শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬, ০৯:১২ অপরাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ
মালয়েশিয়ায় অবৈধ বাংলাদেশিদের জন্য সুখবর হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৬ শিশুর মৃত্যু এইচএসসি পরীক্ষার প্রতিটি কক্ষে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের নির্দেশ বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক সর্বোচ্চ ধাপে পৌঁছেছে: পররাষ্ট্রমন্ত্রী ‘সম্মিলিত উদ্যোগে টেকসই অঙ্গদান ও কিডনি প্রতিস্থাপন ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব’ করিডরে বাংলাদেশ যুক্ত হলে ২৪ ঘণ্টায় চীনে পণ্য পৌঁছানো যাবে : বাণিজ্যমন্ত্রী ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’, যা কিছু অর্জন তা দেশের মানুষের : সংসদে প্রধানমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া-চীন সফর পররাষ্ট্রনীতির মানদণ্ড নিশ্চিত করেছে দেশে ফিরে বাবা-মায়ের কবর জিয়ারত প্রধানমন্ত্রীর রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে চীন ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছে : মির্জা ফখরুল

হাওরকন্যার বিরহী বাঁশি: জন্মদিনে মরমী সাধক উকিল মুন্সীকে স্মরণ

সাখাওয়াত হোসেন বাদশা
  • আপডেট সময় বৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬
  • ৭৮ বার পড়া হয়েছে
ভাটি অঞ্চলের তথা নেত্রকোনার একজন কিংবদন্তি বাউল উকিল মুন্সী

বাংলা লোকসংগীতের আকাশে যে কটি নাম ধ্রুবতারার মতো উজ্জ্বল, তাদের অন্যতম বাউল সাধক, গীতিকবি ও সুরকার উকিল মুন্সী। নেত্রকোনা তথা সমগ্র ভাটি অঞ্চলের কাদা-জল, হাওরের ঢেউ আর অসীম আকাশের শূন্যতা যাঁর কণ্ঠে এসে একাকার হয়েছিল, তিনিই উকিল মুন্সী। রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলা, বিচ্ছেদ আর অধ্যাত্মবাদের মেলবন্ধনে তিনি তৈরি করেছিলেন নিজস্ব এক সুরের ভুবন। আজ ১১ জুন, এই মহান সাধকের জন্মদিনে তাঁর বর্ণিল ও প্রেমময় জীবনকে ফিরে দেখার একটি পরম মুহূর্ত।

এই সাধকের সবচেয়ে আলোচিত গান-  ‘আমার সোয়া চান পাখী, আমি ডাকিতাছি তুমি ঘুমাইছো নাকি…’। বাংলা মরমী সংগীতের ইতিহাসে এটি কেবল একটি গান নয়, এটি আসলে মানুষের বুকফাটানো দীর্ঘশ্বাস আর চিরন্তন বিরহের এক জীবন্ত দলিল। বাউল সাধক উকিল মুন্সী এই কালজয়ী গানের রচয়িতা। লোকমুখে প্রচলিত আছে, উকিল মুন্সী তাঁর স্ত্রী হামিদা খাতুনকে (যাঁকে তিনি ভালোবেসে ‘চানপুরের চান’ বা ‘সোয়া চাঁন পাখি’ বলতেন) অত্যন্ত ভালোবাসতেন। স্ত্রীর মৃত্যুর পর বা তাঁর অসুস্থতার সময় একাকীত্ব ও বিরহের চরম মুহূর্তে তিনি এই গানটি বেঁধেছিলেন। প্রিয় মানুষের নীরব হয়ে যাওয়া বা চিরতরে ঘুমিয়ে পড়াকে তিনি মেনে নিতে পারছিলেন না। বাউল সাধক উকিল মুন্সীর গুরু ছিলেন আরেক বাউল সাধক রশিদ উদ্দিন। তার অসংখ্য গানের মধ্যে- ’আষাঢ় মাইস্যা ভাসা পানি রে’.., ’সোনা বন্ধুয়া রে এতো দুঃখ দিলে তুই আমারে…’ উল্লেখযোগ্য।

জীবনী

উকিল মুন্সীর জন্ম হয়েছিল নেত্রকোনার খালিয়াজুড়ির নূরপুর বোয়ালী গ্রামের একটি অত্যন্ত ধনাঢ্য, অভিজাত এবং সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে (আকন্দ বা কাজী পরিবারে)। ১৮৮৫ সালের ১১ জুন তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তার পারিবারিক নাম সৈয়দ আব্দুল হক আকন্দ। তার পিতার নাম সৈয়দ গোলাম রসুল আকন্দ ও মাতা সৈয়দা উকিলেন্নেসা । মাত্র ১০ বছর বয়সে পিতৃহারা হওয়ার পর উকিল মুন্সী তাঁর চাচা কাজী সৈয়দ আলিম উদ্দিনের বাড়ি জালালপুর গ্রামে চলে আসেন। শৈশবে তিনি ঘেটুগানে যোগ দেন। পরে গজল ও পরিণত বয়স থেকে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত বাউল সাধনায় লিপ্ত থাকেন। তার গজল গানের সূত্রপাত হয় তরুণ বয়সে।

উকিল মুন্সীর প্রেম

উকিল মুন্সীর স্ত্রী হামিদা খাতুনের আদি নিবাস ছিল নেত্রকোনা জেলার মোহনগঞ্জ উপজেলার জালালপুর গ্রামে, যা ধনু নদীর তীরে অবস্থিত। তাঁর বাবার নাম ছিল মোঃ লবু হোসেন। লবু হোসেন ছিলেন তৎকালীন গ্রামীণ সমাজের একজন অত্যন্ত সাধারণ ও প্রান্তিক কৃষক। অর্থনৈতিক ও সামাজিক দিক থেকে তাঁদের পরিবারটি ছিল বেশ সাধারণ ও অসচ্ছল।

উকিল মুন্সী পিতৃহারা হওয়ার পর চাচা কাজী সৈয়দ আলিম উদ্দিনের বাড়ি জালালপুর গ্রামে চলে আসেন। এই জালালপুর গ্রামেই ধনু নদীর পাড়ে সাধারণ কৃষকের রূপবতী কন্যা হামিদা খাতুনের সাথে তরুণ উকিল মুন্সীর পরিচয় ও প্রেম হয়। উকিল মুন্সী একজন সাধারণ কৃষকের মেয়ের প্রেমে এতোটাই গভীরভাবে মগ্ন হন যে, তিনি তার প্রেয়সীকে নিয়ে লিখেন “উকিলের মনচোর” নামক একটি গান।

তাদের এই সম্পর্কের কথা জানাজানি হলে উকিল মুন্সীর পরিবার তীব্র বাধা দেয়। কারণ ছিল পারিবারিক আভিজাত্যের অমিল—উকিল মুন্সীর পরিবার ছিল অবস্থাপন্ন ও প্রভাবশালী, আর হামিদার বাবা লবু হোসেন ছিলেন সাধারণ কৃষক। সম্ভ্রান্ত কাজী পরিবারের লোকেরা একজন দরিদ্র কৃষকের মেয়ের সাথে এই সম্পর্ক কোনোভাবেই মেনে নিতে চাননি।

পারিবারিক বাধার মুখে পড়ে উকিল মুন্সী ঘর ছাড়েন এবং বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়ান। পরবর্তীতে ১৯১৫ সালে তিনি জালালপুর থেকে কিছুটা দূরে বরান্তর গ্রামের এক মসজিদে ইমামতি শুরু করেন। অবশেষে পরিবারের অমত থাকা সত্ত্বেও, হামিদা খাতুনের তীব্র আগ্রহ ও সাহসিকতায় ১৯১৬ সালের ডিসেম্বর মাসে তাঁরা গোপনে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। বিয়ের পর হামিদার বাবা লবু হোসেন তাঁর জামাতা উকিল মুন্সীকে জালালপুরে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ করে দেন। মেয়ের জামাইকে তিনি একটি বসতবাড়ি এবং ৩ একর জমি দান করেন। শ্বশুরের দেওয়া এই জমিতেই উকিল মুন্সী স্থায়ীভাবে থাকা শুরু করেন এবং চাষবাস ও ইমামতির মাধ্যমে সংসার চালাতে থাকেন।

উকিল মুন্সীর জীবনের সমস্ত সাধনা, একাকীত্ব ও দারিদ্র্যের সংসারে হামিদা খাতুন ছিলেন এক পরম ছায়া। ১৯৭৮ সালের মাঝামাঝি সময়ে এই মহীয়সী নারী মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর উকিল মুন্সী সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েন এবং এর মাত্র কয়েক মাস পর (ওই একই বছরের ১২ ডিসেম্বর) তিনিও শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

হামিদা খাতুনের এই সাধারণ ও কৃষক পারিবারিক পটভূমি এবং তাঁদের প্রেমের গভীরতাই উকিল মুন্সীকে আভিজাত্যের অহংকার ভেঙে সাধারণ মানুষের বাউল ও মরমী সাধক হয়ে উঠতে সাহায্য করেছিল।

উকিল মুন্সীর অনেক জনপ্রিয় গান আজও উচ্চারিত হয় সাধারণ মানুষের মুখে মুখে। তার কয়েকটি উল্লেখযোগ্য গান:

‘ওরে বাটাতে সাজাইয়া রাখছি সোনামুখি পান…’

‘নবীজির খাশ মহলে…’

‘সোনা বন্ধুয়া রে এতো দুঃখ দিলে তুই আমারে…’

‘ভেবেছিলাম রঙে দিন যাবেরে সুজন নাইয়া…’

‘আষাঢ় মাইস্যা ভাসা পানি রে…’

সাধনা ও জীবন সংগ্রাম

উকিল মুন্সী পেশাগত জীবনে একজন জামে মসজিদের ইমাম ছিলেন। একদিকে মসজিদের ইমামতি (ইসলামের শরিয়ত চর্চা), অন্যদিকে বাউল গান ও মরমী সাধনা (মারফতের পথ)—এই দুইয়ের এক অপূর্ব ও বিরল সমন্বয় ঘটেছিল তাঁর জীবনে।

তৎকালীন সমাজ বাউল গানকে খুব একটা ভালো চোখে দেখত না। ফলে রক্ষণশীল সমাজের মানুষের কাছ থেকে তাঁকে নানা কথা শুনতে হয়েছে, করতে হয়েছে কঠিন জীবন সংগ্রাম। কিন্তু সুরের প্রতি যাঁর নিখাদ ভালোবাসা, তাঁকে কি আর বেঁধে রাখা যায়? তিনি দিনের পর দিন হাওর অঞ্চলের নৌকায় নৌকায় ঘুরে, প্রকৃতির সাথে মিতালি করে গান বেঁধেছেন এবং গেয়েছেন।

সাহিত্যে অবদান ও সংগীত শৈলী

বাংলা লোকসাহিত্যে উকিল মুন্সীর অবদান অতুলনীয়। তিনি হাজারেরও বেশি গান রচনা করেছেন। তাঁর গানগুলোর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ‘বিরহ’। সূফীবাদের আধ্যাত্মিক বিরহকে তিনি রাধা-কৃষ্ণের বিচ্ছেদের আধ্যাত্মিক রূপকের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন।

তাঁর জনপ্রিয় কিছু গানের মধ্যে রয়েছে:

পুবালী বাতাসে…

আমার গায়ে যত দুঃখ সয়…

আষাঢ় মাসে ভাসল রে ভুবন…

আমি কেমন করে পত্র লিখি রে বন্ধু…

 ‘সুজন বন্ধু রে আরে ও বন্ধু, কোন বা দেশে থাকো, এই দাসীরে কান্দাইয়া রে, কোন দাসীর মন রাখো সুজন বন্ধুরে… ’

এই গানটি দেশের আনাচে-কানাচে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। মানুষের ভেতরের প্রেম, ভালবাসা, দরদ ও মমত্ববোধকে ফুটিয়ে তুলে।

সহজ-সরল শব্দ চয়ন এবং বুক ফাটানো সুরের কারণে তাঁর গানগুলো শুধু ভাটি অঞ্চলেই নয়, আজ সারা বিশ্বের বাংলাভাষী মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে। জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ তাঁর বিভিন্ন চলচ্চিত্র ও নাটকে উকিল মুন্সীর গান ব্যবহার করে এই মহান সাধককে নতুন প্রজন্মের কাছে আরও ব্যাপকভাবে পরিচিত করিয়েছেন।

সাধক জীবনের সফলতা ও স্বীকৃতি

উকিল মুন্সী বেঁচে থাকতে কোনো বৈষয়িক বা প্রাতিষ্ঠানিক পুরস্কারের পেছনে ছোটেননি। তাঁর সবচেয়ে বড় সফলতা ছিল সাধারণ মানুষের ভালোবাসা। ভাটি অঞ্চলের মজলুম, সাধারণ মানুষ ও মাঝিমাল্লারা তাঁর গানকে নিজেদের জীবনের গল্প মনে করত। তৎকালীন সময়ের প্রখ্যাত বাউল সাধক রশিদ উদ্দিন এবং শাহ আব্দুল করিমের সাথে তাঁর গভীর সখ্যতা ছিল। মরমী গানের জগতে তিনি এক অনন্য ধারা তৈরি করতে পেরেছিলেন, যা আজও লোকসংগীত গবেষকদের ভাবিয়ে তোলে। মৃত্যুর পর বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতিতে অবদানের জন্য তিনি মরণোত্তর বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। বর্তমানে নেত্রকোনায় তাঁর স্মরণে নিয়মিত বাউল উৎসবের আয়োজন করা হয়।

শেষ জীবন ও মৃত্যু

জীবনের শেষভাগে এসে উকিল মুন্সী আরও বেশি অন্তর্মুখী ও একাকী হয়ে পড়েন। তাঁর গানের প্রধান অনুপ্রেরণা স্ত্রী হামিদা খাতুনের মৃত্যুর পর তিনি যেন সুরের মাঝেই নিজের শেষ আশ্রয় খুঁজে নেন। ১৯৭৮ সালের এই মহান সাধক চিরতরে চোখ বন্ধ করেন। নেত্রকোনার মোহনগঞ্জের জৈনপুর গ্রামে তাঁকে সমাহিত করা হয়।

উপসংহার

উকিল মুন্সী কেবল একজন ব্যক্তি ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাংলা লোকসংস্কৃতির একটি আস্ত প্রতিষ্ঠান। এক হাতে তসবিহ আর অন্য হাতে দোতারা নিয়ে তিনি যে জীবন পার করেছেন, তা সত্যিই বিস্ময়কর। আজ তাঁর জন্মদিনে এই বিরহী বাউলের প্রতি রইল আমাদের গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি। যতদিন বাংলা ভাষা ও গান থাকবে, ততদিন পুবালী বাতাসে তাঁর সুরের ঢেউ বইতেই থাকবে।

বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর
© All rights reserved © 2015-2026
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com