রাজধানীর ধানমন্ডিতে ৯ বছরের শিশু গৃহকর্মী রিক্তা মণিকে “পরস্পর যোগসাজশে পূর্বপরিকল্পিতভাবে খুন করার অপরাধে” বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (বাপাউবো) অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. সবিবুর রহমানকে চাকরি থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। ধানমন্ডি থানায় হত্যা মামলা রুজু এবং গ্রেফতারের পর তার বিরুদ্ধে এই কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিল পানি উন্নয়ন বোর্ড। একই সাথে, এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্তের জন্য সবিবুর রহমান ও তার স্ত্রী ফারাহ নুসরাত ওরফে বর্নিকে দুই দিনের পুলিশ রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ।
বাপাউবোর পরিচালক মো. আতিকুর রহমান স্বাক্ষরিত এক জরুরি দাপ্তরিক আদেশে বলা হয়েছে— অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (পুর), প্রশিক্ষণ ও মানব সম্পদ উন্নয়ন, বাপাউবো, ঢাকা-কে ধানমন্ডি থানায় গ্রেফতারের পর ‘বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (কর্মকর্তা ও কর্মচারী) চাকরি প্রবিধানমালা-২০১৩’ এর প্রবিধান ৫৫(৫) অনুযায়ী গ্রেফতারের তারিখ (২০ জুন, ২০২৬) হতেই চাকরি থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হলো।
থানা পুলিশ ও মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, পারিবারিক অস্বচ্ছলতার কারণে প্রায় ৩১ মাস আগে প্রত্যন্ত সুনামগঞ্জ থেকে ঢাকার ধানমন্ডিতে সবিবুর রহমানের বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে গৃহকর্মীর কাজে এসেছিল শিশু রিক্তা মণি। দুমুঠো ভাতের আশায় আসা ৯ বছরের এই অবোধ শিশুটির ওপর দীর্ঘ ৩১ মাস ধরে নিয়মিত পাশবিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হতো বলে অভিযোগ উঠেছে।
গত শুক্রবার (১৯ জুন) ভোর আনুমানিক ৬টায় ধানমন্ডির ৯/এ সড়কের ওই বাসার ১১ তলা ভবনের বারান্দা থেকে নিচে পড়ে যায় রিক্তা। রক্তাক্ত ও গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে ধানমন্ডির বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। চিকিৎসকরা জানান, রিক্তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে পূর্বের ও সাম্প্রতিক অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন ছিল এবং তার বাম হাতটি ভাঙা অবস্থায় পাওয়া গেছে।
রিক্তার এই নির্মম মৃত্যুর পর তার পিতা বাদী হয়ে শনিবার (২০ জুন) ধানমন্ডি থানায় দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় একটি হত্যা মামলা (মামলা নং-১৩) দায়ের করেন। মামলার পর শনিবার দিবাগত রাত (২১ জুন) আনুমানিক ৩:৩০ মিনিটে ধানমন্ডির ওই বাসা থেকেই মূল দুই আসামি ইঞ্জিনিয়ার সবিবুর রহমান (৪৬) এবং তার স্ত্রী ফারাহ নুসরাত ওরফে বর্নিকে (৪০) গ্রেফতার করে ধানমন্ডি মডেল থানা পুলিশ।
ঘটনার পর প্রকৌশলীর পরিবারের পক্ষ থেকে বিষয়টিকে ‘দুর্ঘটনা’ বা ‘আত্মহত্যা’ বলে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও পুলিশের প্রাথমিক সুরতহাল এবং এই কর্মকর্তার অন্ধকার অতীত সম্পূর্ণ ভিন্ন গল্পের ইশারা দিচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, টাকার জোর এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার প্রভাবে এর আগেও বিভিন্ন অপরাধ ধামাচাপা দেওয়ার পুরোনো অভ্যাস রয়েছে এই কর্মকর্তার। ফলে এবারও পাশবিক নির্যাতন আড়াল করতেই রিক্তাকে ওপর থেকে ফেলে দেওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়ে জোরালো প্রশ্ন উঠেছে।
বিজ্ঞ আদালতে পুলিশ আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করলে, আদালত সবিবুর রহমান ও তার স্ত্রীর ২ দিনের পুলিশ রিমান্ড মঞ্জুর করেন। বর্তমানে তারা পুলিশ হেফাজতে আছেন।
প্রভাবমুক্ত বিচারের দাবি
ক্ষমতার দম্ভে ও অপরাধের নিষ্ঠুরতায় একটি ৯ বছরের শিশুর জীবন প্রদীপ নিভে যাওয়ার এই ঘটনায় ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও মানবাধিকার কর্মীরা। পাউবো থেকে এই কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করার সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়ে তারা দাবি করেছেন— এই ন্যক্কারজনক ঘটনার পেছনে যদি কোনো প্রশাসনিক বা ক্ষমতার প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করা হয়, তবে তা রুখে দিতে হবে। অবোধ রিক্তার ৩১ মাসের নীরব কান্না ও এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের যেন একটি দৃষ্টান্তমূলক ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত হয়।
নুন আনতে পান্তা ফুরানো এক অসচ্ছল পরিবার। দুমুঠো ভাতের নিশ্চয়তা আর একটু ভালো থাকার আশায় মাত্র সাড়ে ছয় বছর বয়সে প্রত্যন্ত সুনামগঞ্জ থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিল শিশু রিক্তা মণি (৯)। বাদীর পূর্ব পরিচিত ব্যক্তি মো. গাজিবুর রহমানের মাধ্যমে জনৈক আইয়ুব আলীর হাত ধরে সে কাজ নিয়েছিল ধানমন্ডির এক বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে। কিন্তু অবোধ এই শিশুটি তখনো জানত না, জীবনের শেষ ৩১টি মাস তার কাটবে এক জীবন্ত নরকে, আর তার জীবনের শেষ ঠিকানা হবে হাসপাতালের মর্গ।
এই নৃশংস ও বর্বরোচিত ঘটনার পর বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো) এক জরুরি দাপ্তরিক আদেশে তাদের এই অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীকে চাকরি থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করেছে।

বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি