ঢাকা ০২:৩২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬, ১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সকালের এই ভুলেই সারাদিন ক্লান্ত লাগে

ভোরের শুরুটাই অনেক সময় ঠিক করে দেয় পুরো দিনটি কেমন কাটবে। ঘুম থেকে উঠেই তাড়াহুড়ো, এক কাপ কফিতে ভরসা কিংবা ওজন কমানোর চিন্তায় খাবার এড়িয়ে যাওয়া অনেকেরই নিত্যদিনের অভ্যাস। বাইরে থেকে এসব খুব সাধারণ মনে হলেও, বিশেষজ্ঞদের মতে এই অভ্যাসগুলো শরীরের কর্টিসল বা স্ট্রেস হরমোনের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। দীর্ঘদিন এমন চলতে থাকলে ক্লান্তি, উদ্বেগ, ঘুমের সমস্যা, এমনকি বিপাকক্রিয়ার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

কর্টিসলকে সাধারণত ‘স্ট্রেস হরমোন’ বলা হলেও এটি আসলে শরীরের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিডনির ওপর অবস্থিত অ্যাড্রিনাল গ্রন্থি থেকে এই হরমোন নিঃসৃত হয় এবং ঘুম থেকে ওঠা, শক্তি উৎপাদন, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, বিপাকক্রিয়া ও মানসিক চাপ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, ভোর ৬টা থেকে সকাল ৮টার মধ্যে কর্টিসলের মাত্রা স্বাভাবিকভাবেই সর্বোচ্চ থাকে। এরপর ধীরে ধীরে তা কমে রাতের দিকে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছায়। তাই দিনের শুরুতেই এমন কিছু করা জরুরি, যা এই স্বাভাবিক ছন্দকে ব্যাহত না করে বরং সহায়তা করে।

ভুল খাবার নির্বাচন
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রথম ভুলটি হলো কম শর্করাযুক্ত খাবারের নামে ঘরে তৈরি স্বাভাবিক খাবার থেকে নিজেকে বঞ্চিত করা। অনেকেই ওজন কমানোর আশায় ভাত, রুটি বা অন্যান্য শর্করাজাতীয় খাবার পুরোপুরি বাদ দেন। কিন্তু ক্লিনিক্যাল পুষ্টিবিদদের মতে, পরিমিত শর্করা শরীরে সেরোটোনিন তৈরিতে সাহায্য করে, যা মানসিক চাপ কমাতে এবং ভালো ঘুমে ভূমিকা রাখে। ফলে একেবারে শর্করা বাদ দেওয়ার পরিবর্তে সুষম খাদ্যাভ্যাসই শরীরের জন্য বেশি উপকারী।

নাশতা বাদ দেওয়া
দ্বিতীয় যে অভ্যাসটি নিয়ে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা, তা হলো সকালের নাশতা বাদ দেওয়া। অনেকেই ঘুম থেকে উঠে শুধু কফি পান করেন, কেউ কেউ আবার ধূমপান দিয়ে দিন শুরু করেন। এতে কর্টিসলের উচ্চ মাত্রা আরও দীর্ঘ সময় বজায় থাকতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এর ফলে পেটের চারপাশে চর্বি জমা, ইনসুলিন প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিপাকজনিত নানা সমস্যা দেখা দেওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। তাই সকালে পুষ্টিকর নাশতা খাওয়ার অভ্যাস শরীরকে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করতে পারে।

ফল খাওয়া
তৃতীয় ভুলটি ফল খাওয়া নিয়ে। অনেকে ফলের প্রাকৃতিক মিষ্টতার কারণে সেগুলো পুরোপুরি এড়িয়ে চলেন। আবার কেউ কেউ খালি পেটে শুধু ফল খেয়ে নেন। পুষ্টিবিদদের মতে, ফলে থাকা প্রাকৃতিক শর্করা শরীরে দ্রুত গ্লুকোজে রূপ নিতে পারে। তাই ফল খাওয়ার সময় এর সঙ্গে প্রোটিন, স্বাস্থ্যকর চর্বি বা আঁশসমৃদ্ধ খাবার রাখলে রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমে। বিশেষ করে বেশি মিষ্টি ফল খাওয়ার ক্ষেত্রে এই বিষয়টি মাথায় রাখা ভালো।

আরও কিছু জরুরি বিষয়
শুধু খাদ্যাভ্যাস নয়, সকালের জীবনযাপনও কর্টিসলের ভারসাম্যে প্রভাব ফেলে। পর্যাপ্ত ও মানসম্মত ঘুম, নিয়মিত শরীরচর্চা, গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলন, হাসিখুশি থাকা এবং পরিবারের সদস্য বা সহকর্মীদের সঙ্গে ইতিবাচক সম্পর্ক বজায় রাখা মানসিক চাপ কমাতে কার্যকর হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত এসব অভ্যাস গড়ে তুললে শুধু কর্টিসল নিয়ন্ত্রণেই নয়, সারাদিনের মনোযোগ, কর্মক্ষমতা ও মানসিক সুস্থতাও বাড়ে।

স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন মানেই কঠোর নিয়মে নিজেকে বেঁধে ফেলা নয়। বরং প্রতিদিনের ছোট ছোট সচেতন সিদ্ধান্তই শরীর ও মনের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই সকালে কী দিয়ে দিন শুরু করছেন, সেটিও আপনার সুস্থতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।

বাংলা৭১নিউজ/জেএস

Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ

সকালের এই ভুলেই সারাদিন ক্লান্ত লাগে

আপডেট সময় ০১:১০:০৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬

ভোরের শুরুটাই অনেক সময় ঠিক করে দেয় পুরো দিনটি কেমন কাটবে। ঘুম থেকে উঠেই তাড়াহুড়ো, এক কাপ কফিতে ভরসা কিংবা ওজন কমানোর চিন্তায় খাবার এড়িয়ে যাওয়া অনেকেরই নিত্যদিনের অভ্যাস। বাইরে থেকে এসব খুব সাধারণ মনে হলেও, বিশেষজ্ঞদের মতে এই অভ্যাসগুলো শরীরের কর্টিসল বা স্ট্রেস হরমোনের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। দীর্ঘদিন এমন চলতে থাকলে ক্লান্তি, উদ্বেগ, ঘুমের সমস্যা, এমনকি বিপাকক্রিয়ার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

কর্টিসলকে সাধারণত ‘স্ট্রেস হরমোন’ বলা হলেও এটি আসলে শরীরের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিডনির ওপর অবস্থিত অ্যাড্রিনাল গ্রন্থি থেকে এই হরমোন নিঃসৃত হয় এবং ঘুম থেকে ওঠা, শক্তি উৎপাদন, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, বিপাকক্রিয়া ও মানসিক চাপ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, ভোর ৬টা থেকে সকাল ৮টার মধ্যে কর্টিসলের মাত্রা স্বাভাবিকভাবেই সর্বোচ্চ থাকে। এরপর ধীরে ধীরে তা কমে রাতের দিকে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছায়। তাই দিনের শুরুতেই এমন কিছু করা জরুরি, যা এই স্বাভাবিক ছন্দকে ব্যাহত না করে বরং সহায়তা করে।

ভুল খাবার নির্বাচন
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রথম ভুলটি হলো কম শর্করাযুক্ত খাবারের নামে ঘরে তৈরি স্বাভাবিক খাবার থেকে নিজেকে বঞ্চিত করা। অনেকেই ওজন কমানোর আশায় ভাত, রুটি বা অন্যান্য শর্করাজাতীয় খাবার পুরোপুরি বাদ দেন। কিন্তু ক্লিনিক্যাল পুষ্টিবিদদের মতে, পরিমিত শর্করা শরীরে সেরোটোনিন তৈরিতে সাহায্য করে, যা মানসিক চাপ কমাতে এবং ভালো ঘুমে ভূমিকা রাখে। ফলে একেবারে শর্করা বাদ দেওয়ার পরিবর্তে সুষম খাদ্যাভ্যাসই শরীরের জন্য বেশি উপকারী।

নাশতা বাদ দেওয়া
দ্বিতীয় যে অভ্যাসটি নিয়ে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা, তা হলো সকালের নাশতা বাদ দেওয়া। অনেকেই ঘুম থেকে উঠে শুধু কফি পান করেন, কেউ কেউ আবার ধূমপান দিয়ে দিন শুরু করেন। এতে কর্টিসলের উচ্চ মাত্রা আরও দীর্ঘ সময় বজায় থাকতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এর ফলে পেটের চারপাশে চর্বি জমা, ইনসুলিন প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিপাকজনিত নানা সমস্যা দেখা দেওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। তাই সকালে পুষ্টিকর নাশতা খাওয়ার অভ্যাস শরীরকে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করতে পারে।

ফল খাওয়া
তৃতীয় ভুলটি ফল খাওয়া নিয়ে। অনেকে ফলের প্রাকৃতিক মিষ্টতার কারণে সেগুলো পুরোপুরি এড়িয়ে চলেন। আবার কেউ কেউ খালি পেটে শুধু ফল খেয়ে নেন। পুষ্টিবিদদের মতে, ফলে থাকা প্রাকৃতিক শর্করা শরীরে দ্রুত গ্লুকোজে রূপ নিতে পারে। তাই ফল খাওয়ার সময় এর সঙ্গে প্রোটিন, স্বাস্থ্যকর চর্বি বা আঁশসমৃদ্ধ খাবার রাখলে রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমে। বিশেষ করে বেশি মিষ্টি ফল খাওয়ার ক্ষেত্রে এই বিষয়টি মাথায় রাখা ভালো।

আরও কিছু জরুরি বিষয়
শুধু খাদ্যাভ্যাস নয়, সকালের জীবনযাপনও কর্টিসলের ভারসাম্যে প্রভাব ফেলে। পর্যাপ্ত ও মানসম্মত ঘুম, নিয়মিত শরীরচর্চা, গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলন, হাসিখুশি থাকা এবং পরিবারের সদস্য বা সহকর্মীদের সঙ্গে ইতিবাচক সম্পর্ক বজায় রাখা মানসিক চাপ কমাতে কার্যকর হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত এসব অভ্যাস গড়ে তুললে শুধু কর্টিসল নিয়ন্ত্রণেই নয়, সারাদিনের মনোযোগ, কর্মক্ষমতা ও মানসিক সুস্থতাও বাড়ে।

স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন মানেই কঠোর নিয়মে নিজেকে বেঁধে ফেলা নয়। বরং প্রতিদিনের ছোট ছোট সচেতন সিদ্ধান্তই শরীর ও মনের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই সকালে কী দিয়ে দিন শুরু করছেন, সেটিও আপনার সুস্থতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।

বাংলা৭১নিউজ/জেএস