ঢাকা ০২:২৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬, ৬ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দূরদর্শী আইনস্টাইন কেন ইসরাইলের রাষ্ট্রপতি হওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখান করেছিলেন!

পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী আলবার্ট আনস্টাইন

আলবার্ট আইনস্টাইন—যার নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের জটিল সব সূত্র আর আপেক্ষিকতার তত্ত্ব। মহাবিশ্বের গূঢ় রহস্য যার ইশারায় উন্মোচিত হয়েছিল, তিনিই বিনয়ের সাথে প্রত্যাখান করেছিলেন ইসরাইলের রাষ্ট্রপতি হওয়ার প্রস্তাব। ১৯৫২ সালে  নোবেলজয়ী এই বিজ্ঞানীকে প্রস্তাবটি দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে দিয়ে তিনি ইতিহাসের অন্যতম সেরা এক দূরদর্শী একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তার এই অস্বীকৃতির পেছনে লুকিয়ে ছিল এক গভীর আত্মোপলব্ধি এবং নিজস্ব রাজনৈতিক ও নৈতিক দর্শন। যা তাকে আরও জিনিয়াসে পরিণত করেছিল।

যেভাবে এসেছিল সেই প্রস্তাব

১৯৫২ সালের নভেম্বর মাসে ইসরাইলের প্রথম রাষ্ট্রপতি হাইম ওয়াইজম্যান মৃত্যুবরণ করেন। এরপরই দেশটির তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন-গুরিয়ন এবং ওয়াশিংটনে নিযুক্ত ইসরাইলি রাষ্ট্রদূত আব্বা ইবান এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেন। তারা ভাবেন, বিশ্বজুড়ে ইহুদিদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব আলবার্ট আইনস্টাইনকে যদি দেশের দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি করা যায়, তবে তা হবে রাষ্ট্রের জন্য এক বিরাট গৌরব। ১৯৫২ সালের ১৭ নভেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটনে বসবাসরত আইনস্টাইনের কাছে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হয়। চিঠিতে প্রধানমন্ত্রী বেন-গুরিয়নের পক্ষ থেকে প্রস্তাব দেওয়া হয়, আইনস্টাইন যদি রাজি থাকেন তবে দেশটির পার্লামেন্ট ‘নেসেট’ (Knesset)-এর ভোটের মাধ্যমে তাকে রাষ্ট্রপতি করা হবে। একই সাথে আশ্বাস দেওয়া হয়, রাষ্ট্রপতি হলেও তিনি তার বৈজ্ঞানিক গবেষণা সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে চালিয়ে যেতে পারবেন।

কে ছিলেন এই হাইম ওয়াইজম্যান

হাইম ওয়াইজম্যান ১৮৭৪ সালের ২৭ নভেম্বর তৎকালীন রাশিয়ান সাম্রাজ্যের (বর্তমান বেলারুশ) একটি প্রত্যন্ত গ্রামে জন্ম নেন। তিনি সুইজারল্যান্ড এবং জার্মানি থেকে রসায়নে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন। ১৮৯৯ সালে তিনি সুইজারল্যান্ডের ফ্রিবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে তিনি যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়নের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় (১৯১৪-১৯১৮) তিনি এমন একটি ব্যাক্টেরিয়াল ফার্মেন্টেশন (গাঁজন) পদ্ধতি আবিষ্কার করেন, যা দিয়ে স্টার্চ বা শ্বেতসার থেকে প্রচুর পরিমাণে অ্যাসিটোন তৈরি করা সম্ভব হতো। অ্যাসিটোন সে সময় ব্রিটিশদের কর্ডাইট (এক ধরণের ধোঁয়াবিহীন বারুদ) তৈরির জন্য অপরিহার্য ছিল। তার এই আবিষ্কার প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীকে দারুণভাবে সাহায্য করে এবং ব্রিটিশ সরকারের উচ্চমহলে—বিশেষ করে তৎকালীন লর্ড অফ দ্য অ্যাডমিরালটি উইনস্টন চার্চিল এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার বেলফোরের সাথে তার গভীর সুসম্পর্ক তৈরি হয়।

ইসরাইলের রাষ্ট্রপতি হাইম ওয়াইজম্যান

ব্রিটিশ সরকারের ওপর নিজের বৈজ্ঞানিক ও ব্যক্তিগত প্রভাব খাটিয়ে ওয়াইজম্যান ১৯১৭ সালের ঐতিহাসিক বেলফোর ঘোষণা আদায়ে প্রধান ভূমিকা রাখেন। এই ঘোষণায় ব্রিটিশ সরকার প্রথমবার ফিলিস্তিনের মাটিতে ইহুদিদের জন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্র বা ‘জাতীয় আবাসভূমি’ প্রতিষ্ঠার প্রতি সমর্থন জানায়। এটিকে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রথম আনুষ্ঠানিক ভিত্তিপ্রস্তর ধরা হয়। ওয়াইজম্যান বিশ্ব জায়নবাদী সংস্থার সভাপতি হিসেবে দুই মেয়াদে (১৯২১–১৯৩১ এবং ১৯৩৫–১৯৪৬) দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ইহুদিদের একতাবদ্ধ করতে এবং ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ইহুদিদের অভিবাসন নিশ্চিত করতে আজীবন কাজ করেছেন।

১৯৪৮ সালের ১৪ মে যখন স্বাধীন ইসরাইল রাষ্ট্র গঠিত হয়, তখন ওয়াইজম্যানের অবদানকে সম্মান জানিয়ে তাকে দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন কাউন্সিলের সভাপতি করা হয়। পরবর্তীতে ১৯৪৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরাইলের প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। ১৯৩৪ সালে তিনি রেহোভোট শহরে একটি উন্নত গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন, যা বর্তমানে বিশ্বখ্যাত ‘ওয়াইজম্যান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স’ নামে পরিচিত। এছাড়া জেরুজালেমের হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পেছনেও তার বড় অবদান ছিল। ১৯৫২ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এই পদে আসীন ছিলেন। তার মৃত্যুর পরই আলবার্ট আইনস্টাইনকে দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।

 আমি মানুষের মনস্তত্ত্ব বুঝি না

আলবার্ট আইনস্টাইন প্রস্তাব পাওয়ার পর ৭৩ বছর বয়সী আইনস্টাইন বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে অত্যন্ত নম্রতার সাথে তা প্রত্যাখ্যান করেন। ১৮ নভেম্বর দেওয়া এক ফিরতি চিঠিতে তিনি লেখেন:

“আমি ইসরাইল রাষ্ট্রের এই প্রস্তাবে গভীরভাবে আপ্লুত, একই সাথে দুঃখিত ও লজ্জিত যে আমি এটি গ্রহণ করতে পারছি না। সারাজীবন আমি বস্তুনিষ্ঠ ও বৈজ্ঞানিক বিষয় নিয়ে কাজ করেছি। তাই মানুষের মনস্তত্ত্ব নিয়ে কাজ করার কিংবা কোনো দাপ্তরিক দায়িত্ব পালন করার মতো স্বাভাবিক দক্ষতা বা অভিজ্ঞতা—কোনোটিই আমার নেই।”

তিনি আরও যোগ করেন, বয়স বেড়ে যাওয়ার কারণে তার শারীরিক সক্ষমতাও কমে আসছে, যা এই উচ্চ পদের দায়িত্ব পালনের জন্য উপযুক্ত নয়।

পর্দার আড়ালের গল্প: বিবেক বনাম রাজনীতি

চিঠিতে আইনস্টাইন অভিজ্ঞতার অভাবের কথা বললেও, ইতিহাসবিদদের মতে এর পেছনে আরও কিছু গভীর কারণ ছিল।

কূটনৈতিক জটিলতা নিজস্ব বিবেক: আইনস্টাইন তার এক বন্ধুকে ব্যক্তিগতভাবে জানিয়েছিলেন যে, এই পদটি তার জন্য ভীষণ অস্বস্তিকর হতো। কারণ একজন রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাকে এমন অনেক সরকারি সিদ্ধান্তকে সমর্থন করতে হতো, যা হয়তো তার নিজের বিবেক ও নৈতিকতার সাথে সাংঘর্ষিক।

সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের বিরোধিতা: আইনস্টাইন একজন শান্তিবাদী (Pacifist) মানুষ ছিলেন। তিনি চরম জাতীয়তাবাদের ঘোর বিরোধী ছিলেন। ১৯৪৮ সালে ইসরাইল প্রতিষ্ঠার আগে থেকেই তিনি আরব এবং ইহুদিদের দ্বিজাতিক ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পক্ষে ছিলেন। ইসরাইল রাষ্ট্র গঠনের সময়কার কিছু চরমপন্থী সহিংসতায় তিনি গভীরভাবে ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী বেনগুরিয়নের স্বস্তি: মজার ব্যাপার হলো, আইনস্টাইন প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়ায় পর্দার আড়ালে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেন-গুরিয়ন নিজেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলেন। কারণ তিনি জানতেন, আইনস্টাইন যদি কোনো কারণে সরকারের নীতির সমালোচনা করে বসেন, তবে তা সামলানো সরকারের পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। বেন-গুরিয়ন রসিকতা করে তার সহযোগীকে বলেছিলেন, “তিনি যদি প্রস্তাব গ্রহণ করতেন, তবে আমরা বড় বিপদে পড়তাম!”

বিজ্ঞানের বুকেই চির আশ্রয়

ইসরাইলের সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়ার পর আইনস্টাইন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত প্রিন্সটনেই থেকে যান এবং বিজ্ঞানের সাধনা করে যান। ১৯৫৫ সালে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত তিনি মানুষের অধিকার ও বিশ্বশান্তির কথাই বলে গেছেন।

আইনস্টাইনের এই সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে যে, তিনি কেবল বিজ্ঞানেরই জিনিয়াস ছিলেন না, বরং নিজের সীমাবদ্ধতা এবং রাজনীতির মারপ্যাঁচ বোঝার মতো অসাধারণ দূরদর্শিতাও তার ছিল। ক্ষমতার মোহ যাকে স্পর্শ করতে পারেনি, তিনি চিরকাল রয়ে গেছেন বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ধ্রুবতারা হয়ে।

বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি

Tag :

দূরদর্শী আইনস্টাইন কেন ইসরাইলের রাষ্ট্রপতি হওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখান করেছিলেন!

আপডেট সময় ১২:০২:১৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩০ মে ২০২৬

আলবার্ট আইনস্টাইন—যার নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের জটিল সব সূত্র আর আপেক্ষিকতার তত্ত্ব। মহাবিশ্বের গূঢ় রহস্য যার ইশারায় উন্মোচিত হয়েছিল, তিনিই বিনয়ের সাথে প্রত্যাখান করেছিলেন ইসরাইলের রাষ্ট্রপতি হওয়ার প্রস্তাব। ১৯৫২ সালে  নোবেলজয়ী এই বিজ্ঞানীকে প্রস্তাবটি দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে দিয়ে তিনি ইতিহাসের অন্যতম সেরা এক দূরদর্শী একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তার এই অস্বীকৃতির পেছনে লুকিয়ে ছিল এক গভীর আত্মোপলব্ধি এবং নিজস্ব রাজনৈতিক ও নৈতিক দর্শন। যা তাকে আরও জিনিয়াসে পরিণত করেছিল।

যেভাবে এসেছিল সেই প্রস্তাব

১৯৫২ সালের নভেম্বর মাসে ইসরাইলের প্রথম রাষ্ট্রপতি হাইম ওয়াইজম্যান মৃত্যুবরণ করেন। এরপরই দেশটির তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন-গুরিয়ন এবং ওয়াশিংটনে নিযুক্ত ইসরাইলি রাষ্ট্রদূত আব্বা ইবান এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেন। তারা ভাবেন, বিশ্বজুড়ে ইহুদিদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব আলবার্ট আইনস্টাইনকে যদি দেশের দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি করা যায়, তবে তা হবে রাষ্ট্রের জন্য এক বিরাট গৌরব। ১৯৫২ সালের ১৭ নভেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটনে বসবাসরত আইনস্টাইনের কাছে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হয়। চিঠিতে প্রধানমন্ত্রী বেন-গুরিয়নের পক্ষ থেকে প্রস্তাব দেওয়া হয়, আইনস্টাইন যদি রাজি থাকেন তবে দেশটির পার্লামেন্ট ‘নেসেট’ (Knesset)-এর ভোটের মাধ্যমে তাকে রাষ্ট্রপতি করা হবে। একই সাথে আশ্বাস দেওয়া হয়, রাষ্ট্রপতি হলেও তিনি তার বৈজ্ঞানিক গবেষণা সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে চালিয়ে যেতে পারবেন।

কে ছিলেন এই হাইম ওয়াইজম্যান

হাইম ওয়াইজম্যান ১৮৭৪ সালের ২৭ নভেম্বর তৎকালীন রাশিয়ান সাম্রাজ্যের (বর্তমান বেলারুশ) একটি প্রত্যন্ত গ্রামে জন্ম নেন। তিনি সুইজারল্যান্ড এবং জার্মানি থেকে রসায়নে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন। ১৮৯৯ সালে তিনি সুইজারল্যান্ডের ফ্রিবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে তিনি যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়নের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় (১৯১৪-১৯১৮) তিনি এমন একটি ব্যাক্টেরিয়াল ফার্মেন্টেশন (গাঁজন) পদ্ধতি আবিষ্কার করেন, যা দিয়ে স্টার্চ বা শ্বেতসার থেকে প্রচুর পরিমাণে অ্যাসিটোন তৈরি করা সম্ভব হতো। অ্যাসিটোন সে সময় ব্রিটিশদের কর্ডাইট (এক ধরণের ধোঁয়াবিহীন বারুদ) তৈরির জন্য অপরিহার্য ছিল। তার এই আবিষ্কার প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীকে দারুণভাবে সাহায্য করে এবং ব্রিটিশ সরকারের উচ্চমহলে—বিশেষ করে তৎকালীন লর্ড অফ দ্য অ্যাডমিরালটি উইনস্টন চার্চিল এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার বেলফোরের সাথে তার গভীর সুসম্পর্ক তৈরি হয়।

ইসরাইলের রাষ্ট্রপতি হাইম ওয়াইজম্যান

ব্রিটিশ সরকারের ওপর নিজের বৈজ্ঞানিক ও ব্যক্তিগত প্রভাব খাটিয়ে ওয়াইজম্যান ১৯১৭ সালের ঐতিহাসিক বেলফোর ঘোষণা আদায়ে প্রধান ভূমিকা রাখেন। এই ঘোষণায় ব্রিটিশ সরকার প্রথমবার ফিলিস্তিনের মাটিতে ইহুদিদের জন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্র বা ‘জাতীয় আবাসভূমি’ প্রতিষ্ঠার প্রতি সমর্থন জানায়। এটিকে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রথম আনুষ্ঠানিক ভিত্তিপ্রস্তর ধরা হয়। ওয়াইজম্যান বিশ্ব জায়নবাদী সংস্থার সভাপতি হিসেবে দুই মেয়াদে (১৯২১–১৯৩১ এবং ১৯৩৫–১৯৪৬) দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ইহুদিদের একতাবদ্ধ করতে এবং ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ইহুদিদের অভিবাসন নিশ্চিত করতে আজীবন কাজ করেছেন।

১৯৪৮ সালের ১৪ মে যখন স্বাধীন ইসরাইল রাষ্ট্র গঠিত হয়, তখন ওয়াইজম্যানের অবদানকে সম্মান জানিয়ে তাকে দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন কাউন্সিলের সভাপতি করা হয়। পরবর্তীতে ১৯৪৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরাইলের প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। ১৯৩৪ সালে তিনি রেহোভোট শহরে একটি উন্নত গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন, যা বর্তমানে বিশ্বখ্যাত ‘ওয়াইজম্যান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স’ নামে পরিচিত। এছাড়া জেরুজালেমের হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পেছনেও তার বড় অবদান ছিল। ১৯৫২ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এই পদে আসীন ছিলেন। তার মৃত্যুর পরই আলবার্ট আইনস্টাইনকে দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।

 আমি মানুষের মনস্তত্ত্ব বুঝি না

আলবার্ট আইনস্টাইন প্রস্তাব পাওয়ার পর ৭৩ বছর বয়সী আইনস্টাইন বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে অত্যন্ত নম্রতার সাথে তা প্রত্যাখ্যান করেন। ১৮ নভেম্বর দেওয়া এক ফিরতি চিঠিতে তিনি লেখেন:

“আমি ইসরাইল রাষ্ট্রের এই প্রস্তাবে গভীরভাবে আপ্লুত, একই সাথে দুঃখিত ও লজ্জিত যে আমি এটি গ্রহণ করতে পারছি না। সারাজীবন আমি বস্তুনিষ্ঠ ও বৈজ্ঞানিক বিষয় নিয়ে কাজ করেছি। তাই মানুষের মনস্তত্ত্ব নিয়ে কাজ করার কিংবা কোনো দাপ্তরিক দায়িত্ব পালন করার মতো স্বাভাবিক দক্ষতা বা অভিজ্ঞতা—কোনোটিই আমার নেই।”

তিনি আরও যোগ করেন, বয়স বেড়ে যাওয়ার কারণে তার শারীরিক সক্ষমতাও কমে আসছে, যা এই উচ্চ পদের দায়িত্ব পালনের জন্য উপযুক্ত নয়।

পর্দার আড়ালের গল্প: বিবেক বনাম রাজনীতি

চিঠিতে আইনস্টাইন অভিজ্ঞতার অভাবের কথা বললেও, ইতিহাসবিদদের মতে এর পেছনে আরও কিছু গভীর কারণ ছিল।

কূটনৈতিক জটিলতা নিজস্ব বিবেক: আইনস্টাইন তার এক বন্ধুকে ব্যক্তিগতভাবে জানিয়েছিলেন যে, এই পদটি তার জন্য ভীষণ অস্বস্তিকর হতো। কারণ একজন রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাকে এমন অনেক সরকারি সিদ্ধান্তকে সমর্থন করতে হতো, যা হয়তো তার নিজের বিবেক ও নৈতিকতার সাথে সাংঘর্ষিক।

সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের বিরোধিতা: আইনস্টাইন একজন শান্তিবাদী (Pacifist) মানুষ ছিলেন। তিনি চরম জাতীয়তাবাদের ঘোর বিরোধী ছিলেন। ১৯৪৮ সালে ইসরাইল প্রতিষ্ঠার আগে থেকেই তিনি আরব এবং ইহুদিদের দ্বিজাতিক ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পক্ষে ছিলেন। ইসরাইল রাষ্ট্র গঠনের সময়কার কিছু চরমপন্থী সহিংসতায় তিনি গভীরভাবে ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী বেনগুরিয়নের স্বস্তি: মজার ব্যাপার হলো, আইনস্টাইন প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়ায় পর্দার আড়ালে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেন-গুরিয়ন নিজেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলেন। কারণ তিনি জানতেন, আইনস্টাইন যদি কোনো কারণে সরকারের নীতির সমালোচনা করে বসেন, তবে তা সামলানো সরকারের পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। বেন-গুরিয়ন রসিকতা করে তার সহযোগীকে বলেছিলেন, “তিনি যদি প্রস্তাব গ্রহণ করতেন, তবে আমরা বড় বিপদে পড়তাম!”

বিজ্ঞানের বুকেই চির আশ্রয়

ইসরাইলের সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়ার পর আইনস্টাইন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত প্রিন্সটনেই থেকে যান এবং বিজ্ঞানের সাধনা করে যান। ১৯৫৫ সালে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত তিনি মানুষের অধিকার ও বিশ্বশান্তির কথাই বলে গেছেন।

আইনস্টাইনের এই সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে যে, তিনি কেবল বিজ্ঞানেরই জিনিয়াস ছিলেন না, বরং নিজের সীমাবদ্ধতা এবং রাজনীতির মারপ্যাঁচ বোঝার মতো অসাধারণ দূরদর্শিতাও তার ছিল। ক্ষমতার মোহ যাকে স্পর্শ করতে পারেনি, তিনি চিরকাল রয়ে গেছেন বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ধ্রুবতারা হয়ে।

বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি