সকালের নিস্তব্ধতা ভেঙে হাজারও রান্নাঘরে প্রতিদিন যে নীল আগুনের শিখা জ্বলে উঠত, আজ সেখানে কেবলই শীতল হা-হুতাশ। কোনো ঘরে খালি পেটে স্কুলে ছুটছে শিশু, কোথাও আবার বৈদ্যুতিক কিম্বা কাঠের চুলার ধোঁয়ায় বিষাদ জমেছে গৃহিণীর চোখে। রান্নাঘরে এখন আগুনের হাহাকার, অচলাবস্থায় নগরজীবন। এমন পরিস্থিতিতে রাজধানী ঢাকা যেন এক থমকে যাওয়া নগরী- যেখানে গ্যাসের পাইপলাইনগুলো সচল থাকার কথা ছিল, সেখানে এখন কেবলই শূন্যতার দীর্ঘশ্বাস। কক্সবাজারের নীল সমুদ্রের বুকে ভেসে থাকা এলএনজি টার্মিনালের আগুনে পুড়ে ছাই হয়নি কেবল একটি বয়লার, বরং পুড়ে ছাই হয়েছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ।
হাহাকার রাজপথে ও রান্নাঘরে
বাসাবো, মুগদ্, সাইদাবাদ, লালবাগ, জিগাতলা, কলাবাগান, মোহাম্মদপুর, কাফরুল, কাজীপাড়া, পশ্চিম তেজতুরী বাজার, রামপুরা থেকে শুরু করে বাড্ডা- রাজধানীর বিশাল এক মানচিত্র জুড়ে এখন কেবলই দীর্ঘ রূপরেখা। কোথাও চুলায় গ্যাসের চাপ এতটাই ক্ষীণ যে সামান্য চা ফুটতেও প্রহর গুনতে হয়, আর অধিকাংশ জায়গায় চুলায় আগুনের লেশমাত্র নেই।
নিম্ন আয়ের মানুষ বাধ্য হয়ে ফুটপাতে বা বারান্দায় কাঠের চুলার ধোঁয়ায় চোখ মুছছেন, মধ্যবিত্ত ছুটছেন ইলেকট্রিক চুলার খোঁজে। একই দৃশ্য শহরের সিএনজি স্টেশনগুলোতেও; দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর রূপ নিচ্ছে লাইনের সারি, যেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় অপচয় করে থমকে আছে যান্ত্রিক জীবন। দীর্ঘস্থায়ী এই ভোগান্তির আগুনে ক্ষোভ ফুসে উঠছে সাধারণ মানুষের মাঝে, রাজপথে মানববন্ধনে নামছেন ভুক্তভোগী বাসিন্দারা।
সংকট কেন এত গভীরে?
হঠাৎ কেন এই সংকট এত তীব্র হয়ে উঠল? তার উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের একক নির্ভরতা ও দেশীয় সম্পদ রক্ষায় উদাসীনতার করুণ সমীকরণে।
মহেশখালীতে মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটিতে গত মঙ্গলবারের অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রধান বয়লার। এরপর থেকেই পুরো টার্মিনালটি অচল হয়ে পড়ে।
পেট্রোবাংলার হিসেব বলছে, দেশে দিনে গ্যাসের সার্বিক চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। অথচ গত এক বছর ধরেই গড়ে ২৭০ কোটি ঘনফুটের বেশি দেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। অগ্নিকাণ্ডের পর আমদানি নির্ভর এলএনজি সরবরাহ থমকে গিয়ে মোট সরবরাহ নেমে এসেছে ২১৫ কোটি ঘনফুটেরও নিচে।
দেশের মোট গ্যাস সরবরাহের প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশই আসে আমদানি করা এলএনজি থেকে। এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ থাকায় জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমে আসায় বিদেশি এলএনজির ওপর এই নির্ভরতা তৈরি হয়েছে। ফলে একটি মাত্র টার্মিনাল বিকল হতেই পুরো দেশের জ্বালানি ব্যবস্থা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে।
বিদ্যুৎ থেকে শিল্প: স্থবিরতার কালো ছায়া
এই সংকটের ধাক্কা কেবল রান্নাঘরেই সীমাবদ্ধ নেই। পেট্রোবাংলার এই আকস্মিক ঘাটতিতে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে বিদ্যুৎ খাত। প্রায় দেড় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন একলহমে কমে যাওয়ায় দেশজুড়ে লোডশেডিংয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি শিল্পকারখানার চাকা শ্লথ হয়ে পড়েছে, বিঘ্নিত হচ্ছে উৎপাদন। নরসিংদী, সাভার, গাজীপুর ও আশুলিয়ার বিভিন্ন কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত বা বন্ধ রয়েছে এবং পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়েছে।
পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, যুক্তরাজ্য ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের কারিগরি বিশেষজ্ঞরা দিনরাত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন পরিস্থিতি সামাল দিতে। তবে কবে নাগাদ এই যন্ত্র সচল হবে, তা এখনো অনিশ্চিত। বিতরণ সংস্থা তিতাস গ্যাসও এক প্রকার হাত গুটিয়ে জানিয়ে দিয়েছে- পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত রাজধানীর বাসিন্দাদের এই স্বল্পচাপের যন্ত্রণা সয়েই যেতে হবে।
একটি মাত্র আমদানিকৃত টার্মিনাল অচল হলে গোটা দেশের হৃদস্পন্দন থমকে যায়- এই বাস্তবতা আজ বড় নিষ্ঠুরভাবে স্পষ্ট। প্রযুক্তি আর বিদেশি বিশেষজ্ঞের ওপর ভরসা রেখে যখন সময় পার হচ্ছে, তখন ঢাকার রাজপথ থেকে অলিগলি- সবখানে কেবলই অপেক্ষার প্রহর আর একমুঠো নীল আগুনের হাহাকার।
বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি
























