ঢাকা ১২:৪৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬, ৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo রক্তঝরা ২৪ জুলাই: স্মৃতির ক্যানভাসে অশ্রু আর ক্ষোভ Logo ফ্ল্যাট থেকে গৃহকর্মীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার Logo ইতিহাস, স্থাপত্য ও ঐতিহ্যের এক জীবন্ত সাক্ষী তেরশ্রী মসজিদ Logo মাংস, ডিম ও ব্রয়লারের দাম স্থিতিশীল থাকলেও বেড়েছে মাছের দাম Logo সম্পর্কে যেভাবে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে ‘প্যারালাল লাইফ সিন্ড্রোম’ Logo শিক্ষার্থীদের ক্ষতি হতে দেব না: ভিডিও বার্তায় মোদী Logo আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় বললেন আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি Logo ফরিদপুরে বিএনপি নেতার আপত্তিকর ভিডিও ভাইরাল, দল থেকে বহিষ্কার Logo স্পিকার ফিরলেই পদত্যাগপত্র দেবেন রাষ্ট্রপতি, জানিয়ে দিয়েছেন বঙ্গভবনের কর্মকর্তাদেরও Logo নৌ অবরোধ তুলে নিয়ে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করার আহ্বান আসিয়ানের

রক্তঝরা ২৪ জুলাই: স্মৃতির ক্যানভাসে অশ্রু আর ক্ষোভ

কালের প্রবাহে সময় গড়িয়ে যায়, কিন্তু কিছু তারিখ ইতিহাসের পাতায় কেবল রক্তাক্ষরে লেখা থাকে না, লেখা থাকে একটি জাতির তীব্র যন্ত্রণা, কান্না আর অদম্য প্রতিরোধের গল্পে। ২৪ জুলাই, ২০২৪- বাংলাদেশের ইতিহাসে তেমনি একটি বিভীষিকাময় ও থমথমে দিন। বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা স্বৈরাচারী সরকারের ফ্যাসিস্ট আচরণ, গণতন্ত্র হরণ, ভোটাধিকার হরণ ও চরম ভোট জালিয়াতির কবলে পড়ে দেশ যখন এক দমবন্ধ করা পরিস্থিতিতে শ্বাস নিচ্ছিল, ঠিক তখনই রাজপথে নেমে এসেছিল অকুতোভয় ছাত্র-জনতা।

কিন্তু সেই ন্যায়সংগত আন্দোলন দমনে তৎকালীন ক্ষমতাশ্রয়ী শাসকগোষ্ঠী বেছে নিয়েছিল গুম, খুন এবং নজিরবিহীন গণহত্যার পথ। স্বাধিকার, রাজপথের কান্না আর অবরুদ্ধ স্বদেশের এক অদ্ভুত নীরবতায় সেদিন স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল পুরো দেশ।

স্মৃতির পাতা উল্টে ফিরে দেখা যাক উত্তাল ও রক্তঝরা সেই দিনটির করুণ অথচ ঐতিহাসিক কিছু মুহূর্ত।

কার্ফিউয়ের খড়্গ ও কৃত্রিম স্তব্ধতা

সেদিন সূর্য উঠেছিল, কিন্তু ভোরের সেই আলোয় কোনো স্বাভাবিকতার উষ্ণতা ছিল না। শহরজুড়ে সাঁজোয়া যান, বুটের আওয়াজ আর শাসকগোষ্ঠীর লেলিয়ে দেওয়া সশস্ত্র বাহিনীর সতর্ক দৃষ্টি। ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের বুকে মাত্র পাঁচ ঘণ্টার (সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা) জন্য নেমে এসেছিল এক ধরনের কৃত্রিম ‘জীবনপ্রবাহ’।

জনমানুষের স্বাভাবিক গতি স্তব্ধ করে চার ঘণ্টার জন্য খুলে দেওয়া হয়েছিল ব্যাংক, সরকারি দপ্তর আর কলকারখানা। থমকে থাকা দূরপাল্লার বাস ও নৌযানগুলো ছাড়লেও তাতে ছিল না কোনো চেনা কোলাহল; কেবল ছিল গন্তব্যে পৌঁছানোর এক ব্যাকুল তাড়াহুড়ো আর আশঙ্কা। প্রতিটি সাধারণ মানুষের চোখেমুখে ছিল একটিই ভয়- ‘বিকেল ৫টা বাজলেই তো আবার বন্দিদশা!’

ডিজিটাল অন্ধকার ও তথ্যের অবরুদ্ধতা

টানা পাঁচ দিন ধরে এক অখণ্ড ডিজিটাল অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল গোটা দেশ। রাজপথে চলা গণহত্যা ও দমন-পীড়নের খবর যেন বিশ্ববাসীর কাছে না পৌঁছায়, সেজন্যই চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল এই ডিজিটাল ব্ল্যাকআউট। আপনজনের খবর না পেয়ে দেশ-বিদেশে থাকা কোটি মানুষের বুক খালি করা উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছিল বাতাসজুড়ে।

২৪ জুলাইয়ের নিঝুম রাতে অবশেষে ফিরেছিল সামান্য প্রাণস্পন্দন- পরীক্ষামূলকভাবে চালুর ঘোষণা দেওয়া হয় ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট। কিন্তু সেই আলোও ছিল অত্যন্ত সীমিত; মোবাইল ইন্টারনেটকে তখনও রাখা হয়েছিল পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন, যাতে সাধারণ মানুষ রাজপথের সত্য তুলে ধরতে না পারে।

ভয়াল গ্রেপ্তার অভিযান

দিনটি কেবল থমথমে পরিবেশেই কাটেনি, এর আড়ালে চলেছিল ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার এক নিশব্দ হিংস্রতা। ২৪ জুলাইয়ের হিসাব অনুযায়ী, মাত্র ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে সাঁড়াশি অভিযানে তুলে নেওয়া হয়েছিল প্রায় ১,৪০০ জন তরুণ ও বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীদের—যার মধ্যে শুধুই ঢাকা শহরের বুক থেকে ৬৪১ জন।

১৭ জুলাই থেকে ২৪ জুলাই- মাত্র আট দিনে গ্রেপ্তারের সংখ্যা ছাড়িয়ে যায় সাড়ে চার হাজারের গণ্ডি। গুমোট রাতে গলির মুখে পুলিশের গাড়ির আলো, দরজায় করাঘাত আর বুটের শব্দ তখন প্রতিটি পরিবারের জন্য তৈরি করেছিল আতঙ্কের একেকটি নতুন অধ্যায়।

সমন্বয়কদের সন্ধান ও বাড়তে থাকা প্রাণহানি

সেদিনের একটি আলোচিত খবর ছিল নিখোঁজ থাকা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ, আবু বাকের মজুমদাররিফাত রশিদের সন্ধান পাওয়া। গুমের শঙ্কার মাঝে বেশ কদিন ধরে তাঁদের হদিস না পেয়ে দেশজুড়ে যে উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছিল, তাঁদের ফিরে আসায় তাতে সামান্য জল পড়েছিল।

কিন্তু সেই স্বস্তির আনন্দকে ম্লান করে দিয়েছিল হাসপাতালের আইসিইউ থেকে আসা করুণ সংবাদ। সরকারি বাহিনীর গুলিতে আহত হয়ে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে হেরে যান আরও ৪ জন আন্দোলনকারী। সরকারি ও বেসরকারি গণমাধ্যমের তৎকালীন সীমিত হিসাবেই নিহতের মোট সংখ্যা পৌঁছে যায় ২০১ জনে। রাজপথের রক্তে ভিজে সেদিন ভারাক্রান্ত হয়েছিল বাংলার বাতাস।

রাজপথের রক্তে লেখা প্রতিরোধ

২০২৪ সালের ২৪ জুলাই- কেবল একটি ক্যালেন্ডারের তারিখ ছিল না, তা ছিল এক স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে একটি শৃঙ্খলিত স্বদেশের বুকচেরা দীর্ঘশ্বাস। গুম, খুন ও কারফিউয়ের কঠিন কড়াকড়ির মাঝেই সেদিন জন্ম নিয়েছিল গণ-অভ্যুত্থানের সেই অমর স্ফুলিঙ্গ।

আজ স্মৃতির পাতায় ফিরে তাকালে ২৪ জুলাই আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়- জনগণের ভোটাধিকার হরণ করে এবং রক্তের নদী ভাসিয়ে দিয়ে কোনো স্বৈরাচারী সরকার টিকে থাকতে পারে না। ইতিহাসের সত্যকে কখনো কারফিউ দিয়ে চেপে রাখা যায় না, আর শহীদের রক্তের অক্ষরে লেখা দাবির কাছে একদিন না একদিন স্বৈরাচারের পতন নিশ্চিত হতেই হয়।

বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি

Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ

রক্তঝরা ২৪ জুলাই: স্মৃতির ক্যানভাসে অশ্রু আর ক্ষোভ

রক্তঝরা ২৪ জুলাই: স্মৃতির ক্যানভাসে অশ্রু আর ক্ষোভ

আপডেট সময় ১১:৩০:১০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬

কালের প্রবাহে সময় গড়িয়ে যায়, কিন্তু কিছু তারিখ ইতিহাসের পাতায় কেবল রক্তাক্ষরে লেখা থাকে না, লেখা থাকে একটি জাতির তীব্র যন্ত্রণা, কান্না আর অদম্য প্রতিরোধের গল্পে। ২৪ জুলাই, ২০২৪- বাংলাদেশের ইতিহাসে তেমনি একটি বিভীষিকাময় ও থমথমে দিন। বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা স্বৈরাচারী সরকারের ফ্যাসিস্ট আচরণ, গণতন্ত্র হরণ, ভোটাধিকার হরণ ও চরম ভোট জালিয়াতির কবলে পড়ে দেশ যখন এক দমবন্ধ করা পরিস্থিতিতে শ্বাস নিচ্ছিল, ঠিক তখনই রাজপথে নেমে এসেছিল অকুতোভয় ছাত্র-জনতা।

কিন্তু সেই ন্যায়সংগত আন্দোলন দমনে তৎকালীন ক্ষমতাশ্রয়ী শাসকগোষ্ঠী বেছে নিয়েছিল গুম, খুন এবং নজিরবিহীন গণহত্যার পথ। স্বাধিকার, রাজপথের কান্না আর অবরুদ্ধ স্বদেশের এক অদ্ভুত নীরবতায় সেদিন স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল পুরো দেশ।

স্মৃতির পাতা উল্টে ফিরে দেখা যাক উত্তাল ও রক্তঝরা সেই দিনটির করুণ অথচ ঐতিহাসিক কিছু মুহূর্ত।

কার্ফিউয়ের খড়্গ ও কৃত্রিম স্তব্ধতা

সেদিন সূর্য উঠেছিল, কিন্তু ভোরের সেই আলোয় কোনো স্বাভাবিকতার উষ্ণতা ছিল না। শহরজুড়ে সাঁজোয়া যান, বুটের আওয়াজ আর শাসকগোষ্ঠীর লেলিয়ে দেওয়া সশস্ত্র বাহিনীর সতর্ক দৃষ্টি। ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের বুকে মাত্র পাঁচ ঘণ্টার (সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা) জন্য নেমে এসেছিল এক ধরনের কৃত্রিম ‘জীবনপ্রবাহ’।

জনমানুষের স্বাভাবিক গতি স্তব্ধ করে চার ঘণ্টার জন্য খুলে দেওয়া হয়েছিল ব্যাংক, সরকারি দপ্তর আর কলকারখানা। থমকে থাকা দূরপাল্লার বাস ও নৌযানগুলো ছাড়লেও তাতে ছিল না কোনো চেনা কোলাহল; কেবল ছিল গন্তব্যে পৌঁছানোর এক ব্যাকুল তাড়াহুড়ো আর আশঙ্কা। প্রতিটি সাধারণ মানুষের চোখেমুখে ছিল একটিই ভয়- ‘বিকেল ৫টা বাজলেই তো আবার বন্দিদশা!’

ডিজিটাল অন্ধকার ও তথ্যের অবরুদ্ধতা

টানা পাঁচ দিন ধরে এক অখণ্ড ডিজিটাল অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল গোটা দেশ। রাজপথে চলা গণহত্যা ও দমন-পীড়নের খবর যেন বিশ্ববাসীর কাছে না পৌঁছায়, সেজন্যই চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল এই ডিজিটাল ব্ল্যাকআউট। আপনজনের খবর না পেয়ে দেশ-বিদেশে থাকা কোটি মানুষের বুক খালি করা উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছিল বাতাসজুড়ে।

২৪ জুলাইয়ের নিঝুম রাতে অবশেষে ফিরেছিল সামান্য প্রাণস্পন্দন- পরীক্ষামূলকভাবে চালুর ঘোষণা দেওয়া হয় ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট। কিন্তু সেই আলোও ছিল অত্যন্ত সীমিত; মোবাইল ইন্টারনেটকে তখনও রাখা হয়েছিল পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন, যাতে সাধারণ মানুষ রাজপথের সত্য তুলে ধরতে না পারে।

ভয়াল গ্রেপ্তার অভিযান

দিনটি কেবল থমথমে পরিবেশেই কাটেনি, এর আড়ালে চলেছিল ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার এক নিশব্দ হিংস্রতা। ২৪ জুলাইয়ের হিসাব অনুযায়ী, মাত্র ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে সাঁড়াশি অভিযানে তুলে নেওয়া হয়েছিল প্রায় ১,৪০০ জন তরুণ ও বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীদের—যার মধ্যে শুধুই ঢাকা শহরের বুক থেকে ৬৪১ জন।

১৭ জুলাই থেকে ২৪ জুলাই- মাত্র আট দিনে গ্রেপ্তারের সংখ্যা ছাড়িয়ে যায় সাড়ে চার হাজারের গণ্ডি। গুমোট রাতে গলির মুখে পুলিশের গাড়ির আলো, দরজায় করাঘাত আর বুটের শব্দ তখন প্রতিটি পরিবারের জন্য তৈরি করেছিল আতঙ্কের একেকটি নতুন অধ্যায়।

সমন্বয়কদের সন্ধান ও বাড়তে থাকা প্রাণহানি

সেদিনের একটি আলোচিত খবর ছিল নিখোঁজ থাকা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ, আবু বাকের মজুমদাররিফাত রশিদের সন্ধান পাওয়া। গুমের শঙ্কার মাঝে বেশ কদিন ধরে তাঁদের হদিস না পেয়ে দেশজুড়ে যে উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছিল, তাঁদের ফিরে আসায় তাতে সামান্য জল পড়েছিল।

কিন্তু সেই স্বস্তির আনন্দকে ম্লান করে দিয়েছিল হাসপাতালের আইসিইউ থেকে আসা করুণ সংবাদ। সরকারি বাহিনীর গুলিতে আহত হয়ে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে হেরে যান আরও ৪ জন আন্দোলনকারী। সরকারি ও বেসরকারি গণমাধ্যমের তৎকালীন সীমিত হিসাবেই নিহতের মোট সংখ্যা পৌঁছে যায় ২০১ জনে। রাজপথের রক্তে ভিজে সেদিন ভারাক্রান্ত হয়েছিল বাংলার বাতাস।

রাজপথের রক্তে লেখা প্রতিরোধ

২০২৪ সালের ২৪ জুলাই- কেবল একটি ক্যালেন্ডারের তারিখ ছিল না, তা ছিল এক স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে একটি শৃঙ্খলিত স্বদেশের বুকচেরা দীর্ঘশ্বাস। গুম, খুন ও কারফিউয়ের কঠিন কড়াকড়ির মাঝেই সেদিন জন্ম নিয়েছিল গণ-অভ্যুত্থানের সেই অমর স্ফুলিঙ্গ।

আজ স্মৃতির পাতায় ফিরে তাকালে ২৪ জুলাই আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়- জনগণের ভোটাধিকার হরণ করে এবং রক্তের নদী ভাসিয়ে দিয়ে কোনো স্বৈরাচারী সরকার টিকে থাকতে পারে না। ইতিহাসের সত্যকে কখনো কারফিউ দিয়ে চেপে রাখা যায় না, আর শহীদের রক্তের অক্ষরে লেখা দাবির কাছে একদিন না একদিন স্বৈরাচারের পতন নিশ্চিত হতেই হয়।

বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি