ঢাকা ০৩:৫১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬, ১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যান্ত্রিক সভ্যতার ছোঁয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে পালতোলা নৌকা

মাগুরার গড়াই, চিত্রা ও ফটকি নদীর বুকে একসময় বাতাসে ফুলে ওঠা রঙিন পালের সারি ছিল নিত্যদিনের দৃশ্য। যাত্রী পারাপার থেকে কৃষিপণ্য পরিবহন—সব ক্ষেত্রেই ছিল পালতোলা নৌকার দাপট। কিন্তু যান্ত্রিক সভ্যতার প্রসার, নদীর নাব্যতা সংকট এবং সড়ক যোগাযোগের উন্নয়নে সেই ঐতিহ্য আজ প্রায় বিলুপ্ত।

নদীর বুকে ভাটিয়ালি গান আর রঙিন পাল এখন কেবল প্রবীণদের স্মৃতি আর লোককথার অংশ হয়ে আছে। ‘মাঝি নাও ছাইড়া দে, মাঝি পাল উড়াইয়া দে, গা রে মাঝি গা কোনো গান’, ‘ঝড় সামলে নিও তুমি, বাঁধবো আমি ঘরের চাল, তুমি নৌকা ভাসিও গাঙ্গে, আবার আমি তুলবো পাল’ এমন অসংখ্য গান, কবিতা ও লোককথায় স্থান পেলে কালের গর্ভে প্রায় হারিয়ে গেছে, হারিয়ে গেছে সেসব জনপ্রিয় গানের রচয়িতারাও। পেশা বদলে মাঝিরাও বেছে নিচ্ছেন নতুন নতুন পেশা।

নদীমাতৃক বাংলাদেশের মানুষের জীবন-জীবিকার অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল যে নৌকা, যান্ত্রিক সভ্যতার বিকাশ, নদী-নালার নাব্যতা সংকট এবং সড়ক যোগাযোগের সম্প্রসারণে তা এখন ইতিহাসের অংশ হয়ে পড়েছে।

একসময় মাগুরার শ্রীপুরের গড়াই শালিখার ছোট চিত্রা ও ফটকি নদীতে সারি সারি পালতোলা নৌকা ছিল নিত্যদিনের দৃশ্য। যাত্রী পারাপার, কৃষিপণ্য পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে বিয়ে-সবকিছুতেই ছিল পালতোলা নৌকার ব্যবহার। নদীর বুকে বাতাসে ফুলে ওঠা রঙিন পাল আর মাঝিদের ভাটিয়ালি গান যেন গ্রামবাংলার চিরচেনা সৌন্দর্যের প্রতীক ছিল।

বর্তমানে সেই দৃশ্য আর চোখে পড়ে না। হাতে গোনা কয়েকটি নৌকা থাকলেও তাতে নেই পাল। ডিজেলচালিত ইঞ্জিনই এখন নৌযানের প্রধান ভরসা। ফলে হারিয়ে যাচ্ছে মাঝি-মাল্লাদের ঐতিহ্যবাহী জীবনধারা, সঙ্গে বিলীন হচ্ছে নদীকেন্দ্রিক লোকসংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়।

একসময় নববধূ শ্বশুরবাড়ি থেকে বাবার বাড়ি ফিরতেন পালতোলা নৌকায়। ব্যবসায়ীরা রঙিন পাল তুলে নদীপথে পণ্য নিয়ে যেতেন এক এলাকা থেকে আরেক এলাকায়। দূর-দূরান্তে ভেসে যেত মাঝিদের কণ্ঠে ভাটিয়ালি গান। এখন এসব দৃশ্য কেবল পুরোনো ছবি, গল্প আর স্মৃতিচারণেই সীমাবদ্ধ।

প্রবীণদের ভাষ্য, দুই-তিন দশক আগেও নদীপথ ছিল যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। সাম্পান, গয়না নৌকা, একমালাই, কোষা, ছিপনাও, ডিঙি, পেটকাটা ও বোঁচা নাওসহ নানা ধরনের নৌকার ব্যবহার ছিল। এসব নৌকায় হাজারীপাল, বিড়ালীপাল ও বাদুরপালের মতো বিভিন্ন ধরনের পাল লাগানো হতো।

স্থানীয় প্রবীণ মাঝিরা বাতাসের গতি-প্রকৃতি, জোয়ার-ভাটা ও আকাশের তারা দেখে নৌকা চালাতেন। লোকমুখে প্রচলিত আছে, অভিজ্ঞ মাঝিরা বাতাসের গন্ধেই ঝড়ের আগাম আভাস পেতেন। আধুনিক প্রযুক্তির আগেই প্রকৃতির সঙ্গে এমন নিবিড় সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল তাদের।

শালিখার আড়পাড়া ইউনিয়নের পুকুরিয়া গ্রামের বাসিন্দা ধলা কাজী স্মৃতিচারণ করে বলেন, ১৯৭১ সালের আগে বাবার সঙ্গে পালতোলা নৌকায় চিত্রা নদী দিয়ে বিয়ে করতে গিয়েছিলাম। ফেরার পথে কালীবাড়ি ঘাটে পৌঁছালে প্রবল বৃষ্টি শুরু হয়। বাবা বলেছিলেন, ভয় করিস না, মাঝিরা ঠিকই আমাদের পৌঁছে দেবে। সেই স্মৃতির কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি।

সুনীল নামে শ্রীপুরের এক প্রবীন মাঝি বলেন, আগে ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পালতোলা নৌকা নিয়ে নদীতে থাকতাম। যাত্রী পারাপার, ধান, পাট, খড়—সবই নৌকায় বহন করতাম। বাতাস ভালো থাকলে পাল তুলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নৌকা চলত। ইঞ্জিনচালিত নৌকা আর সড়কপথের কারণে পালতোলা নৌকার কদর একেবারেই শেষ হয়ে গেছে।

নিতাই নামে আরেক মাঝি বলেন, পালতোলা নৌকা শুধু আমাদের জীবিকার মাধ্যম ছিল না, এটি ছিল আমাদের গর্ব। ভাটিয়ালি গান গাইতে গাইতে নদী পাড়ি দিতাম। এখন ছেলেরা আর এসব শিখতে চায় না। নতুন প্রজন্মের অনেকেই জানে না পালতোলা নৌকা কীভাবে চালানো হয়। এই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে সরকারি উদ্যোগে নৌকা সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মীরা জানান, পালতোলা নৌকা শুধু একটি যানবাহন নয়, এটি বাংলার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও লোকজ ঐতিহ্যের অংশ। তাই নতুন প্রজন্মের কাছে এই ঐতিহ্য তুলে ধরতে স্থানীয় উদ্যোগে একটি সংগ্রহশালা স্থাপন, ঐতিহ্যবাহী নৌকার প্রতিরূপ সংরক্ষণ এবং নদীকেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক উৎসব আয়োজনের দাবি জানিয়েছেন তারা।

সংশ্লিষ্টদের মতে, নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা, ঐতিহ্যবাহী নৌকা নির্মাণ ও সংরক্ষণে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং লোকজ সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে হারিয়ে যেতে বসা পালতোলা নৌকার ইতিহাস অন্তত ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে জীবন্ত রাখা সম্ভব হবে।

বাংলা৭১নিউজ/জেএস

Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ

যান্ত্রিক সভ্যতার ছোঁয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে পালতোলা নৌকা

আপডেট সময় ০১:২৯:৫০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬

মাগুরার গড়াই, চিত্রা ও ফটকি নদীর বুকে একসময় বাতাসে ফুলে ওঠা রঙিন পালের সারি ছিল নিত্যদিনের দৃশ্য। যাত্রী পারাপার থেকে কৃষিপণ্য পরিবহন—সব ক্ষেত্রেই ছিল পালতোলা নৌকার দাপট। কিন্তু যান্ত্রিক সভ্যতার প্রসার, নদীর নাব্যতা সংকট এবং সড়ক যোগাযোগের উন্নয়নে সেই ঐতিহ্য আজ প্রায় বিলুপ্ত।

নদীর বুকে ভাটিয়ালি গান আর রঙিন পাল এখন কেবল প্রবীণদের স্মৃতি আর লোককথার অংশ হয়ে আছে। ‘মাঝি নাও ছাইড়া দে, মাঝি পাল উড়াইয়া দে, গা রে মাঝি গা কোনো গান’, ‘ঝড় সামলে নিও তুমি, বাঁধবো আমি ঘরের চাল, তুমি নৌকা ভাসিও গাঙ্গে, আবার আমি তুলবো পাল’ এমন অসংখ্য গান, কবিতা ও লোককথায় স্থান পেলে কালের গর্ভে প্রায় হারিয়ে গেছে, হারিয়ে গেছে সেসব জনপ্রিয় গানের রচয়িতারাও। পেশা বদলে মাঝিরাও বেছে নিচ্ছেন নতুন নতুন পেশা।

নদীমাতৃক বাংলাদেশের মানুষের জীবন-জীবিকার অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল যে নৌকা, যান্ত্রিক সভ্যতার বিকাশ, নদী-নালার নাব্যতা সংকট এবং সড়ক যোগাযোগের সম্প্রসারণে তা এখন ইতিহাসের অংশ হয়ে পড়েছে।

একসময় মাগুরার শ্রীপুরের গড়াই শালিখার ছোট চিত্রা ও ফটকি নদীতে সারি সারি পালতোলা নৌকা ছিল নিত্যদিনের দৃশ্য। যাত্রী পারাপার, কৃষিপণ্য পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে বিয়ে-সবকিছুতেই ছিল পালতোলা নৌকার ব্যবহার। নদীর বুকে বাতাসে ফুলে ওঠা রঙিন পাল আর মাঝিদের ভাটিয়ালি গান যেন গ্রামবাংলার চিরচেনা সৌন্দর্যের প্রতীক ছিল।

বর্তমানে সেই দৃশ্য আর চোখে পড়ে না। হাতে গোনা কয়েকটি নৌকা থাকলেও তাতে নেই পাল। ডিজেলচালিত ইঞ্জিনই এখন নৌযানের প্রধান ভরসা। ফলে হারিয়ে যাচ্ছে মাঝি-মাল্লাদের ঐতিহ্যবাহী জীবনধারা, সঙ্গে বিলীন হচ্ছে নদীকেন্দ্রিক লোকসংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়।

একসময় নববধূ শ্বশুরবাড়ি থেকে বাবার বাড়ি ফিরতেন পালতোলা নৌকায়। ব্যবসায়ীরা রঙিন পাল তুলে নদীপথে পণ্য নিয়ে যেতেন এক এলাকা থেকে আরেক এলাকায়। দূর-দূরান্তে ভেসে যেত মাঝিদের কণ্ঠে ভাটিয়ালি গান। এখন এসব দৃশ্য কেবল পুরোনো ছবি, গল্প আর স্মৃতিচারণেই সীমাবদ্ধ।

প্রবীণদের ভাষ্য, দুই-তিন দশক আগেও নদীপথ ছিল যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। সাম্পান, গয়না নৌকা, একমালাই, কোষা, ছিপনাও, ডিঙি, পেটকাটা ও বোঁচা নাওসহ নানা ধরনের নৌকার ব্যবহার ছিল। এসব নৌকায় হাজারীপাল, বিড়ালীপাল ও বাদুরপালের মতো বিভিন্ন ধরনের পাল লাগানো হতো।

স্থানীয় প্রবীণ মাঝিরা বাতাসের গতি-প্রকৃতি, জোয়ার-ভাটা ও আকাশের তারা দেখে নৌকা চালাতেন। লোকমুখে প্রচলিত আছে, অভিজ্ঞ মাঝিরা বাতাসের গন্ধেই ঝড়ের আগাম আভাস পেতেন। আধুনিক প্রযুক্তির আগেই প্রকৃতির সঙ্গে এমন নিবিড় সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল তাদের।

শালিখার আড়পাড়া ইউনিয়নের পুকুরিয়া গ্রামের বাসিন্দা ধলা কাজী স্মৃতিচারণ করে বলেন, ১৯৭১ সালের আগে বাবার সঙ্গে পালতোলা নৌকায় চিত্রা নদী দিয়ে বিয়ে করতে গিয়েছিলাম। ফেরার পথে কালীবাড়ি ঘাটে পৌঁছালে প্রবল বৃষ্টি শুরু হয়। বাবা বলেছিলেন, ভয় করিস না, মাঝিরা ঠিকই আমাদের পৌঁছে দেবে। সেই স্মৃতির কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি।

সুনীল নামে শ্রীপুরের এক প্রবীন মাঝি বলেন, আগে ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পালতোলা নৌকা নিয়ে নদীতে থাকতাম। যাত্রী পারাপার, ধান, পাট, খড়—সবই নৌকায় বহন করতাম। বাতাস ভালো থাকলে পাল তুলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নৌকা চলত। ইঞ্জিনচালিত নৌকা আর সড়কপথের কারণে পালতোলা নৌকার কদর একেবারেই শেষ হয়ে গেছে।

নিতাই নামে আরেক মাঝি বলেন, পালতোলা নৌকা শুধু আমাদের জীবিকার মাধ্যম ছিল না, এটি ছিল আমাদের গর্ব। ভাটিয়ালি গান গাইতে গাইতে নদী পাড়ি দিতাম। এখন ছেলেরা আর এসব শিখতে চায় না। নতুন প্রজন্মের অনেকেই জানে না পালতোলা নৌকা কীভাবে চালানো হয়। এই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে সরকারি উদ্যোগে নৌকা সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মীরা জানান, পালতোলা নৌকা শুধু একটি যানবাহন নয়, এটি বাংলার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও লোকজ ঐতিহ্যের অংশ। তাই নতুন প্রজন্মের কাছে এই ঐতিহ্য তুলে ধরতে স্থানীয় উদ্যোগে একটি সংগ্রহশালা স্থাপন, ঐতিহ্যবাহী নৌকার প্রতিরূপ সংরক্ষণ এবং নদীকেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক উৎসব আয়োজনের দাবি জানিয়েছেন তারা।

সংশ্লিষ্টদের মতে, নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা, ঐতিহ্যবাহী নৌকা নির্মাণ ও সংরক্ষণে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং লোকজ সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে হারিয়ে যেতে বসা পালতোলা নৌকার ইতিহাস অন্তত ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে জীবন্ত রাখা সম্ভব হবে।

বাংলা৭১নিউজ/জেএস