প্রাচীন গ্রিসের কিংবদন্তি, যার লেখা মহাকাব্য হাজার হাজার বছর ধরে বিশ্বসাহিত্যের বিস্ময় হয়ে টিকে আছে। তিনি হোমার। ‘ইলিয়াড’ এবং ‘ওডিসি’, এই দুটি মহাকাব্যের স্রষ্টা হিসেবে তার নাম ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকলেও, ব্যক্তি হোমারকে ঘিরে রহস্যের কোনো অন্ত নেই।
তিনি দেখতে কেমন ছিলেন? সত্যিই কি অন্ধ ছিলেন? নাকি হোমার বলতে বাস্তবে কোনো একক ব্যক্তির অস্তিত্বই ছিল না? প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের গবেষক, সবার কাছেই হোমার এক অমীমাংসিত রহস্যের নাম।
খ্রিস্টপূর্ব ৭৫০ থেকে ৬৫০ অব্দের মাঝামাঝি কোনো এক সময়ে লেখা হয়েছিল ‘ইলিয়াড’ ও ‘ওডিসি’। ‘ইলিয়াড’-এ ট্রয় যুদ্ধের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম আর ‘ওডিসি’-তে বীর অডিসিউসের নিজ ঘরে ফেরার বিপদসংকুল যাত্রার কথা তুলে ধরা হয়েছে। সাহিত্যে এই দুটি মহাকাব্যের প্রভাব এতটাই বিশাল যে, সাহিত্য সমালোচক হ্যারল্ড ব্লুম একবার মন্তব্য করেছিলেন, “পশ্চিমা বিশ্বে বর্তমানে যারা সাহিত্য পড়েন বা লেখেন, তাদের জাতিগত, লৈঙ্গিক বা আদর্শিক প্রেক্ষাপট যাই হোক না কেন, তারা প্রত্যেকেই মূলত হোমারের সন্তান।”
হাজার বছর ধরে এই মহাকাব্যগুলো মানুষের মুখে মুখে ফিরেছে, লিখিত রূপ পেয়েছে এবং আধুনিক সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় এর ছাপ রেখে গেছে। কিন্তু এত কিছুর পরও, স্রষ্টা হোমার নিজেই যেন প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে রয়ে গেছেন।
হোমারকে প্রায়ই ‘অন্ধ বৃদ্ধ কবি’ হিসেবে চিত্রিত করা হয়। কিন্তু এই অন্ধত্বের ধারণার শুরুটা কোথায়? গবেষকরা মনে করেন, এই জল্পনার সূত্রপাত স্বয়ং তার নাম থেকে। প্রাচীন গ্রিক ভাষায় ‘হোমেরোস’ শব্দের অর্থ হতে পারে ‘অন্ধ’ অথবা ‘জিম্মি’। নামের এই অর্থই হয়তো তাকে অন্ধ হিসেবে ভাবার প্রথম ইন্ধন জুগিয়েছিল।
এই তত্ত্বকে আরও জোরালো করেছে ‘ওডিসি’ মহাকাব্যের ডেমোডোকাস চরিত্রটি। ডেমোডোকাস হলো রাজদরবারে গান গাওয়া এক অন্ধ চারণকবি। অনেক সাহিত্যিকের মতে, এই ডেমোডোকাস চরিত্রটি আসলে হোমারের নিজেরই এক ছায়াসত্তা। নিজের অবয়বকেই তিনি হয়তো এই অন্ধ চারণকবির মাধ্যমে মহাকাব্যে অমর করে রেখে গেছেন।
তাহলে কিংবদন্তি আড়ালে কীভাবে দৃষ্টি হারালেন মহাকবি? কালের পরিক্রমায় প্রাচীন গ্রিক সমাজের অনেকেই হোমারের অন্ধত্বের কথা প্রচার করেছেন। দার্শনিক অ্যারিস্টটল তাকে অন্ধ হিসেবেই বর্ণনা করেছেন। আবার ‘রোমান লাইফ অব হোমার’-এর মতো প্রাচীন বইগুলো ঘাঁটলে হোমারের জীবন ও অন্ধত্ব নিয়ে রোমাঞ্চকর সব মিথের দেখা মেলে।
সেখানে বলা হয়েছে, হোমারের জন্মের সময় নাম ছিল মেলেসিজেনিস বা মেলেসাগোরাস। পরে লেসবিয়ান উপভাষায় তাকে ‘হোমার’ বলে ডাকা শুরু হয়, কারণ লেসবিয়ানরা অন্ধদের ‘হোমেরোই’ বলত। অন্য একটি বর্ণনা অনুযায়ী, তাকে একবার কোনো রাজার কাছে জিম্মি হিসেবে রাখা হয়েছিল বলে তার নাম হয়ে যায় ‘হোমার’, যেহেতু হোমার শব্দের আরেক অর্থ জিম্মি বা গ্যারান্টি।
তবে সবচেয়ে চমকপ্রদ গল্পটি তার অন্ধ হওয়ার পেছনের কারণ নিয়ে। প্রচলিত আছে, হোমার একবার বীর অ্যাকিলিসের সমাধির সামনে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করেছিলেন, অ্যাকিলিস যখন তার নতুন বর্ম আর অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে যুদ্ধের ময়দানে অবতীর্ণ হতেন, ঠিক সেই বীরত্বপূর্ণ রূপে তিনি তাকে একবার দেখতে চান।
হোমারের ডাকে সাড়া দিয়ে অ্যাকিলিস যখন আবির্ভূত হলেন, তখন তার ঐশ্বরিক অস্ত্রের ঝলকানিতে হোমারের দুই চোখ চিরতরে অন্ধ হয়ে যায়। এই মর্মান্তিক ঘটনায় দেবী থেটিস এবং শিল্পের দেবী মিউজরা হোমারের প্রতি করুণাসিক্ত হয়ে তার দৃষ্টিশক্তির বদলে তাকে দান করেন কাব্য রচনার এক ঐশ্বরিক ক্ষমতা।
আরেকটি মিথ অনুযায়ী, হোমারের অন্ধত্বের পেছনে ছিল হেলেনের অভিশাপ। হোমার তার কাব্যে দাবি করেছিলেন যে, হেলেন তার প্রথম স্বামীকে ছেড়ে প্যারিসের (আলেকজান্ডার) হাত ধরে পালিয়েছিলেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে হেলেনের প্রেতাত্মা রাতের বেলা হোমারের কাছে এসে তাকে সাবধান করে যায় এবং প্রাণ বাঁচাতে নিজের সমস্ত কবিতা পুড়িয়ে ফেলতে বলে। কিন্তু হোমার তা করতে অস্বীকৃতি জানান এবং পরিণতিস্বরূপ নিজের দৃষ্টিশক্তি হারান।
হোমার কি সত্যিই বাস্তবে ছিলেন? হোমার সত্যিই অন্ধ ছিলেন কি না, তার চেয়েও বড় বিতর্ক হলো, হোমার নামের কোনো মানুষের আদৌ কোনো অস্তিত্ব ছিল কি না। আধুনিক ক্লাসিকবাদীদের কাছে এটি একটি বড় প্রশ্ন। অনেক পণ্ডিত মনে করেন, ‘ইলিয়াড’ বা ‘ওডিসি’ কোনো একক ব্যক্তির রচনা নয়। লেখক ও গবেষক ডেইজি ডানের মতে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে অসংখ্য চারণকবির মুখে মুখে ঘুরে এই গল্পগুলো বর্তমান রূপ পেয়েছে। হোমার হয়তো সেই অসংখ্য কবিরই একটি সম্মিলিত কাল্পনিক নাম।
ডান আরও মনে করেন, হোমারের অন্ধত্বের বিষয়টিও সম্পূর্ণ একটি ‘মনগড়া মিথ’। প্রাচীন গ্রিসে যখন লেখার প্রচলন শুরু হয়নি, তখন গল্পগুলো মানুষের মুখে মুখে ছড়াতো। একজন চারণকবি চোখে না দেখেও যে তার স্মৃতিশক্তি আর কল্পনার ওপর ভর করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মহাকাব্য আবৃত্তি করতে পারেন, সেই ধারণাকে মহিমান্বিত করতেই হয়তো হোমারের অন্ধত্বের গল্পটি তৈরি করা হয়েছিল।
গবেষক বারবারা গ্র্যাজিওসি তার লেখায় দেখিয়েছেন যে, অন্ধত্ব, দারিদ্র্য এবং দেবতাদের কাছাকাছি থাকা—এই তিনটি বৈশিষ্ট্য প্রাচীনকালে চারণকবিদের জন্য খুব সাধারণ ব্যাপার ছিল। হোমারের অন্ধত্বকে অনেক সময় তার কাব্যিক প্রতিভার ‘ঐশ্বরিক ক্ষতিপূরণ’ হিসেবে দেখা হতো।
প্রাচীন উপাখ্যানগুলোতে হোমারের মৃত্যুর ঘটনাটিও বেশ রহস্যময়। বলা হয়, ইয়োস দ্বীপে তিনি মারা যান। সেখানে কয়েকজন জেলে বালকের একটি ধাঁধার সমাধান করতে না পারার হতাশায় তার মৃত্যু হয়েছিল বলে জনশ্রুতি রয়েছে। ধাঁধাটি ছিল এমন: “আমরা যা ধরেছি তা ফেলে এসেছি, আর যা ধরতে পারিনি তা সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছি।” মূলত এই ধাঁধাটির উত্তর ছিল—‘মাথার উকুন’।
হোমারের সমাধির ওপর যে এপিটাফ বা লিপি খোদাই করা ছিল, তা আজও মানুষকে আলোড়িত করে। সেখানে যা লেখা ছিল তা বাংলায় অনেকটা এরকম: “এখানে মাটি ঢেকে রেখেছে দিব্য হোমারের পবিত্র মাথাকে, যিনি ছিলেন বীর পুরুষদের শিল্পী।”
খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীর দিকে গ্রিকরা যখন তাদের ঐতিহাসিক চরিত্রগুলোর প্রতিকৃতি তৈরি করতে শুরু করে, তখন হোমারকে চিত্রিত করা হয়েছিল দীর্ঘ, পরিপাটি দাড়ি আর লম্বা চুলের এক বৃদ্ধ হিসেবে। তার চেহারায় ছিল স্নিগ্ধ আদর্শিক রূপ, আর চোখ দুটো বড় ও বোজা, যা তার অন্ধত্বেরই প্রতীক বলে ধারণা করা হয়।
‘ইলিয়াড’ এবং ‘ওডিসি’-এর প্রভাব যতই বেড়েছে, হোমারের এই অন্ধ রূপটি মানুষের মনে ততই শক্তভাবে গেঁথে গেছে। তিনি আসলে কে ছিলেন, আদৌ ছিলেন কি না, কিংবা তিনি পৃথিবীর আলো দেখতে পেতেন কি না, এইসব অমীমাংসিত প্রশ্ন আজও তার পরিচয়ের চারপাশে রহস্য তৈরি করে রেখেছে। আর এ রহস্যই হয়তো তার সাহিত্যকর্মের আবেদনকে যুগে যুগে আরও বেশি আকর্ষণীয় করে তুলেছে। অন্ধত্বের আঁধার পেরিয়ে তিনি মানবজাতিকে যে সাহিত্যের আলো দিয়েছেন, তা সত্যিই চিরন্তন।
তথ্যসূত্র: হিস্ট্রি ডটকম
বাংলা৭১নিউজ/জেএস




























