একটি জাতির আত্মপরিচয় গড়ে ওঠে তার ইতিহাস, সংস্কৃতি, ভাষা এবং মানুষের সৃজনশীল অর্জনের মধ্য দিয়ে। কিন্তু সেই পরিচয়কে বিশ্বসভায় প্রতিষ্ঠিত করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সাফল্য। আজকের পৃথিবীতে কোনো দেশের মর্যাদা শুধু তার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা অবকাঠামোগত উন্নয়নের ওপর নির্ভর করে না; নির্ভর করে সেই দেশের শিশুরা কতটা জ্ঞাননির্ভর, কতটা উদ্ভাবনী এবং কতটা আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন হয়ে উঠছে তার ওপর। এই বাস্তবতায় মাত্র আট বছর বয়সী এক শিশুর এশিয়া সেরা হওয়ার খবর নিছক একটি শিক্ষাবিষয়ক সংবাদ নয়; এটি বাংলাদেশের সম্ভাবনার এক আলোকিত প্রতিচ্ছবি।
সামিনা নূর তাজের অর্জনের মধ্যে আমরা কেবল একটি ব্যক্তিগত সাফল্য দেখি না; দেখি একটি নতুন বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি। যে বাংলাদেশ সম্পর্কে বহুদিন ধরে বলা হয়—এ দেশের তরুণরাই সবচেয়ে বড় শক্তি। কিন্তু শক্তি তখনই সম্পদে রূপান্তরিত হয়, যখন তাকে যথাযথভাবে বিকশিত করা যায়। সামিনা সেই সম্ভাবনার একটি বাস্তব উদাহরণ। আজকের শিশুরাই আগামী দিনের বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, কূটনীতিক, বিচারপতি, উদ্যোক্তা, গবেষক কিংবা রাষ্ট্রনায়ক। তাই তাদের শিক্ষা শুধু পরীক্ষার ফলাফলে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। এমন শিক্ষা দরকার, যা তাদের প্রশ্ন করতে শেখাবে, যুক্তি খুঁজতে শেখাবে, নতুন কিছু আবিষ্কার করতে শেখাবে এবং বিশ্বমানের প্রতিযোগিতায় আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে অংশ নিতে প্রস্তুত করবে। আন্তর্জাতিক অলিম্পিয়াডগুলোর মূল দর্শনও সেটিই। সেখানে মুখস্থবিদ্যার মূল্য খুব কম; মূল্য বেশি চিন্তার স্বাধীনতা, ভাষার যথাযথ ব্যবহার, বিশ্লেষণী দক্ষতা এবং বাস্তব পরিস্থিতিতে জ্ঞান প্রয়োগের ক্ষমতার।
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষাব্যবস্থার নানা সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা চলছে। পাঠ্যক্রম পরিবর্তন হয়েছে, মূল্যায়ন পদ্ধতিতে পরিবর্তন এসেছে, আবার নানা বিতর্কও তৈরি হয়েছে। কিন্তু একটি বিষয় প্রায় সবাই স্বীকার করেন—আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও বেশি দক্ষতা-ভিত্তিক, গবেষণামুখী এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করতে হবে। কারণ আগামী পৃথিবীতে শুধু ভালো ফলাফল যথেষ্ট হবে না; প্রয়োজন হবে সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা, যোগাযোগ দক্ষতা, প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা এবং বহুভাষিক পরিবেশে কাজ করার যোগ্যতা। এই প্রেক্ষাপটে সামিনা নূর তাজের অর্জন আমাদের সামনে একটি ইতিবাচক দিকনির্দেশনা তুলে ধরে। এটি প্রমাণ করে, বাংলাদেশের শিশুরা যদি সঠিক পরিবেশ পায়, তাহলে তারাও বিশ্বের সেরা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সমানতালে প্রতিযোগিতা করতে পারে। এই আত্মবিশ্বাস একটি জাতির জন্য অমূল্য সম্পদ।
আমাদের দেশে বহু পরিবার এখনও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে সন্তানের মেধা বিকাশে প্রয়োজনীয় সুযোগ দিতে পারে না। অনেক প্রতিভাবান শিশু বইয়ের অভাবে, প্রশিক্ষণের অভাবে কিংবা প্রযুক্তির অভাবে পিছিয়ে পড়ে। আবার অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকের অজ্ঞতার কারণেও শিশুর স্বাভাবিক প্রতিভা বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায় না। ফলে যে শিশুটি আন্তর্জাতিক মানের প্রতিযোগিতায় সাফল্য অর্জন করতে পারত, সে হয়তো স্থানীয় পর্যায়েই হারিয়ে যায়। রাষ্ট্র, সমাজ এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত এমন মেধাবী শিশুদের খুঁজে বের করার জন্য একটি কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা। প্রতিটি উপজেলায় যদি মেধা অনুসন্ধান কর্মসূচি পরিচালিত হয়, যদি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে ওঠে এবং যদি আর্থিকভাবে অসচ্ছল মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে আগামী এক দশকে বাংলাদেশের অবস্থান আন্তর্জাতিক শিক্ষা প্রতিযোগিতায় অনেক শক্তিশালী হতে পারে।
এখানে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোরও সামাজিক দায়বদ্ধতা রয়েছে। আমরা প্রায়ই দেখি, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান খেলাধুলা বা বিনোদনমূলক আয়োজনের পৃষ্ঠপোষকতা করে। এটি অবশ্যই ইতিবাচক। তবে একইভাবে আন্তর্জাতিক অলিম্পিয়াড, ভাষা প্রতিযোগিতা, বিজ্ঞান গবেষণা, রোবটিক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং সৃজনশীল শিক্ষা কার্যক্রমেও বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন। কারণ এগুলোই ভবিষ্যতের মানবসম্পদ গঠনের ভিত্তি। বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা ইতোমধ্যে গণিত, তথ্যপ্রযুক্তি, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন এবং প্রোগ্রামিং অলিম্পিয়াডে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছে। সামিনা নূর তাজের অর্জন সেই ধারাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বিশ্বজয়ের পথ শুরু হয় শ্রেণিকক্ষ থেকেই। একজন শিক্ষক যখন একটি শিশুকে নতুন একটি শব্দ শেখান, একটি বই পড়তে উদ্বুদ্ধ করেন কিংবা একটি প্রশ্ন করতে উৎসাহ দেন, তখন হয়তো তিনি জানেন না—সেই ছোট্ট উদ্যোগই একদিন আন্তর্জাতিক সাফল্যের ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।
আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও একটি সুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি হওয়া উচিত। কোন বিদ্যালয় সবচেয়ে বেশি জিপিএ–৫ পেল, সেটি গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো কোন বিদ্যালয় সবচেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষার্থী তৈরি করল, কতজন শিক্ষার্থী গবেষণায়, ভাষা প্রতিযোগিতায়, বিজ্ঞান মেলায় কিংবা আন্তর্জাতিক অলিম্পিয়াডে অংশ নিল। এই মানসিকতার পরিবর্তনই শিক্ষার প্রকৃত গুণগত উন্নয়নের সূচনা করতে পারে। সামিনা নূর তাজের বিদ্যালয় যেভাবে তার ভবিষ্যৎ শিক্ষার দায়িত্ব নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে, সেটি একটি ইতিবাচক উদাহরণ। দেশের অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও যদি তাদের মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা তহবিল গঠন করে, তাহলে অনেক প্রতিভাবান শিক্ষার্থী আর্থিক সংকটে থেমে যাবে না। শিক্ষা তখন কেবল পাঠদান নয়, বরং প্রতিভা লালনের একটি পূর্ণাঙ্গ প্রক্রিয়ায় পরিণত হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই যুগে আরেকটি দায়িত্ব আমাদের সবার। আমরা যেন কোনো শিশুর সাফল্যকে ক্ষণিকের ভাইরাল ঘটনায় পরিণত না করি। বরং তার অর্জন থেকে শিক্ষা নিয়ে আরও হাজারো শিশুকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা দিই। একটি ইতিবাচক সমাজ সেই সমাজই, যেখানে একজনের সাফল্য অন্যজনের ঈর্ষার কারণ নয়; বরং নতুন স্বপ্ন দেখার প্রেরণা হয়ে ওঠে। আজ সামিনা নূর তাজ এশিয়ার শীর্ষে উঠে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করেছে। কিন্তু প্রকৃত সাফল্য তখনই আসবে, যখন আগামী বছর আরেকজন সামিনা, তার পরের বছর আরও দশজন, তারপর শত শত বাংলাদেশি শিশু আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় দেশের পতাকা বহন করবে। একটি শিশুর সাফল্য যদি একটি জাতীয় আন্দোলনের সূচনা করতে পারে—মেধা বিকাশের আন্দোলন, মানসম্মত শিক্ষার আন্দোলন, বিশ্বমানের মানবসম্পদ তৈরির আন্দোলন—তাহলেই এই অর্জনের পূর্ণ মূল্যায়ন হবে।
এই কারণেই সামিনা নূর তাজের এশিয়া সেরা হওয়া কেবল একটি সংবাদ নয়; এটি একটি বার্তা। সেই বার্তা হলো- বাংলাদেশ পারে, বাংলাদেশের শিশুরা পারে, যদি আমরা তাদের বিশ্বাস করি, সুযোগ দিই এবং তাদের পাশে দাঁড়াই। কারণ প্রতিটি শিশুর মধ্যেই একটি সম্ভাবনার মহাবিশ্ব লুকিয়ে থাকে। সেই সম্ভাবনাকে বিকশিত করার দায়িত্ব পরিবার, বিদ্যালয়, সমাজ এবং রাষ্ট্র—সবার।
আজ আমরা সামিনা নূর তাজকে অভিনন্দন জানাই। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা, আমরা যেন এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলার অঙ্গীকার করি, যেখানে কোনো মেধাবী শিশু সুযোগের অভাবে পিছিয়ে থাকবে না; যেখানে প্রতিটি বিদ্যালয় স্বপ্ন দেখাবে, প্রতিটি শিক্ষক আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলবেন, প্রতিটি পরিবার সন্তানকে শেখার আনন্দ উপহার দেবে এবং প্রতিটি শিশুই বিশ্বাস করবে- বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের পতাকা বহন করার অধিকার তারও আছে।
◊লেখক একজন সাংবাদিক ও কলামিস্ট
























