ঢাকা ০৪:৪৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬, ২৪ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম

মানুষ কেন সহজে প্রাক্তনকে ভুলতে পারে না

সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পরও কোনো পুরনো গান, ভেজা বিকেলের আলো কিংবা চেনা কোনো রাস্তা হঠাৎ করে প্রাক্তনের স্মৃতি ফিরিয়ে আনে। অনেকের মনেই তখন প্রশ্ন জাগে মানুষ কি সত্যিই প্রাক্তনকে ভুলতে পারে? মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এর উত্তর এতটা সহজ নয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিছু মানুষ শুধু জীবনের একটি সম্পর্ক হয়ে আসে না; তারা ধীরে ধীরে একজন মানুষের আবেগ, অভ্যাস ও মানসিক জগতের অংশ হয়ে ওঠে। তাই বিচ্ছেদ মানেই শুধু আলাদা হয়ে যাওয়া নয়, বরং এক ধরনের আবেগিক শূন্যতার মুখোমুখি হওয়া।

বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী জন বোলবির অ্যাটাচমেন্ট থিও, মানুষের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক কেবল ভালোবাসার অনুভূতির ওপর নির্ভর করে না; এটি এক ধরনের আবেগিক নিরাপত্তাব্যবস্থা হিসেবেও কাজ করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সময় একসঙ্গে থাকার ফলে প্রিয় মানুষটি শুধু একজন ব্যক্তি হিসেবে নয়, বরং ভরসা, আশ্রয় ও দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠেন। ফলে বিচ্ছেদের পর সেই শূন্যতা কাটিয়ে উঠতে সময় লাগে।

মনোবিজ্ঞান বলছে, মানুষের মস্তিষ্ক অনেক সময় কষ্টের চেয়ে সুখের স্মৃতিগুলোকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে সংরক্ষণ করে। তাই সম্পর্ক শেষ হওয়ার পর একাকিত্বের মুহূর্তে সুখের স্মৃতিগুলোই বেশি ফিরে আসে।

এর ফলে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে, সবকিছু কি সত্যিই শেষ হয়ে গিয়েছিল? এই ধরনের চিন্তা মানুষকে বারবার অতীতের দিকে টেনে নিয়ে যেতে পারে।

সব সম্পর্ক সমাপ্তির স্পষ্ট ব্যাখ্যা নিয়ে শেষ হয় না। অনেক সময় কোনো কারণ না জেনেই সম্পর্ক ভেঙে যায়। তখন থেকে যায় না বলা কথা, অমীমাংসিত প্রশ্ন এবং অপূর্ণ আবেগ।

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, অসমাপ্ত অভিজ্ঞতা মানুষের মনে দীর্ঘদিন সক্রিয় থাকে। কারণ মস্তিষ্ক স্বাভাবিকভাবেই একটি গল্পের শেষ খুঁজতে চায়। তাই অপূর্ণ সম্পর্কের স্মৃতি অনেক সময় আরও গভীরভাবে মনে গেঁথে থাকে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিচ্ছেদের পর মানুষ সব সময় প্রাক্তন ব্যক্তিকেই মিস করে না। অনেক সময় সে মিস করে সেই সম্পর্কের মাধ্যমে পাওয়া যত্ন, নিরাপত্তা, মনোযোগ এবং মানসিক সঙ্গকে।

এই আবেগিক সহায়তার অভাবই অনেকের কাছে প্রাক্তনকে ভুলে যাওয়াকে কঠিন করে তোলে।

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, ভালোবাসা কোনো সুইচের মতো নয়, যা মুহূর্তেই বন্ধ হয়ে যায়। সম্পর্ক শেষ হলেও আবেগ ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়। নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে সময় লাগে, আর এই সময়টুকুতেই অনেকের কাছে প্রাক্তনের স্মৃতি বারবার ফিরে আসে।

আধুনিক মনোবিজ্ঞানী কার্লা ম্যারি ম্যানলির মতে, প্রেমের সম্পর্ক শুধু আবেগের বিষয় নয়, এটি এক ধরনের স্নায়বিক বন্ধনও।

দীর্ঘ সময় একসঙ্গে থাকা, মানসিক নির্ভরতা এবং ঘনিষ্ঠতার মাধ্যমে মস্তিষ্ক একটি মানুষকে নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত করে ফেলে। সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পরও সেই শেখা অভ্যাস সহজে বদলায় না। ফলে মন বারবার পুরোনো নিরাপত্তাবোধের দিকে ফিরে যেতে চায়।

বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, সময় সব স্মৃতি মুছে দেয় না। বরং মানুষকে সেই স্মৃতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে শেখায়। একসময় যে স্মৃতি গভীর কষ্টের কারণ ছিল, সময়ের সঙ্গে সেটিই জীবনের একটি অভিজ্ঞতা হয়ে থাকে।

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, প্রাক্তনকে সহজে ভুলতে না পারা কোনো দুর্বলতার লক্ষণ নয়। বরং এটি প্রমাণ করে, একসময় সেই মানুষটি জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন।

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দেন, অতীতের স্মৃতিকে সম্মান জানিয়েই বর্তমান ও ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়াই মানসিক সুস্থতার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলা৭১নিউজ/জেএস

Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ

প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি গড়ে তুলতে স্মার্ট প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াচ্ছে সরকার

মানুষ কেন সহজে প্রাক্তনকে ভুলতে পারে না

আপডেট সময় ০২:৩৩:৩৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ৮ জুলাই ২০২৬

সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পরও কোনো পুরনো গান, ভেজা বিকেলের আলো কিংবা চেনা কোনো রাস্তা হঠাৎ করে প্রাক্তনের স্মৃতি ফিরিয়ে আনে। অনেকের মনেই তখন প্রশ্ন জাগে মানুষ কি সত্যিই প্রাক্তনকে ভুলতে পারে? মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এর উত্তর এতটা সহজ নয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিছু মানুষ শুধু জীবনের একটি সম্পর্ক হয়ে আসে না; তারা ধীরে ধীরে একজন মানুষের আবেগ, অভ্যাস ও মানসিক জগতের অংশ হয়ে ওঠে। তাই বিচ্ছেদ মানেই শুধু আলাদা হয়ে যাওয়া নয়, বরং এক ধরনের আবেগিক শূন্যতার মুখোমুখি হওয়া।

বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী জন বোলবির অ্যাটাচমেন্ট থিও, মানুষের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক কেবল ভালোবাসার অনুভূতির ওপর নির্ভর করে না; এটি এক ধরনের আবেগিক নিরাপত্তাব্যবস্থা হিসেবেও কাজ করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সময় একসঙ্গে থাকার ফলে প্রিয় মানুষটি শুধু একজন ব্যক্তি হিসেবে নয়, বরং ভরসা, আশ্রয় ও দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠেন। ফলে বিচ্ছেদের পর সেই শূন্যতা কাটিয়ে উঠতে সময় লাগে।

মনোবিজ্ঞান বলছে, মানুষের মস্তিষ্ক অনেক সময় কষ্টের চেয়ে সুখের স্মৃতিগুলোকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে সংরক্ষণ করে। তাই সম্পর্ক শেষ হওয়ার পর একাকিত্বের মুহূর্তে সুখের স্মৃতিগুলোই বেশি ফিরে আসে।

এর ফলে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে, সবকিছু কি সত্যিই শেষ হয়ে গিয়েছিল? এই ধরনের চিন্তা মানুষকে বারবার অতীতের দিকে টেনে নিয়ে যেতে পারে।

সব সম্পর্ক সমাপ্তির স্পষ্ট ব্যাখ্যা নিয়ে শেষ হয় না। অনেক সময় কোনো কারণ না জেনেই সম্পর্ক ভেঙে যায়। তখন থেকে যায় না বলা কথা, অমীমাংসিত প্রশ্ন এবং অপূর্ণ আবেগ।

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, অসমাপ্ত অভিজ্ঞতা মানুষের মনে দীর্ঘদিন সক্রিয় থাকে। কারণ মস্তিষ্ক স্বাভাবিকভাবেই একটি গল্পের শেষ খুঁজতে চায়। তাই অপূর্ণ সম্পর্কের স্মৃতি অনেক সময় আরও গভীরভাবে মনে গেঁথে থাকে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিচ্ছেদের পর মানুষ সব সময় প্রাক্তন ব্যক্তিকেই মিস করে না। অনেক সময় সে মিস করে সেই সম্পর্কের মাধ্যমে পাওয়া যত্ন, নিরাপত্তা, মনোযোগ এবং মানসিক সঙ্গকে।

এই আবেগিক সহায়তার অভাবই অনেকের কাছে প্রাক্তনকে ভুলে যাওয়াকে কঠিন করে তোলে।

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, ভালোবাসা কোনো সুইচের মতো নয়, যা মুহূর্তেই বন্ধ হয়ে যায়। সম্পর্ক শেষ হলেও আবেগ ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়। নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে সময় লাগে, আর এই সময়টুকুতেই অনেকের কাছে প্রাক্তনের স্মৃতি বারবার ফিরে আসে।

আধুনিক মনোবিজ্ঞানী কার্লা ম্যারি ম্যানলির মতে, প্রেমের সম্পর্ক শুধু আবেগের বিষয় নয়, এটি এক ধরনের স্নায়বিক বন্ধনও।

দীর্ঘ সময় একসঙ্গে থাকা, মানসিক নির্ভরতা এবং ঘনিষ্ঠতার মাধ্যমে মস্তিষ্ক একটি মানুষকে নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত করে ফেলে। সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পরও সেই শেখা অভ্যাস সহজে বদলায় না। ফলে মন বারবার পুরোনো নিরাপত্তাবোধের দিকে ফিরে যেতে চায়।

বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, সময় সব স্মৃতি মুছে দেয় না। বরং মানুষকে সেই স্মৃতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে শেখায়। একসময় যে স্মৃতি গভীর কষ্টের কারণ ছিল, সময়ের সঙ্গে সেটিই জীবনের একটি অভিজ্ঞতা হয়ে থাকে।

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, প্রাক্তনকে সহজে ভুলতে না পারা কোনো দুর্বলতার লক্ষণ নয়। বরং এটি প্রমাণ করে, একসময় সেই মানুষটি জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন।

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দেন, অতীতের স্মৃতিকে সম্মান জানিয়েই বর্তমান ও ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়াই মানসিক সুস্থতার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলা৭১নিউজ/জেএস