ঢাকা ০৩:১২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬, ৩১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ছন্দের বেড়াজাল ভাঙা শব্দের জাদুকর: ওয়াল্ট হুইটম্যানের জন্মবার্ষিকী আজ

আজ ৩১ মে। বিশ্ব সাহিত্যের অন্যতম কালজয়ী মণীষী, মুক্তচিন্তার মহানায়ক এবং আমেরিকান কবিতার জনক ওয়াল্ট হুইটম্যানের জন্মবার্ষিকী। ১৮১৯ সালের আজকের এই দিনে নিউইয়র্কের লং আইল্যান্ডে এক দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এই মহান শব্দশিল্পী। প্রচলিত ছন্দের চেনা দেয়াল ভেঙে কবিতাকে সাধারণ মানুষের ভাষায় রূপ দিয়ে তিনি বিশ্ব সাহিত্যজগতে এক নতুন ও বৈপ্লবিক যুগের সূচনা করেছিলেন। আজ তার জন্মদিনে বিশ্বজুড়ে লাখো সাহিত্যপ্রেমী তাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছে।

প্রতিকূলতা জয় ও সাংবাদিকতা জীবন

এক দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া হুইটম্যানের জীবন শুরু হয়েছিল চরম আর্থিক অনটনে। মাত্র ১১ বছর বয়সে তাকে প্রথাগত পড়াশোনা ছেড়ে পরিবারের হাল ধরতে কাজে নামতে হয়। তবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও অদম্য মেধার জোরে তিনি নিজেকে গড়ে তোলেন। জীবনের শুরুতে তিনি একটি আইনি কার্যালয়ের অফিস বয় এবং পরে ছাপাখানার শিক্ষানবিস হিসেবে কাজ শুরু করেন। মূলত ছাপাখানা থেকেই অক্ষরের সাথে তার আজীবনের মিতালী তৈরি হয়। পরবর্তীতে তিনি শিক্ষকতা এবং সাংবাদিকতাকেও পেশা হিসেবে বেছে নেন, যা তার জীবনবোধকে আরও গভীর করে তোলে।

‘লিভস অব গ্রাস’ এবং সাহিত্যে এক নতুন বিপ্লব

১৮৫৫ সালে হুইটম্যান নিজের জমানো টাকায় প্রকাশ করেন তার জীবনের শ্রেষ্ঠ কবিতার সংকলন ‘লিভস অব গ্রাস’ (Leaves of Grass)। প্রথম সংস্করণে মাত্র ১২টি কবিতা থাকা এই বইটি প্রকাশের সাথে সাথে পুরো সাহিত্যজগতে তোলপাড় সৃষ্টি করে।

প্রচলিত অন্ত্যমিল বা নির্দিষ্ট ব্যাকরণ ছাড়াই যে অসামান্য ও হৃদয়স্পর্শী কবিতা লেখা যায়, তা তিনি প্রমাণ করে দেখান। এ কারণেই তাকে বিশ্ব সাহিত্যে ‘মুক্তছন্দের জনক’ (Father of Free Verse) বলা হয়। তার কবিতায় কোনো রাখঢাক ছিল না; সেখানে উঠে এসেছে মানবতাবাদ, প্রকৃতি, গণতন্ত্র এবং আমেরিকার সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের জীবনের জয়গান। তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজ তার এই সাহসী লেখাকে সহজে গ্রহণ না করলেও, পরবর্তীতে এটিই বিশ্ব সাহিত্যের একটি অনন্য মাইলফলক হিসেবে স্বীকৃতি পায়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের মৃত্যুর পর তার স্মরণে লেখা ‘ও ক্যাপ্টেন! মাই ক্যাপ্টেন!’ কবিতাটি আজও বিশ্বজুড়ে আবৃত্তি করা হয়।

বিশ্ব সাহিত্যে চিরন্তন প্রভাব

বিখ্যাত আধুনিক কবি এজরা পাউন্ড একবার বলেছিলেন, “আপনি ওয়াল্ট হুইটম্যান এবং তার ‘লিভস অব গ্রাস’কে না পড়ে আমেরিকাকে পুরোপুরি বুঝতে পারবেন না। তিনি শুধু একজন কবি ছিলেন না, তিনি ছিলেন আমেরিকার আত্মিক কণ্ঠস্বর।”

ওয়াল্ট হুইটম্যানের কবিতায় জীবন, প্রকৃতি এবং মানুষের স্বাধীনতার এক অদ্ভুত জয়গান রয়েছে।

তার বিখ্যাত তিনটি কবিতার কিছু স্মরণীয় লাইন 

১. ‘সং অব মাইসেলফ’ (Song of Myself) । এটি তার ‘লিভস অব গ্রাস’ গ্রন্থের সবচেয়ে বিখ্যাত ও দীর্ঘ কবিতা। এখানে তিনি নিজেকে পুরো মানবজাতির এক অংশ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।

মূল লাইন:

“I celebrate myself, and sing myself,

And what I assume you shall assume,

For every atom belonging to me as good belongs to you.”

বাংলা অনুবাদ:

“আমি আমার নিজের উৎসব করি, নিজের গান গাই,

আর আমি যা বিশ্বাস করি, তুমিও তা-ই বিশ্বাস করবে,

কারণ আমার ভেতরের প্রতিটি পরমাণু, ঠিক তোমারও অংশ।”

২. ‘ও ক্যাপ্টেন! মাই ক্যাপ্টেন!’ (O Captain! My Captain!) । আব্রাহাম লিংকনের মৃত্যুর পর দেশের প্রতি তার অবদানের কথা স্মরণ করে হুইটম্যান এই শোকগাথাটি লিখেছিলেন।

মূল লাইন:

“O Captain! my Captain! our fearful trip is done,

The ship has weather’d every rack, the prize we sought is won,

The port is near, the bells I hear, the people all exulting…”

বাংলা অনুবাদ:

“ও ক্যাপ্টেন! আমার ক্যাপ্টেন! আমাদের ভয়ংকর সেই সমুদ্রযাত্রা শেষ হয়েছে,

জাহাজটি প্রতিটি ঝড়ঝাপটা পেরিয়ে এসেছে, আমাদের কাঙ্ক্ষিত সেই বিজয় অর্জিত হয়েছে,

তীর আজ খুব কাছে, আমি ঘণ্টার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি, মানুষ সব উল্লাস করছে…”

৩. ‘পায়োনিয়ার্স! ও পায়োনিয়ার্স!’ (Pioneers! O Pioneers!) ।এই কবিতায় তিনি নতুন পৃথিবী গড়ার কারিগর, অর্থাৎ তরুণ ও যুবসমাজকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

মূল লাইন:

“Come my tan-faced children,

Follow the youth, forward the army, march!

Follow the path of the pioneers, O pioneers!”

বাংলা অনুবাদ:

“এসো আমার রোদে পোড়া মুখের সন্তানেরা,

তারুণ্যের পিছু নাও, সেনাবাহিনীকে সামনে এগিয়ে নাও, মার্চ করো!

অগ্রপথিকদের দেখানো পথ অনুসরণ করো, ওগো অগ্রপথিক দল!”

হুইটম্যানের কবিতার এই লাইনগুলোতে যে জীবনবোধ ফুটে উঠেছে, তা যুগের পর যুগ ধরে মানুষকে অনুপ্রাণিত করে আসছে। ১৮৯২ সালের ২৬ মার্চ ৭২ বছর বয়সে এই মহান মণীষী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর শত বছর পরেও আজ তার সৃষ্টি সমানভাবে জীবন্ত। তিনি পৃথিবীকে শিখিয়ে গেছেন—কবিতা কোনো সুনির্দিষ্ট খাঁচায় বন্দী পাখি নয়, বরং তা মুক্ত আকাশের চেয়েও স্বাধীন ও অসীম।

বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি

Tag :

ছন্দের বেড়াজাল ভাঙা শব্দের জাদুকর: ওয়াল্ট হুইটম্যানের জন্মবার্ষিকী আজ

আপডেট সময় ১১:১৩:০৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৩১ মে ২০২৬

আজ ৩১ মে। বিশ্ব সাহিত্যের অন্যতম কালজয়ী মণীষী, মুক্তচিন্তার মহানায়ক এবং আমেরিকান কবিতার জনক ওয়াল্ট হুইটম্যানের জন্মবার্ষিকী। ১৮১৯ সালের আজকের এই দিনে নিউইয়র্কের লং আইল্যান্ডে এক দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এই মহান শব্দশিল্পী। প্রচলিত ছন্দের চেনা দেয়াল ভেঙে কবিতাকে সাধারণ মানুষের ভাষায় রূপ দিয়ে তিনি বিশ্ব সাহিত্যজগতে এক নতুন ও বৈপ্লবিক যুগের সূচনা করেছিলেন। আজ তার জন্মদিনে বিশ্বজুড়ে লাখো সাহিত্যপ্রেমী তাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছে।

প্রতিকূলতা জয় ও সাংবাদিকতা জীবন

এক দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া হুইটম্যানের জীবন শুরু হয়েছিল চরম আর্থিক অনটনে। মাত্র ১১ বছর বয়সে তাকে প্রথাগত পড়াশোনা ছেড়ে পরিবারের হাল ধরতে কাজে নামতে হয়। তবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও অদম্য মেধার জোরে তিনি নিজেকে গড়ে তোলেন। জীবনের শুরুতে তিনি একটি আইনি কার্যালয়ের অফিস বয় এবং পরে ছাপাখানার শিক্ষানবিস হিসেবে কাজ শুরু করেন। মূলত ছাপাখানা থেকেই অক্ষরের সাথে তার আজীবনের মিতালী তৈরি হয়। পরবর্তীতে তিনি শিক্ষকতা এবং সাংবাদিকতাকেও পেশা হিসেবে বেছে নেন, যা তার জীবনবোধকে আরও গভীর করে তোলে।

‘লিভস অব গ্রাস’ এবং সাহিত্যে এক নতুন বিপ্লব

১৮৫৫ সালে হুইটম্যান নিজের জমানো টাকায় প্রকাশ করেন তার জীবনের শ্রেষ্ঠ কবিতার সংকলন ‘লিভস অব গ্রাস’ (Leaves of Grass)। প্রথম সংস্করণে মাত্র ১২টি কবিতা থাকা এই বইটি প্রকাশের সাথে সাথে পুরো সাহিত্যজগতে তোলপাড় সৃষ্টি করে।

প্রচলিত অন্ত্যমিল বা নির্দিষ্ট ব্যাকরণ ছাড়াই যে অসামান্য ও হৃদয়স্পর্শী কবিতা লেখা যায়, তা তিনি প্রমাণ করে দেখান। এ কারণেই তাকে বিশ্ব সাহিত্যে ‘মুক্তছন্দের জনক’ (Father of Free Verse) বলা হয়। তার কবিতায় কোনো রাখঢাক ছিল না; সেখানে উঠে এসেছে মানবতাবাদ, প্রকৃতি, গণতন্ত্র এবং আমেরিকার সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের জীবনের জয়গান। তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজ তার এই সাহসী লেখাকে সহজে গ্রহণ না করলেও, পরবর্তীতে এটিই বিশ্ব সাহিত্যের একটি অনন্য মাইলফলক হিসেবে স্বীকৃতি পায়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের মৃত্যুর পর তার স্মরণে লেখা ‘ও ক্যাপ্টেন! মাই ক্যাপ্টেন!’ কবিতাটি আজও বিশ্বজুড়ে আবৃত্তি করা হয়।

বিশ্ব সাহিত্যে চিরন্তন প্রভাব

বিখ্যাত আধুনিক কবি এজরা পাউন্ড একবার বলেছিলেন, “আপনি ওয়াল্ট হুইটম্যান এবং তার ‘লিভস অব গ্রাস’কে না পড়ে আমেরিকাকে পুরোপুরি বুঝতে পারবেন না। তিনি শুধু একজন কবি ছিলেন না, তিনি ছিলেন আমেরিকার আত্মিক কণ্ঠস্বর।”

ওয়াল্ট হুইটম্যানের কবিতায় জীবন, প্রকৃতি এবং মানুষের স্বাধীনতার এক অদ্ভুত জয়গান রয়েছে।

তার বিখ্যাত তিনটি কবিতার কিছু স্মরণীয় লাইন 

১. ‘সং অব মাইসেলফ’ (Song of Myself) । এটি তার ‘লিভস অব গ্রাস’ গ্রন্থের সবচেয়ে বিখ্যাত ও দীর্ঘ কবিতা। এখানে তিনি নিজেকে পুরো মানবজাতির এক অংশ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।

মূল লাইন:

“I celebrate myself, and sing myself,

And what I assume you shall assume,

For every atom belonging to me as good belongs to you.”

বাংলা অনুবাদ:

“আমি আমার নিজের উৎসব করি, নিজের গান গাই,

আর আমি যা বিশ্বাস করি, তুমিও তা-ই বিশ্বাস করবে,

কারণ আমার ভেতরের প্রতিটি পরমাণু, ঠিক তোমারও অংশ।”

২. ‘ও ক্যাপ্টেন! মাই ক্যাপ্টেন!’ (O Captain! My Captain!) । আব্রাহাম লিংকনের মৃত্যুর পর দেশের প্রতি তার অবদানের কথা স্মরণ করে হুইটম্যান এই শোকগাথাটি লিখেছিলেন।

মূল লাইন:

“O Captain! my Captain! our fearful trip is done,

The ship has weather’d every rack, the prize we sought is won,

The port is near, the bells I hear, the people all exulting…”

বাংলা অনুবাদ:

“ও ক্যাপ্টেন! আমার ক্যাপ্টেন! আমাদের ভয়ংকর সেই সমুদ্রযাত্রা শেষ হয়েছে,

জাহাজটি প্রতিটি ঝড়ঝাপটা পেরিয়ে এসেছে, আমাদের কাঙ্ক্ষিত সেই বিজয় অর্জিত হয়েছে,

তীর আজ খুব কাছে, আমি ঘণ্টার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি, মানুষ সব উল্লাস করছে…”

৩. ‘পায়োনিয়ার্স! ও পায়োনিয়ার্স!’ (Pioneers! O Pioneers!) ।এই কবিতায় তিনি নতুন পৃথিবী গড়ার কারিগর, অর্থাৎ তরুণ ও যুবসমাজকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

মূল লাইন:

“Come my tan-faced children,

Follow the youth, forward the army, march!

Follow the path of the pioneers, O pioneers!”

বাংলা অনুবাদ:

“এসো আমার রোদে পোড়া মুখের সন্তানেরা,

তারুণ্যের পিছু নাও, সেনাবাহিনীকে সামনে এগিয়ে নাও, মার্চ করো!

অগ্রপথিকদের দেখানো পথ অনুসরণ করো, ওগো অগ্রপথিক দল!”

হুইটম্যানের কবিতার এই লাইনগুলোতে যে জীবনবোধ ফুটে উঠেছে, তা যুগের পর যুগ ধরে মানুষকে অনুপ্রাণিত করে আসছে। ১৮৯২ সালের ২৬ মার্চ ৭২ বছর বয়সে এই মহান মণীষী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর শত বছর পরেও আজ তার সৃষ্টি সমানভাবে জীবন্ত। তিনি পৃথিবীকে শিখিয়ে গেছেন—কবিতা কোনো সুনির্দিষ্ট খাঁচায় বন্দী পাখি নয়, বরং তা মুক্ত আকাশের চেয়েও স্বাধীন ও অসীম।

বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি