেত পৌঁছায়—গুরুতর অভিযোগ আর সহজে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

তবে, এই দায়িত্বশীলতার প্রকৃত মূল্যায়ন হবে পরবর্তী পদক্ষেপে। তদন্ত কমিটি গঠন একটি গুরুত্বপূর্ণ শুরু, কিন্তু সেটিই শেষ কথা নয়। তদন্ত প্রতিবেদন সময়মতো প্রকাশ বা সংশ্লিষ্টদের কাছে উপস্থাপন, দায় নির্ধারণ এবং প্রমাণিত অপরাধের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। শুধু তদন্ত কমিটি গঠন করে পরে বিষয়টি চাপা পড়ে গেলে মানুষের আস্থা আরো ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভুলের ক্ষেত্রে দায় নির্ধারণের পাশাপাশি ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা প্রতিরোধের ব্যবস্থা গ্রহণ করা। একজন ব্যক্তির শাস্তি কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার বিচার নিশ্চিত করতে পারে, কিন্তু পুরো ব্যবস্থার দুর্বলতা চিহ্নিত না করলে একই ভুল অন্য কোথাও আবার ঘটতে পারে। তাই কনিকার মৃত্যুর ঘটনাকে একটি ‘কেস স্টাডি’ হিসেবে বিবেচনা করে দেশের হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর অস্ত্রোপচার-সংক্রান্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা পুনর্মূল্যায়ন করা যেতে পারে।

কোথায় প্রশিক্ষিত জনবলের ঘাটতি রয়েছে, কোথায় অপারেশন থিয়েটারের মান নিয়ন্ত্রণ দুর্বল, কোন প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা প্রটোকল কাগজে আছে কিন্তু বাস্তবে কার্যকর নয়—এসব বিষয় নিয়মিত অডিটের মাধ্যমে চিহ্নিত করতে হবে। সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর ক্ষেত্রেও সমান কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।

স্বাস্থ্যসেবায় মানুষের আস্থা মূলত দুটি বিষয়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে—দক্ষতা ও জবাবদিহি। চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীদের পেশাগত দক্ষতা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেই দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ববোধ, সতর্কতা ও মানবিকতাও সমান জরুরি। আবার কোনো ভুল হলে সেটি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা না গেলে মানুষের আস্থা ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে।

স্বাস্থ্যখাতে কাজ করা চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্ট, ওটি সহকারীসহ সংশ্লিষ্ট সবাই মানুষের জীবন নিয়ে কাজ করেন। তাই তাদের সামান্য অসতর্কতারও মূল্য অনেক সময় অপূরণীয় হতে পারে। একজন রোগীর মৃত্যু কখনোই কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি পরিবার, স্বজনদের স্বপ্ন এবং অনেক মানুষের ভবিষ্যৎ।

কনিকার মৃত্যু সেই কঠিন বাস্তবতাই আবার সামনে এনেছে। হারানো মানুষটিকে আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। কিন্তু তার মৃত্যুর ঘটনার সঠিক তদন্ত হলে, দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হলে এবং হাসপাতালগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা আরো শক্তিশালী করা গেলে ভবিষ্যতে অন্য কোনো পরিবার হয়তো একই ধরনের শোক থেকে রক্ষা পাবে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ভুক্তভোগী পরিবারের পাশে দাঁড়ানো তাই একটি ইতিবাচক ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ। কিন্তু সেই দায়িত্বশীলতার পূর্ণতা আসবে তখনই, যখন তদন্ত হবে নিরপেক্ষ, সত্য উদ্ঘাটিত হবে নির্ভয়ে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে দৃশ্যমানভাবে। সাধারণ মানুষ শুধু সহানুভূতির কথা শুনতে চায় না; তারা দেখতে চায় ন্যায়বিচার। আমরা বিশ্বাস করি, তিনি সেই কাজটি করে স্বাস্থ্যসেবা খাতে আস্থার পরিণত করবেন।

একটি আধুনিক ও জনবান্ধব স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভিত্তি হওয়া উচিত রোগীর নিরাপত্তা, চিকিৎসাকর্মীদের দায়িত্ববোধ এবং ভুলের ক্ষেত্রে কঠোর জবাবদিহি। রাজবাড়ীর এই মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের আবারো সেই সত্য মনে করিয়ে দিল।

এখন সময় শুধু শোক প্রকাশের নয়। সময় কার্যকর তদন্তের, কঠোর সিদ্ধান্তের এবং হাসপাতালগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নতুন করে পর্যালোচনার। কারণ একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্র কেবল মানুষের কষ্টে সহানুভূতি প্রকাশ করে না; সেই কষ্টের কারণ খুঁজে বের করে এবং ভবিষ্যতে তা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপও নেয়।

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্য ও ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ তাই একটি বড় পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে। তবে, সেই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নিতে হলে প্রয়োজন প্রতিশ্রুতির ধারাবাহিকতা। চিকিৎসায় অবহেলা প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা এবং একই সঙ্গে সারা দেশের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কার্যকর উদ্যোগ—এই দুইয়ের সমন্বয়ই হতে পারে কনিকার মৃত্যুর ঘটনায় রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জবাব।

চিকিৎসা নিতে গিয়ে কোনো মানুষ যেন অবহেলার কারণে প্রাণ না হারান—এটি শুধু একটি পরিবারের দাবি নয়, এটি দেশের প্রতিটি নাগরিকের অধিকার।

বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ