ইন্টারনেটের বড় একটি অংশে ব্যবহৃত প্রোগ্রামিং ভাষা পিএইচপি’তে দুটি গুরুতর নিরাপত্তা ত্রুটি শনাক্ত হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক ওয়েবসাইট সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। ত্রুটি দুটি কাজে লাগিয়ে হ্যাকাররা দূর থেকেই আক্রান্ত সার্ভারে অননুমোদিত নির্দেশনা চালাতে এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের নাগাল পেতে পারে বলে সতর্ক করেছেন সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা।
বুধবার পিএইচপির উন্নয়নকারীরা ত্রুটি সংশোধনের জন্য নিরাপত্তা হালনাগাদ প্রকাশ করেন। তবে তার আগেই বিভিন্ন দেশের সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা ঝুঁকিপূর্ণ ওয়েবসাইটের পরিচালকদের দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানায়। যেসব প্রতিষ্ঠান তাৎক্ষণিকভাবে ত্রুটি সংশোধন করতে পারবে না, তাদের আক্রান্ত সিস্টেম সাময়িকভাবে ইন্টারনেট থেকে বিচ্ছিন্ন রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়।
ফিনল্যান্ডের সরকারি ওয়েবসেবাগুলো সতর্কতামূলকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। নেদারল্যান্ডসের সাইবার নিরাপত্তা সংস্থাও নিজেদের ওয়েবসাইট সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার কথা জানায়। এ ছাড়া দেশটির বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল এবং রাজনৈতিক দলের ওয়েবসাইটেও বিঘ্ন দেখা যায়। জার্মানি ও ফ্রান্সের সরকারি ওয়েবসাইটের কিছু অংশও সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়।
অনলাইন বিশ্বকোষ উইকিপিডিয়ার পরিচালনাকারী উইকিমিডিয়া ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, তারা নিরাপত্তা ত্রুটি সংশোধনের কাজ করছে। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে কিছু সিস্টেম বন্ধ রাখায় বুধবার ব্যবহারকারীরা উইকিপিডিয়ার কয়েকটি সেবা ব্যবহারে সমস্যায় পড়েন। এডিনবরা সিটি কাউন্সিলের ওয়েবসাইট এবং বিবিসির ‘ডক্টর হু’ ও ‘দ্য ট্রেইটার্স’-এর মতো কয়েকটি অনুষ্ঠানের ওয়েবপেজও অপ্রাপ্য হয়ে পড়ে। তবে এসব ওয়েবসাইট সরাসরি পিএইচপির ত্রুটির কারণে বন্ধ হয়েছিল কি না, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেনি।
কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে- পিএইচপি এমন একটি প্রোগ্রামিং ভাষা, যা ওয়েবসাইটের পেছনে কাজ করে। ব্যবহারকারী কোনো ওয়েবপেজ খুললে সার্ভার পিএইচপির সাহায্যে প্রয়োজনীয় তথ্য ও কনটেন্ট প্রস্তুত করে ব্রাউজারে পাঠায়। ওয়ার্ডপ্রেসসহ বহুল ব্যবহৃত বিভিন্ন ওয়েবসাইট ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যারেও ভাষাটি ব্যবহৃত হয়।
প্রযুক্তি পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ডব্লিউথ্রিটেকসের হিসাব অনুযায়ী, যেসব ওয়েবসাইটের প্রোগ্রামিং ভাষা শনাক্ত করা সম্ভব, সেগুলোর প্রায় ৭০ শতাংশে পিএইচপি ব্যবহৃত হয়। ফলে একই ভাষার গুরুতর দুর্বলতা বিপুলসংখ্যক ওয়েবসাইটকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে সব ওয়েবসাইট আক্রান্ত হয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা সার্ট-ইইউ জানিয়েছে, ত্রুটি দুটির ঝুঁকির মাত্রা থেকে বোঝা যায়, আক্রমণকারী কোনো ব্যবহারকারীর অনুমোদন বা পাসওয়ার্ড ছাড়াই দূর থেকে সার্ভারে কোড চালানোর সুযোগ পেতে পারে। এমন আক্রমণ সফল হলে তথ্য চুরি, ওয়েবসাইটের কনটেন্ট পরিবর্তন, ক্ষতিকর সফটওয়্যার স্থাপন কিংবা সার্ভারের নিয়ন্ত্রণ হারানোর মতো ঘটনা ঘটতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা (এনএসএ) সতর্ক করেছে, এ ধরনের দুর্বলতা সার্ভারের ফাইল ব্যবস্থা বা ডেটাবেইসে সরাসরি প্রবেশের সুযোগ তৈরি করতে পারে। যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, অস্ট্রেলিয়া ও জাপানের সাইবার নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষও দ্রুত নিরাপত্তা হালনাগাদ ইনস্টল করার পরামর্শ দিয়েছে।
ত্রুটি শনাক্তে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা- এ ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ত্রুটিগুলো শনাক্ত করা হয়েছে। সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ক্যালিফ ও উইজের গবেষকেরা এ কাজে এআইয়ের সহায়তা নেন। ওপেনএআইয়ের ‘প্যাচ দ্য প্ল্যানেট’ কর্মসূচির আওতায় ক্যালিফ ও পিএইচপি ফাউন্ডেশন উন্নত এআই সরঞ্জাম ব্যবহারের সুযোগ পেয়েছিল।
ওপেনএআই জানিয়েছে, তাদের এআই সরঞ্জাম ব্যবহার করে নিরাপত্তা দুর্বলতা শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির একজন গবেষকও প্রায় একই সময়ে সমস্যাটি শনাক্ত করেন বলে জানানো হয়েছে। উইজের গবেষকেরা বলেছেন, উন্নত এআই মডেলের সাহায্যে বিভিন্ন সফটওয়্যারে সম্ভাব্য আক্রমণ যাচাই ও কার্যকর করার উপায় তৈরি করা আগের তুলনায় অনেক দ্রুত হয়েছে।
গবেষকদের ভাষ্য, দুর্বলতাগুলো এক দশকেরও বেশি সময় ধরে অশনাক্ত ছিল। তবে এআইয়ের সাহায্যে সেগুলো শনাক্ত হওয়ার পর সমস্যার ব্যাপকতা সামনে আসে। উইজের হিসাবে, ইন্টারনেটের প্রায় ৭০ শতাংশ এর আওতায় পড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। বিবিসি অবশ্য এই হিসাব স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।
হালনাগাদ না করলে ঝুঁকি থেকেই যাবে- সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু নিরাপত্তা হালনাগাদ প্রকাশ করলেই ঝুঁকি শেষ হবে না। কোন কোন সার্ভার, ওয়েবসাইট, হোস্টিং সেবা এবং তৃতীয় পক্ষের সফটওয়্যারে পিএইচপি ব্যবহৃত হচ্ছে, তা শনাক্ত করে সেগুলো হালনাগাদ করতে হবে। কোনো সিস্টেমে আগে থেকেই অনুপ্রবেশ ঘটেছে কি না, সেটিও পরীক্ষা করা জরুরি।
ইন্টারনেট অবকাঠামো সেবাদাতা ক্লাউডফ্লেয়ারের প্রযুক্তিপ্রধান ডেন ক্রেখট জানিয়েছেন, দুর্বলতাগুলো কাজে লাগিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ের আক্রমণের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি নতুন আক্রমণপদ্ধতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রতিরোধব্যবস্থা হালনাগাদ করছে। তবে সব আক্রান্ত ওয়েবসাইটে সফল সাইবার হামলা হয়েছে- এমন কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
পিএইচপি ফাউন্ডেশন নিরাপত্তা হালনাগাদ প্রকাশ করলেও পুরোনো সংস্করণ ব্যবহারকারীদের জন্য ঝুঁকি মোকাবিলা আরও কঠিন হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা তাই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে দ্রুত সমর্থিত সংস্করণে উন্নীত হওয়া, নিরাপত্তা প্যাচ প্রয়োগ এবং সার্ভারের কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের পরামর্শ দিয়েছেন।
ঘটনাটি দেখিয়েছে, একটি বহুল ব্যবহৃত প্রোগ্রামিং ভাষার দুর্বলতা একসঙ্গে বহু দেশের সরকারি ও বেসরকারি ডিজিটাল সেবাকে প্রভাবিত করতে পারে। একই সঙ্গে এআই যেমন জটিল নিরাপত্তা ত্রুটি শনাক্তে সহায়তা করছে, তেমনি সেই ত্রুটি কাজে লাগানোর সক্ষমতাও বাড়তে পারে। তাই দ্রুত সংশোধন, নিয়মিত নিরাপত্তা পরীক্ষা এবং সম্ভাব্য আক্রমণ শনাক্ত করার প্রস্তুতি এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: বিবিসি
বাংলা৭১নিউজ/জেএস
























