ঢাকা ০৩:০২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬, ৩১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ভর্তুকির বোঝা ও বকেয়া ৬৭ হাজার কোটি টাকা

বিদ্যুৎ বিতরণ যাচ্ছে বেসরকারি খাতে: সমাধান নাকি নতুন দুর্ভোগের শঙ্কা?

খাতা-কলমে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা চাহিদার তুলনায় অনেক বাড়লেও বাস্তবে কমেনি লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণা। একদিকে চড়া দামে বিদ্যুৎ কিনে গ্রাহকের কাছে কম দামে বিক্রির ফলে বাড়ছে সরকারের ভর্তুকির পাহাড়, অন্যদিকে বিদ্যুৎ খাতের ঘাড়ে চেপে বসেছে প্রায় ৬৭ হাজার কোটি টাকার বিশাল বকেয়া বিলের চাপ। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকার যে ১৫টি খাতকে সর্বাধিক অগ্রাধিকার দিয়েছে, তার অন্যতম বিদ্যুৎ খাতেই বাজেট রাখা হয়েছে ১৪ হাজার ৯৯৬ কোটি টাকা। তবে তা সত্ত্বেও চলতি অর্থবছরে কেবল এই এক খাতেই ভর্তুকি বাবদ গুণতে হতে পারে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা।

এই আর্থিক ধস ও অব্যবস্থাপনার সংকট সামাল দিতে এবার বিদ্যুৎ খাতের সবচেয়ে স্পর্শকাতর অংশ—খুচরা পর্যায়ে বিতরণ ব্যবস্থাপনা বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার নীতিগত পরিকল্পনা করছে সরকার।

কী ভাবছে সরকার?

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পাইকারি সরবরাহের নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রের হাতে থাকলেও সরাসরি গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুৎ পৌঁছানো ও বিল আদায়ের দায়িত্ব বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে দেওয়ার চিন্তা করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীও এ উদ্যোগে সায় দিয়েছেন।

বিদ্যুৎমন্ত্রী ভারতের মুম্বাইয়ে রিলায়েন্স, দিল্লিতে আদানি কিংবা কলকাতায় গোয়েঙ্কা গ্রুপের সফল পরিচালনার উদাহরণ টেনে বলেন, “আমাদের দেশীয় কোম্পানিগুলো কেন পারবে না? আমরা নিজেরা কোম্পানি গঠন করে চেষ্টা করেছি, কিন্তু খুব একটা লাভ হয়নি। তাই দক্ষতা বাড়াতে ও সেবা সুনিশ্চিত করতে আমরা বেসরকারি খাতে ছাড়ার বিষয়টি ভাবছি।” খুচরা বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির বিষয়ে তিনি খোলাখুলি জানান, সরকার ১৭ টাকায় বিদ্যুৎ কিনে মাত্র ৮ টাকায় বিক্রি করছে; এই বিপুল অঙ্কের ভর্তুকি সরকারের পক্ষে টানা আর সম্ভব নয়।

বিশেষজ্ঞদের আপত্তি ও শঙ্কা

সরকার ভর্তুকি কমানো ও কার্যক্ষমতা বাড়ানোর অজুহাত দেখালেও দেশের জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা এই পদক্ষেপকে বিদ্যুৎ খাতের সংকট সমাধানের বদলে ‘নতুন সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির কারণ’ হিসেবে দেখছেন।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছেন, দেশের জ্বালানি খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা ও অনিয়ম দূর না করে কেবল বেসরকারিকরণ করলে গ্রাহকের ওপর ব্যয়ের বোঝা আরও বাড়বে। উদাহরণ হিসেবে তিনি তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) কথা মনে করিয়ে দিয়ে বলেন, পুরোপুরি বেসরকারি খাতের হাতে থাকা এলপিজির দাম সরকার কখনো নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। এ ছাড়া জ্বালানির মতো কৌশলগত রাষ্ট্রীয় উপাদান পুরোপুরি ব্যক্তিখাতে গেলে জাতীয় সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

বুয়েটের অধ্যাপক আব্দুল হাসিব চৌধুরীও ব্যাংকিং খাতের বিশৃঙ্খলার উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, “ব্যাংকে লুটপাটের পর যেমন আমানতকারীর টাকা সরকারকে ফেরত দিতে হয়েছে, দুর্বল রেগুলেটরি ফ্রেমওয়ার্ক ছাড়া বিদ্যুৎ খাত বেসরকারি হাতে দিলে একই পরিণতি হতে পারে।”

বেসরকারি নিয়ন্ত্রণে চ্যালেঞ্জ ও ঝুঁকি

বেসরকারি খাতের প্রধান উদ্দেশ্য মুনাফা। তারা কোনো অঞ্চলের দায়িত্ব পেলে বিদ্যুৎ বিল হু হু করে বাড়ানোর চাপ তৈরি হবে।

পাহাড়ি, দুর্গম বা কম জনবহুল এলাকায় অবকাঠামোগত খরচ বেশি কিন্তু মুনাফা কম। ফলে এসব অঞ্চলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সংযোগ দিতে বা বিনিয়োগে অনাগ্রহ দেখালে প্রান্তিক মানুষ বিদ্যুৎ সেবা থেকে বঞ্চিত হবে।

বর্তমানে সরকারের অধীন থাকা ৬টি বিতরণ সংস্থার হাজার হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ার শঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি কুইক রেন্টালের মতো অস্বচ্ছ চুক্তি করা হলে পুরো বিদ্যুৎ খাত বেসরকারি খাতের কাছে জিম্মি হয়ে পড়তে পারে।

সমাধানের পথ কী?

বিশ্বের যেসব দেশে বিদ্যুৎ বিতরণ সফলভাবে বেসরকারিকরণ করা হয়েছে (যেমন—যুক্তরাজ্য, ভারত ও তুরস্ক), সেখানে প্রথম ও প্রধান শর্ত ছিল স্বাধীন ও শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক সংস্থা (Regulatory Body) গঠন করা। কিন্তু বাংলাদেশে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) ক্ষমতা খর্ব করে নির্বাহী আদেশে দাম বাড়ানোর চর্চা রেগুলেটরি সিস্টেমকেই ধূলিসাৎ করে দিয়েছে বলে বিশেষজ্ঞদের মত।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, বিতরণ খাত বেসরকারি হাতে তুলে দেওয়ার আগে বিইআরসি-কে সর্বাত্মক স্বাধীন ও শক্তিশালী করতে হবে, বিগত সময়ের অস্বচ্ছ চুক্তিগুলো পুনঃমূল্যায়ন করতে হবে এবং ফৌজদারি অপরাধ ও চুরির বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় নিয়ন্ত্রণহীন এই বাজার সাধারণ গ্রাহক ও শিল্প খাত—উভয়ের জন্যই এক চরম সর্বনাশ ডেকে আনবে।

বাংলা৭১নিউজ/এসএচিবি

Tag :

ভর্তুকির বোঝা ও বকেয়া ৬৭ হাজার কোটি টাকা

বিদ্যুৎ বিতরণ যাচ্ছে বেসরকারি খাতে: সমাধান নাকি নতুন দুর্ভোগের শঙ্কা?

আপডেট সময় ১১:১৮:৪৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২ অগাস্ট ২০২৬

খাতা-কলমে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা চাহিদার তুলনায় অনেক বাড়লেও বাস্তবে কমেনি লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণা। একদিকে চড়া দামে বিদ্যুৎ কিনে গ্রাহকের কাছে কম দামে বিক্রির ফলে বাড়ছে সরকারের ভর্তুকির পাহাড়, অন্যদিকে বিদ্যুৎ খাতের ঘাড়ে চেপে বসেছে প্রায় ৬৭ হাজার কোটি টাকার বিশাল বকেয়া বিলের চাপ। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকার যে ১৫টি খাতকে সর্বাধিক অগ্রাধিকার দিয়েছে, তার অন্যতম বিদ্যুৎ খাতেই বাজেট রাখা হয়েছে ১৪ হাজার ৯৯৬ কোটি টাকা। তবে তা সত্ত্বেও চলতি অর্থবছরে কেবল এই এক খাতেই ভর্তুকি বাবদ গুণতে হতে পারে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা।

এই আর্থিক ধস ও অব্যবস্থাপনার সংকট সামাল দিতে এবার বিদ্যুৎ খাতের সবচেয়ে স্পর্শকাতর অংশ—খুচরা পর্যায়ে বিতরণ ব্যবস্থাপনা বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার নীতিগত পরিকল্পনা করছে সরকার।

কী ভাবছে সরকার?

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পাইকারি সরবরাহের নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রের হাতে থাকলেও সরাসরি গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুৎ পৌঁছানো ও বিল আদায়ের দায়িত্ব বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে দেওয়ার চিন্তা করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীও এ উদ্যোগে সায় দিয়েছেন।

বিদ্যুৎমন্ত্রী ভারতের মুম্বাইয়ে রিলায়েন্স, দিল্লিতে আদানি কিংবা কলকাতায় গোয়েঙ্কা গ্রুপের সফল পরিচালনার উদাহরণ টেনে বলেন, “আমাদের দেশীয় কোম্পানিগুলো কেন পারবে না? আমরা নিজেরা কোম্পানি গঠন করে চেষ্টা করেছি, কিন্তু খুব একটা লাভ হয়নি। তাই দক্ষতা বাড়াতে ও সেবা সুনিশ্চিত করতে আমরা বেসরকারি খাতে ছাড়ার বিষয়টি ভাবছি।” খুচরা বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির বিষয়ে তিনি খোলাখুলি জানান, সরকার ১৭ টাকায় বিদ্যুৎ কিনে মাত্র ৮ টাকায় বিক্রি করছে; এই বিপুল অঙ্কের ভর্তুকি সরকারের পক্ষে টানা আর সম্ভব নয়।

বিশেষজ্ঞদের আপত্তি ও শঙ্কা

সরকার ভর্তুকি কমানো ও কার্যক্ষমতা বাড়ানোর অজুহাত দেখালেও দেশের জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা এই পদক্ষেপকে বিদ্যুৎ খাতের সংকট সমাধানের বদলে ‘নতুন সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির কারণ’ হিসেবে দেখছেন।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছেন, দেশের জ্বালানি খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা ও অনিয়ম দূর না করে কেবল বেসরকারিকরণ করলে গ্রাহকের ওপর ব্যয়ের বোঝা আরও বাড়বে। উদাহরণ হিসেবে তিনি তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) কথা মনে করিয়ে দিয়ে বলেন, পুরোপুরি বেসরকারি খাতের হাতে থাকা এলপিজির দাম সরকার কখনো নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। এ ছাড়া জ্বালানির মতো কৌশলগত রাষ্ট্রীয় উপাদান পুরোপুরি ব্যক্তিখাতে গেলে জাতীয় সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

বুয়েটের অধ্যাপক আব্দুল হাসিব চৌধুরীও ব্যাংকিং খাতের বিশৃঙ্খলার উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, “ব্যাংকে লুটপাটের পর যেমন আমানতকারীর টাকা সরকারকে ফেরত দিতে হয়েছে, দুর্বল রেগুলেটরি ফ্রেমওয়ার্ক ছাড়া বিদ্যুৎ খাত বেসরকারি হাতে দিলে একই পরিণতি হতে পারে।”

বেসরকারি নিয়ন্ত্রণে চ্যালেঞ্জ ও ঝুঁকি

বেসরকারি খাতের প্রধান উদ্দেশ্য মুনাফা। তারা কোনো অঞ্চলের দায়িত্ব পেলে বিদ্যুৎ বিল হু হু করে বাড়ানোর চাপ তৈরি হবে।

পাহাড়ি, দুর্গম বা কম জনবহুল এলাকায় অবকাঠামোগত খরচ বেশি কিন্তু মুনাফা কম। ফলে এসব অঞ্চলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সংযোগ দিতে বা বিনিয়োগে অনাগ্রহ দেখালে প্রান্তিক মানুষ বিদ্যুৎ সেবা থেকে বঞ্চিত হবে।

বর্তমানে সরকারের অধীন থাকা ৬টি বিতরণ সংস্থার হাজার হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ার শঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি কুইক রেন্টালের মতো অস্বচ্ছ চুক্তি করা হলে পুরো বিদ্যুৎ খাত বেসরকারি খাতের কাছে জিম্মি হয়ে পড়তে পারে।

সমাধানের পথ কী?

বিশ্বের যেসব দেশে বিদ্যুৎ বিতরণ সফলভাবে বেসরকারিকরণ করা হয়েছে (যেমন—যুক্তরাজ্য, ভারত ও তুরস্ক), সেখানে প্রথম ও প্রধান শর্ত ছিল স্বাধীন ও শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক সংস্থা (Regulatory Body) গঠন করা। কিন্তু বাংলাদেশে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) ক্ষমতা খর্ব করে নির্বাহী আদেশে দাম বাড়ানোর চর্চা রেগুলেটরি সিস্টেমকেই ধূলিসাৎ করে দিয়েছে বলে বিশেষজ্ঞদের মত।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, বিতরণ খাত বেসরকারি হাতে তুলে দেওয়ার আগে বিইআরসি-কে সর্বাত্মক স্বাধীন ও শক্তিশালী করতে হবে, বিগত সময়ের অস্বচ্ছ চুক্তিগুলো পুনঃমূল্যায়ন করতে হবে এবং ফৌজদারি অপরাধ ও চুরির বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় নিয়ন্ত্রণহীন এই বাজার সাধারণ গ্রাহক ও শিল্প খাত—উভয়ের জন্যই এক চরম সর্বনাশ ডেকে আনবে।

বাংলা৭১নিউজ/এসএচিবি