মাদকের ছোবল থেকে দেশের মানুষকে রক্ষার বড় দায়িত্ব পালন করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। অস্ত্র না থাকায় ঝুঁকি নিয়ে তারা মাদকের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করেন। এতে তাদের আহত-নিহত হওয়ার ঘটনাও কম নয়। শিগগির তাদের দীর্ঘদিনের চাওয়া পূরণ হচ্ছে।
পুলিশের সহযোগিতা নিয়ে অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা অভিযান পরিচালনা করলেও মাদক সন্ত্রাসীদের হাতে তাদের প্রায়ই জখম হতে হয়। এ ঘটনা থেকে রেহাই পেতে নিজেরা অস্ত্র ব্যবহারের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। সে দাবিতে সায় মিলেছে সরকারের।
সম্প্রতি গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে রাজধানীর সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল সংলগ্ন এলাকায় অভিযানে যান মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণের কর্মকর্তারা। অভিযানে হঠাৎ গুলি করেন মাদক কারবারিরা। গুলিতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিদর্শক সিদ্দিকুর রহমান আহত হন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেন।
মাদক অভিযান পরিচালনাকালে সিদ্দিকুরের মতো এখন পর্যন্ত অধিদপ্তরের ১২৫ জন সদস্য গুরুতর আহত হয়েছেন। দুজন প্রাণও হারান।
দেশে মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার রোধকল্পে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) প্রধান মূল সংস্থা হিসেবে কাজ করে। ২০০৮ সাল থেকে অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মাদকবিরোধী অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি চাইলেও নানান জটিলতা ও বিভিন্ন পক্ষের আপত্তিতে বিষয়টি ঝুলে যায়।
২০২৪ সালে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) কর্মকর্তাকে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের অনুমোদন দিয়ে নীতিমালা চূড়ান্ত করে সরকার। এরপর দীর্ঘ সময় পার হলেও অস্ত্র হাতে পাননি কর্মকর্তারা। এর মধ্যে শেষ হয়েছে তাদের আগ্নেয়াস্ত্রের প্রশিক্ষণ।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিভিন্ন প্রক্রিয়া শেষে শিগগির আগ্নেয়াস্ত্র হাতে পাচ্ছেন কর্মকর্তারা। মাদক অধিদপ্তরের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জাগো নিউজকে জানায়, টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। সব ঠিকঠাক থাকলে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে নিয়ে অভিযানে নামতে পারবেন কর্মকর্তারা।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, তাদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল মাঠপর্যায়ে দায়িত্বরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অস্ত্র দেওয়া। কারণ, মাদকবিরোধী অভিযান অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। অনেক মাদক কারবারির কাছে অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র থাকে। ফলে অভিযানের সময় তাদের জীবন ঝুঁকিতে পড়ে।
এমন পরিস্থিতিতে আগ্নেয়াস্ত্র বহন এবং ব্যবহারের অনুমতি পাওয়ায় মাদকের বিরুদ্ধে আরও কার্যকর ভূমিকা নেওয়া সম্ভব হবে।
আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও চালানোর দক্ষতা বাড়িয়ে প্রশিক্ষিত হতে রাজশাহীর সারদা পুলিশ একাডেমিতে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। ৩৫ দিনব্যাপী এ প্রশিক্ষণে কয়েক ধাপে অংশ নিচ্ছেন ডিএনসির ৫৭৯ জন কর্মকর্তা।
এ পর্যন্ত মোট ২৬০ জনের বিশেষ প্রশিক্ষণ শেষ হয়েছে। উপপরিদর্শক থেকে শুরু করে পরিদর্শক, সহকারী পরিচালক ও উপপরিচালকদের এই প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে বাকি কর্মকর্তারাও প্রশিক্ষণে অংশ নেবেন এবং অস্ত্রচালনায় পারদর্শী হয়ে অভিযান পরিচালনা করবেন।
মাদক নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে সুরক্ষিত অস্ত্রাগার না হওয়া পর্যন্ত অস্ত্র সংরক্ষণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে জেলা প্রশাসকের ট্রেজারি রুম অথবা জেলা পুলিশ লাইনস বা সংশ্লিষ্ট থানার অস্ত্রাগারে।
গত ১৮ বছরে অধিদপ্তরের নিরস্ত্র সদস্যরা মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনাকালে অবৈধ মাদকদ্রব্য উদ্ধারের পাশাপাশি ৭৮টি পিস্তল, সাতটি শটগান, ২৭টি ম্যাগাজিন, ১৭টি রিভলবার, একটি এয়ারগান, এক হাজার এক রাউন্ড গুলি উদ্ধার ও জব্দ করেছে।
মাদক উদ্ধারের পাশাপাশি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারে বিগত ১০ বছরে অভিযান পরিচালনাকালে অধিদপ্তরের ১২৫ জন সদস্য গুরুতর আহত হন। দুজন প্রাণও হারান।
এছাড়া, মাদক সংক্রান্ত অপরাধের সঙ্গে জড়িতরা বেশিরভাগই সশস্ত্র, হিংস্র ও সংঘবদ্ধ হওয়ায় অধিদপ্তরের নিরস্ত্র কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অভিযান পরিচালনা করতে হয় বলে জানান দায়িত্বপালনকারীরা।
অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়ে নীতিমালায় বলা হয়েছে- ‘একমাত্র সর্বশেষ পন্থা’ হিসেবে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা যাবে। তবে আদেশ প্রদানকারীকে অধিদপ্তর বা নির্বাহী তদন্তে গুলি করার যৌক্তিকতা প্রমাণ করতে হবে। গুলি করার আদেশ দেওয়ার আগে যতদূর সম্ভব বলপ্রয়োগ (যেমন লাঠিপেটা ও অস্ত্রের বাঁট দিয়ে আঘাত) করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করতে হবে। কোনো অবস্থায়ই অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করা যাবে না।
নীতিমালায় বলা হয়, যতদূর সম্ভব ন্যূনতম বলপ্রয়োগে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করতে হবে। তাতে কাজ না হলে দু-একটি গুলি করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা যেতে পারে। কোনোভাবেই প্রথমে দুটি ফাঁকা ও সরাসরি একটির বেশি গুলি চালানো যাবে না। অধিদপ্তরের ৫৭৯ জন ৯ মিমি সেমি অটোমেটিক পিস্তল ব্যবহার করতে পারবেন।
অস্ত্রসংক্রান্ত নীতিমালায় বলা হয়েছে, গুলি করার প্রয়োজন হলে প্রথমে কারও দিকে তাক না করে আকাশের দিকে ফাঁকা গুলি ছুড়তে হবে। পাশাপাশি হ্যান্ডমাইকে ঘোষণা দিতে হবে। ন্যূনতম বলপ্রয়োগ করে লাঠিচার্জ ও অস্ত্রের বাঁট দিয়ে আঘাতের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
এক থেকে দুটি গুলি করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা গেলে এর বেশি গুলি করা যাবে না। ফাঁকা গুলির মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে একজন মাদক কারবারির কোমরের নিচে, হাঁটু অথবা পায়ে একটি গুলি করা যাবে।
যে কোনো একজনের দিকে তাক করার সময় খেয়াল রাখতে হবে বর্ষিত গুলি যেন কোনোক্রমেই পেছনে অন্য কাউকে আঘাত না করে। ঘনবসতি অথবা আবাসিক এলাকায় অথবা সমবেত উচ্ছৃঙ্খল জনতার ওপর গুলিবর্ষণের সময় খেয়াল রাখতে হবে নিরপরাধ জনগণ যেন আঘাত না পায়।
গুলি করার পর গুলির খোসা অবশ্যই সংগ্রহের নির্দেশনা দেওয়া দিয়ে আরও বলা হয়েছে, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সদস্যরা যেন কিংকর্তব্যবিমূঢ় বা ভয় পেয়ে এলোপাথাড়ি গুলি না করেন। প্রতিটি ক্ষেত্রে গুলির আদেশ দেওয়া ব্যক্তি গুলিবর্ষণের আদেশ দেওয়ার যৌক্তিকতা পরবর্তীসময়ে যুক্তিযুক্তভাবে উপস্থাপনের জন্য দায়ী থাকবেন।
যে কোনো উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গুলিবর্ষণ করার প্রয়োজন হলে অথবা জরুরি অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে গুলির ঘটনা ঘটলে তা তাৎক্ষণিকভাবে অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট বিভাগীয়, মেট্রো, জেলা গোয়েন্দা অথবা বিশেষ জোন কার্যালয়ের নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তা মহাপরিচালককে অবহিত করবেন।
অভিযানকারী দলের দলনেতা যত শিগগির সম্ভব মরদেহগুলো পুলিশ না আসা পর্যন্ত পাহারা দেওয়ার ব্যবস্থা করবেন এবং আহতদের হাসপাতালে পাঠাবেন। তিনি গুলির খোসা সংগ্রহ করে ইস্যু করা রাউন্ড সংখ্যার সঙ্গে মিলিয়ে দেখবেন। প্রতি ক্ষেত্রেই গুলিবর্ষণের পর যথা শিগগির সংশ্লিষ্ট থানায় এজাহার বা মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করতে হবে।
মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা, আসামি গ্রেফতার ও আলামত উদ্ধার, আত্মরক্ষা এবং সরকারি সম্পত্তি, অস্ত্রশস্ত্র, গোলাবারুদ, স্থাপনা, যানবাহন উদ্ধার, উদ্ধার করা আলামত, আসামি, জব্দ করা আলামত, সম্পদ রক্ষা করার আইনানুগ অধিকার রক্ষার্থে শক্তি প্রয়োগ তথা অস্ত্রশস্ত্র ব্যবহার করা যাবে।
তবে কোনো অবস্থায়ই অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করা যাবে না এবং ঘটনার পর যুক্তিযুক্ত ও গ্রহণযোগ্যভাবে বলপ্রয়োগ বা গুলিবর্ষণের প্রমাণ দেখাতে হবে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (ক্রয়, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অধিশাখা) এইচ এম মোস্তাফিজুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক টেন্ডারের মাধ্যমে প্রতিরক্ষা ক্রয় মহাপরিদপ্তরের মাধ্যমে অস্ত্রগুলো কিনবে। তাদের মাধ্যমে আমরা হাতে পারবো।’
আপাতত ২৭৫টি ৯ এমএম আধা-স্বয়ংক্রিয় পিস্তল কেনা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত ২৬০ জন কর্মকর্তাকে অস্ত্রের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। অনুমোদন রয়েছে ৫৯৫টি অস্ত্র কেনার। তবে আপাতত ২৭৫টি অস্ত্র কেনা হচ্ছে।’
‘অস্ত্র পেলে অভিযানের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি মাদক উদ্ধার ও কারবারি গ্রেফতারের সংখ্যা বাড়বে। এবার আমাদের অফিসাররা আগ্নেয়াস্ত্র সঙ্গে নিয়ে অভিযান পরিচালনা করবেন,’ বলছিলেন এইচ এম মোস্তাফিজুর রহমান।
‘মাদক কারবারিদের কাছে আগ্নেয়াস্ত্র থাকায় অভিযানে গিয়ে অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী আহত হয়েছেন।’ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ জাগো নিউজকে আরও বলেন, ‘এবার তাদের বিরুদ্ধে আমাদের অফিসাররা অস্ত্র হাতে অভিযানে নামবেন। একদিকে যেমন মাদক উদ্ধার বেশি হবে, অন্যদিকে কারবারি গ্রেফতার বাড়বে।’
বাংলা৭১নিউজ/এসএএইচ