ঢাকা ১২:৪৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬, ৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo রক্তঝরা ২৪ জুলাই: স্মৃতির ক্যানভাসে অশ্রু আর ক্ষোভ Logo ফ্ল্যাট থেকে গৃহকর্মীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার Logo ইতিহাস, স্থাপত্য ও ঐতিহ্যের এক জীবন্ত সাক্ষী তেরশ্রী মসজিদ Logo মাংস, ডিম ও ব্রয়লারের দাম স্থিতিশীল থাকলেও বেড়েছে মাছের দাম Logo সম্পর্কে যেভাবে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে ‘প্যারালাল লাইফ সিন্ড্রোম’ Logo শিক্ষার্থীদের ক্ষতি হতে দেব না: ভিডিও বার্তায় মোদী Logo আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় বললেন আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি Logo ফরিদপুরে বিএনপি নেতার আপত্তিকর ভিডিও ভাইরাল, দল থেকে বহিষ্কার Logo স্পিকার ফিরলেই পদত্যাগপত্র দেবেন রাষ্ট্রপতি, জানিয়ে দিয়েছেন বঙ্গভবনের কর্মকর্তাদেরও Logo নৌ অবরোধ তুলে নিয়ে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করার আহ্বান আসিয়ানের

ইতিহাস, স্থাপত্য ও ঐতিহ্যের এক জীবন্ত সাক্ষী তেরশ্রী মসজিদ

গ্রামের সরু পথ পেরিয়ে চোখে পড়ে কালো রঙের বিশাল এক গম্বুজ। চারপাশে ছড়িয়ে আছে আরও ১২টি ছোট গম্বুজ। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকা এই স্থাপনাকে ঘিরে রয়েছে অসংখ্য গল্প, লোককথা আর ইতিহাসের টুকরো স্মৃতি। কেউ বলেন এর বয়স ৫০০ বছর, কেউ আবার দাবি করেন ৭০০ বছরেরও বেশি। নির্দিষ্ট কোনো শিলালিপি বা দলিল না থাকলেও স্থানীয় বাসিন্দাদের বিশ্বাস, এটি মুঘল আমলের নির্মাণ। মোটা দেওয়াল, গোলাকৃতির গম্বুজ ও প্রাচীন স্থাপত্যশৈলী সেই ধারণাকেই যেন আরও জোরালো করে।

ময়মনসিংহের দক্ষিণ গফরগাঁও উপজেলার উস্থি ইউনিয়নের তেরশ্রী গ্রামে অবস্থিত এই ঐতিহাসিক মসজিদ। তেরশ্রী বাজার থেকে কিছুটা ভেতরে গেলেই গ্রামের মাঝখানে চোখে পড়ে ব্যতিক্রমী এই স্থাপনাটি। সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিশাল এক গম্বুজকে ঘিরে নির্মিত মসজিদটির চারপাশে সারিবদ্ধভাবে রয়েছে আরও ১২টি ছোট গম্বুজ। ভেতর-বাইরের দেওয়ালে এখনো টিকে আছে পুরোনো কারুকাজের নানা নিদর্শন, যদিও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর অনেকটাই হারিয়ে গেছে।

মসজিদের সামনে বসে স্মৃতির ঝাঁপি খুললেন সত্তরোর্ধ্ব মো. আজিজুল হক। তার ভাষায়, বাবা-দাদারাও এই মসজিদকে বহু শত বছরের পুরোনো বলে জেনে এসেছেন। তাদের মৃত্যুরও প্রায় একশ বছর হয়ে গেছে। তিনি বলেন, একসময় বাঘেরগাঁও, কান্দিপাড়া, তেরশ্রী, নাগারকান্দি ও নূরাপাড়া এই পাঁচ গ্রামের মানুষের একমাত্র নামাজের স্থান ছিল এই মসজিদ। পরে কিছু অংশ সম্প্রসারণ করায় এখন প্রায় ১০০ জন মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারেন। তার দাবি, এটি মুঘল আমলের স্থাপনা এবং দক্ষিণ গফরগাঁওয়ের অন্যতম ঐতিহ্য। ডিমের মতো গোলাকৃতির এমন মসজিদ আশপাশে আর নেই বলেও জানান তিনি।

স্থানীয় সর্দার বংশের সদস্য আশরাফ সিদ্দিকী, যিনি বাবলু সর্দার নামেই পরিচিত, তিনি জানান, তাদের বংশপরম্পরায় প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী মসজিদটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মির্জা সর্দার। এটি নির্মিত হয়েছিল সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলে। তার দাবি, গফরগাঁওয়ের এটিই প্রথম মসজিদ।

তিনি আরও জানান, প্রধান গম্বুজটির চারপাশে থাকা ১২টি ছোট গম্বুজ স্থানীয়ভাবে ‘শ্রী’ নামে পরিচিত। ‘শ্রী’ শব্দের অর্থ সৌন্দর্য। বড় গম্বুজসহ মোট ১৩টি গম্বুজ। সেই ১৩টি ‘শ্রী’ থেকেই মসজিদের নাম হয়েছে ‘তেরশ্রী মসজিদ’। পরে মসজিদের নামেই পরিচিতি পেয়েছে পুরো গ্রাম। যদিও গ্রামের আগের নাম কী ছিল, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য তার জানা নেই।

বাবলু সর্দার আরও বলেন, মূল মসজিদে একসময় মাত্র ১৬ থেকে ১৮ জন মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারতেন। দেওয়ালের প্রস্থ প্রায় পৌনে চার হাত। বর্তমানে স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্যোগেই এর রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। সরকারি উদ্যোগে সংরক্ষণ করা হলে মসজিদটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব আরও ভালোভাবে তুলে ধরা সম্ভব হতো।

গ্রামের আরেক বাসিন্দা শাহজাহান সর্দার বলেন, মসজিদটি কবে নির্মিত হয়েছিল তার কোনো লিখিত তথ্য নেই। তাদের পূর্বপুরুষরাও সুনির্দিষ্ট সময় বলতে পারেননি। তিনি জানান, একসময় এ অঞ্চলে ঈশা খাঁ ও মানসিংহের শাসনের কথা প্রচলিত ছিল। পাকুন্দিয়ার এগারোসিন্দুরের প্রাচীন মসজিদের সঙ্গে তেরশ্রী মসজিদের স্থাপত্যগত মিল থাকায় তার ধারণা, এটি হয়তো ঈশা খাঁর আমলে নির্মিত হতে পারে।

মসজিদের মুয়াজ্জিন আবদুস সামাদ বলেন, অতীতে মসজিদের ভেতর ও বাইরের অংশে আরও অনেক কারুকাজ ছিল। সময়ের ব্যবধানে সেগুলোর বেশ কিছু নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ২০০৪ সালে সংস্কার করে নতুন করে রং করা হয়। এ ছাড়া মুসল্লিদের জায়গা সংকুলান না হওয়ায় পরে বাইরের অংশ সম্প্রসারণ করা হয়েছে।

প্রায় পাঁচ বছর ধরে এখানে ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মাওলানা রফিকুল ইসলাম হেলালী। তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকেই এলাকার প্রবীণদের মুখে এই মসজিদের ইতিহাস শুনে আসছি। সবাই এটিকে ৫০০ থেকে ৭০০ বছরের পুরোনো বলে জানলেও প্রকৃত বয়স নির্দিষ্ট করে বলতে পারেন না কেউই। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এই মসজিদ দেখতে আসেন। তাদের অনেকেরই বিস্ময়, এত শত বছর ধরে কীভাবে এই স্থাপনাটি অটুট রয়েছে।

তিনি বলেন, মুসলিম ঐতিহ্যের অনেক নিদর্শন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। তাই এমন প্রাচীন স্থাপনাগুলো সংরক্ষণে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

তিনি আরও বলেন, যখন এই মসজিদ নির্মিত হয়েছিল, তখন সিমেন্টের ব্যবহার ছিল না। চুন-সুড়কি ও বিভিন্ন ধরনের কষ জাতীয় উপকরণ দিয়ে এটি নির্মাণ করা হয়েছিল। আধুনিক প্রযুক্তি ছাড়াই নির্মিত এই মসজিদ আজও অনেক নতুন ভবনের চেয়েও দৃঢ়ভাবে টিকে আছে। আর সেই কারণেই তেরশ্রী মসজিদ শুধু একটি ইবাদতের স্থান নয়, এটি এ অঞ্চলের ইতিহাস, স্থাপত্য ও ঐতিহ্যেরও এক জীবন্ত সাক্ষী।

বাংলা৭১নিউজ/জেএস

Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ

রক্তঝরা ২৪ জুলাই: স্মৃতির ক্যানভাসে অশ্রু আর ক্ষোভ

ইতিহাস, স্থাপত্য ও ঐতিহ্যের এক জীবন্ত সাক্ষী তেরশ্রী মসজিদ

আপডেট সময় ১০:৩৬:৩৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬

গ্রামের সরু পথ পেরিয়ে চোখে পড়ে কালো রঙের বিশাল এক গম্বুজ। চারপাশে ছড়িয়ে আছে আরও ১২টি ছোট গম্বুজ। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকা এই স্থাপনাকে ঘিরে রয়েছে অসংখ্য গল্প, লোককথা আর ইতিহাসের টুকরো স্মৃতি। কেউ বলেন এর বয়স ৫০০ বছর, কেউ আবার দাবি করেন ৭০০ বছরেরও বেশি। নির্দিষ্ট কোনো শিলালিপি বা দলিল না থাকলেও স্থানীয় বাসিন্দাদের বিশ্বাস, এটি মুঘল আমলের নির্মাণ। মোটা দেওয়াল, গোলাকৃতির গম্বুজ ও প্রাচীন স্থাপত্যশৈলী সেই ধারণাকেই যেন আরও জোরালো করে।

ময়মনসিংহের দক্ষিণ গফরগাঁও উপজেলার উস্থি ইউনিয়নের তেরশ্রী গ্রামে অবস্থিত এই ঐতিহাসিক মসজিদ। তেরশ্রী বাজার থেকে কিছুটা ভেতরে গেলেই গ্রামের মাঝখানে চোখে পড়ে ব্যতিক্রমী এই স্থাপনাটি। সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিশাল এক গম্বুজকে ঘিরে নির্মিত মসজিদটির চারপাশে সারিবদ্ধভাবে রয়েছে আরও ১২টি ছোট গম্বুজ। ভেতর-বাইরের দেওয়ালে এখনো টিকে আছে পুরোনো কারুকাজের নানা নিদর্শন, যদিও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর অনেকটাই হারিয়ে গেছে।

মসজিদের সামনে বসে স্মৃতির ঝাঁপি খুললেন সত্তরোর্ধ্ব মো. আজিজুল হক। তার ভাষায়, বাবা-দাদারাও এই মসজিদকে বহু শত বছরের পুরোনো বলে জেনে এসেছেন। তাদের মৃত্যুরও প্রায় একশ বছর হয়ে গেছে। তিনি বলেন, একসময় বাঘেরগাঁও, কান্দিপাড়া, তেরশ্রী, নাগারকান্দি ও নূরাপাড়া এই পাঁচ গ্রামের মানুষের একমাত্র নামাজের স্থান ছিল এই মসজিদ। পরে কিছু অংশ সম্প্রসারণ করায় এখন প্রায় ১০০ জন মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারেন। তার দাবি, এটি মুঘল আমলের স্থাপনা এবং দক্ষিণ গফরগাঁওয়ের অন্যতম ঐতিহ্য। ডিমের মতো গোলাকৃতির এমন মসজিদ আশপাশে আর নেই বলেও জানান তিনি।

স্থানীয় সর্দার বংশের সদস্য আশরাফ সিদ্দিকী, যিনি বাবলু সর্দার নামেই পরিচিত, তিনি জানান, তাদের বংশপরম্পরায় প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী মসজিদটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মির্জা সর্দার। এটি নির্মিত হয়েছিল সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলে। তার দাবি, গফরগাঁওয়ের এটিই প্রথম মসজিদ।

তিনি আরও জানান, প্রধান গম্বুজটির চারপাশে থাকা ১২টি ছোট গম্বুজ স্থানীয়ভাবে ‘শ্রী’ নামে পরিচিত। ‘শ্রী’ শব্দের অর্থ সৌন্দর্য। বড় গম্বুজসহ মোট ১৩টি গম্বুজ। সেই ১৩টি ‘শ্রী’ থেকেই মসজিদের নাম হয়েছে ‘তেরশ্রী মসজিদ’। পরে মসজিদের নামেই পরিচিতি পেয়েছে পুরো গ্রাম। যদিও গ্রামের আগের নাম কী ছিল, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য তার জানা নেই।

বাবলু সর্দার আরও বলেন, মূল মসজিদে একসময় মাত্র ১৬ থেকে ১৮ জন মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারতেন। দেওয়ালের প্রস্থ প্রায় পৌনে চার হাত। বর্তমানে স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্যোগেই এর রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। সরকারি উদ্যোগে সংরক্ষণ করা হলে মসজিদটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব আরও ভালোভাবে তুলে ধরা সম্ভব হতো।

গ্রামের আরেক বাসিন্দা শাহজাহান সর্দার বলেন, মসজিদটি কবে নির্মিত হয়েছিল তার কোনো লিখিত তথ্য নেই। তাদের পূর্বপুরুষরাও সুনির্দিষ্ট সময় বলতে পারেননি। তিনি জানান, একসময় এ অঞ্চলে ঈশা খাঁ ও মানসিংহের শাসনের কথা প্রচলিত ছিল। পাকুন্দিয়ার এগারোসিন্দুরের প্রাচীন মসজিদের সঙ্গে তেরশ্রী মসজিদের স্থাপত্যগত মিল থাকায় তার ধারণা, এটি হয়তো ঈশা খাঁর আমলে নির্মিত হতে পারে।

মসজিদের মুয়াজ্জিন আবদুস সামাদ বলেন, অতীতে মসজিদের ভেতর ও বাইরের অংশে আরও অনেক কারুকাজ ছিল। সময়ের ব্যবধানে সেগুলোর বেশ কিছু নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ২০০৪ সালে সংস্কার করে নতুন করে রং করা হয়। এ ছাড়া মুসল্লিদের জায়গা সংকুলান না হওয়ায় পরে বাইরের অংশ সম্প্রসারণ করা হয়েছে।

প্রায় পাঁচ বছর ধরে এখানে ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মাওলানা রফিকুল ইসলাম হেলালী। তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকেই এলাকার প্রবীণদের মুখে এই মসজিদের ইতিহাস শুনে আসছি। সবাই এটিকে ৫০০ থেকে ৭০০ বছরের পুরোনো বলে জানলেও প্রকৃত বয়স নির্দিষ্ট করে বলতে পারেন না কেউই। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এই মসজিদ দেখতে আসেন। তাদের অনেকেরই বিস্ময়, এত শত বছর ধরে কীভাবে এই স্থাপনাটি অটুট রয়েছে।

তিনি বলেন, মুসলিম ঐতিহ্যের অনেক নিদর্শন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। তাই এমন প্রাচীন স্থাপনাগুলো সংরক্ষণে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

তিনি আরও বলেন, যখন এই মসজিদ নির্মিত হয়েছিল, তখন সিমেন্টের ব্যবহার ছিল না। চুন-সুড়কি ও বিভিন্ন ধরনের কষ জাতীয় উপকরণ দিয়ে এটি নির্মাণ করা হয়েছিল। আধুনিক প্রযুক্তি ছাড়াই নির্মিত এই মসজিদ আজও অনেক নতুন ভবনের চেয়েও দৃঢ়ভাবে টিকে আছে। আর সেই কারণেই তেরশ্রী মসজিদ শুধু একটি ইবাদতের স্থান নয়, এটি এ অঞ্চলের ইতিহাস, স্থাপত্য ও ঐতিহ্যেরও এক জীবন্ত সাক্ষী।

বাংলা৭১নিউজ/জেএস