রাজধানীর মগবাজারের আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর পর লাইসেন্স বাতিল হওয়ায় সৃষ্ট অচলাবস্থা কাটেনি। একদিকে হাসপাতালটির কার্যক্রম বন্ধ থাকায় ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা, অন্যদিকে মেডিকেল কলেজে অধ্যয়নরত ২৯৫ জন বিদেশি শিক্ষার্থীসহ শত শত শিক্ষার্থী পড়েছেন চরম অনিশ্চয়তায়। বিষয়টির সমাধানে বিদেশি মেডিকেল শিক্ষার্থী, দেশীয় রোগী এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বেশ দৌড়ঝাঁপ করছেন। ব্যাপক আলোচনা হয়েছে জাতীয় সংসদেও। সরকারের সব শর্ত মেনে হাসপাতাল চালু করতে সম্মত কর্তৃপক্ষ। সরকারও এ বিষয়ে নমনীয়।
আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশনের পরিচালক (কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স) তারিকুল ইসলাম মুকুল বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে যেসব ত্রুটির কথা বলা হয়েছিল, আমরা সেগুলো সংশোধন করে সচিব বরাবর আবেদন করেছি। এখন তাদের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়।
তবে, রোববার (২৮ জুন) জাতীয় সংসদে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের অব্যবস্থাপনার বর্ণনা দিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, আদ্-দ্বীন হাসপাতালে চিকিৎসকদের গাফিলতি, সেন্ট্রাল এসি বন্ধ থাকা এবং পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহের অভাবের কারণে একই দিনে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। হাইপারক্যাপনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে যখন শিশুদের হাত-পা কাঁপছিল, তখন সেন্ট্রাল এসি বন্ধ ছিল।
কোনো জানালা খোলা ছিল না এবং জরুরি অক্সিজেন সাপোর্টও পাওয়া যায়নি। ১৬ থেকে ১৭ জন মা যখন তাদের সন্তানদের বাঁচানোর জন্য হাসপাতাল চত্বরে ছোটাছুটি করছিলেন, তখন সেখানে কোনো অন-ডিউটি চিকিৎসকও ছিলেন না। এমনকি নার্সদের ডাকলেও তারা সাড়া দেননি। কার্বন ডাই-অক্সাইডের বিষক্রিয়ায় শিশুরা মারা যায়।
তিনি বলেন, লাইসেন্সের শর্ত লঙ্ঘন ও চরম অব্যবস্থাপনার কারণে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এরই মধ্যে হাসপাতালটির লাইসেন্স স্থগিত করেছে। পাশাপাশি পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে সরকারি তত্ত্বাবধানে নতুন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
যদিও এতদিন বলা হচ্ছিল— লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। এজন্য হাসপাতাল বন্ধ করেও দেওয়া হয়। তবে এখন মন্ত্রী কেন বলছেন লাইসেন্স স্থগিত? এমন প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, এটি শব্দ চয়নের তারতম্য হতে পারে। মূলত লাইসেন্স বাতিলই করা হয়েছে।
আদ্-দ্বীন হাসপাতালের বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত কী হতে পারে? জবাবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেন, আমি যতটুকু জেনেছি, তারা আপিল করেছেন। হয়তো প্রক্রিয়াগতভাবে সরকার একটি সিদ্ধান্ত নেবে।
হাসপাতাল বন্ধ থাকলেও মেডিকেল কলেজ চালু রয়েছে। তবে ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিস ও ইন্টার্নশিপের জন্য শিক্ষার্থীরা পড়েছেন বড় সংকটে। বিশেষ করে ভারত ও মালদ্বীপের ২৯৫ জন শিক্ষার্থী নিজ দেশের মেডিকেল কাউন্সিলের নিয়ম নিয়ে শঙ্কিত। একাধিক শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, তাদের দেশের নিয়ম অনুযায়ী ইন্টার্নশিপ সম্পন্ন করতে হয় মেডিকেল কলেজ-সংযুক্ত হাসপাতালেই। অন্য কোনো হাসপাতালে ইন্টার্নশিপ করলে তা তাদের দেশে স্বীকৃতি পাবে না। ফলে তাদের ৬-৭ বছরের এই পরিশ্রম বিফলে যাবে। ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যাবে।
ইন্ডিয়ান মেডিকেল রেগুলেটরি ফ্রেমওয়ার্ক অনুযায়ী, ডিগ্রি সম্পন্ন করা ওই প্রতিষ্ঠানের হাসপাতালেই ইন্টার্নশিপ করতে হয়। শিক্ষার্থীরা আশঙ্কা করছেন, এখন অন্য কোনো হাসপাতালে তাদের পাঠিয়ে দেওয়া হলে তাদের পুরো শিক্ষাজীবন ও পেশাগত ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। এ বিষয়ে প্রতিকার চেয়ে তারা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরে স্মারকলিপি দিয়েছেন।
স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল হোসেন এ বিষয়ে গণমাধ্যমকে বলেন, আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর হাসপাতালের বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেবে তার ওপর। কলেজের শিক্ষার্থীদের বিষয়টি আমাদের বিবেচনায় আছে, এটা নিয়ে এখনই আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।
তার এই বক্তব্যের সূত্র ধরে মন্ত্রণালয়ের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এরই মধ্যে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তন হয়েছে। হাসপাতালের এরিয়ায় বেকারি না রাখা, ভবনের কাঠামো সংস্কারসহ বেশকিছু শর্ত দিয়ে হাসপাতালের লাইসেন্স ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে ভাবছে সরকার। যেহেতু কর্তৃপক্ষ সরকারের শর্ত মানতে রাজি, তাই সরকারও জনস্বার্থে হাসপাতাল সচল করতে সম্মত।
দীর্ঘদিন স্বল্পমূল্যে মানসম্মত চিকিৎসাসেবা দেওয়ার জন্য পরিচিত আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের পর সাধারণ রোগীরাও সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। লাইসেন্স পুনর্বহালের দাবিতে মানববন্ধনও করেন অনেকে। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে আয়োজিত মানববন্ধনে বক্তারা দাবি জানান, নবজাতক মৃত্যুর ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি এমন প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত, যাতে শিক্ষার্থী ও সাধারণ রোগীরা দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির শিকার না হন।
আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কার্যক্রম বন্ধ হওয়ায় সাশ্রয়ীমূল্যে স্বল্প আয়ের মানুষ চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে দাবি করে হাসপাতালটির প্রতি সংহতি জানিয়েছেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের চেয়ারপারসন শিরীন পারভিন। রোগীবান্ধব হাসপাতাল হিসেবে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের স্বাভাবিক কার্যক্রম অতি দ্রুত শুরু করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আদ্-দ্বীন হাসপাতাল সীমিত ও স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ীমূল্যে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত।
এই হাসপাতালের মাধ্যমে লাখ লাখ দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত মানুষ দীর্ঘদিন স্বল্পমূল্যে সুচিকিৎসা পেয়ে আসছে। সম্প্রতি ওই হাসপাতালে ঘটে যাওয়া একটি দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে সরকার হাসপাতালের কার্যক্রম বন্ধ করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং সুবিবেচনাপ্রসূত নয় বলেই আমরা মনে করি।
ছয় শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করা সর্বোত্তম সমাধান নয় বলে মন্তব্য করেছে বেসরকারি হাসপাতাল মালিকদের সংগঠন বিপিএইচসিডিএ। সংগঠনটির সভাপতি ডা. মো. মোসাদ্দেক হোসেন বিশ্বাস ডাম্বেল ও মহাসচিব ডা. এ এম শামীম এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক, বেদনাদায়ক এবং অনাকাঙ্ক্ষিত।
তদন্তের মাধ্যমে যদি কোনো ধরনের অবহেলা বা দায়িত্বে ঘাটতির প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া অবশ্যই প্রয়োজন। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া আবশ্যক। তবে, একটি নির্দিষ্ট ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে দীর্ঘদিনের চিকিৎসা সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স স্থায়ীভাবে বাতিল করে দেওয়া সমস্যার সর্বোত্তম সমাধান নয়। এতে মূলত ক্ষতিগ্রস্ত হবে মধ্যবিত্ত, গরিব ও নিম্নবিত্ত শ্রেণির মানুষ; যারা ব্যয়বহুল হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নিতে সমর্থ নয়— যা মোটেও কাম্য নয়।
জামায়াত সমর্থিত চিকিৎসকদের সংগঠন এনডিএফ এবং এনসিপির চিকিৎসক সংগঠন এনএইচএ এ বিষয়ে পৃথক বিবৃতিতে হাসপাতাল বন্ধের বিরোধিতা করেছে।
আদ্-দ্বীন হাসপাতাল ও মৃত ছয় নবজাতকের পরিবারের আইনজীবী অ্যাডভোকেট শিশির মনিরের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।
বাংলা৭১নিউজ/এসএএইচ