উচ্চফলনের আশায় হাওরে বিভিন্ন ধরনের হাইব্রিড ধান চাষের দিকে ঝুঁকেছেন কৃষকরা। এসব ধানে রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ ঠেকাতে বাড়ছে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার।
এতে একদিকে কৃষকের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে, অন্যদিকে হুমকির মুখে পড়ছে হাওরের জীববৈচিত্র্য।
বাংলাদেশে একসময় হাজার হাজার প্রজাতির ঐতিহ্যবাহী দেশি ধান পাওয়া যেত। হাওরাঞ্চলের পরিচিত দেশি ধানের মধ্যে রাতা, গচি শাইল, নাজিশাইল, লাকাই, পানিশাইল, বোর, টেপি, রঙ্গিলা টেপি, রাজাশাইল, বেগুন বিচি, কালোজিরা ও বাঁশফুল উল্লেখযোগ্য। আধুনিক উচ্চফলনশীল জাতের আধিক্যে এসব দেশি ধানের অনেকগুলোই এখন বিলুপ্তির পথে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের সংস্পর্শে মানুষের নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ত্বকের প্রদাহ, শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা ও বমিভাবের মতো তাৎক্ষণিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এসব বিষাক্ত উপাদানের সংস্পর্শে ক্যান্সার, স্নায়ুরোগ, কিডনি ও লিভারের ক্ষতি এবং হরমোনের ভারসাম্যহীনতার মতো জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
টাঙ্গুয়ার হাওরপাড়ের কৃষক মুক্তার হোসেন বলেন, ‘আমরা একসময় দেশি ধানের আবাদ করতাম।
এসব ধান উৎপাদনে তেমন সার-কীটনাশকের প্রয়োজন হতো না। বর্তমানে হাইব্রিড ধান চাষ করতে গিয়ে সার-কীটনাশক ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে শারীরিকভাবে নানা ধরনের রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছি।’
সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার বংশীকুন্ডা উত্তর ইউনিয়নের বাঁকাতলা গ্রামের সত্তরোর্ধ্ব কৃষক রবীন্দ্র হাজংও একসময় দেশি ধানের আবাদ করতেন। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অন্য কৃষকদের মতো তিনিও এখন হাইব্রিড ধান চাষ করছেন।
তবে ধান উৎপাদনে তিনি তুলনামূলক কম সার ও কীটনাশক ব্যবহার করেন। তার ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে নিজের উৎপাদিত ধানের ভাত খেয়ে আসছেন। কম মাত্রায় সার-কীটনাশক ব্যবহারের কারণে এখনো সুস্থ আছেন বলেও মনে করেন এই প্রবীণ কৃষক।
হাওরের জমিতে ব্যবহৃত রাসায়নিকের একটি অংশ বৃষ্টির পানি ও সেচের পানির সঙ্গে ধুয়ে হাওর, নদী, খাল-বিল ও অন্যান্য জলাশয়ে গিয়ে মিশছে। এতে শুধু পোকামাকড় নয়, মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণী ও উপকারী জীবও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
টাঙ্গুয়ার হাওরকে দেশি মাছের আধার বা ‘মাদার ফিশারিজ’ বলা হয়। এটি জলজ প্রাকৃতিক বন, দেশি ও পরিযায়ী পাখির গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল এবং দেশি মাছের অন্যতম প্রজননক্ষেত্র। প্রতিবছর শীত মৌসুমে এখানে দেশি ও পরিযায়ী পাখির সমাগম ঘটে। দীর্ঘদিন পানির নিচে টিকে থাকতে পারে এমন কিছু বিরল উদ্ভিদও রয়েছে এই হাওরে। বিলুপ্তপ্রায় হিজল ও করচগাছের পাশাপাশি রয়েছে নলখাগড়া, সিঙরা, চাইল্যা, বইল্যা, বনতুলসী, উকল, গুইজ্জাকাঁটা, শালুক ও শাপলা।
হাওরে ১৫০ প্রজাতির উদ্ভিদ, ১৪১ প্রজাতির মাছ, ১১ প্রজাতির উভচর, ছয় প্রজাতির কচ্ছপ, সাত প্রজাতির গিরগিটি ও ২১ প্রজাতির সাপের অস্তিত্ব রয়েছে। অস্তিত্বের হুমকিতে থাকা ২৬ প্রজাতির বন্য প্রাণীর আবাসভূমিও এই হাওর। হাওরতীরবর্তী ফসলি জমিতে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে বিষাক্ত পদার্থ পানির সঙ্গে হাওরে গিয়ে মিশলে এসব জলজ বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতির আশঙ্কা বাড়ে।
পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাসমির রেজা বলেন, হাওর অঞ্চলের কৃষিজমিতে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে হাওরের বাস্তুসংস্থান ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বৃষ্টির পানি ও কৃষিজমির পলি ধুয়ে এসব রাসায়নিক হাওর, বিল ও খালে প্রবেশ করে পানির গুণগত মান নষ্ট করে। অতিরিক্ত পুষ্টি উপাদান পানিতে শৈবালের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটিয়ে অক্সিজেনের ভারসাম্য নষ্ট করে। ফলে মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কীটনাশকের বিষাক্ত উপাদান মাছ, ব্যাঙ, জলজ পোকামাকড় ও অণুজীবের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এতে খাদ্যশৃঙ্খল ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য ব্যাহত হয়। দীর্ঘমেয়াদে হাওরের জীববৈচিত্র্য ও প্রতিবেশগত স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়ে।’
বাড়ছে কীটনাশক বিষক্রিয়া–
যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব এডিনবরার এক গবেষণায় ২০১৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের ১০টি হাসপাতালের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এসব হাসপাতাল দেশের ৬৫ শতাংশের বেশি জনগোষ্ঠীকে চিকিৎসাসেবা দিয়ে থাকে। গবেষণার ওই সময়ে কীটনাশক বিষক্রিয়ার মোট এক হাজার ৪২০টি ঘটনা শনাক্ত করা হয়।
গবেষণায় দেখা যায়, ২০১৩ সালে কীটনাশক পানে বিষক্রিয়ায় একটি মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল। ২০২৪ সালে এ ধরনের বিষক্রিয়ার ৪৯৩টি ঘটনা রেকর্ড করা হয়। এর মধ্যে ৪৩ দশমিক ২ শতাংশ রোগীর মৃত্যু হয়েছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. রমিজ উদ্দিন বলেন, হাওর কোনো সাধারণ সমতল কৃষিজমি নয়; এটি প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রের বিশাল ভাণ্ডার। অধিক ফসল উৎপাদনের আশায় কৃষক হাওরের জমিতে যে হারে রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করছেন, তা আমাদের সমৃদ্ধ প্রাণবৈচিত্র্যকে তিলে তিলে নিঃশেষ করে দিচ্ছে। পাশাপাশি মানুষও নানা রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে।
তিনি বলেন, সার ও কীটনাশক স্প্রে করার সময় মাস্ক, গ্লাভসসহ প্রয়োজনীয় সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। ব্যবহৃত রাসায়নিকের খালি পাত্র জলাশয়ে ফেলা যাবে না। রাসায়নিকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা বা আইপিএম কৃষিপদ্ধতি বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।
ধর্মপাশা উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, হাওরাঞ্চল ধর্মপাশা ও মধ্যনগর উপজেলায় গত বোরো মৌসুমে ৫৭ হাজার ৮২২ জন কৃষক ৩১ হাজার ৯১০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করেছেন। তাদের সবাই উফশী জাতের ধান চাষ করেছেন।
ধর্মপাশা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আসয়াদ বিন খলিল রাহাত বলেন,কীটনাশকযুক্ত খাবার খাওয়ার ফলে মানুষের জটিল রোগ হতে পারে। ক্যান্সার, চর্মরোগসহ নানা রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কৃষকরা যদি কীটনাশক সঠিক মাত্রায় ব্যবহার করেন, তাহলে এসব স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ

























